চা নয় ক্যাপাচিনো খেলা বাদ ক্যাসিনো

  মো. রায়হান কবির ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশজুড়ে হইচই পড়ে গেল যখন মাসুদ রানা খোঁজার জন্য আয়োজন করা হল- কে হবে মাসুদ রানা? বিচারকরা করলেন চুলছেঁড়া (চুলচেরা নয়) বিশ্লেষণ। কেননা এই মাসুদ রানাকে খুঁজতে অনেক বিচারক বিচার মঞ্চে তাদের চুল ছিঁড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে মনে করেন কেউ কেউ। এতটাই কঠিন হয়েছে প্রতিযোগিতা।

আবার বিচারকদের বিচার করতে গিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইউটিউবেও কম চুলছেঁড়া হয়নি। সব কিছুর উদ্দেশ্য একটাই- একজন যোগ্য মাসুদ রানা খোঁজা। যিনি গোয়েন্দা চরিত্র মাসুদ রানাকে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেটের ছবি (পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী ৮৩ কোটি টাকা বাজেট) এবং হলিউডের পরিচালক দিয়ে পরিচালিত ছবির জন্য এমন বিশ্লেষণ হতেই পারে। তাই মাসুদ রানা নিয়ে মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া গরম হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মাসুদ রানা নিয়ে যদি ছবি বানানো হয় তবে কি তা আমাদের সামাজিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বানানো হবে? নাকি ছবির গল্প হবে ধার করা?

বলিউড যেমন তাদের নিজস্ব সুপার হিরো বানানোর জন্য কৃশ, রা-ওয়ান ছবি বানিয়েছে। এসব সুপার হিরোরা কিন্তু ভারতের সামাজিক সমস্যা সমাধানেই এগিয়ে এসেছে। আমাদের দেশের ছবি আমাদের গল্প অনুসারেই হওয়া উচিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এত স্মার্ট মাসুদ রানা, স্যুট, টাই, সু পরে নিশ্চয়ই বস্তিতে লুঙ্গি পরে, পাটি বিছিয়ে জুয়া খেলা লোকদের মাঝে অপরাধী খুঁজতে যাবে না! যারা তাস দিয়ে কিংবা সিগারেটের প্যাকেট দিয়ে বানানো তাস নিয়ে জুয়া খেলে এমন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বানানো গল্প যতই আমাদের সামাজিক অবস্থার সঙ্গে যাক, তা দিয়ে সিনেমা হয় না। অন্যদিকে দেশের উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। আপনি রাস্তায় বের হলেই চোখে পড়বে বিশাল কর্মযজ্ঞ। ১০টার অফিস ধরতে ৩-৪ ঘণ্টা আগে বের হয়েই বুঝবেন জ্যাম সরি উন্নয়ন কোথায় কোথায় হচ্ছে।

রাস্তার বিলবোর্ড জুড়ে আর মোবাইল ইন্টারনেটের বিশাল অফারের বিশাল বিজ্ঞাপন নেই। কারণ মানুষ নিজেই এখন অফার খুঁজে কিনে নেয়। এটা তিন বেলা ভাত খাওয়ার মতোই ব্যাপার। ভাত বিক্রি করতে যেমন বিজ্ঞাপন লাগে না, তেমনি উন্নত দেশেও ইন্টারনেট কিংবা স্মার্টফোনের বিপণনের জন্য বিজ্ঞাপন লাগে না, পাবলিক নিজেই খুঁজে নেয়। জ্যামের সঙ্গে ইন্টারনেটের গভীর সম্পর্ক আছে। মানুষ জ্যামে বসে নেট ব্রাউজ করতে থাকে। হাতে থাকা বাড়তি ৩-৪ ঘণ্টা সময় বাধ্য হয়েই নেটে কাটায়। ফলে ব্যবসার খাতিরে হলেও হয়তো জ্যাম আর কমবে না।

