‘আমি পৃথিবীর এই বুকে আগুন জ্বালিয়ে দেব...’
jugantor
বাংলা সিনেমার গানের ব্যবচ্ছেদ
‘আমি পৃথিবীর এই বুকে আগুন জ্বালিয়ে দেব...’

  শফিক হাসান  

১৫ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর বুকের খোঁজে : নায়ক মহাশয় নায়িকাকে না পেলে পৃথিবীর বুকে আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন! বুকে যেহেতু আগুন লাগাতে চান, তার মানে পিঠ, হাত-পা, মাথা, পেট সবই আছে পৃথিবীর।

কিন্তু সেটা কোথায়, কোন অংশে শুরু কোন অংশে শেষ! এমনও হতে পারে স্বয়ং নায়ক কিংবা কোনো নৃতাত্ত্বিক বা ভূতাত্ত্বিক আমাজন জঙ্গলের মাঝখানে পৃথিবীর বুক শনাক্ত করলেন। (তাতে আগুন জ্বালাতে সুবিধা হবে)! কিন্তু এটা কি পরাক্রমশালী আমেরিকা মেনে নেবে? পরে হয়তো দেখা যাবে- বুক-পিঠের মালিকানার ভাগাভাগি এবং পেশিশক্তির স্ট্যাটাস ফলাতে গিয়ে আমেরিকা-রাশিয়া-চীন-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে!

বুকে আমার আগুন জ্বলে : ভয়াবহ যে কোনো অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। ইচ্ছাকৃত কিংবা দুর্ঘটনাসৃষ্ট আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসই পারঙ্গম। যেহেতু সিনেমার নায়ক স্বয়ং আগুন জ্বালাবেন এই আগুন নেভানো ফায়ার সার্ভিসের জন্য অতটা সহজ হবে না। নায়ক বলে কথা! তারচেয়ে বরং ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ থানায় নাশকতার হুমকির জিডি করে রাখতে পারে! জিডিতে এ প্রশ্নও উত্থাপন করা যায়- পৃথিবী কি নায়কের একচ্ছত্র মালিকানা নাকি এটা তার বাপ-দাদার তালুক!

ভালোবাসার ডান্ডাবেড়ি : একটি বাংলা সিনেমার নাম ‘তোকে ভালোবাসতেই হবে’! এককালে শোনা যেত ‘স্বর্গ থেকে আসে প্রেম স্বর্গে যায় চলে’! দিন পাল্টেছে। নায়করা খুব সহজেই আলটিমেটাম দিয়ে দেন। স্পষ্ট এ হুমকি প্রমাণ করে নায়কের প্রেম আসলে জোর-জবরদস্তিমূলক; গোঁয়ার প্রেমিক হিসেবে নিজের চাওয়াটাকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চান। নায়িকা তাকে পছন্দ করলেন কী করলেন না সেটা ধর্তব্য নয়। গানটির মাধ্যমে নায়িকাকে নায়ক প্রচ্ছন্ন তথা সুকৌশলে হুমকি দিয়েছেন- পৃথিবী যদি জ্বলেই যায়, নায়িকার অস্তিত্ব কি আর থাকে! কিংবা নায়িকার ঘরদোর, আত্মীয়-পরিজন! পৃথিবীর ভবিষ্যৎ এবং নিজের স্বজনদের কথা চিন্তা করে হলেও নায়িকা নায়কের প্রেমে সাড়া দেবেন!

শীতকালের উষ্ণতা : কথায় বলে- কারো ঘর পোড়া যায় কেউ আলু পোড়ানোর আগুন পায়! হাজারও হুমকিধমকি, বগিজগি করার পরও নায়ক যদি নায়িকার মন না পান; ‘সাহস’ করে আগুন লাগিয়ে দিতেই পারেন! বাংলাদেশে প্রতি বছরই শীতে অসংখ্য মানুষ মারা যায়। আগুন লাগানোর পর এরা এবং অন্য শীতার্তরা তা নেভানোর চেষ্টা না করে আগুন পোহাতে আসবে। জানা কথা, রোম যখন পুড়ছিল নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলো; সেখানে পৃথিবী যখন পুড়তে শুরু করবে, তখন শীতার্ত মানুষ একটু আগুন পোহাতেই পারে!

সাধারণ জ্ঞানের অসাধারণ সন্নিবেশ : গানের কথার মাধ্যমে সচেতনভাবে সাধারণ জ্ঞানের সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে। গানটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সহজেই বুঝতে পারবে- আমরা একটি গ্রহে বসবাস করি। গ্রহের নাম পৃথিবী। পৃথিবী এমনিতেই পতনোন্মুখ, চাইলে পৃথিবীর পুরোপুরি বারটা বাজিয়ে দেয়া যায়। পৃথিবীর দুর্যোগে এর বাসিন্দারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া ‘কার্যকর’ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে না। শিক্ষার্থীর পাশাপাশি দাবি-দাওয়া আদায়ে আন্দোলনকারীরাও এখান থেকে নিখুঁত একটা ছবক পাবে, জানবে- কীভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করে নিজের ‘অধিকার’ প্রতিষ্ঠা করতে হয়!

