সমাধান বিশারদ আজিজ ভাই
jugantor
সমাধান বিশারদ আজিজ ভাই

  মাসুদ রানা আশিক  

১১ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজিজ ভাই আমাদের এলাকার বিগ ব্রাদার। স্বঘোষিত সমাধান বিশারদ। বিনামূল্যে তিনি সমস্যার অন্দরমহলে প্রবেশ করে সমাধান দেয়ার চেষ্টা করেন। আজিজ ভাই দেখতে তালপাতার সেপাই! সামান্য বাতাসেই তিনি ঝরা পাতার মতো উড়ে যাবেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। তিনি আড্ডা দিতে পছন্দ করেন। তবে আড্ডাতে তাকে নীরব ভঙ্গিতেই বসে থাকতে বেশি দেখা যায়। তিনি নাকি তখনও সমস্যা এবং সমস্যার সমাধান নিয়ে ভাবগম্ভির চিন্তা করে থাকেন। আজিজ ভাই যেহেতু সমাধান বিশারদ মানুষ সেহেতু তাকে দিয়েই আমার একটা সমস্যার সমাধান করানো যায়। ঘটনা হল, আমি সুমিকে ভালোবাসি। কিন্তু তাকে বলতে পারি না। যেহেতু বলতে পারি না সেহেতু অবশ্যই এটা সমস্যা! এ সমস্যার সমাধান নেয়ার জন্য শরণাপন্ন হলাম আজিজ ভাইয়ের দরবারে। আজিজ ভাই আমাকে দেখেই বললেন, ‘হুম, বুঝতে পারছি প্রেমবিষয়ক সমস্যায় ভুগছিস। কী সমস্যা বল।’

আজিজ ভাইয়ের কথা শুনে স্মরণকালের ভয়াবহ রকম টাসকি খেলাম আমি! আমি যে প্রেমবিষয়ক জটিলতায় পড়েছি সেটি আজিজ ভাই জানলেন কীভাবে! আমি প্রশ্ন করলাম, ‘আজিজ ভাই, আমার সমস্যা আপনি জানলেন কীভাবে?’ এবার আজিজ ভাই আমার দিকে তাকালেন, ‘আরে আমার কাজই হল সমস্যার গভীর থেকে গভীরতম জায়গায় মনোনিবেশ করা। সমস্যাই যদি না বুঝতে পারি তাহলে সমাধান করব কীভাবে! আর তোদের মতো বয়সের পোলাপান এমন সমস্যাতেই বেশি পতিত হয়। এ আর নতুন কী!’

আমি সায় জানালাম আজিজ ভাইয়ের কথায়। তারপর আমার সমস্যার কথা সুনিপুণভাবে ব্যাখ্যা করলাম আজিজ ভাইয়ের কাছে। আজিজ ভাই শুনলেন, মাথা ঝাঁকালেন এবং গম্ভীরভাবে বসে থাকলেন। কিন্তু কোনো সমাধান দিতে পারলেন না। কিছুক্ষণ পর আমি নিজেই মুখ খুললাম, ‘আজিজ ভাই, আপনি কি সমাধান দেবেন নাকি এভাবে রোবটের মতো বসে থেকে মাথা ঝাঁকাবেন।’ আজিজ ভাই এবারও মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললেন, ‘শোন, সে এক বিরাট ইতিহাস। এক মজনু ছিল। সে ভালোবাসত একজনকে। কিন্তু সে এর কোনো সমাধান বের করতে পারত না। তাই সে শরণাপন্ন হল এক দরবেশ বাবার কাছে। দরবেশ বাবা তাকে সমাধান দেয়ার আগেই বলল, খাওন চাই। খাওন দে!’ আমি আজিজ ভাইকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘শুনুন আজিজ ভাই, আমি বিরাট কোনো ইতিহাস শুনতে চাচ্ছি না। আমার ইতিহাস খুবই সামান্য, অতি নগণ্য। আমি এই অতি নগণ্য ইতিহাসের সমাধান চাই।’

‘আরে বেকুব, আমি তো সমাধান দিতেই চাই।’ বলতে শুরু করলেন আজিজ ভাই, ‘তাহলে শোন, সে এক বিরাট ইতিহাস...!’

