শান্তি বেগমের অশান্তির সংসার!
jugantor
শান্তি বেগমের অশান্তির সংসার!

  শফিক হাসান  

২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শান্তি বেগমের জীবনে অশান্তি নেমে এসেছে আচানক। গোবেচারা স্বামী, টানাটানির সংসার সত্ত্বেও সুখেই ছিলেন। বাদসাধল মহামারী করোনা। শুরু থেকেই বিটিভি দেখে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। যে কারণে করোনা তাকে আঁচড়টিও দিতে পারেনি। অবশ্য বিগত ছয় মাসে এক দিনের জন্যও বাইরে যাননি। ছোটবোন একবার নেমন্তন্ন করতে চাইলে খেঁকিয়ে উঠেছেন- বাইরে যাব করোনার আহার হতে!

বাইরের দিকটা সামাল দেয়া গেলেও ঘরের ভেতরেই সমস্যা। নজির মিয়া আজকাল বাগে আসছেন না। যদিও স্বামী হিসেবে আদর্শ। করোনার প্রথম দিকে শান্তি বেগমের কথামতো চলেছেনও। তারপর যখন স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুপুরের অধিবেশন স্থগিত হল, বিটিভি পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতে শুরু করল তিনিও আমূল বদলে গেলেন। দেশে এখন নাকি করোনা নাই! এসেছিল কিনা সে বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নজির। তাহলে মারা গেল কারা? নজিরের উত্তর খাড়া- তারা নিশ্চয়ই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিল!

বাজার সেরে নজির মিয়া বাসায় প্রবেশ করলে আজও শান্তি বেগম হুকুম জারি করে বললেন, ‘হাতে সাবান মাখো!’

মাস্ক খুলে সেটা দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে নজির বলেন, ‘সাবানের দাম কত বেড়েছে খেয়াল আছে?’

‘সাবানের দাম বাড়বে কেন?’

‘ভুলে গেলে, মাঝখানে বাজেট গেল!’

‘তাই বলে করোনাকে সেধে বাসায় আস্তানা দেবে?’

বকতে বকতে ব্যাগের ভেতর হাত দিলেন শান্তি বেগম। চুপসে থাকা ব্যাগের অবস্থা দেখে তেলে-নুনে রাগলেন এবার- ‘কী এনেছ, হাফ কেজি পটোল, পাঁচ টাকার কাঁচামরিচ!’

‘কোনো কিছুকেই খাটো করে দেখতে নেই, শান্তি। এখানে পঞ্চাশ টাকার মরিচ! সারা দেশে বন্যা, বেগুনের ক্ষেত ডুবে গেছে। তাই পাইনি।’

ফাঁকা ব্যাগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নজিরের বক্তব্যে উচ্চবাচ্য করলেন না শান্তি। বিড়বিড় করে বললেন, ‘আজ রাতে কাঁচামরিচই খাওয়াব!’

নজির বুঝলেন মাঠ তার দখলে। ভ্রূ পাকিয়ে বললেন, ‘কিছু বললে, অশান্তি?’

‘বাবা কত আদর করে নাম রেখেছেন শান্তি। তিনিই আবার ফেললেন এমন অশান্তির সংসারে!’

‘শান্ত হও, তবেই শান্তি পাবে।’

‘শান্তি না ছাই! আমার জীবনকে তুমি কয়লা বানিয়ে ফেলেছ! কত মানুষ চাকরি করে, বেতনের চেয়ে উপরি পায় বেশি। অথচ মিনসে জীবনে পারল না একটাও উপরি টাকা বাসায় আনতে। আমার ঘরে ফ্রিজ নাই, এটা মানুষকে বলার সময় মাথা কাটা যায়!’

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন নজির। উপরির চাকরি পাওয়া কি অত সহজ! কী করে বোঝাবেন শান্তি নামের এই অতৃপ্ত মুখরা রমণীকে।

দুই.

