চারিদিকে যুদ্ধ

  শফিক হাসান ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ছা-পোষা কেরানি হয়ে ওঠা মোফাজ্জল হোসেনের দু’চোখ ভরা স্বপ্ন আর মন-ভরা ভয়! নিত্যদিনের রকমারি যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে ভীরু থেকে যথার্থই কাপুরুষ হয়ে উঠছেন তিনি। অথচ একসময় রাজনীতি করে মন্ত্রী-এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। এখনও কোথাও কোনো নির্বাচন বা উপনির্বাচনের খবর শুনলে ইচ্ছা করে দাঁড়িয়ে যেতে। মনোনয়ন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। কিন্তু ঘরে-বাইরে কোথাও সমর্থন পান না। বউ রানু বেগম মুখ ঝামটা মেরে বলেন, ‘তুমি নির্বাচনে দাঁড়াতে চাও কোন আক্কেলে?’

‘জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে, তাদের দুঃখে সুখী হয়ে...!’

‘আগে নিজের পায়ে দাঁড়াও, তারপর জনগণ!’

‘নিজের পায়েই তো সেই কবে থেকেই দাঁড়িয়ে আছি।’

‘কত টাকা পকেটে নিয়ে দাঁড়াতে চাও শুনি?’

গুনে দেখা মিললো সর্বসাকুল্যে ৬৭৯ টাকার। হাসলেন বউ, ‘অর্থনৈতিক ভিত পোক্ত না হলে সেটাকে দাঁড়ানো বলে না! প্রথম রাউন্ড মানে নমিনেশন যুদ্ধেই তুমি হেরে যাবে, ভোটারের দুয়ারে দৌড়ানো তো দূরের কথা। ছোট্ট সংসারটা চালাতে পারছো না, তুমি চালাবে দেশ! তোমার মতো ব্যর্থ লোকের পক্ষে দেশ-জনতা আর রোহিঙ্গা পরিস্থিতিসহ নানাকিছু সামাল দেয়া?’

‘মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাচ্ছি নাকি! আমার যুদ্ধ হবে ইয়াবা ডনদের বিরুদ্ধে। যারা যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে! কত নায়িকা-গায়িকা থেকে শুরু করে তরুণীরাও আজকাল মাদকের জালে জড়াচ্ছে।’

‘মিনসের আদিখ্যেতা দেখে বাঁচি না। এ বয়সেও তরুণী পটানোর স্বপ্ন দেখে। আমার হাড়-মাংস চিবিয়ে খেয়ে...।’

মোফাজ্জল হোসেন বললেন, ‘জীবনভর আমাকে জ্বালিয়েছো, শেষ বয়সেও একটু স্বস্তি দেবে না? সাহস থাকলে কবেই হেমলকের পেয়ালা তুলে নিয়ে ভব-যন্ত্রণা মিটিয়ে ফেলতাম!’

‘আমার কী হবে রে! কার সঙ্গে সংসার পাতলাম রে...।’ বলতে বলতে ফ্লোরে আছড়ে পড়লেন রানু। জুড়ে দিলেন মরাকান্না। বড় এক ব্যবসায়ী তাকে বিয়ে করতে এসেছিল। সেখানে মত না দিয়ে কোন পাপে এ হতচ্ছাড়ার গলায় ঝুলে পড়লেন! এসব কথা বলতে লাগলেন বিলাপ করে। মোফাজ্জল হোসেন বিরক্ত হলেন। বড় ব্যবসায়ী না ছাই, খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, ওই লোক তার খালুর মুদি দোকান সামলায়। এখনও একই কাজ করে। দুনিয়ার ম্যান্দামারা লোকজন নিয়ে সবার স্ত্রী ফ্যান্টাসিতে ভোগে- অমুকের সঙ্গে বিয়ে হলে জীবন কত সুখেরই না হতো!

শব্দ-সন্ত্রাসে টিকতে না পেরে ছুটে এলো এ দম্পতির সন্তান রনি- ‘তোমরা কী শুরু করলে? পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছি না!’

রানু তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন, ‘দেখ না, তোর বাবা এ বয়সে আরেকটা বিয়ে করতে চায়!’

বিব্রতকর বিষয়গুলোও সয়ে গেছে রনির, ‘আমাকে পানিপথের যুদ্ধ, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিষয়গুলো মুখস্থ করতে হচ্ছে। সিলেবাসে মা-বাবার গৃহযুদ্ধের প্রসঙ্গ নেই।’

ইন্টারমিডিয়েট পাস করে রনি প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিযুদ্ধের। এ জন্য রাত-দিন একাকার করে পড়ছে। ভর্তিযুদ্ধে হারা চলবে না। তাহলে জীবনযুদ্ধেও ধুঁকতে হবে পদে পদে। এ বয়সেও সচেতন সে।

মোফাজ্জল হোসেন বললেন, ‘কয়টা বিশ্ববিদ্যালয়কে টার্গেট করলি?’

