গণতান্ত্রিক ভালোবাসা

  রোহিত হাসান কিছলু ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘কী হিংসে হয়? হতে চাস আমার মতো?’ কথাটা বলেই আমি মুচকি হাসতে হাসতে বন্ধু শ্যামলের দিকে তাকালাম। বেচারা দুই ঘণ্টা ধরে ওর প্রেমিকার নামে এটা-ওটা বলে চলেছে। ঠিক ওর পাশেই বসে আছে আমাদের আরেক বন্ধু রইস। সেও কথা বলার জন্য ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত হচ্ছে।

আমি হাসতেই শ্যামল উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘মজা নিস না দোস্ত, মেলা প্যারায় আছি!’

এবার বন্ধু রইস আর থাকতে না পেরে বলে উঠল, ‘তোর থেকে আমার প্যারা অনেক বেশি। আগে জানলে এই প্রেমের আমি গুষ্টি কিলাইতাম!’

আমি অনেক কষ্টে হাসি চেপে বললাম, ‘এখন কিলিয়ে দে গুষ্টি।’

রইস হতাশ হয়ে বলল, ‘নারে, একটা মায়া জন্মে গেছে। চাইলেও এখন অনেক কিছু পারি না।’

ঘটনা হচ্ছে বহুদিন পর আমরা তিন বন্ধু একটা রেস্টুরেন্টে বসেছি। এ কথায় সে কথায় আমাদের আলোচনা এখন চলছে কার প্রেমিকা কেমন সেটা নিয়ে। যতটুকু জানা গেছে তার সারমর্ম হল, দুজনের প্রেমিকাই অনেক প্যারা দেয়। ওদের লাইফে স্বাধীনতা বলে কোনো শব্দ নাকি এখন নেই! শ্যামলের তো ধারণা, ওর বাসায় যে বাংলা অভিধান আছে সেটারও স্বাধীনতা শব্দটা ওর এই প্যারা দেখে মুছে গেছে!

রইস একটা টিস্যু দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল, ‘জানিস, এই যে আমি মদনের মতো কটকটা লাল রঙের শার্ট পরে আছি এর কারণ ওর লাল রং পছন্দ। অন্য কিছু পরতে দেখলেই গ্যানজাম শুরু হয়ে যায়।’

আমি অনেক কষ্টে হাসি চেপে বললাম, ‘এখন তো ও তোর সামনে নাই। অন্য শার্ট পর।’

রইস এবার ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, ‘এই বুদ্ধি যে আমার মাথায় আসেনি তা নয়, এসেছিল। কিন্তু ও ১০ মিনিট পরপর ভিডিও কল দিয়ে চেক করে আমি আজ কোন কালারের জামা পরেছি! গড়বড় দেখলেই গ্যানজাম বাধিয়ে দেয়।’

রইসের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্যামল বলল, ‘আমারটা তো আরও এক ডিগ্রি উপরে! আমি কী খাব, কখন ঘুমাব সব ঠিক করে দেয়!’

বন্ধুদের কথা শুনে আমি জিভ দিয়ে চুক চুক শব্দ করলাম। ভাব দেখালাম ওদের দুঃখে আমার কলিজা ফেটে যাচ্ছে। আসলে হাসি আটকাতেই আমার দম বের হয়ে যাচ্ছে। দুই বন্ধু একের পর এক তাদের কষ্টের কথা বলে যাচ্ছে। এখন আমার আসলে কিছু বলা উচিত। তাই চেহারায় গাম্ভীর্য এনে বললাম, ‘হুম, তোদের কথা শুনে মনে হচ্ছে তোরা দুজনে স্বৈরতান্ত্রিক প্রেমিকার খপ্পরে পড়েছিস! তোদের জীবনে আসলে গণতান্ত্রিক প্রেমিকা দরকার!’

শ্যামল উৎসুক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গণতান্ত্রিক প্রেমিকা বানাব ক্যামনে রে?’

আমি বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বললাম, ‘এই স্বৈরতান্ত্রিক প্রেমিকাকে আসলে গণতান্ত্রিক প্রেমিকা বানানো সম্ভব নয়।’

আমার কথা শুনে রইস খুব হতাশ হয়ে বলল, ‘একটাও কি উপায় নাই দোস্ত?’

আমি আবারও বিজ্ঞের মতো দু’দিকে মাথা নাড়ালাম। তারপর দুজনের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তবে একটা চিপা উপায় আছে।’

আমার কথা শুনে দুজনের মুখেই হাসি ফুটে উঠল। দুজন একসঙ্গে বলে উঠল, ‘কী সেই উপায়?’