অসম্ভবকে সম্ভব করাই নায়কের কাজ : অধিকাংশ বাংলাদেশিই ‘আমিত্ব’ রোগে আক্রান্ত। সবকিছুতেই আমি আমি। নিজেকে নিয়ে সবাই এমনই ব্যতিব্যস্ত যে আমি-তুমির বাইরে ‘আমরা’ ভাবতে পারি না। এজন্য অবশ্য কাউকে দোষ দেয়া যাবে না। নায়িকাকে ছাড়া নায়ক যেমন বাঁচে না, নায়ককে ছাড়া নায়িকা আত্মাহুতি দেয়- এমন অবস্থায় আমি-তুমিরই প্রাধান্য। অসম্ভবকে সম্ভব করাই বাংলা সিনেমার নায়কদের কাজ। এক ঘুষিতে একশজনকে উড়িয়ে দেয়ার মতো করিৎকর্মা একমাত্র এফডিসির নায়কই! এ ধারার নায়কদের মধ্যে একজনের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ থেকে ঘানা পর্যন্ত তার বীরত্ব সর্বজনবিদিত।

যদি, কিন্তু, তবে : সুতরাং, যদি, কিন্তু, দেখি, তাহলে, পারলে, তবে... চলতে-ফিরতে আমরা এ শব্দগুলোই বেশি ব্যবহার করি। সিদ্ধান্তহীন বাক্য কোনো না কোনোভাবে সুবিধা দেয়। বিশেষ করে অজুহাত দেখাতে পারঙ্গমদের। নায়ক এ গানে কৌশলী ভূমিকা পালন করেছেন। ‘যদি’ অপশন দিয়ে বলেছেন তুমি আমার না হলে আগুন জ্বালিয়ে দেবো। তুমি আমার হয়ে গেলে কোনো সমস্যা থাকে না- আগুন-পানির হিসাব নাই! অবশ্য নায়িকাকে বাগানোর জন্য এটা নায়কের বিশেষ কোনো কৌশল, ফাঁকা আওয়াজ কি না- এখনও জানা যায়নি!

বাংলা সিনেমার গানের ব্যবচ্ছেদ

‘আমি পৃথিবীর এই বুকে আগুন জ্বালিয়ে দেব...’

 শফিক হাসান 
১৫ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর বুকের খোঁজে : নায়ক মহাশয় নায়িকাকে না পেলে পৃথিবীর বুকে আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন! বুকে যেহেতু আগুন লাগাতে চান, তার মানে পিঠ, হাত-পা, মাথা, পেট সবই আছে পৃথিবীর।

কিন্তু সেটা কোথায়, কোন অংশে শুরু কোন অংশে শেষ! এমনও হতে পারে স্বয়ং নায়ক কিংবা কোনো নৃতাত্ত্বিক বা ভূতাত্ত্বিক আমাজন জঙ্গলের মাঝখানে পৃথিবীর বুক শনাক্ত করলেন। (তাতে আগুন জ্বালাতে সুবিধা হবে)! কিন্তু এটা কি পরাক্রমশালী আমেরিকা মেনে নেবে? পরে হয়তো দেখা যাবে- বুক-পিঠের মালিকানার ভাগাভাগি এবং পেশিশক্তির স্ট্যাটাস ফলাতে গিয়ে আমেরিকা-রাশিয়া-চীন-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে!

বুকে আমার আগুন জ্বলে : ভয়াবহ যে কোনো অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। ইচ্ছাকৃত কিংবা দুর্ঘটনাসৃষ্ট আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসই পারঙ্গম। যেহেতু সিনেমার নায়ক স্বয়ং আগুন জ্বালাবেন এই আগুন নেভানো ফায়ার সার্ভিসের জন্য অতটা সহজ হবে না। নায়ক বলে কথা! তারচেয়ে বরং ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ থানায় নাশকতার হুমকির জিডি করে রাখতে পারে! জিডিতে এ প্রশ্নও উত্থাপন করা যায়- পৃথিবী কি নায়কের একচ্ছত্র মালিকানা নাকি এটা তার বাপ-দাদার তালুক!