‘সবখানেই পরীক্ষা দেব! যেখানে সুযোগ পাই। টাকা রেডি রাখ।’

‘এত টাকা কোথায় পাব? ভোটে দাঁড়াচ্ছি, পোস্টার ছাপতে দিতে হবে; লোকজনকে চা-পানি খাওয়াতে হবে। এ মুহূর্তে অপচয় করা যাবে না বাবা!’

শোন বাবা, ‘লোকাল বাসের আসনটাই ধরতে পার না, জাতীয় সংসদে আসন পাওয়ার স্বপ্ন দেখ কোন আক্কেলে?’

কথাটা মিথ্যা নয়। বাসে ওঠার যুদ্ধে বরাবরই তিনি হেরে যান। এ হার পৌঁছায় অফিস পর্যন্ত। বাদুড়ঝোলা হয়ে ঝুলে অফিসে যেতে প্রায়ই দেরি হয়ে যায়। ঘুষ-দুর্নীতির সঙ্গে মিত্রতা করে কেউ কেউ গাড়ি কিনে বাড়িয়েছে যানজট। সহকর্মীদের সঙ্গে না গিয়ে সৎভাবেই জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার ব্রত নেয়ার মাশুল হিসেবে ঘরেও যুদ্ধ করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

ভর্তি ও সংসারযুদ্ধের বাহাসের মাঝখানেই বেজে উঠল রানুর ফোন। ওপাশ থেকে বার্তা এলো, তার খালাত বোনের মেয়ের ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ফরমান জারি হল, ফলমূল নিয়ে মোফাজ্জলকে যেতে হবে রোগী দেখতে। মশাকে তার বড় ভয়। যৌবনে মশার রক্ত দিয়ে প্রেমপত্র লিখে হেরে গিয়েছিলেন প্রেমযুদ্ধে। আরেক প্রতিযোগী নিজের হাত কাচ দিয়ে কেটে প্রেমিকার নাম লিখে ঠিকই দখল নিয়েছিল তার। পরে জানা গেল, সেসব ছিল এফডিসি স্টাইলের চালাকি। সর্বনাশ যা হওয়ার হয়েই গেছে! সেই থেকে মশা তার চক্ষুশূল, ভয় পান বিষধর সাপের মতো।

রানুকে বললেন, ‘রোগীকে কামড়ানো মশা যদি আমাকেও হুলফুটিয়ে দেয়! তাহলে কিন্তু ডেঙ্গু হয়ে যাবে।’

‘মরণ! এমন গা বাঁচানো চিন্তাভাবনা নিয়ে উনি আবার নেতা হতে চান?’

বাধ্য হয়ে হাসপাতালের পথে রওনা হলেন মোফাজ্জল হোসেন। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে তিনি নিজেও বাসায়-অফিসে সর্বত্র এডিস মশার সঙ্গে যুদ্ধ করেন রোজ। মানে মশার কামড় থেকে বাঁচতে যত কায়দা-কানুন আছে সবই মেনে চলেন। ফল কিনতে গিয়ে পড়লেন দ্বন্দ্বে। কোন ফল কিনবেন, ফরমালিনের বাইরে কিছুই নেই। ভ্রাম্যমাণ হকার পত্রিকার শিরোনাম বলতে বলতে দৌড়াল খদ্দেরের দিকে। ফল না কিনে পেপার কিনলেন তিনি। শিরোনামে লেখা হয়েছে- ভেজালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী কর্মকর্তা নিজেই ভেজাল খাবার খেয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন!

হাসপাতালে পৌঁছে মোফাজ্জল হোসেন জানলেন, তাদের কোনো আত্মীয় হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। তবে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত আরও প্রায় এক হাজার রোগী ভর্তি হয়েছে। আত্মীয়ের নামে এমন গুজবটা ছড়াল কে, কেনই বা তাকে নিয়ে আসা হল যমের বাড়ি! ছেলেধরার গুজব সৃষ্টির পর থেকে সরকার আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে গুজবের বিরুদ্ধে। এসব ভাবনার মাঝখানে পশ্চাদ্দেশে কুট্টুস করে হুল ফুটিয়ে দিল মশা! মোফাজ্জেল হোসেন থমকে গেলেন, কিন্তু ঘাবড়ালেন না। জীবনের চারদিকে যাদের সকাল-সন্ধ্যা যুদ্ধ, তাদের কোন কিছুতেই ভয় পাওয়ার কোনো মানেই হয় না।

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×