লাইভ সমাচার
jugantor
লাইভ সমাচার

  সাদিকুল নিয়োগী পন্নী  

২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সেদিন শামছুদ্দোহা ভাই মেসেঞ্জারে নক করে বললেন, ‘কয়েকটা কবিতা রেডি করো। ফেসবুক লাইভে আমাদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হবে।’ শামছুদ্দোহা ভাই একটি আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি।

ভাইয়ের পাঠানো দুই লাইনের মেসেজ পড়ে আমি দশ লাইনের ধাক্কা খেলাম। পরীক্ষার হলে প্রশ্ন কমন না পড়লেও এমন অবস্থা হতো না। কারণ আমার কমন না পড়লেও পাশের জনের তো পড়ত! আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, ‘ভাই, আমি পারব না। আমার মোবাইলের ফ্রন্ট ক্যামেরা নষ্ট।’

‘কোনো সমস্যা নাই। তুমি ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে করো। তোমাকে দেখা গেলেই তো হলো।’ ভাইয়ের এ কথা শোনার পর কপালে ঘাম দিল। তাই মাথা ঘামিয়ে উত্তর দেব সে সুযোগ নেই। আমি বলে দিলাম, ‘ভাই, ব্যাক ক্যামেরাও বেশি ভালো না। ছবি ঘোলা আসে। আমাকে চিনতেও পারবে না কেউ।’

‘ওই মিয়া, তোমাকে কি পাত্রী পক্ষ দেখবে নাকি যে ঝকঝকা দেখাতে হবে? মানুষ তোমার কবিতা শুনবে। আবৃত্তির মূল বিষয় হল উচ্চারণ। তাই ন্যাকামি ছেড়ে সময়মতো লাইভে থেক।’ উচ্চারণের প্রসঙ্গ আসার পর মনে হল এবার হয়তো লাইভ থেকে মুক্তি পাব।

বললাম, ‘ভাই, আমার উচ্চারণে মারাত্মক সমস্যা। আমি কবিতা পড়লে সবাই হাসাহাসি করবে। এতে সংগঠনের বদনাম হবে।’

‘তুমি তো আমাদের ২২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলে। ক্লাসও তো নিয়মিত করেছ। সমস্যা থাকার

কথা না।’

‘ভাই, ক্লাস করলেও আমি মঞ্চে একদিনও আবৃত্তি করিনি। আপনি জানেন না, আমার উচ্চারণের কত বড় সমস্যা। লিখছি বলে টের পাচ্ছেন না। কথা বললে ঠিকই বুঝতেন।’

শামছুদ্দোহা ভাই বললেন, ‘বুঝিয়ে বল।’

“ভাই, আমি কথা বলার সময় শিফট চাপতে ভুলে যাই। আবার অনেক সময় অকারণে শিফট চাপি। আপনি যাকে ‘চোর’ বলেন আমি তাকে ‘চুর’ বলি।”

ভাই ধমক দিয়ে বললেন, “ওই মিয়া, তুমি কি ‘লিচু চোর’ কবিতা আবৃত্তি করবে নাকি? এগুলো তো শিশুদের জন্য। তুমি পড়বা রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর লেখা ‘ফাঁদে অন্ধকারে’ কবিতাটা।”

আমার গলা শুকিয়ে গেল। বললাম, “ভাই, আপনি যেটাকে ‘ফ’ উচ্চারণ করেন আমি সেটাকে ‘প’ বলি। আমি যদি পড়ি তবে কেলেংকারি হয়ে যাবে। তখন আমার নামে মানহানির মামলা হবে কবিতা বিকৃত করার অপরাধে। কেউ বুঝতে চাইবে না আমি ‘ফ’-এর সঠিক উচ্চারণ করতে পারি না!”