বাসা থেকে নজির মিয়া যখন বের হলেন, তার এক হাতে দুপুরের খাবারের ব্যাগ, অন্য হাতে ছাতা। বৃষ্টিও আজকাল ব্যাকরণ মানছে না। পূর্বাভাস ছাড়াই যখন-তখন এসে পড়ে। বৃষ্টি না থাকলে দেখা দেয় কাঠফাটা রোদ। সব মিলিয়ে ছাতাটা সঙ্গে থাকলে দু’কূলই রক্ষা হয়। বাসে উঠেই মাস্কটা খুলে ছাতার ভেতর চালান করলেন। এমন গা ঘেঁষাঘেঁষির মধ্যে মাস্ক পরার যৌক্তিকতা খুঁজে পান না। শুধু শুধুই নাকটাকে কষ্ট দেয়া! বাসের জানালার পাশে বসে দেখতে পান, বাইরে জন-উৎসব। কত মানুষ কতদিকে যাচ্ছে। রিকশায় প্রেমিক-প্রেমিকার খুনসুটি। বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার নিবিড় গলাগলি। সব দেখে মনে মনে ভাবেন, দেশে আসলেই মহামারী এসেছিল! শান্তি বেগমের ভয়েই মাস্ক পরেন নজির। নইলে কত আগেই ছুড়ে ফেলতেন। যেসব দোকানে আগে সাবান পানি দিয়ে হাত না ধুলে প্রবেশ করতে দিত না, সেগুলোর দোকানদাররা এখন হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। এমন আন্তরিকতায় হয়তো পুষিয়ে নিতে চায় বিগত দিনের বকেয়া উষ্ণতা। সব দেখে মনে হয় দেশ করোনামুক্ত হয়ে গেছে কত আগে! অথচ ভীরু শান্তি বেগম এখনও কত রকম সাজার মধ্যে রাখতে চান!

তিন.

নজির যখন অফিসে প্রবেশ করেন, সহকর্মীরা সব এক জায়গায় গল্প করছেন। বস না আসার আগ পর্যন্ত গল্প-গুজব চলতে থাকবে। আজকের আলোচনার বিষয়- করোনাকালে দাম্পত্য অশান্তি। চিরন্তন শান্তিবাণী মুখস্থ করে অনেকেই চেয়েছেন সংসারে শান্তি বজায় রাখতে; কিন্তু কজন পারেন তা!

বসের বেমক্কা উপস্থিতিতে আড্ডা ছত্রভঙ্গ হয়। তবে আড্ডার সূত্র ধরে অফিসপ্রধান নিজাম উদ্দিন বুঝতে পারেন, মাস্ক ফেলে এসেছেন বাসায়। বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করতে করতে মাথা ঠিক রাখতে পারেননি। কিছুক্ষণ পরই বাসা থেকে কল। তিনি বুঝে যান, কপালে দুঃখ আছে। আজকের ‘সাংসারিক ট্রিটমেন্ট’ হবে শান্তি বেগম স্টাইলে। হতভাগা নজিরের কথা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস চাপেন। আহা রে বেচারা, সংসারে অশান্তি সবার, নাম ফাটে নজিরের!

[email protected]

শান্তি বেগমের অশান্তির সংসার!

 শফিক হাসান 
২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শান্তি বেগমের জীবনে অশান্তি নেমে এসেছে আচানক। গোবেচারা স্বামী, টানাটানির সংসার সত্ত্বেও সুখেই ছিলেন। বাদসাধল মহামারী করোনা। শুরু থেকেই বিটিভি দেখে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। যে কারণে করোনা তাকে আঁচড়টিও দিতে পারেনি। অবশ্য বিগত ছয় মাসে এক দিনের জন্যও বাইরে যাননি। ছোটবোন একবার নেমন্তন্ন করতে চাইলে খেঁকিয়ে উঠেছেন- বাইরে যাব করোনার আহার হতে!

বাইরের দিকটা সামাল দেয়া গেলেও ঘরের ভেতরেই সমস্যা। নজির মিয়া আজকাল বাগে আসছেন না। যদিও স্বামী হিসেবে আদর্শ। করোনার প্রথম দিকে শান্তি বেগমের কথামতো চলেছেনও। তারপর যখন স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুপুরের অধিবেশন স্থগিত হল, বিটিভি পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতে শুরু করল তিনিও আমূল বদলে গেলেন। দেশে এখন নাকি করোনা নাই! এসেছিল কিনা সে বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নজির। তাহলে মারা গেল কারা? নজিরের উত্তর খাড়া- তারা নিশ্চয়ই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিল!

বাজার সেরে নজির মিয়া বাসায় প্রবেশ করলে আজও শান্তি বেগম হুকুম জারি করে বললেন, ‘হাতে সাবান মাখো!’

মাস্ক খুলে সেটা দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে নজির বলেন, ‘সাবানের দাম কত বেড়েছে খেয়াল আছে?’

‘সাবানের দাম বাড়বে কেন?’

‘ভুলে গেলে, মাঝখানে বাজেট গেল!’

‘তাই বলে করোনাকে সেধে বাসায় আস্তানা দেবে?’

বকতে বকতে ব্যাগের ভেতর হাত দিলেন শান্তি বেগম। চুপসে থাকা ব্যাগের অবস্থা দেখে তেলে-নুনে রাগলেন এবার- ‘কী এনেছ, হাফ কেজি পটোল, পাঁচ টাকার কাঁচামরিচ!’