ভালোবাসার ডান্ডাবেড়ি : একটি বাংলা সিনেমার নাম ‘তোকে ভালোবাসতেই হবে’! এককালে শোনা যেত ‘স্বর্গ থেকে আসে প্রেম স্বর্গে যায় চলে’! দিন পাল্টেছে। নায়করা খুব সহজেই আলটিমেটাম দিয়ে দেন। স্পষ্ট এ হুমকি প্রমাণ করে নায়কের প্রেম আসলে জোর-জবরদস্তিমূলক; গোঁয়ার প্রেমিক হিসেবে নিজের চাওয়াটাকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চান। নায়িকা তাকে পছন্দ করলেন কী করলেন না সেটা ধর্তব্য নয়। গানটির মাধ্যমে নায়িকাকে নায়ক প্রচ্ছন্ন তথা সুকৌশলে হুমকি দিয়েছেন- পৃথিবী যদি জ্বলেই যায়, নায়িকার অস্তিত্ব কি আর থাকে! কিংবা নায়িকার ঘরদোর, আত্মীয়-পরিজন! পৃথিবীর ভবিষ্যৎ এবং নিজের স্বজনদের কথা চিন্তা করে হলেও নায়িকা নায়কের প্রেমে সাড়া দেবেন!

শীতকালের উষ্ণতা : কথায় বলে- কারো ঘর পোড়া যায় কেউ আলু পোড়ানোর আগুন পায়! হাজারও হুমকিধমকি, বগিজগি করার পরও নায়ক যদি নায়িকার মন না পান; ‘সাহস’ করে আগুন লাগিয়ে দিতেই পারেন! বাংলাদেশে প্রতি বছরই শীতে অসংখ্য মানুষ মারা যায়। আগুন লাগানোর পর এরা এবং অন্য শীতার্তরা তা নেভানোর চেষ্টা না করে আগুন পোহাতে আসবে। জানা কথা, রোম যখন পুড়ছিল নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলো; সেখানে পৃথিবী যখন পুড়তে শুরু করবে, তখন শীতার্ত মানুষ একটু আগুন পোহাতেই পারে!

সাধারণ জ্ঞানের অসাধারণ সন্নিবেশ : গানের কথার মাধ্যমে সচেতনভাবে সাধারণ জ্ঞানের সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে। গানটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সহজেই বুঝতে পারবে- আমরা একটি গ্রহে বসবাস করি। গ্রহের নাম পৃথিবী। পৃথিবী এমনিতেই পতনোন্মুখ, চাইলে পৃথিবীর পুরোপুরি বারটা বাজিয়ে দেয়া যায়। পৃথিবীর দুর্যোগে এর বাসিন্দারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া ‘কার্যকর’ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে না। শিক্ষার্থীর পাশাপাশি দাবি-দাওয়া আদায়ে আন্দোলনকারীরাও এখান থেকে নিখুঁত একটা ছবক পাবে, জানবে- কীভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করে নিজের ‘অধিকার’ প্রতিষ্ঠা করতে হয়!

অসম্ভবকে সম্ভব করাই নায়কের কাজ : অধিকাংশ বাংলাদেশিই ‘আমিত্ব’ রোগে আক্রান্ত। সবকিছুতেই আমি আমি। নিজেকে নিয়ে সবাই এমনই ব্যতিব্যস্ত যে আমি-তুমির বাইরে ‘আমরা’ ভাবতে পারি না। এজন্য অবশ্য কাউকে দোষ দেয়া যাবে না। নায়িকাকে ছাড়া নায়ক যেমন বাঁচে না, নায়ককে ছাড়া নায়িকা আত্মাহুতি দেয়- এমন অবস্থায় আমি-তুমিরই প্রাধান্য। অসম্ভবকে সম্ভব করাই বাংলা সিনেমার নায়কদের কাজ। এক ঘুষিতে একশজনকে উড়িয়ে দেয়ার মতো করিৎকর্মা একমাত্র এফডিসির নায়কই! এ ধারার নায়কদের মধ্যে একজনের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ থেকে ঘানা পর্যন্ত তার বীরত্ব সর্বজনবিদিত।

যদি, কিন্তু, তবে : সুতরাং, যদি, কিন্তু, দেখি, তাহলে, পারলে, তবে... চলতে-ফিরতে আমরা এ শব্দগুলোই বেশি ব্যবহার করি। সিদ্ধান্তহীন বাক্য কোনো না কোনোভাবে সুবিধা দেয়। বিশেষ করে অজুহাত দেখাতে পারঙ্গমদের। নায়ক এ গানে কৌশলী ভূমিকা পালন করেছেন। ‘যদি’ অপশন দিয়ে বলেছেন তুমি আমার না হলে আগুন জ্বালিয়ে দেবো। তুমি আমার হয়ে গেলে কোনো সমস্যা থাকে না- আগুন-পানির হিসাব নাই! অবশ্য নায়িকাকে বাগানোর জন্য এটা নায়কের বিশেষ কোনো কৌশল, ফাঁকা আওয়াজ কি না- এখনও জানা যায়নি!