ইঁদুর জীবন

  শফিক হাসান ২৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চল্লিশ পেরোনোর আগেই অর্ধেক চুল ঝরে গেছে মোছলেহ উদ্দিনের। ডানে বামে পেছনে কয়েক গাছি অবশিষ্ট থাকলেও সামনের পুরোটাই ফাঁকা। আলোতে সেই টাক ঝকঝক করে। চাইলে যে কেউ টাক মাথাকে আয়না হিসেবে ব্যবহার করে শেভ সারতে পারবে! আজ কন্ডাক্টর যখন ১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা নিল, ঘাম নামল জুলফি বেয়ে- ‘ভাড়া ১৫ টাকাই রাখবে?’

ভিড় ঠেলে পেছনে অগ্রসর হতে হতে সে বলল, ‘৫ টাকা ঈদের বকশিশ।’

‘ঈদ তো শেষ হয়েছে ১০ দিন আগেই!’

বিস্ময়টুকু ছোকরা কন্ডাক্টরের উত্তরে উবে গেল- ‘কোরবানির গোশত এখনও হগলের পাতিলে, ফিরিজে আছে না!’

কন্ডাক্টরের যুক্তিতে মোছলেহ উদ্দিন পরাস্ত হলেও পেছনের যাত্রীরা হার মানেনি। এক যাত্রী প্রতিবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শুরু করল তুমুল বচসা। এক পর্যায়ে কন্ডাক্টরের গালে চড় মেরে বসল। একপক্ষ অন্যপক্ষকে ‘ছোটলোক’ গালি দিয়ে শুরু করল টকশোর আদলে বাসশো! দেরি করা মানে বসদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া। প্রাইভেট ফার্মের চাকরি বলে কথা। দেরি মানেই বসের ঝাড়ি!

পরিবহনকর্মীরা বরাবরই রাস্তার রাজা। তাদের নেতারাও একেকজন সম্রাট। এদের খেয়ালখুশির পুতুল না হয়ে উপায় কী! দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোছলেহ উদ্দিন হাঁটা দিলেন অফিসের দিকে। রিকশায় উঠলে ৫০ টাকা ভাড়া চাইবে। বড়জোর ১০ মিনিটের পথ কিন্তু পকেটকাটা ভাড়া! পাকিস্তানি লেহেঙ্গার বিখ্যাত শোরুম অতিক্রমের সময় গরমের মাত্রা বাড়ল। তার স্ত্রীর পছন্দ পাকিস্তানি মুরগি। সকালে বাজার থেকে দুই আঁটি শাপলা শাক, এক কেজি আলু ও তিন ভাগা কুচো চিংড়ি নিয়ে বাসায় গেলেন। ‘দরিদ্র’ সওদায় রেগে ব্যাগসুদ্ধ ছুড়ে মারলেন সানজিদা। নিদেনপক্ষে একটা পাকিস্তানি মুরগি কেনার ক্ষমতা হল না মোছলেহ উদ্দিনের! বিগত দিনের মতো বোঝানোর চেষ্টা করলেন- ভোগে সুখ নেই। আর দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে পাকিস্তানি মুরগি কেন সব পণ্যই বর্জন করা উচিত।

‘তোমার চালাকি বুঝি না? আমাকে পাকিস্তানি লেহেঙ্গা কিনে দেবে না বলেই দেশপ্রেম দেখাও।’

সানজিদাকে বোঝানোর সাধ্য মোছলেহ উদ্দিনের নেই। তবু মিনমিনে গলায় বলল, ‘লুঙ্গি আর লেহেঙ্গা প্রায় একই জিনিস। আমার লুঙ্গি পরলেই পারো!’

জ্বলন্ত উনুনে ঘি পড়ল। সানজিদা কল করলেন আড়তদার বাবাকে- ‘ফকিরের বাচ্চার হাতে আমাকে তুলে দিয়েই দায়িত্ব সারলে? তোমার জামাই বলছে, আমাকে আর পোশাক কিনে দেবে না। আজ থেকে তার লুঙ্গি-শার্ট পরেই কাটাতে হবে বাকি জীবন!’

ওপাশ থেকে বাবা জানালেন, আজই আসছেন তিনি। বিহিত না করে ছাড়বেন না!