‘কোনো কিছুকেই খাটো করে দেখতে নেই, শান্তি। এখানে পঞ্চাশ টাকার মরিচ! সারা দেশে বন্যা, বেগুনের ক্ষেত ডুবে গেছে। তাই পাইনি।’

ফাঁকা ব্যাগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নজিরের বক্তব্যে উচ্চবাচ্য করলেন না শান্তি। বিড়বিড় করে বললেন, ‘আজ রাতে কাঁচামরিচই খাওয়াব!’

নজির বুঝলেন মাঠ তার দখলে। ভ্রূ পাকিয়ে বললেন, ‘কিছু বললে, অশান্তি?’

‘বাবা কত আদর করে নাম রেখেছেন শান্তি। তিনিই আবার ফেললেন এমন অশান্তির সংসারে!’

‘শান্ত হও, তবেই শান্তি পাবে।’

‘শান্তি না ছাই! আমার জীবনকে তুমি কয়লা বানিয়ে ফেলেছ! কত মানুষ চাকরি করে, বেতনের চেয়ে উপরি পায় বেশি। অথচ মিনসে জীবনে পারল না একটাও উপরি টাকা বাসায় আনতে। আমার ঘরে ফ্রিজ নাই, এটা মানুষকে বলার সময় মাথা কাটা যায়!’

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন নজির। উপরির চাকরি পাওয়া কি অত সহজ! কী করে বোঝাবেন শান্তি নামের এই অতৃপ্ত মুখরা রমণীকে।

দুই.

বাসা থেকে নজির মিয়া যখন বের হলেন, তার এক হাতে দুপুরের খাবারের ব্যাগ, অন্য হাতে ছাতা। বৃষ্টিও আজকাল ব্যাকরণ মানছে না। পূর্বাভাস ছাড়াই যখন-তখন এসে পড়ে। বৃষ্টি না থাকলে দেখা দেয় কাঠফাটা রোদ। সব মিলিয়ে ছাতাটা সঙ্গে থাকলে দু’কূলই রক্ষা হয়। বাসে উঠেই মাস্কটা খুলে ছাতার ভেতর চালান করলেন। এমন গা ঘেঁষাঘেঁষির মধ্যে মাস্ক পরার যৌক্তিকতা খুঁজে পান না। শুধু শুধুই নাকটাকে কষ্ট দেয়া! বাসের জানালার পাশে বসে দেখতে পান, বাইরে জন-উৎসব। কত মানুষ কতদিকে যাচ্ছে। রিকশায় প্রেমিক-প্রেমিকার খুনসুটি। বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার নিবিড় গলাগলি। সব দেখে মনে মনে ভাবেন, দেশে আসলেই মহামারী এসেছিল! শান্তি বেগমের ভয়েই মাস্ক পরেন নজির। নইলে কত আগেই ছুড়ে ফেলতেন। যেসব দোকানে আগে সাবান পানি দিয়ে হাত না ধুলে প্রবেশ করতে দিত না, সেগুলোর দোকানদাররা এখন হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। এমন আন্তরিকতায় হয়তো পুষিয়ে নিতে চায় বিগত দিনের বকেয়া উষ্ণতা। সব দেখে মনে হয় দেশ করোনামুক্ত হয়ে গেছে কত আগে! অথচ ভীরু শান্তি বেগম এখনও কত রকম সাজার মধ্যে রাখতে চান!

তিন.

নজির যখন অফিসে প্রবেশ করেন, সহকর্মীরা সব এক জায়গায় গল্প করছেন। বস না আসার আগ পর্যন্ত গল্প-গুজব চলতে থাকবে। আজকের আলোচনার বিষয়- করোনাকালে দাম্পত্য অশান্তি। চিরন্তন শান্তিবাণী মুখস্থ করে অনেকেই চেয়েছেন সংসারে শান্তি বজায় রাখতে; কিন্তু কজন পারেন তা!

বসের বেমক্কা উপস্থিতিতে আড্ডা ছত্রভঙ্গ হয়। তবে আড্ডার সূত্র ধরে অফিসপ্রধান নিজাম উদ্দিন বুঝতে পারেন, মাস্ক ফেলে এসেছেন বাসায়। বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করতে করতে মাথা ঠিক রাখতে পারেননি। কিছুক্ষণ পরই বাসা থেকে কল। তিনি বুঝে যান, কপালে দুঃখ আছে। আজকের ‘সাংসারিক ট্রিটমেন্ট’ হবে শান্তি বেগম স্টাইলে। হতভাগা নজিরের কথা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস চাপেন। আহা রে বেচারা, সংসারে অশান্তি সবার, নাম ফাটে নজিরের!

[email protected]