ভাই আরও বিরক্ত হয়ে বললেন, “তাহলে তুমি ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ রবীন্দ্রনাথের এই গানটা কবিতার মতো করে পড়ে দিও। যেহেতু এটা গান, তাই কবিতার মতো পড়লে নতুন একটা আমেজ সৃষ্টি হবে।”

এবার আমার মাথা চক্কর দিল। কারণ জীবনে সবচেয়ে বেশি লজ্জা পেয়েছি ‘কোথায়’ শব্দটি নিয়ে। দুই বড় ভাই ইশতিয়াক ভাই আর ইকবাল ভাই মজা করে কারণে-অকারণে, দূরে কিংবা পাশে বসে থেকেও বলতেন, ‘পন্নী তুমি কুতায়?’ একাধিকবার হাসির পাত্র হওয়ার পর আমি সহজে কাউকে ‘কোথায়’ আছেন জিজ্ঞেস করি না। কুতায় উচ্চারণ হতে পারে এই আশঙ্কায় ‘আপনি কই’ বলে চালিয়ে দিই। তাই আর ব্যাখ্যায় না গিয়ে আমি শামছুদ্দোহা ভাইকে বললাম, ‘আমাকে মাফ করেন ভাই!’

ভাই বললেন, ‘তোমাকে মাফ করা যাবে না। তুমি ফেসবুক লাইভ নিয়ে প্রতিদিন উল্টা-পাল্টা স্ট্যাটাস দাও। তোমার মুখ বন্ধ করতে হলেও তোমাকে লাইভে প্রয়োজন।’

‘লাইভ নিয়ে কথা বলার কারণে এর মধ্যে মুখের আহার বন্ধ করে দিয়েছেন কাজের বুয়া। বাবাও কড়া ঝারি দিয়েছেন! এবার আমার মুখও বন্ধ করে দেবেন ভাই?’ আমি কাতর কণ্ঠে বললাম।

শামছুদ্দোহা ভাইয়ের হয়তো কিছুটা মায়া হল। তিনি আর কিছু বললেন না। আমি প্রাণে রক্ষা পেলাম। সেদিন যে ভয়টা আমি পেয়েছিলাম কেউ

হয়তো খুন করার হুমকি দিলেও তেমন ভয় পেতাম না আমি।

লাইভ সমাচার

 সাদিকুল নিয়োগী পন্নী 
২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সেদিন শামছুদ্দোহা ভাই মেসেঞ্জারে নক করে বললেন, ‘কয়েকটা কবিতা রেডি করো। ফেসবুক লাইভে আমাদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হবে।’ শামছুদ্দোহা ভাই একটি আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি।

ভাইয়ের পাঠানো দুই লাইনের মেসেজ পড়ে আমি দশ লাইনের ধাক্কা খেলাম। পরীক্ষার হলে প্রশ্ন কমন না পড়লেও এমন অবস্থা হতো না। কারণ আমার কমন না পড়লেও পাশের জনের তো পড়ত! আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, ‘ভাই, আমি পারব না। আমার মোবাইলের ফ্রন্ট ক্যামেরা নষ্ট।’

‘কোনো সমস্যা নাই। তুমি ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে করো। তোমাকে দেখা গেলেই তো হলো।’ ভাইয়ের এ কথা শোনার পর কপালে ঘাম দিল। তাই মাথা ঘামিয়ে উত্তর দেব সে সুযোগ নেই। আমি বলে দিলাম, ‘ভাই, ব্যাক ক্যামেরাও বেশি ভালো না। ছবি ঘোলা আসে। আমাকে চিনতেও পারবে না কেউ।’

‘ওই মিয়া, তোমাকে কি পাত্রী পক্ষ দেখবে নাকি যে ঝকঝকা দেখাতে হবে? মানুষ তোমার কবিতা শুনবে। আবৃত্তির মূল বিষয় হল উচ্চারণ। তাই ন্যাকামি ছেড়ে সময়মতো লাইভে থেক।’ উচ্চারণের প্রসঙ্গ আসার পর মনে হল এবার হয়তো লাইভ থেকে মুক্তি পাব।

বললাম, ‘ভাই, আমার উচ্চারণে মারাত্মক সমস্যা। আমি কবিতা পড়লে সবাই হাসাহাসি করবে। এতে সংগঠনের বদনাম হবে।’

‘তুমি তো আমাদের ২২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলে। ক্লাসও তো নিয়মিত করেছ। সমস্যা থাকার

কথা না।’

‘ভাই, ক্লাস করলেও আমি মঞ্চে একদিনও আবৃত্তি করিনি। আপনি জানেন না, আমার উচ্চারণের কত বড় সমস্যা। লিখছি বলে টের পাচ্ছেন না। কথা বললে ঠিকই বুঝতেন।’

শামছুদ্দোহা ভাই বললেন, ‘বুঝিয়ে বল।’

“ভাই, আমি কথা বলার সময় শিফট চাপতে ভুলে যাই। আবার অনেক সময় অকারণে শিফট চাপি। আপনি যাকে ‘চোর’ বলেন আমি তাকে ‘চুর’ বলি।”

ভাই ধমক দিয়ে বললেন, “ওই মিয়া, তুমি কি ‘লিচু চোর’ কবিতা আবৃত্তি করবে নাকি? এগুলো তো শিশুদের জন্য। তুমি পড়বা রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর লেখা ‘ফাঁদে অন্ধকারে’ কবিতাটা।”

আমার গলা শুকিয়ে গেল। বললাম, “ভাই, আপনি যেটাকে ‘ফ’ উচ্চারণ করেন আমি সেটাকে ‘প’ বলি। আমি যদি পড়ি তবে কেলেংকারি হয়ে যাবে। তখন আমার নামে মানহানির মামলা হবে কবিতা বিকৃত করার অপরাধে। কেউ বুঝতে চাইবে না আমি ‘ফ’-এর সঠিক উচ্চারণ করতে পারি না!”

ভাই আরও বিরক্ত হয়ে বললেন, “তাহলে তুমি ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ রবীন্দ্রনাথের এই গানটা কবিতার মতো করে পড়ে দিও। যেহেতু এটা গান, তাই কবিতার মতো পড়লে নতুন একটা আমেজ সৃষ্টি হবে।”

এবার আমার মাথা চক্কর দিল। কারণ জীবনে সবচেয়ে বেশি লজ্জা পেয়েছি ‘কোথায়’ শব্দটি নিয়ে। দুই বড় ভাই ইশতিয়াক ভাই আর ইকবাল ভাই মজা করে কারণে-অকারণে, দূরে কিংবা পাশে বসে থেকেও বলতেন, ‘পন্নী তুমি কুতায়?’ একাধিকবার হাসির পাত্র হওয়ার পর আমি সহজে কাউকে ‘কোথায়’ আছেন জিজ্ঞেস করি না। কুতায় উচ্চারণ হতে পারে এই আশঙ্কায় ‘আপনি কই’ বলে চালিয়ে দিই। তাই আর ব্যাখ্যায় না গিয়ে আমি শামছুদ্দোহা ভাইকে বললাম, ‘আমাকে মাফ করেন ভাই!’

ভাই বললেন, ‘তোমাকে মাফ করা যাবে না। তুমি ফেসবুক লাইভ নিয়ে প্রতিদিন উল্টা-পাল্টা স্ট্যাটাস দাও। তোমার মুখ বন্ধ করতে হলেও তোমাকে লাইভে প্রয়োজন।’

‘লাইভ নিয়ে কথা বলার কারণে এর মধ্যে মুখের আহার বন্ধ করে দিয়েছেন কাজের বুয়া। বাবাও কড়া ঝারি দিয়েছেন! এবার আমার মুখও বন্ধ করে দেবেন ভাই?’ আমি কাতর কণ্ঠে বললাম।

শামছুদ্দোহা ভাইয়ের হয়তো কিছুটা মায়া হল। তিনি আর কিছু বললেন না। আমি প্রাণে রক্ষা পেলাম। সেদিন যে ভয়টা আমি পেয়েছিলাম কেউ

হয়তো খুন করার হুমকি দিলেও তেমন ভয় পেতাম না আমি।