বাবার আগমনবার্তা শুনিয়ে সানজিদা ফের বাজারে পাঠালেন মোছলেহ উদ্দিনকে। শূন্য পকেটে দ্বিতীয়বার বাজারমুখী হলে নিজেকে ধাড়ি একটা ইঁদুর মনে হল। তাড়া খেয়ে ইঁদুর এদিক থেকে ওদিকে পালায়- তিনিও তাই।

অবশেষে মোছলেহ উদ্দিন অফিসে পৌঁছালেন। সাদা শার্ট ভিজে শরীরে সেঁটে গিয়ে দৃশ্যমান হয়েছে সেচ প্রকল্প। ঠাট্টার সম্পর্কের সহকর্মী জিল্লুর রহমান বললেন, ‘সাদা কাপড় পরে নায়িকারা বৃষ্টিতে ভিজে গান গায়; তাদের সাদা পোশাক ভেদ করে পেট-পিঠ উঁকি দেয়- দেখতে ভালো লাগে। আপনার এ ফ্যাশনে কে বিনোদিত হবে!’

‘সাদামাটা মানুষের পছন্দ সাদাই।’

রং-ঢঙের কথার মধ্যেই ভেতরে বসের তলব। বসার আগেই পিয়ন হাজির- ‘বড় স্যার সালাম দিয়েছেন!’

সালামের উত্তরটা ফেরত পাঠাতে পারলে ভালো হতো। তা সম্ভব নয়। উদ্দেশ্যমূলক সালাম ধাতানি দেয়ার প্রাথমিক স্তর। বস চিকন দৃষ্টিতে তাকালেন তার দিকে। মনে করিয়ে দিলেন, চারদিন ছুটি কাটানোর পরও সময়মতো অফিসে পৌঁছায় না যে ব্যক্তি- কোন আক্কেলে ইনক্রিমেন্টের আশায় থাকে!

মোছলেহ উদ্দিন মুখ ফসকে বলে ফেলল, তার চেয়ে শতগুণ বেশি অনিয়মিত করেন সোলেমান সাহেব। তার ইনক্রিমেট কিংবা পদোন্নতি কোনোটাই আটকায়নি। চেহারায় ক্রুর ভাব ফুটিয়ে তুলে বস বললেন, ‘তিনি আর আপনি কি এক?’

টনক নড়ল তার। সত্যিই, দুজনে এক নন। সোলেমান অফিসে ঢুকেই আধাঘণ্টা সময় কাটান বসের রুমে। বসের ঘরের-বাইরের খবর নেন। দুর্দান্ত পোশাক পরেছেন বস, তাকে দারুণ মানিয়েছে- জানিয়ে দেন মুগ্ধতার কথা। অফিস ছুটির শেষেও খোশগল্প করতে ভোলেন না। এমন চৌকস লোকের সঙ্গে নিজের তুলনা নির্বুদ্ধিতা।

বসের ঝাড়ি খেয়ে কাজে মন বসল না। তার ওপর অফিসেও মশার উৎপাত। চেয়ারে বেশিক্ষণ বসা যায় না। কুটুর কুটুর কামড়ায়। এরমধ্যে ডেঙ্গু হলে তবেই কম্মো সারা! এক ঘণ্টায় তিনটা ভুল করলে ইমিডিয়েট বস তাকে অকর্মণ্য উপাধি দিলেন।

জিল্লুর রহমানের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিতে হল। আগামীকাল অফিসে আসার ভাড়াও নেই। বাজার না করে তিনি কোন চুলোয় গিয়েছেন জানতে চেয়ে সানজিদা কল করেছেন। শেষে জানালেন, বাবা বাসায় পৌঁছেছেন, আপ্যায়নের জন্য মাছ-মাংস ও রসমালাই লাগবে। মাছ-মাংস না কিনে রসমালাই নিয়ে বাসার কাছাকাছি পৌঁছালেন তিনি। অপ্রত্যাশিত সালাম চিন্তাজগৎ থেকে বাস্তবে ফেরালো তাকে। অন্ধকারে ঝাঁকিয়ে উঠল ছিনতাইকারীর ছুরি! ছিনতাই হল রসমালাই, সামান্য ক’টা টাকা। যাওয়ার আগে ছিনতাইকারী বলে গেল, সে শিক্ষিত বেকার। চাকরি না পেয়ে বিকল্প পেশা নিয়েছে তাকে যেন ক্ষমা করে দেয়া হয়! প্রমাণ হিসেবে দেখাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সনদ।

অতি দুঃখেও হাসল মোছলেহ উদ্দিন। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দেখল, একটা ইঁদুর তাকে দেখে সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে ছুটে গেল নর্দমার দিকে।

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×