যে কারণে আমি মহল্লা বদল করার সিদ্ধান্ত নিলাম
jugantor
যে কারণে আমি মহল্লা বদল করার সিদ্ধান্ত নিলাম

  মাসুদ রানা আশিক  

২৫ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গভীর মুগ্ধতা নিয়ে বউয়ের দিকে তাকালাম। সে বেশ আগ্রহের সঙ্গে শাড়ি খোঁজার চেষ্টা করছে। আমি অবাক হয়ে যাই, একটা মাত্র শাড়ি খোঁজার জন্য তো এত সময় লাগার কথা না! যে সময় নিয়ে বউ শাড়ি খুঁজছে সে সময়টুকু পেলে আমার আরামের একটা ঘুম হয়ে যেত!

মুগ্ধতা নিয়ে বউয়ের দিকে তাকানোর কারণ হল তার ধৈর্য! এত সময় নিয়ে কোনো কিছু খোঁজার ধৈর্য আমার কোনো কালে ছিল না। কোনো কালে হবে বলেও মনে হয় না। সেই সকাল থেকে আলমারির ভেতরে যুদ্ধ চলছে। এখানকার শাড়ি ওখানে, ওখানকার শাড়ি এখানে! কোনো শাড়ির ভাঁজ খুলে যাচ্ছে তাই অবস্থা! আমি বউয়ের এমন বেহাল দশা দেখে তার হাল ধরার আশায় এগিয়ে গেলাম, ‘বউ, আমি তোমাকে একটু হেল্প করি। কেমন শাড়ি তুমি পরতে চাচ্ছ আজ?’

বউ আমার দিকে তাকাল। অদ্ভুত নয়নে, কিছুটা বাঁকাভাবে। আমি একটু সরে এলাম। বললাম, ‘এমনভাবে তাকিয়ে আছ কেন? আমার খুব ভয় করছে। আমি কি কোনো অপরাধ করেছি?’

‘অবশ্যই অপরাধ করেছ! মহাসাগর সমান অপরাধ! তুমি শাড়ির কী বোঝ! তুমি কি মেয়ে মানুষ? মেয়ে হলে বুঝতে আমার জ্বালাটা! আমি এখন কোন জ্বালায় মরছি!’

‘নিশ্চই শাড়ি সংক্রান্তু কোনো জ্বালায়?’

‘তা নয় তো প্যান্ট সংক্রান্ত জ্বালায় মরব! আমি কি প্যান্ট পরি!’

আমি আরেকটু দূরে সরে বসি। বলা যায় না, রাগ করে শাড়ির স্তূপটাই আমার দিকে ছুড়ে মারতে পারে! তখন আবার শাড়ির চাপায় পিষ্ট হতে হবে! এতগুলো শাড়ির ওজন তো আর কম না। এভাবে আরও অনেক্ষণ কাটল। তারপরও বউয়ের শাড়ি খোঁজা শেষ হয় না দেখে আবারও সাহস করে এগিয়ে যাই তার কাছে, ‘আজ কোথাও কি দাওয়াত আছে তোমার?’

‘পাড়ার সাবিনা আপার আজ ম্যারেজ ডে। শুধু ঘরোয়াভাবে মহল্লার মহিলাদের দাওয়াত করেছেন তিনি। আমার তো আর সে ঘরে বিয়ে হয়নি যে ম্যারেজ ডে পালন করব! পোড়া কপাল আমার!’

‘যাক, কপালটা পোড়া হোক, তবুও তো কয়লা হয়নি! কয়লা হলে সেই কয়লা দিয়ে না হয় কিছু না কিছু করা যেত! এখন তো কয়লারও অনেক দাম!’

‘ফোড়ন কাটবে না বলে দিলাম। এটা আমার পছন্দ না। এমনিতেই কোনো শাড়ি পরব বুঝতে পারছি না! কোনোটাই তো পছন্দ হচ্ছে না!’

‘ওমা তাই!’ অবাক হয়ে যাই আমি, ‘বুঝতেই পারছ না! তোমার তো মিনিমাম ৩০টা শাড়ি! এর ভেতর থেকেই পছন্দ হচ্ছে না! তাহলে তো তোমাকে পুরো দোকান দিয়ে দিতে হবে! এখন দোকান আমি কোথায় পাই বল তো!’

আরও কিছুক্ষণ নীরবে শাড়ি ঘাঁটাঘাঁটি করে বউ। তারপর বলল, ‘তুমি কি আমাকে শাড়ি কিনে দাও? পছন্দসই কোনো শাড়িই তো আমার নেই!’

‘তাই!’ আবারও অবাক হয়ে যাই আমি, ‘যে ৩০টা আছে সেগুলোর একটাও পছন্দ না! পছন্দ না করেই তুমি শাড়িগুলো কিনেছ! আর আমি তোমাকে শাড়ি কিনে না দিলে এ শাড়িগুলো কোথা থেকে এলো বল তো? হাওয়ায় উড়ে তো আর আসেনি! কিংবা শাড়িগুলোর তো আর পা গজায়নি যে হেঁটে হেঁটে এখানে এসেছে!’

বউ খটমট করে তাকাল আমার দিকে। তারপর বাজখাঁই গলায় বলল, ‘যে শাড়িগুলো আছে সেগুলো সব তো মহল্লার মহিলারা দেখে ফেলেছে! এখন একটা নতুন শাড়ি না হলে কি চলে! ম্যারেজ ডে পার্টিতে যাব। সবাই এমন শাড়িই পরবে- যে শাড়িগুলো অন্যরা দেখেনি। এখন মনে হচ্ছে আমিই তেমন শাড়ি পরব যেটি সবাই এরই মধ্যে দেখে ফেলেছে। তুমিই বল এতে আমার সম্মান থাকবে?’

‘না, থাকবে না। এটা আমি অবশ্যই বুঝতে পারছি।’ নীরবতা পালন করি কিছুক্ষণ। তারপর বেশ আনন্দ নিয়ে বলি, ‘বউ, তাহলে একটা কাজ করি। আমরা মহল্লাটাই বদল করে ফেলি! এমন এক মহল্লায় যাব যেখানে তোমার শাড়িগুলো আশপাশের কোনো ভাবি এরই মধ্যে দেখেনি। তখন সব তোমার কাছে নতুন মনে হবে, মহল্লার ভাবিদের কাছেও!’

যে কারণে আমি মহল্লা বদল করার সিদ্ধান্ত নিলাম

 মাসুদ রানা আশিক 
২৫ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গভীর মুগ্ধতা নিয়ে বউয়ের দিকে তাকালাম। সে বেশ আগ্রহের সঙ্গে শাড়ি খোঁজার চেষ্টা করছে। আমি অবাক হয়ে যাই, একটা মাত্র শাড়ি খোঁজার জন্য তো এত সময় লাগার কথা না! যে সময় নিয়ে বউ শাড়ি খুঁজছে সে সময়টুকু পেলে আমার আরামের একটা ঘুম হয়ে যেত!

মুগ্ধতা নিয়ে বউয়ের দিকে তাকানোর কারণ হল তার ধৈর্য! এত সময় নিয়ে কোনো কিছু খোঁজার ধৈর্য আমার কোনো কালে ছিল না। কোনো কালে হবে বলেও মনে হয় না। সেই সকাল থেকে আলমারির ভেতরে যুদ্ধ চলছে। এখানকার শাড়ি ওখানে, ওখানকার শাড়ি এখানে! কোনো শাড়ির ভাঁজ খুলে যাচ্ছে তাই অবস্থা! আমি বউয়ের এমন বেহাল দশা দেখে তার হাল ধরার আশায় এগিয়ে গেলাম, ‘বউ, আমি তোমাকে একটু হেল্প করি। কেমন শাড়ি তুমি পরতে চাচ্ছ আজ?’

বউ আমার দিকে তাকাল। অদ্ভুত নয়নে, কিছুটা বাঁকাভাবে। আমি একটু সরে এলাম। বললাম, ‘এমনভাবে তাকিয়ে আছ কেন? আমার খুব ভয় করছে। আমি কি কোনো অপরাধ করেছি?’

‘অবশ্যই অপরাধ করেছ! মহাসাগর সমান অপরাধ! তুমি শাড়ির কী বোঝ! তুমি কি মেয়ে মানুষ? মেয়ে হলে বুঝতে আমার জ্বালাটা! আমি এখন কোন জ্বালায় মরছি!’

‘নিশ্চই শাড়ি সংক্রান্তু কোনো জ্বালায়?’

‘তা নয় তো প্যান্ট সংক্রান্ত জ্বালায় মরব! আমি কি প্যান্ট পরি!’

আমি আরেকটু দূরে সরে বসি। বলা যায় না, রাগ করে শাড়ির স্তূপটাই আমার দিকে ছুড়ে মারতে পারে! তখন আবার শাড়ির চাপায় পিষ্ট হতে হবে! এতগুলো শাড়ির ওজন তো আর কম না। এভাবে আরও অনেক্ষণ কাটল। তারপরও বউয়ের শাড়ি খোঁজা শেষ হয় না দেখে আবারও সাহস করে এগিয়ে যাই তার কাছে, ‘আজ কোথাও কি দাওয়াত আছে তোমার?’

‘পাড়ার সাবিনা আপার আজ ম্যারেজ ডে। শুধু ঘরোয়াভাবে মহল্লার মহিলাদের দাওয়াত করেছেন তিনি। আমার তো আর সে ঘরে বিয়ে হয়নি যে ম্যারেজ ডে পালন করব! পোড়া কপাল আমার!’

‘যাক, কপালটা পোড়া হোক, তবুও তো কয়লা হয়নি! কয়লা হলে সেই কয়লা দিয়ে না হয় কিছু না কিছু করা যেত! এখন তো কয়লারও অনেক দাম!’

‘ফোড়ন কাটবে না বলে দিলাম। এটা আমার পছন্দ না। এমনিতেই কোনো শাড়ি পরব বুঝতে পারছি না! কোনোটাই তো পছন্দ হচ্ছে না!’

‘ওমা তাই!’ অবাক হয়ে যাই আমি, ‘বুঝতেই পারছ না! তোমার তো মিনিমাম ৩০টা শাড়ি! এর ভেতর থেকেই পছন্দ হচ্ছে না! তাহলে তো তোমাকে পুরো দোকান দিয়ে দিতে হবে! এখন দোকান আমি কোথায় পাই বল তো!’

আরও কিছুক্ষণ নীরবে শাড়ি ঘাঁটাঘাঁটি করে বউ। তারপর বলল, ‘তুমি কি আমাকে শাড়ি কিনে দাও? পছন্দসই কোনো শাড়িই তো আমার নেই!’

‘তাই!’ আবারও অবাক হয়ে যাই আমি, ‘যে ৩০টা আছে সেগুলোর একটাও পছন্দ না! পছন্দ না করেই তুমি শাড়িগুলো কিনেছ! আর আমি তোমাকে শাড়ি কিনে না দিলে এ শাড়িগুলো কোথা থেকে এলো বল তো? হাওয়ায় উড়ে তো আর আসেনি! কিংবা শাড়িগুলোর তো আর পা গজায়নি যে হেঁটে হেঁটে এখানে এসেছে!’

বউ খটমট করে তাকাল আমার দিকে। তারপর বাজখাঁই গলায় বলল, ‘যে শাড়িগুলো আছে সেগুলো সব তো মহল্লার মহিলারা দেখে ফেলেছে! এখন একটা নতুন শাড়ি না হলে কি চলে! ম্যারেজ ডে পার্টিতে যাব। সবাই এমন শাড়িই পরবে- যে শাড়িগুলো অন্যরা দেখেনি। এখন মনে হচ্ছে আমিই তেমন শাড়ি পরব যেটি সবাই এরই মধ্যে দেখে ফেলেছে। তুমিই বল এতে আমার সম্মান থাকবে?’

‘না, থাকবে না। এটা আমি অবশ্যই বুঝতে পারছি।’ নীরবতা পালন করি কিছুক্ষণ। তারপর বেশ আনন্দ নিয়ে বলি, ‘বউ, তাহলে একটা কাজ করি। আমরা মহল্লাটাই বদল করে ফেলি! এমন এক মহল্লায় যাব যেখানে তোমার শাড়িগুলো আশপাশের কোনো ভাবি এরই মধ্যে দেখেনি। তখন সব তোমার কাছে নতুন মনে হবে, মহল্লার ভাবিদের কাছেও!’