গোপাল ভাঁড়- কতটা বাস্তব কতটা কল্পনা?

  মোস্তাক শরীফ ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রসিকরাজ গোপাল ভাঁড়ের দু-চারটি গল্প শোনেনি এমন বাঙালি কি আছে ধরাধামে? মনে হয় না। এ দেশের শিশুরা সেই ছোট্টটি থাকতেই গোপালের মজার মজার সব গল্প শুনে ফেলে। হাল আমলের শিশুরা তো আরও এক কাঠি সরেস। গোপালের মজার মজার কার্টুন দেখে নাদুসনুদুস চেহারার এই রসিকপ্রবরের সঙ্গে নাড়ির যোগ এমনিতেই হয়ে যায় তাদের। কিন্তু কে ছিল এই গোপাল ভাঁড়? তার চেয়েও গুরুতর প্রশ্ন- আসলেই কি গোপাল ভাঁড় বলে কেউ ছিলেন? নাকি সবটাই বাঙালির কল্পনা?

এক কথায় এ প্রশ্নের জবাব দেয়া কঠিন। তিনি আঠারো শতকে নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বিদুষক ছিলেন- এ কথাটি আমাদের সবারই শোনা? কিন্তু এর কি কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে? ইতিহাসের মূলধারা থেকে এ প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যাবে না। অনেক ইতিহাসবিদই বলেন, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় গোপাল নামে কারও উপস্থিতির প্রমাণ দলিলপত্রে পাওয়া যায়নি। তার জন্ম কোথায়, কত সালে- এসব বিষয়েও ইতিহাস নীরব। কৃষ্ণচন্দ্রের পঞ্চরত্নসভার রাজকবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর কৃষ্ণচন্দ্র ও তার সভাসদদের নিয়ে কবিতা লিখেছেন। সেখানেও গোপাল ভাঁড়ের উল্লেখ নেই। কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির আর্কাইভেও গোপালের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারে এমন কোনো দলিল-দস্তাবেজ নেই।

তাহলে গোপাল কি কেবলই অলীক কল্পনা? সেটিও হলফ করে বলা মুশকিল। নগেন্দ্রনাথ দাস নামে এক গবেষক গোপাল ভাঁড়কে ঐতিহাসিক চরিত্র বলে দাবি করেছেন। এ দাবির সপক্ষে ‘মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড়’ নামে আস্ত একটা বই-ই লিখে ফেলেছেন তিনি। এ বইতে তিনি জানাচ্ছেন, ভাঁড় নয়, গোপালের প্রকৃত পদবি ‘নাই’। তার পিতামহ ছিলেন তান্ত্রিক সাধক আনন্দরাম নাই আর পিতা ছিলেন দুলালচন্দ্র নাই নামে এক নাপিত। গোপালের তীক্ষ্ণবুদ্ধিতে চমৎকৃত হয়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাকে নিজের সভার অন্যতম সভাসদ হিসেবে স্থান দেন। গোপালের গুণমুগ্ধ কৃষ্ণচন্দ্র তাকে ‘ভাণ্ডারি’ উপাধি দেন- আর সেটিই কালক্রমে হয়েছে ‘ভাঁড়’। জনশ্রুতি আছে, তীক্ষ্ণবুদ্ধির গুণে অনেকবারই রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে মুর্শিদাবাদের নবাবের রোষ থেকে রক্ষা করেছিলেন গোপাল। অন্যদিকে, গোপালের অতি পাকামো আর বেপরোয়া আচরণের জন্য কখনও কখনও তার ওপর ভীষণভাবে রুষ্টও হয়েছেন। সে ক্ষেত্রেও উপস্থিত বুদ্ধি আর প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের জোরে নিজেকে রক্ষা করেছেন গোপাল। এ গল্প তো সবারই জানা- একবার গোপালকে শুলে চড়ানোর আদেশ দিয়েছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র- কারণ দিনের শুরুটা গোপলকে দেখে শুরু হওয়ার পর কোনো একটা ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল তাকে- অতএব গোপাল নিশ্চয়ই অপয়া! তখন আত্মপক্ষ সমর্থন করে গোপাল বলেছিলেন- আমাকে দেখে দিন শুরু করার পর যেহেতু ছোটখাটো হলেও একটা সমস্যা আপনার হয়েছে সেহেতু আমি নিশ্চয়ই অপয়া। কিন্তু মহারাজ, আপনাকে দেখে দিন শুরু করে আমার যে প্রাণটাই যেতে বসেছে, এখন আপনিই বিচার করুন কে বেশি অপয়া! এমন মোক্ষম যুক্তির পর কি আর কারও প্রাণ নেয়া যায়? এভাবেই বারবার বুদ্ধির মারপ্যাঁচে বিপদের জাল কেটে বেরিয়ে এসেছেন গোপাল।

একেক গল্পে একেক রূপে আবির্ভূত হয়েছেন গোপাল। সমস্যা যত বড়ই হোক, একবিন্দুও বিচলিত না হয়ে ঠাণ্ডা মাথায় সমাধান করেছেন। এ কারণে কেবল ভাঁড় বলে তাকে অবহেলা করার উপায় নেই। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের অন্যতম পরামর্শদাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিু বংশমর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও। ঐতিহাসিক দীনেশচন্দ্র সেনও মন্তব্য করেছেন - ‘ভাঁড় শব্দটি কদর্থে না ধরিয়া বিদূষক বলা যাইতে পারে।’ নিছক হাস্যরস নয়, গোপালের অনেক গল্পেই আছে পরিচ্ছন্ন চিন্তা আর জীবনের নিগুঢ় সত্যের প্রতিফলন। তার গল্পে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার বর্ণনা পাওয়া যায়। পাওয়া যায় সমাজের শ্রেণিভেদ, বর্ণপ্রথা আর কুসংস্কারাচ্ছন্নতার নানা তথ্য। সমাজে বিরাজমান নানা বৈষম্য আর অনাচারের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করেছেন তিনি, অসহায়, বঞ্চিত আর দুঃখী মানুষদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন অকুতোভয়ে। গোপালের অনেক গল্পেই আছে কূপমণ্ডূক পণ্ডিতসমাজের প্রতি তীক্ষè বিদ্রুপ। কেবল বংশমর্যাদা কিংবা প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুবাদে যারা নিজেদের অন্যদের তুলনায় উচ্চতর বলে মনে করে তাদের প্রতি বিরাগ কোনোরকম রাখঢাক না করেই প্রকাশ করেছেন তিনি।

তাহলে শেষমেশ কথা কী দাঁড়াল?

গোপাল ভাঁড় নামে বাস্তবে কেউ ছিলেন কি ছিলেন না সে তর্ক ইতিহাসবিদরা করুন। আপামর বাঙালির কাছে গোপাল ভাঁড় নামের মানুষটি চিরদিনই থাকবেন একান্তই নিজেদের একজন হিসেবে- ঠাট্টা আর বিদ্রুপের আড়ালে যিনি বাঙালির ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলার চেষ্টায় কাটিয়ে গেছেন একজীবন। হ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×