‘থামুন তো আজিজ ভাই!’ এবার মাত্রাতিরিক্ত রেগে গেলাম আমি, ‘আপনার ইতিহাস শোনার প্রয়োজন নেই। আমার প্রয়োজন সমাধান। প্রেমবিষয়ক ছোট্ট একটি সমাধান।’

‘সমাধান দেয়ার জন্যই তো আমি এক পায়ে খাড়া। তবে ঘটনা হল ইতিহাস বলার একটা কারণ আছে। মানে ইয়ে হয়েছি কী, একটু পেট পুরে খাওয়াবি, তবেই না ব্রেন ফ্রেস থাকবে। পেট ভরা থাকলে দেখবি একটা জুতসই সমাধান দিতে পারব।’

‘খানাপিনা! কেন ভাই, আপনি না বিনামূল্যে সমাধান দেন!’

‘ধুর গাধা! আমি মূল্য নিলাম কোথায়! আমি তোর কাছে টাকা চেয়েছি? চাইনি। আমি তো একটু পেট ভরে খেতে চাইছি। পেট ঠাণ্ডা তো সব ঠাণ্ডা।’

পড়েছি ফাঁদে, খানা খেতে হবে এক সঙ্গে। কী আর করা! আমি বাধ্য হয়েই আজিজ ভাইকে পেট পুরে খাওয়ালাম। মনে করেছিলাম আজিজ ভাই খাওয়ার পরই আমাকে ফটাস করে সমাধান দিয়ে দেবেন। কিন্তু কোথায় কী! তিনি আমাকে বললেন, ‘বিকালে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ কর। আমি তোকে সমাধানের গোটা একটা ঝুড়ি ধরিয়ে দেব।’

ব্যস, আমিও রাজি হয়ে গেলাম। বিকালে আবারও গেলাম আজিজ ভাইয়ের কাছে। গিয়ে দেখি তিনি বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে শুয়ে আছেন। আমাকে দেখে আধশোয়া অবস্থায় ইশারায় কাছে ডাকলেন। তারপর একটু একটু করে সমাধানের ঝুড়ি বের করতে লাগলেন, ‘বুঝলি রে পাগলা, পৃথিবীতে ভালোবাসা বলে কিছু নাই! ভালোবাসা করে কী করবি বল। শুধু সময়, অর্থ, আর মানসিক ক্ষতি! ভালোবাসা আবেগ ছাড়া কিছুই না। আবেগ স্ববেগে আক্রমণ করে বলেই ভালোবাসার জন্ম হয়। তুই হয়তো জানিস না। জানবিই বা কীভাবে! তোরা তো আন্ডা বাচ্চা টাইপ। আমরা এখন সিনিয়র হয়েছি তো, তাই বলতেই পারি ভালোবাসা মানেই লস! লাভের সিকি আনাও নেই! আর যদি প্রেমিকার চাইনিজ, ফাস্টফুড বা মার্কেটের তাল ওঠে তাহলে তুই শ্যাষ! তার চেয়ে ঢের শ্রেয়তর ব্যাপার হল প্রেম থেকে শতহাত দূরে থাকা!’

আমি আজিজ ভাইয়ের কথা শুনলাম। তার সমাধান শুনে দিলে একটু ব্যথাও পেলাম। হায়রে! এ সমাধান শোনার জন্য তাকে পেট পুরে খাওয়ালাম! কী সুন্দর সমাধানই না দিলেন তিনি! কতটুকু যৌক্তিক আর কতটুকুই বা অযৌক্তিক সেটা তো আর আমি বুঝব না। যারা প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে তারাই ভালো বলতে পারবে। আমি আজিজ ভাইয়ের সমাধান মেনে নিয়ে উদাস

হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম!

