রম্য গল্প

এ নয় আঁখিজল

  মোকাম্মেল হোসেন ০১ এপ্রিল ২০১৮, ১৮:০২ | প্রিন্ট সংস্করণ

এ নয় আঁখিজল
এ নয় আঁখিজল। ছবি: যুগান্তর

মেয়েটি আজ আসবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। লটারি করলে কেমন হয়? মনতাজ পকেট থেকে কয়েন বের করল। চারবারের ভোটাভুটিতে দু’বার হাঁ, দু’বার না।

তার মানে ফিফটি-ফিফটি চান্স। আরেকবার দেখা যাক। মনতাজ তালুবন্দি কয়েন ঘোরাতে শুরু করেছে- এমন সময় মেয়েটিকে আসতে দেখা গেল।

এই মুহূর্তে কলপাড়ে মনতাজের কোনো কাজ নেই। সে টেবিলে রাখা গ্লাসের পানি চৌকির নিচে চালান করে শূন্য গ্লাস নিয়ে কলপাড়ে হাজির হল। মেয়েটি কলসি ভরার কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছে। সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে অনুচ্চস্বরে মেয়েটির উদ্দেশে মনতাজ বলল-

: নাম কী?

কলসি কাঁখে নিতে নিতে বিজলি কটাক্ষ হেনে মেয়েটি বলল-

: নাম দিয়া কী কাজ?

মেয়েটির ধমক খেয়ে মনতাজ দমল না। বলল-

: কাজ আছে।

: অত আলগা কাজের দরকার নাই।

কী সর্বনাশ! এই মেয়ে তো পুঁটিমাছের মতো লাফাচ্ছে! মনতাজ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল-

: ইঃ ফুটাঙ্গি কত! তিন পয়সা দামের বাতাশা না; আঠার টাকার ঠমক!

মনতাজের কথা শুনে মেয়েটি তেরছা চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল-

: বাতাশা তিন পয়সার, নাকি চার আঠারং বাহাত্তর টাকার- সময় হইলেই টের পাবেন।

সময় হল। বিদায় নেয়ার সময়। অথচ কোনোকিছুই টের পেল না মনতাজ। মনতাজ ভেবেছিল- মেয়েটির মুখ থেকে সে এমন কিছু কথা শুনবে, যা এর আগে কেউ তাকে বলেনি। কথাগুলো শুনে তার হৃদয়রাজ্যে উথাল-পাথাল ঢেউ উঠবে, যা তাকে টের পাইয়ে দেবে- প্রেমের বাতাশার সঙ্গে বাতাসের গতিবেগের একটা যোগসূত্র আছে।

প্রেমের সুবাতাসে আন্দোলিত হওয়ার কথা ছিল যে হৃদয়ের, তা ছেয়ে গেল বিষাদের কালো মেঘে। মেয়েটির কথাই ঠিক। নাম দিয়ে কাজ কী? নাম ধুয়ে কি সে পানি পান করবে, যদি আসল কাজই না হয়? মনতাজ একবার ভাবল- এখানে আরও কিছুদিন থেকে মেয়েটির মন পাওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু এটা অশোভন। এরইমধ্যে এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। ছোটবোনের শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এসে নিশ্চয়ই এতদিন কেউ থাকে না।

বিরহের কুপিবাতিতে দুঃখের আগুন জ্বেলে মাওইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার জন্য রান্নাঘরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল মনতাজ। এসময় পাশের বাড়ির সেই মেয়েটিকে পাটখড়ি হাতে এগিয়ে আসতে দেখে দিনের বেলায়ই আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ দেখল সে। আনন্দ-অশ্র“ সংবরণ করে কম্পিতকণ্ঠে কোনোমতে মনতাজ বলল-

: কই যাও?

: আগুন নিতে আসছি।

: আগুন নিতে আসছ, না জ্বালাইতে আসছ!

: নতুন কইরা আগুন জ্বালানোর প্রয়োজন কী! দেইখা তো মনে হইতেছে, আগুন জ্বইল্যাই রইছে!

: এইটা তুমি বোঝ?

: বুঝি। না বুঝলে এই অসময়ে আগুন নেয়ার ছলে কেউ আসে?

: যদি তাই হয়, তাহলে এতদিন আসো নাই কেন?

: আমি তো বাড়িতে ছিলাম না। বুবুর অসুখের খবর শুইন্যা বিদ্যাগঞ্জে গেছিলাম।

: আমি চইলা যাইতেছি।

: আইজ থাকেন।

: কেমনে থাকব! যাওয়ার কথা বইলা ফেলছি যে!

: একটা ফন্দি বাইর করেন।

: আমার মাথায় কিছু ঢুকতেছে না!

মনতাজের ছোটবোনের নাম মাসতুরা। মাসতুরার শাশুড়িকে রান্নাঘর থেকে বের হতে দেখে মেয়েটি বলল-

: অই যে চাচি আসতেছে! শুনেন, আইজ সন্ধ্যার পরে আমাদের রান্নাঘরের পিছনের বাঁশঝাড়ে, আলাপ আছে...

মেয়েটির মুখে আলাপ আছে শুনে মনতাজের চেতনার জগতে সবকিছু আউলা লেগে গেল। ঠাণ্ডা মাথায় একটা উপায় খুঁজে বের করার জন্য মনতাজ বদনা হাতে টাট্টিখানায় ঢুকল এবং সমস্যার সমাধানও পেয়ে গেল। সমাধান খুঁজে পাওয়ার আধঘণ্টার মাথায় মাসতুরা ব্যাকুল কণ্ঠে জানতে চাইল-

: কী হইছে ভাইজান? লোডা লইয়া ছোটাছুটি করতেছেন কেন!

মনতাজ চিঁচিঁ সুরে বলল-

: কেইস খারাপ! পাতলা পায়খানা শুরু হইয়া গেছেরে বইন!

: হায় আল্লাহ! কী কন এইসব!

: অস্থির হইস না। বাড়িতে গেলে সব ঠিক হইয়া যাবে।

: মাথা খারাপ হইছে আপনের! এই অবস্থায় বাড়ির পথ ধরবেন?

: বাড়িতে একটা জরুরি কাজ...

: যত জরুরি কাজই থাক, আপনে যাইতে পারবেন না।

: কিন্তু...

: কোনো কিন্তু নয়। আপনে বিছানায় শুইয়া থাকেন। আমি গাছ থেইকা ডাব পাড়াইতেছি।

বিছানায় শুয়ে ভাগ্যকে ধন্যবাদ জানাল মনতাজ। এখন ডায়রিয়া রোগীর ন্যায় বদনা হাতে কিছুক্ষণ পর পর টাট্টিখানায় ইন-আউটের পাশাপাশি সূর্যাস্তের প্রতীক্ষা করতে হবে। এভাবে দিন যখন নিকটবর্তী হচ্ছিল রাতের আর মনতাজ পরম আহ্লাদে পানি পান করছিল ডাবের- তখন একটা বিপত্তি ঘটল।

মাসতুরার শ্বশুর এখলাস মুন্সি মাঠ থেকে ফেরার পর পুতরার ডায়রিয়ার কথা শুনে হইচই বাধিয়ে দিলেন। একটা রিকশাভ্যান ঠিক করে মনতাজকে মুক্তাগাছা উপজেলা হাসপাতালে পাঠানোর বন্দোবস্ত করে তিনি বললেন-

: ডায়রিয়া কোনো হেলাফেলা করার বিষয় না বাজান। আমার বাড়িতে থাকা অবস্থায় আল্লাহ না করুক, আইজ যদি আপনের একটা কিছু হইয়া যায়, তাহলে বেয়াই-বেয়াইনরে আমি কী জবাব দিব?

রিকশাভ্যানের পাটাতনে কাঁথা-বালিশ বিছিয়ে মাসতুরা উঠে বসল। তার হাতে দু’জোড়া ডাব ও কাচের বৈয়ামভর্তি লবণ-গুড়ের শরবত। সবাই ধরাধরি করে মনতাজকে কাঁথার ওপর শুইয়ে দেয়ার পর তার মনে হল- এটা রিকশাভ্যান নয়, এ হচ্ছে কবর; আর সেই কবরে সে হচ্ছে একটা জিন্দা লাশ।

নিজেকে জিন্দা লাশ হিসেবে আবিষ্কারের পর তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোটা তপ্ত অশ্রুজল। তবে পাঠক, এ কেবল অশ্রুবিন্দু ছিল না; এ ছিল মনতাজের হৃৎপিণ্ড উপড়ানো তাজা রক্তবিন্দু।

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter