চরম ট্র্যাজেডি
jugantor
চরম ট্র্যাজেডি

  জামসেদুর রহমান সজীব  

১৫ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমার ভীষণ মুশকিল হয়েছে! মুখ ফুটে কাউকে বলতেও পারছি না। তবে খুব যে জটিল বিষয় তাও না। সাহস করে বলেই ফেলা যায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এর প্রতিক্রিয়া কী দাঁড়াবে, সেটা ভেবেই আতঙ্কে কাউকে কিছু বলতে পারছি না। গতকাল বউকে ঘুষ বাবদ দুটো জামদানি শাড়ি কিনে দিয়েছি। ক্ষণস্থায়ীভাবে আমার কদর গেল বেড়ে। স্পেশাল চিকেন বিরিয়ানি রান্না করল আমার জন্য। খুব রোমান্টিক মুহূর্তে বউয়ের কানের কাছে গিয়ে আস্তে করে বললাম, ‘ওগো, আমি না মশাদের কথা শুনতে পাই! ভীষণ ঝামেলায় আছি এটা নিয়ে।’

সে রাতের বাকি কাহিনী আর বিস্তারিত না বলি। শুধু এটুকু জানাতে পারি যে এরপর থেকে তিনবেলা বাইরের খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এবার আসি মূল ঘটনায়। সমস্যার সূত্রপাত ঘটে এক সপ্তাহ আগে। অফিস থেকে ক্লান্ত দেহ নিয়ে বাসায় ফিরেছি। বউ গেছে তার বাপের বাড়ি। এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে, ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে গরম করারও শক্তি ছিল না। টেনেটুনে বিছানা পর্যন্ত গিয়েই আছড়ে পড়ি। কাল ঘুমে তলিয়ে যাই। আর সেই ঘুম মধ্যরাতে ভেঙে যায় তুমুল চিল্লা-পাল্লা শুনে।

মনে হল যেন জনা বিশেক মানুষ একত্রিত হয়ে ব্যাপক কোন্দল লাগিয়েছে। ঘরের ভেতর এত মানুষ কোত্থেকে এলো? আগুন-টাগুন লাগলো নাকি? এই ভেবে ধড়ফড় করে উঠি বসি। আগুন যে লাগেনাই সেটা ভেবে খুশি হতে পারি না, উল্টো আতঙ্কে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলার মতো দশা হল। রুমে আমি ছাড়া আর কেউ নাই। না থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তখনও তুমুল চিল্লা-পাল্লা চলছে। আর তা রুমের ভেতরই!

ভয়ে আমার দুই হাঁটুতে ঠোকাঠুকি শুরু হয়ে গেল। এ কী বিপদ!

‘ব্যাটা তো ডরাইছে। শার্ট-প্যান্টের অবস্থা দেখছেন? ভেজা ভেজা লাগে তো!’

‘আরে না ভয়ের চোটে ঘাইমা গেছে মনে হয়।’

‘আমার মনে হয় পুরো শক খেয়ে গেছে। বেশি শক পাইলে হার্টফেল হইতে পারে। তখন আরেক বিপদ! চলেন তার হুশ ফিরাই। ব্যাটা বাঁচলে আমরাও বাঁচব। অত্র এলাকায় তার রক্তের মতো সুস্বাদু রক্ত আর দ্বিতীয় পাইনাই।’

এসব আলাপ-আলোচনা শুনে আমার ভেতরটা বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। গালে হঠাৎ করে সুচ বিঁধে যাওয়ার মতো ব্যথা পেলাম। ঠাস করে চড় লাগালাম গালে। ধামড়া সাইজের দুটো মশা খতম! এমন সময় একটি মশা বেজায় পনপন শব্দ তুলে আমার মাথার চতুর্দিক ঘুরতে শুরু করল। মারতে যাবো তখনই মশাটি বলে উঠল, ‘ধুর মিয়া! এইডা কোনো কাম করলেন! পণ্ডিত মশা ছিল দুজনই! আমার বাপের বয়সী। এতটা নির্দয়ভাবে না মারলেও পারতেন!’ শুনে আমি তো ব্ল্যাকআউট। এরপর কী ঘটেছিল কিছু আর মনে নাই।

পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সব ঠিকঠাক চলছিল। আমিও নিজেকে আশ্বস্ত করলাম, ক্লান্ত থাকায় এমন ভুলভাল ঘটেছে। নাথিং সিরিয়াস। কিন্তু সন্ধ্যার পর অফিস থেকে বেরিয়ে যেন অথৈ সাগরে পড়লাম। অনুধাবন করলাম যেখানেই যাচ্ছি দু-একটা মশা আমার সঙ্গে সঙ্গেই থাকছে। শুধু থাকছেই না, আমাকে নিয়ে গুরু গম্ভীর আলাপ-আলোচনাও করছে। যেমন অফিস থেকে বেরোনোর সময় এক মশাকে বলতে শুনলাম, ‘কাহিনী জানেন, এই লোকটা গতরাতে হুদাই দুজন জ্ঞানী-গুণী মশাকে থাবড়া দিয়ে মেরে ফেলেছে! চেহারা পোলাপানের, কাম করছে দুর্ধর্ষ খুনির মতো!’

দ্রুত পা চালালাম বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে। তখন শুনতে হলো, ‘পা দুইটা পাইছেও রে ভাই। জিরাফের পা। আর গতি ক্যাঙ্গারুর মতো। লম্বা লম্বা পা নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটতেছে।’ সামান্য মশার মুখে এমন চরম অপমানকর কথা শুনে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। পেছন ফিরে খুঁজলাম কোন মশার এতবড় স্পর্ধা। এদিক-সেদিক খুব মনোযোগ দিয়ে খুঁজলাম। পেলাম না। উল্টো আশপাশের মানুষদের দেখলাম আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি ফের হাঁটা শুরু করলাম। পেছন থেকে বলাবলি চলছে, ‘খুঁইজা পায়নাই। ব্যাটা কানা!’

ঠেলাঠেলি করে বাসে উঠলাম। সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হচ্ছে। হারামজাদা মশা বাসেও ঢুকে পড়েছে, ‘দেখ দেখ, বাদুড়ের মতো ঝুলে আছে। বেশ হয়েছে।’

এভাবে দিনের পর দিন কাটতে লাগল। আর আমাকেও মশাদের সব ভর্ৎসনা সহ্য করতে হল। তবে সবসময়ই যে আমাকে নিয়ে কথা হয় তা-ও না। মশাদের পারিবারিক, সামাজিক জীবন নিয়েও বহু কিছু শুনেছি-জেনেছি। তাদের সুখ-দুঃখ, আশা-হতাশার বহু গল্প শোনা হয়েছে। সবচাইতে মজার ব্যাপার হল, মশারাও মানুষদের মতো প্রেম নিবেদন করে! এমনকি প্রেমে ছ্যাঁকাও খায়! তখন শহরের বিভিন্ন নামি-দামি বারে গিয়ে মদ্যপ ব্যক্তির রক্ত খেয়ে মাতাল হয়ে মাতলামি করে। সেদিন এমন এক মাতাল মশার পাল্লায় পড়েছিলাম। মুখের কী ভাষা রে বাবা! একে-ওকে গালাগাল করছে, একসময় হাউমাউ করে কান্নাকাটি করছে, আবার এর-ওর কট্টর সমালোচনা করছে, এমনকি সরকারের বিরুদ্ধেও আক্রোশ প্রকাশ করছে!

আমি বিষয়টা বুঝতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, প্রেমে ব্যর্থ হয়েছেন বুঝলাম। কিন্তু এতে সরকারের কী দোষ?’ প্রশ্ন শুনে মশা কিছুক্ষণ থম মেরে রইল। তারপর কেঁদে দিয়ে বলল, ‘স্যরি ভাই, ভুল হয়ে গেছে। আমি মাতাল, আমাকে মাফ করে দিন।’

মশাদের এই যন্ত্রণার মাঝেই আমার বউ ফিরে এলো। কিন্তু সংসার, চাকরি জীবনে মন দিতে পারি না। যাই করি না কেন, কানের কাছে চব্বিশ ঘণ্টা মশাদের বাতচিত চলতেই থাকে। কাজে মনোযোগ দিতে মশাদের ধমক দিয়ে বসি, পরে খেয়াল করি বস সামনে দাঁড়িয়ে। নিজেকে নিয়ে সমালোচনা সহ্য করা যায়, কিন্তু লক্ষ্মী বউটাকে নিয়ে যখন সমালোচনা শুনি মাথা ঠিক থাকে না। এলোপাতাড়ি হাত-পা ছুড়ে বসি, পরে খেয়াল হয় ভুলে বউকে চড়-লাথি মেরে বসেছি। আন্দাজ করতে পারি যে আমার হাসিখুশি জীবনটা ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে।

বউকে সেদিন সত্যটা বলেও লাভ হল না। বন্ধুদের কয়েকজনকে জানিয়েছিলাম ঘটনাটা। ভেবেছিলাম সমাধান পাবো। পেয়েছি ঠ্যাঙানি আর হাসি ঠাট্টা। সাহস করে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছেও গেলাম। মশাদের আলাপ শুনতে তিনি যে আগ্রহ দেখালেন, তেমন আগ্রহ আমার রোগ নিরাময়ের প্রতি দেখালেন না। হতাশ হয়ে এক মাঝরাতে মশাদের কাছেই নত হলাম। হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলাম। তওবা করলাম জীবনে আর কোনো দিন মশার গায়ে হাত তুলব না। আমার দুরাবস্থা মশাদের ক্ষুদ্রতর হৃদয়কেও ছুঁয়ে গিয়েছিল। তারা আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে পরিত্রাণ পেয়ে এই খুশির সংবাদটা বউসহ বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করলাম। কিন্তু পরিণামে কী হল! আমাকে জোর করে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করানো হল! আমি নাকি সারা দিন মশা নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলে বেড়াই! এই লেখাটি যখন লিখছি ডাক্তার এসে বললেন, ‘এসব লিখে লাভটা কী? পাগলের লেখা কে-ই বা পড়বে?’

আমি শান্ত ভাবে জবাব দিলাম, ‘দেশে কি আর পাগলের অভাব! হরেক রকমের পাগল আছে দেশে। টাকার পাগল, নেশার পাগল, ক্ষমতার পাগল, প্রেমের পাগল... আমার লেখা না হয় তারাই পড়বে যারা মশার উৎপাতে পাগল হয়ে আছে!’

চরম ট্র্যাজেডি

 জামসেদুর রহমান সজীব 
১৫ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমার ভীষণ মুশকিল হয়েছে! মুখ ফুটে কাউকে বলতেও পারছি না। তবে খুব যে জটিল বিষয় তাও না। সাহস করে বলেই ফেলা যায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এর প্রতিক্রিয়া কী দাঁড়াবে, সেটা ভেবেই আতঙ্কে কাউকে কিছু বলতে পারছি না। গতকাল বউকে ঘুষ বাবদ দুটো জামদানি শাড়ি কিনে দিয়েছি। ক্ষণস্থায়ীভাবে আমার কদর গেল বেড়ে। স্পেশাল চিকেন বিরিয়ানি রান্না করল আমার জন্য। খুব রোমান্টিক মুহূর্তে বউয়ের কানের কাছে গিয়ে আস্তে করে বললাম, ‘ওগো, আমি না মশাদের কথা শুনতে পাই! ভীষণ ঝামেলায় আছি এটা নিয়ে।’

সে রাতের বাকি কাহিনী আর বিস্তারিত না বলি। শুধু এটুকু জানাতে পারি যে এরপর থেকে তিনবেলা বাইরের খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এবার আসি মূল ঘটনায়। সমস্যার সূত্রপাত ঘটে এক সপ্তাহ আগে। অফিস থেকে ক্লান্ত দেহ নিয়ে বাসায় ফিরেছি। বউ গেছে তার বাপের বাড়ি। এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে, ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে গরম করারও শক্তি ছিল না। টেনেটুনে বিছানা পর্যন্ত গিয়েই আছড়ে পড়ি। কাল ঘুমে তলিয়ে যাই। আর সেই ঘুম মধ্যরাতে ভেঙে যায় তুমুল চিল্লা-পাল্লা শুনে।

মনে হল যেন জনা বিশেক মানুষ একত্রিত হয়ে ব্যাপক কোন্দল লাগিয়েছে। ঘরের ভেতর এত মানুষ কোত্থেকে এলো? আগুন-টাগুন লাগলো নাকি? এই ভেবে ধড়ফড় করে উঠি বসি। আগুন যে লাগেনাই সেটা ভেবে খুশি হতে পারি না, উল্টো আতঙ্কে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলার মতো দশা হল। রুমে আমি ছাড়া আর কেউ নাই। না থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তখনও তুমুল চিল্লা-পাল্লা চলছে। আর তা রুমের ভেতরই!

ভয়ে আমার দুই হাঁটুতে ঠোকাঠুকি শুরু হয়ে গেল। এ কী বিপদ!

‘ব্যাটা তো ডরাইছে। শার্ট-প্যান্টের অবস্থা দেখছেন? ভেজা ভেজা লাগে তো!’

‘আরে না ভয়ের চোটে ঘাইমা গেছে মনে হয়।’

‘আমার মনে হয় পুরো শক খেয়ে গেছে। বেশি শক পাইলে হার্টফেল হইতে পারে। তখন আরেক বিপদ! চলেন তার হুশ ফিরাই। ব্যাটা বাঁচলে আমরাও বাঁচব। অত্র এলাকায় তার রক্তের মতো সুস্বাদু রক্ত আর দ্বিতীয় পাইনাই।’

এসব আলাপ-আলোচনা শুনে আমার ভেতরটা বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। গালে হঠাৎ করে সুচ বিঁধে যাওয়ার মতো ব্যথা পেলাম। ঠাস করে চড় লাগালাম গালে। ধামড়া সাইজের দুটো মশা খতম! এমন সময় একটি মশা বেজায় পনপন শব্দ তুলে আমার মাথার চতুর্দিক ঘুরতে শুরু করল। মারতে যাবো তখনই মশাটি বলে উঠল, ‘ধুর মিয়া! এইডা কোনো কাম করলেন! পণ্ডিত মশা ছিল দুজনই! আমার বাপের বয়সী। এতটা নির্দয়ভাবে না মারলেও পারতেন!’ শুনে আমি তো ব্ল্যাকআউট। এরপর কী ঘটেছিল কিছু আর মনে নাই।

পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সব ঠিকঠাক চলছিল। আমিও নিজেকে আশ্বস্ত করলাম, ক্লান্ত থাকায় এমন ভুলভাল ঘটেছে। নাথিং সিরিয়াস। কিন্তু সন্ধ্যার পর অফিস থেকে বেরিয়ে যেন অথৈ সাগরে পড়লাম। অনুধাবন করলাম যেখানেই যাচ্ছি দু-একটা মশা আমার সঙ্গে সঙ্গেই থাকছে। শুধু থাকছেই না, আমাকে নিয়ে গুরু গম্ভীর আলাপ-আলোচনাও করছে। যেমন অফিস থেকে বেরোনোর সময় এক মশাকে বলতে শুনলাম, ‘কাহিনী জানেন, এই লোকটা গতরাতে হুদাই দুজন জ্ঞানী-গুণী মশাকে থাবড়া দিয়ে মেরে ফেলেছে! চেহারা পোলাপানের, কাম করছে দুর্ধর্ষ খুনির মতো!’

দ্রুত পা চালালাম বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে। তখন শুনতে হলো, ‘পা দুইটা পাইছেও রে ভাই। জিরাফের পা। আর গতি ক্যাঙ্গারুর মতো। লম্বা লম্বা পা নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটতেছে।’ সামান্য মশার মুখে এমন চরম অপমানকর কথা শুনে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। পেছন ফিরে খুঁজলাম কোন মশার এতবড় স্পর্ধা। এদিক-সেদিক খুব মনোযোগ দিয়ে খুঁজলাম। পেলাম না। উল্টো আশপাশের মানুষদের দেখলাম আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি ফের হাঁটা শুরু করলাম। পেছন থেকে বলাবলি চলছে, ‘খুঁইজা পায়নাই। ব্যাটা কানা!’

ঠেলাঠেলি করে বাসে উঠলাম। সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হচ্ছে। হারামজাদা মশা বাসেও ঢুকে পড়েছে, ‘দেখ দেখ, বাদুড়ের মতো ঝুলে আছে। বেশ হয়েছে।’

এভাবে দিনের পর দিন কাটতে লাগল। আর আমাকেও মশাদের সব ভর্ৎসনা সহ্য করতে হল। তবে সবসময়ই যে আমাকে নিয়ে কথা হয় তা-ও না। মশাদের পারিবারিক, সামাজিক জীবন নিয়েও বহু কিছু শুনেছি-জেনেছি। তাদের সুখ-দুঃখ, আশা-হতাশার বহু গল্প শোনা হয়েছে। সবচাইতে মজার ব্যাপার হল, মশারাও মানুষদের মতো প্রেম নিবেদন করে! এমনকি প্রেমে ছ্যাঁকাও খায়! তখন শহরের বিভিন্ন নামি-দামি বারে গিয়ে মদ্যপ ব্যক্তির রক্ত খেয়ে মাতাল হয়ে মাতলামি করে। সেদিন এমন এক মাতাল মশার পাল্লায় পড়েছিলাম। মুখের কী ভাষা রে বাবা! একে-ওকে গালাগাল করছে, একসময় হাউমাউ করে কান্নাকাটি করছে, আবার এর-ওর কট্টর সমালোচনা করছে, এমনকি সরকারের বিরুদ্ধেও আক্রোশ প্রকাশ করছে!

আমি বিষয়টা বুঝতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, প্রেমে ব্যর্থ হয়েছেন বুঝলাম। কিন্তু এতে সরকারের কী দোষ?’ প্রশ্ন শুনে মশা কিছুক্ষণ থম মেরে রইল। তারপর কেঁদে দিয়ে বলল, ‘স্যরি ভাই, ভুল হয়ে গেছে। আমি মাতাল, আমাকে মাফ করে দিন।’

মশাদের এই যন্ত্রণার মাঝেই আমার বউ ফিরে এলো। কিন্তু সংসার, চাকরি জীবনে মন দিতে পারি না। যাই করি না কেন, কানের কাছে চব্বিশ ঘণ্টা মশাদের বাতচিত চলতেই থাকে। কাজে মনোযোগ দিতে মশাদের ধমক দিয়ে বসি, পরে খেয়াল করি বস সামনে দাঁড়িয়ে। নিজেকে নিয়ে সমালোচনা সহ্য করা যায়, কিন্তু লক্ষ্মী বউটাকে নিয়ে যখন সমালোচনা শুনি মাথা ঠিক থাকে না। এলোপাতাড়ি হাত-পা ছুড়ে বসি, পরে খেয়াল হয় ভুলে বউকে চড়-লাথি মেরে বসেছি। আন্দাজ করতে পারি যে আমার হাসিখুশি জীবনটা ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে।

বউকে সেদিন সত্যটা বলেও লাভ হল না। বন্ধুদের কয়েকজনকে জানিয়েছিলাম ঘটনাটা। ভেবেছিলাম সমাধান পাবো। পেয়েছি ঠ্যাঙানি আর হাসি ঠাট্টা। সাহস করে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছেও গেলাম। মশাদের আলাপ শুনতে তিনি যে আগ্রহ দেখালেন, তেমন আগ্রহ আমার রোগ নিরাময়ের প্রতি দেখালেন না। হতাশ হয়ে এক মাঝরাতে মশাদের কাছেই নত হলাম। হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলাম। তওবা করলাম জীবনে আর কোনো দিন মশার গায়ে হাত তুলব না। আমার দুরাবস্থা মশাদের ক্ষুদ্রতর হৃদয়কেও ছুঁয়ে গিয়েছিল। তারা আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে পরিত্রাণ পেয়ে এই খুশির সংবাদটা বউসহ বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করলাম। কিন্তু পরিণামে কী হল! আমাকে জোর করে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করানো হল! আমি নাকি সারা দিন মশা নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলে বেড়াই! এই লেখাটি যখন লিখছি ডাক্তার এসে বললেন, ‘এসব লিখে লাভটা কী? পাগলের লেখা কে-ই বা পড়বে?’

আমি শান্ত ভাবে জবাব দিলাম, ‘দেশে কি আর পাগলের অভাব! হরেক রকমের পাগল আছে দেশে। টাকার পাগল, নেশার পাগল, ক্ষমতার পাগল, প্রেমের পাগল... আমার লেখা না হয় তারাই পড়বে যারা মশার উৎপাতে পাগল হয়ে আছে!’