সমাধান বিশারদ আজিজ ভাই

 মাসুদ রানা আশিক 
১১ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজিজ ভাই আমাদের এলাকার বিগ ব্রাদার। স্বঘোষিত সমাধান বিশারদ। বিনামূল্যে তিনি সমস্যার অন্দরমহলে প্রবেশ করে সমাধান দেয়ার চেষ্টা করেন। আজিজ ভাই দেখতে তালপাতার সেপাই! সামান্য বাতাসেই তিনি ঝরা পাতার মতো উড়ে যাবেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। তিনি আড্ডা দিতে পছন্দ করেন। তবে আড্ডাতে তাকে নীরব ভঙ্গিতেই বসে থাকতে বেশি দেখা যায়। তিনি নাকি তখনও সমস্যা এবং সমস্যার সমাধান নিয়ে ভাবগম্ভির চিন্তা করে থাকেন। আজিজ ভাই যেহেতু সমাধান বিশারদ মানুষ সেহেতু তাকে দিয়েই আমার একটা সমস্যার সমাধান করানো যায়। ঘটনা হল, আমি সুমিকে ভালোবাসি। কিন্তু তাকে বলতে পারি না। যেহেতু বলতে পারি না সেহেতু অবশ্যই এটা সমস্যা! এ সমস্যার সমাধান নেয়ার জন্য শরণাপন্ন হলাম আজিজ ভাইয়ের দরবারে। আজিজ ভাই আমাকে দেখেই বললেন, ‘হুম, বুঝতে পারছি প্রেমবিষয়ক সমস্যায় ভুগছিস। কী সমস্যা বল।’

আজিজ ভাইয়ের কথা শুনে স্মরণকালের ভয়াবহ রকম টাসকি খেলাম আমি! আমি যে প্রেমবিষয়ক জটিলতায় পড়েছি সেটি আজিজ ভাই জানলেন কীভাবে! আমি প্রশ্ন করলাম, ‘আজিজ ভাই, আমার সমস্যা আপনি জানলেন কীভাবে?’ এবার আজিজ ভাই আমার দিকে তাকালেন, ‘আরে আমার কাজই হল সমস্যার গভীর থেকে গভীরতম জায়গায় মনোনিবেশ করা। সমস্যাই যদি না বুঝতে পারি তাহলে সমাধান করব কীভাবে! আর তোদের মতো বয়সের পোলাপান এমন সমস্যাতেই বেশি পতিত হয়। এ আর নতুন কী!’

আমি সায় জানালাম আজিজ ভাইয়ের কথায়। তারপর আমার সমস্যার কথা সুনিপুণভাবে ব্যাখ্যা করলাম আজিজ ভাইয়ের কাছে। আজিজ ভাই শুনলেন, মাথা ঝাঁকালেন এবং গম্ভীরভাবে বসে থাকলেন। কিন্তু কোনো সমাধান দিতে পারলেন না। কিছুক্ষণ পর আমি নিজেই মুখ খুললাম, ‘আজিজ ভাই, আপনি কি সমাধান দেবেন নাকি এভাবে রোবটের মতো বসে থেকে মাথা ঝাঁকাবেন।’ আজিজ ভাই এবারও মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললেন, ‘শোন, সে এক বিরাট ইতিহাস। এক মজনু ছিল। সে ভালোবাসত একজনকে। কিন্তু সে এর কোনো সমাধান বের করতে পারত না। তাই সে শরণাপন্ন হল এক দরবেশ বাবার কাছে। দরবেশ বাবা তাকে সমাধান দেয়ার আগেই বলল, খাওন চাই। খাওন দে!’ আমি আজিজ ভাইকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘শুনুন আজিজ ভাই, আমি বিরাট কোনো ইতিহাস শুনতে চাচ্ছি না। আমার ইতিহাস খুবই সামান্য, অতি নগণ্য। আমি এই অতি নগণ্য ইতিহাসের সমাধান চাই।’

‘আরে বেকুব, আমি তো সমাধান দিতেই চাই।’ বলতে শুরু করলেন আজিজ ভাই, ‘তাহলে শোন, সে এক বিরাট ইতিহাস...!’

‘থামুন তো আজিজ ভাই!’ এবার মাত্রাতিরিক্ত রেগে গেলাম আমি, ‘আপনার ইতিহাস শোনার প্রয়োজন নেই। আমার প্রয়োজন সমাধান। প্রেমবিষয়ক ছোট্ট একটি সমাধান।’

‘সমাধান দেয়ার জন্যই তো আমি এক পায়ে খাড়া। তবে ঘটনা হল ইতিহাস বলার একটা কারণ আছে। মানে ইয়ে হয়েছি কী, একটু পেট পুরে খাওয়াবি, তবেই না ব্রেন ফ্রেস থাকবে। পেট ভরা থাকলে দেখবি একটা জুতসই সমাধান দিতে পারব।’

‘খানাপিনা! কেন ভাই, আপনি না বিনামূল্যে সমাধান দেন!’

‘ধুর গাধা! আমি মূল্য নিলাম কোথায়! আমি তোর কাছে টাকা চেয়েছি? চাইনি। আমি তো একটু পেট ভরে খেতে চাইছি। পেট ঠাণ্ডা তো সব ঠাণ্ডা।’

পড়েছি ফাঁদে, খানা খেতে হবে এক সঙ্গে। কী আর করা! আমি বাধ্য হয়েই আজিজ ভাইকে পেট পুরে খাওয়ালাম। মনে করেছিলাম আজিজ ভাই খাওয়ার পরই আমাকে ফটাস করে সমাধান দিয়ে দেবেন। কিন্তু কোথায় কী! তিনি আমাকে বললেন, ‘বিকালে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ কর। আমি তোকে সমাধানের গোটা একটা ঝুড়ি ধরিয়ে দেব।’

ব্যস, আমিও রাজি হয়ে গেলাম। বিকালে আবারও গেলাম আজিজ ভাইয়ের কাছে। গিয়ে দেখি তিনি বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে শুয়ে আছেন। আমাকে দেখে আধশোয়া অবস্থায় ইশারায় কাছে ডাকলেন। তারপর একটু একটু করে সমাধানের ঝুড়ি বের করতে লাগলেন, ‘বুঝলি রে পাগলা, পৃথিবীতে ভালোবাসা বলে কিছু নাই! ভালোবাসা করে কী করবি বল। শুধু সময়, অর্থ, আর মানসিক ক্ষতি! ভালোবাসা আবেগ ছাড়া কিছুই না। আবেগ স্ববেগে আক্রমণ করে বলেই ভালোবাসার জন্ম হয়। তুই হয়তো জানিস না। জানবিই বা কীভাবে! তোরা তো আন্ডা বাচ্চা টাইপ। আমরা এখন সিনিয়র হয়েছি তো, তাই বলতেই পারি ভালোবাসা মানেই লস! লাভের সিকি আনাও নেই! আর যদি প্রেমিকার চাইনিজ, ফাস্টফুড বা মার্কেটের তাল ওঠে তাহলে তুই শ্যাষ! তার চেয়ে ঢের শ্রেয়তর ব্যাপার হল প্রেম থেকে শতহাত দূরে থাকা!’

আমি আজিজ ভাইয়ের কথা শুনলাম। তার সমাধান শুনে দিলে একটু ব্যথাও পেলাম। হায়রে! এ সমাধান শোনার জন্য তাকে পেট পুরে খাওয়ালাম! কী সুন্দর সমাধানই না দিলেন তিনি! কতটুকু যৌক্তিক আর কতটুকুই বা অযৌক্তিক সেটা তো আর আমি বুঝব না। যারা প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে তারাই ভালো বলতে পারবে। আমি আজিজ ভাইয়ের সমাধান মেনে নিয়ে উদাস

হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম!