টিকটক কতটা টক?
jugantor
টিকটক কতটা টক?

  মো. রায়হান কবির  

০৯ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বদরুল সাহেব হাঁটতে বেরিয়ে দেখলেন, রাস্তার মাথা থেকে এক কিশোরী দৌড়ে যাচ্ছে। তার পেছনে দৌড়াচ্ছে কিছু কিশোর। বদরুল সাহেব ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে তার পাশের ফ্ল্যাটের হান্নান সাহেবকে চিৎকার করে ডাকলেন, ‘হান্নান সাহেব, এদিকে আসেন- ঝামেলা বেধে গেছে!’

হান্নান সাহেব হাতে একটা দুধের প্যাকেট নিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে?’

‘আমাদের পাশের গলিতে একটা মেয়ের পেছনে কয়েকটা উশৃঙ্খল ছেলেকে দৌড়ে যেতে দেখলাম। আপনার হাতে তো ফোন আছে, দয়া করে ট্রিপল নাইনে ফোন দিন!’

শুনে হান্নান সাহেব যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। বললেন, ‘‘ও, এই ব্যাপার? আরে এটা তেমন কিছু না। ওরা ‘টিকটক’ বানাচ্ছে!”

বদরুল সাহেব অবাক, ‘টিকটক বানাচ্ছে মানে? টিকটক আবার কী?’

‘আপনি কোন যুগে বাস করেন! এখনকার শিশুরা পর্যন্ত টিকটক চেনে আর আপনি চেনেন না?’

‘আসলেই চিনি না ভাই!’

‘‘আরে ভাই, আমিও চিনতাম না, কিছুদিন আগে আপনি এখন যাদের দেখে উদ্বিগ্ন হলেন ওদের দেখি রাস্তায় কেমন কেমন যেন করছিল। ডেকে বললাম, ‘বাবারা, তোমরা এমন করছ কেন?’ ওদের একজন বলল, ‘আংকেল আমরা টিকটক বানাই। আর এই যে সবুজ রঙের চুলওয়ালা যারে দেখতেছেন ও টিকটকের অনেক বড় স্টার!’ পরে আমাকে বোঝালো, দুই-তিন মিনিটের ভিডিও বা কিছু সংলাপ বা গানের অংশে ঠোঁট নাড়িয়ে অভিনয় করাই হল টিকটক। এ রকমই আরেকটা আছে। ওটার নাম ‘লাইকি’। আজকাল আমাদের উঠতি বয়সের কিশোর বা তরুণদের অনেকেই এ সবে ব্যস্ত।’

‘কিন্তু এসব দুই-তিন মিনিটের ভিডিও দেখে মানুষ কি মজা পায়?’

হান্নান সাহেব একটু মজার ছলে বললেন, ‘এখন ভাই টি-টুয়েন্টির যুগ। অনেকে দুই-তিন ঘণ্টার সিনেমা দেখার চেয়ে দুই-তিন মিনিটের ভিডিও দেখেই দুধের সাধ ঘোলে মেটাতে চায়।’

‘সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু একটা মেয়েকে কিছু ছেলে পেছন থেকে দৌড়াচ্ছে ধরার জন্য- এমন দৃশ্যে কিসের বিনোদন?’ ‘এসব দেখার ওদের সময় কোথায়! কে কত আজব সাজ সাজতে পারে বা আজব কিছু দেখাতে পারে তার ওপরই নির্ভর করে তাদের তারকা খ্যাতি!’

‘তারকা! বলেন কী! এদের মধ্যে আবার তারকাও আছে নাকি?’

‘কী যে বলেন, টিকটকে এসব আজব ছেলের জনপ্রিয়তা আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠিত তারকাদের চেয়েও বেশি! আপনি হয়তো নায়িকা অপু বিশ্বাসকে চেনেন, কিন্তু অপু ভাইকে কি চেনেন? অথচ এক সময় সেলুনে কাজ করা এই অপু পরে টিকটক আর লাইকিতে ভিডিও আপলোড করে এখন টিকটক স্টার!’

‘কিন্তু ওদেরকে এত পছন্দই বা করে কারা?’ বদরুল সাহেব আরও অবাক হয়ে জানতে চাইলেন।

‘ওদের মতোই যারা। মানে উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরী, যারা বিখ্যাত হওয়ার স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখে আগে-পেছনে সবাই তাদের তোয়াজ করবে, ভাই ভাই বলবে, নামের সঙ্গে ভাই যুক্ত হবে। যেমন অপু ভাই। অথবা অমুক আপু, তমুক আপু!’

‘কিন্তু এসবে কি আসলেই তারকা হওয়া যায়?’

‘ভাই, এক সময় রোজ সকালে আমি মাঠা খেতাম। এখন আমি মাঠার স্বাদ দুধে মেটাই! প্রতিদিন আমি তরল দুধ কিনে খাই। কারণ এখন এক গ্লাস ভালো মাঠার দাম পঁচিশ টাকা আর এক গ্লাস দুধের দাম আঠারো টাকা। আগে দুধের দাম ছিল বেশি, মাঠার দাম ছিল কম। এখন উল্টো। ঠিক তেমনি মূল ধারার অভিনেতারা হলেন দুধ আর ঠিকটকে এসব দুই মিনিটের অভিনেতা-অভিনেত্রী মাঠার মতো। এরা আবার নিজেদের এক নম্বর পজিশনের জন্য মারামারিও করে! এ কারণে অনেকের অ্যাকাউন্টও বাতিল করেছে টিকটক। কারণ বিনোদনকে তারা উশৃঙ্খলতায় পরিণত করেছে।

এসব বখাটেপনার ভিডিও দিয়ে যারা নিজেদের তারকা ভাবে তাদের পারিবারিক শিক্ষা বা রুচি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। কারণ খ্যাতির জন্য কেউ মারামারি করে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এটা নিত্য দিনের ঘটনা। সবচেয়ে খারাপ দিক হল তথাকথিত এই তারকাদের আবার দলও থাকে, যারা পরস্পরের সঙ্গে প্রায়ই মারামারিতে জড়ায়! এমনকি এদের এসব কর্মকাণ্ডে অনেক সময় পাবলিকও ভোগান্তিতে পড়ে! সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।’

বদরুল সাহেব অস্থির হয়ে বললেন, ‘ভাই রে, আর বলবেন না, টিকটক তো দেখছি পুরাটাই টক!’

টিকটক কতটা টক?

 মো. রায়হান কবির 
০৯ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বদরুল সাহেব হাঁটতে বেরিয়ে দেখলেন, রাস্তার মাথা থেকে এক কিশোরী দৌড়ে যাচ্ছে। তার পেছনে দৌড়াচ্ছে কিছু কিশোর। বদরুল সাহেব ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে তার পাশের ফ্ল্যাটের হান্নান সাহেবকে চিৎকার করে ডাকলেন, ‘হান্নান সাহেব, এদিকে আসেন- ঝামেলা বেধে গেছে!’

হান্নান সাহেব হাতে একটা দুধের প্যাকেট নিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে?’

‘আমাদের পাশের গলিতে একটা মেয়ের পেছনে কয়েকটা উশৃঙ্খল ছেলেকে দৌড়ে যেতে দেখলাম। আপনার হাতে তো ফোন আছে, দয়া করে ট্রিপল নাইনে ফোন দিন!’

শুনে হান্নান সাহেব যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। বললেন, ‘‘ও, এই ব্যাপার? আরে এটা তেমন কিছু না। ওরা ‘টিকটক’ বানাচ্ছে!”

বদরুল সাহেব অবাক, ‘টিকটক বানাচ্ছে মানে? টিকটক আবার কী?’

‘আপনি কোন যুগে বাস করেন! এখনকার শিশুরা পর্যন্ত টিকটক চেনে আর আপনি চেনেন না?’

‘আসলেই চিনি না ভাই!’

‘‘আরে ভাই, আমিও চিনতাম না, কিছুদিন আগে আপনি এখন যাদের দেখে উদ্বিগ্ন হলেন ওদের দেখি রাস্তায় কেমন কেমন যেন করছিল। ডেকে বললাম, ‘বাবারা, তোমরা এমন করছ কেন?’ ওদের একজন বলল, ‘আংকেল আমরা টিকটক বানাই। আর এই যে সবুজ রঙের চুলওয়ালা যারে দেখতেছেন ও টিকটকের অনেক বড় স্টার!’ পরে আমাকে বোঝালো, দুই-তিন মিনিটের ভিডিও বা কিছু সংলাপ বা গানের অংশে ঠোঁট নাড়িয়ে অভিনয় করাই হল টিকটক। এ রকমই আরেকটা আছে। ওটার নাম ‘লাইকি’। আজকাল আমাদের উঠতি বয়সের কিশোর বা তরুণদের অনেকেই এ সবে ব্যস্ত।’

‘কিন্তু এসব দুই-তিন মিনিটের ভিডিও দেখে মানুষ কি মজা পায়?’

হান্নান সাহেব একটু মজার ছলে বললেন, ‘এখন ভাই টি-টুয়েন্টির যুগ। অনেকে দুই-তিন ঘণ্টার সিনেমা দেখার চেয়ে দুই-তিন মিনিটের ভিডিও দেখেই দুধের সাধ ঘোলে মেটাতে চায়।’

‘সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু একটা মেয়েকে কিছু ছেলে পেছন থেকে দৌড়াচ্ছে ধরার জন্য- এমন দৃশ্যে কিসের বিনোদন?’ ‘এসব দেখার ওদের সময় কোথায়! কে কত আজব সাজ সাজতে পারে বা আজব কিছু দেখাতে পারে তার ওপরই নির্ভর করে তাদের তারকা খ্যাতি!’

‘তারকা! বলেন কী! এদের মধ্যে আবার তারকাও আছে নাকি?’

‘কী যে বলেন, টিকটকে এসব আজব ছেলের জনপ্রিয়তা আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠিত তারকাদের চেয়েও বেশি! আপনি হয়তো নায়িকা অপু বিশ্বাসকে চেনেন, কিন্তু অপু ভাইকে কি চেনেন? অথচ এক সময় সেলুনে কাজ করা এই অপু পরে টিকটক আর লাইকিতে ভিডিও আপলোড করে এখন টিকটক স্টার!’

‘কিন্তু ওদেরকে এত পছন্দই বা করে কারা?’ বদরুল সাহেব আরও অবাক হয়ে জানতে চাইলেন।

‘ওদের মতোই যারা। মানে উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরী, যারা বিখ্যাত হওয়ার স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখে আগে-পেছনে সবাই তাদের তোয়াজ করবে, ভাই ভাই বলবে, নামের সঙ্গে ভাই যুক্ত হবে। যেমন অপু ভাই। অথবা অমুক আপু, তমুক আপু!’

‘কিন্তু এসবে কি আসলেই তারকা হওয়া যায়?’

‘ভাই, এক সময় রোজ সকালে আমি মাঠা খেতাম। এখন আমি মাঠার স্বাদ দুধে মেটাই! প্রতিদিন আমি তরল দুধ কিনে খাই। কারণ এখন এক গ্লাস ভালো মাঠার দাম পঁচিশ টাকা আর এক গ্লাস দুধের দাম আঠারো টাকা। আগে দুধের দাম ছিল বেশি, মাঠার দাম ছিল কম। এখন উল্টো। ঠিক তেমনি মূল ধারার অভিনেতারা হলেন দুধ আর ঠিকটকে এসব দুই মিনিটের অভিনেতা-অভিনেত্রী মাঠার মতো। এরা আবার নিজেদের এক নম্বর পজিশনের জন্য মারামারিও করে! এ কারণে অনেকের অ্যাকাউন্টও বাতিল করেছে টিকটক। কারণ বিনোদনকে তারা উশৃঙ্খলতায় পরিণত করেছে।

এসব বখাটেপনার ভিডিও দিয়ে যারা নিজেদের তারকা ভাবে তাদের পারিবারিক শিক্ষা বা রুচি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। কারণ খ্যাতির জন্য কেউ মারামারি করে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এটা নিত্য দিনের ঘটনা। সবচেয়ে খারাপ দিক হল তথাকথিত এই তারকাদের আবার দলও থাকে, যারা পরস্পরের সঙ্গে প্রায়ই মারামারিতে জড়ায়! এমনকি এদের এসব কর্মকাণ্ডে অনেক সময় পাবলিকও ভোগান্তিতে পড়ে! সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।’

বদরুল সাহেব অস্থির হয়ে বললেন, ‘ভাই রে, আর বলবেন না, টিকটক তো দেখছি পুরাটাই টক!’