এমন এক ডিজিটাল যুগের মাসুদ রানা কেমন হওয়া উচিত? সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন মাসুদ রানা নিয়ে আলোচনা শেষ আর তার ভবিষ্যৎ মানে ছবি নিয়ে আলোচনা শুরু হবে তখনই আলোচনার সম্পূর্ণ রসদ নিয়ে হাজির ‘ক্যাসিনো বাবারা’। এতদিন অপরাধ জগতের বেতাজ বাদশা ছিল ইয়াবা বা বাবা ব্যবসায়ীরা। আর এখন তাদের সরিয়ে মিডিয়ার সব আলো কেড়ে নিয়েছে ক্যাসিনো বাবা। সত্যি বলতে কি, পুরো ব্যাপারটাই ‘সিনেমাটিক’। কেবলই একজন সিনেমার নায়ক খোঁজা শেষ হল কি হয়নি- এরই মাঝে সিনেমার গল্প চলে এলো! স্যুট, টাই, সু পরে মাসুদ রানা আরামবাগ, মতিঝিলের এসব ক্যাসিনোর আসরে গেলে একেবারে মানিয়ে যাবে। এসব নাইট ক্লাব আর ক্যাসিনোর আসরে একেবারেই ফিট মাসুদ রানা। উন্নত দেশের সঙ্গে ছবির প্লট একেবারেই মানিয়ে যায়।

এক সময় রাস্তার পাশে বিক্রি হতো ঘুগনি, বাদাম কিংবা চটপটি। আর এখন বিক্রি হয় চিকেন অথবা বিফ চাপ, লুচি কিংবা কোল্ড কফি। আরেকটু খুঁজলে ক্যাপাচিনোও পাওয়া যায়। সুতরাং পরিবেশ একেবারে খাপেখাপ মিলে গেছে। বরং সাধারণ মানুষ এমনিতেও একটু সন্দিহান ছিল এ ভেবে যে, আমাদের দেশের এত উন্নয়নের ছোঁয়া কেন অপরাধ জগতে লাগেনি? এখন মনে হচ্ছে অপরাধ জগতও উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়েই এগিয়েছে। শুধু মিডিয়া তাদের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। যে দেশের বালিশ বহনের খরচ ৭৬০ টাকা হয়, সে দেশের জুয়াড়িরা তিন কার্ড খেলবে এটা কিভাবে ভাবা যায়? এত এত টাকা যাদের তাদের সে টাকা খরচের জায়গা তো লাগবে? ক্যাসিনোগুলো তার ছোট্ট একটি উদাহরণ। একবার ভাবুন, এ দেশের ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা হকি লীগ চ্যাম্পিয়নদের প্রাইজমানি কত? সম্ভবত ক্যাসিনো নাইটের এক রাতের আয়ের সমানও না। তাহলে ওরা কেনই বা লীগ খেলবে?

তাই কারও চাওয়া যদি লীগ শিরোপা না হয়ে ক্যাসিনো কমিশন হয়, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। একটি উন্নত দেশে যদি চা বিলুপ্তির পথ ধরে সেখানে কী খেলবেন? এক কাপ চায়ের দাম যদি ধরা হয় ১০ টাকা আর এক কাপ ক্যাপাচিনো? মিনিমাম ১৫০ টাকা। তাহলে ১৫ গুণ খরচ ওঠাতে হলে অপরাধ জগতে কতগুণ অগ্রগতি দরকার তা ক্যাসিনোর আয়ের সঙ্গে যে কোনো খেলার লীগ শিরোপার প্রাইজমানির তুলনা করলেই পাওয়া যায়। ক্যাসিনোর রঙিন আলো যেন আমাদের ক্লাবগুলোর আসল খেলা (ফুটবল, ক্রিকেট, হকি ইত্যাদি) অন্ধকারে ঢেকে না দেয় সেদিকে নজর দেয়াটা এখন অনেক বেশি জরুরি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×