আমি ওদের দুজনের দিকে একটু ঝুঁকে খুব গোপন কথা বলার ভঙ্গিতে বললাম, ‘মাইনাস ফর্মুলা!’

দুজনে আঁতকে উঠে বলল, ‘মানে?’

আমি হাসি মুখে বললাম,‘তোরা তোদের পুরনো প্রেমিকাদের বাদ দিয়ে দে। নতুন প্রেমিকা খুঁজে নে।’

দুই বন্ধুই মাথা নেড়ে জানাল তাদের পক্ষে এটা সম্ভব নয়। তাদের ভয় করে। এবার আমার পালা। নিজেকে জাহির করার এই সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না দেখে আমি নিজেই নিজের গুণগান গাওয়া শুরু করলাম। দুই বন্ধুর দিকে তাকিয়ে কতক্ষণ ছিঃ ছিঃ করলাম। তারপর বেশ ভাব নিয়ে বললাম, ‘তোদের দেখে আমার এই এক গ্লাস পানিতে ডুবে মরতে মন চাইছে! এই আমাকে দ্যাখ, আমি যা বলব আমার প্রেমিকা ঠিক তাই করে। আমি সম্পূর্ণ স্বাধীন! আমার পেছনে ও স্পাইও লাগিয়ে রাখে না। আমার যখন যেখানে ইচ্ছা আমি সেখানে যাই। যা খেতে মন চায়, খাই, যা পড়তে মন চায়, পরি।’

দুই বন্ধু খুবই হিংসাত্মক দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে। ওদের হিংসা আরও বাড়িয়ে দিতে বললাম, ‘পরশু কী হয়েছে শোন। আমার জন্য ও কেক বানিয়ে এনেছে। কেক মুখে দিয়েই তো আমার মাথা গেল ঘুরে। জব্বর পানসে কেক। ও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কেমন হয়েছে জানু? আমি মেজাজ খারাপ করে বললাম, গু হয়েছে! এই জিনিস আর আমার সামনে আনবা না। আমি তেলাপিয়া মাছ না যে শখ করে গু খাবো!’

আমার গণতান্ত্রিক প্রেমের বর্ণনা শুনে আমার দুই বন্ধুর চোখ একদম কপালে উঠে গেছে। রইস কোনো মতে তোতলাতে তোতলাতে বলল, ‘গুল মারছিস না তো? তুই সত্যি এই কথা বলেছিস? মানে তোর নিজের মত প্রকাশ করতে পারিস?’

রইসের কথা শুনে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এখন ওকে একটা শক্ত কথা বলা দরকার। কিন্তু কী বলা যায়, কী বলা যায়... অনেক ভেবে বললাম, ‘তোদের মতো ভীতু নই আমি। আমার প্রেমে গণতন্ত্র আছে। আমার অধিকার আমি আদায় করে নিতে জানি। তোরা প্রেমিক নামের কলঙ্ক। পুরুষ নামেরও কলঙ্ক। কীভাবে পারিস প্রেমিকার পায়ে পড়ে থাকতে? লজ্জা করে না?’

আমি আরও কিছু বলতাম। তার আগেই শ্যামল আমার হাত টিপ দিয়ে বলল, ‘দোস্ত, ওই যে তোর প্রেমিকা। মনে হয় তোকেই খুঁজছে।’

শ্যামলের কথা শুনে আমার মুখের কথা হারিয়ে গেল। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি চৈতি এদিকেই আসছে। আমি আর দেরি করলাম না। চট করে টেবিলের তলায় লুকিয়ে পড়লাম। চৈতি আমাকে এদের সঙ্গে দেখলে খুব ঝামেলা হয়ে যাবে। বন্ধুদের সঙ্গে আমি যেন আড্ডা না দিই, এটা ও আগেই আমাকে বারণ করে দিয়েছে।

ঘুরতে ঘুরতে চৈতি টেবিলের কাছে চলে এলো। শ্যামল ও রইসকে দেখে বলল, ‘ও আপনারা এখানে! আপনাদের বন্ধু কই?’

আমি টেবিলের তলা থেকে শক্ত করে শ্যামলের পা চেপে ধরলাম। টেবিলের নিচ দিয়ে শ্যামলের দিকে করুণ চোখে চাইলাম। চোখে ফুটিয়ে তুললাম অসহায় বাঙালির ভাষা, আমাকে বাঁচা দোস্ত!

আমাকে বাঁচা!

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×