বন্ধু যখন বিশ্বপ্রেমিক
jugantor
পাঠক রম্য
বন্ধু যখন বিশ্বপ্রেমিক

  হোসাইন আহমেদ অলিভ  

১০ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ একসঙ্গে কয়টি প্রেম করতে পারে? দুটি, চারটি, পাঁচটি? আমার বন্ধু সাব্বির এক্ষেত্রে রেকর্ড করে ফেলেছে। সে একই সময়ে একসঙ্গে পনেরো জন প্রেমিকা ম্যানেজ করে চলে।

তার মোবাইলের কন্টাক্টলিস্ট চেক করলে দেখা যায় ভাইয়া এক, ভাইয়া দুই, বাবা দুই, বাবা পাঁচ- এরকম সিরিয়াল দিয়ে দুই ডজন নাম্বার সেভ করা। একবার তার মেসে গেছি। সে ঢুকেছে গোসল করতে। তখন তার ফোনে কল এলো ভাইয়া এক-এর। আমি সরল মনে ফোন রিসিভ করে সালাম দিয়ে বললাম, ‘ভাইয়া, সাব্বির তো গোসলে ঢুকেছে। একটু পরে ফোন দিন।’

‘শালা, কারে ভাইয়া ডাকস? আমারে কি তোর ভাইয়া মনে হয়?’ ওপাশ থেকে এক মেয়ে কণ্ঠ ঝেড়ে দিয়ে ফোন কেটে দিল।

সাব্বিরের ভাইয়া কবে থেকে মেয়ে হয়ে গেল সেটা ভেবে আমার মাথা নষ্ট হওয়ার জোগাড়! সাব্বির গোসলখানা থেকে বের হতেই চেপে ধরলাম, ‘হারামি, তোর ভাই যে জেন্ডার চেঞ্জ করে মেয়ে হইছে সেটা আমায় বললি না কেন?’

সাব্বির তো অবাক, ‘আমার ভাই মেয়ে হয়ে গেছে তোকে কে বলল?’

‘তোর ভাই ফোন করেছিল। ভাইয়া ডাকায় রাগ করে ফোন কেটে দিল।’

সাব্বির ছোঁ মেরে মোবাইল হাতে নিয়েই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল, ‘তুই কী করছস এইটা? তুই শালা আমার ব্রেকআপের ব্যবস্থা করছস।’

আমি ভেবেই পেলাম না তার ভাইয়ার সঙ্গে আমি কিভাবে ব্রেকআপ করালাম। এতক্ষণে সে অপরপাশে ফোন দিয়ে ‘জানপাখি’, ‘জান্টুস’, ‘ফুলপাখি’ বলা শুরু করে দিয়েছে। এতক্ষণে আমার ভাইয়া রহস্য উদ্ধার হলো।

সে ফোন রাখার পর চেপে ধরলাম, ‘তুই যে প্রেম করস এইডা কি আমারে কইছস? আবার প্রেমিকার নাম্বার ভাইয়া নামে সেভ কইরা রাখস?’

সে লজ্জায় মিইয়ে গেল, ‘দোস্ত, আসলে আগেই কইবার চাইছিলাম। লজ্জায় কইতে পারি নাই!’

সাব্বির আমাকে বোঝাল প্রেমিকাকে ভাইয়া নামে সেভ করার রহস্য, ‘বর্তমানে প্রেম করে ধরা খাওয়ার হাত থেকে বাঁচার এটাই নিঞ্জা টেকনিক। প্রেমিকার নাম্বার সবাই বাবা, ভাইয়ার নামেই সেভ করে রাখে!’

আমিও এই গুপ্তবিদ্যা জেনে বিজ্ঞ হয়ে বাড়ি ফিরে গেলাম।

পরদিন খেলা ছিল। খেলার পর সবাই মাঠের পাশের পুকুরে নামল গোসল করতে। আমি সাঁতার পারি না। তাই পাড়ে বসে সবার গোসল করা দেখছি। পাহারাদার সূত্রে সবার মোবাইল আমার কাছে। এমন সময় সাব্বিরের ফোনে কল এলো। বাবা নামে একজন কল করেছে। আমিও অভিজ্ঞ ব্যক্তির মতো ফোন রিসিভ করে বললাম, ‘ভাবি, সাব্বির তো গোসল করে! গোসল শেষ হলে বলব আপনি ফোন করেছিলেন। তা ভাবি আমাদের ট্রিট দেবেন কবে?’

‘দেওয়াচ্ছি তোর ট্রিট! আগে বল ভাবি কে?’ ওপাশ থেকে পুরুষ কণ্ঠের গর্জন শুনে আমার ভিমরি খাওয়ার জোগাড়!

আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘আপনি সাব্বিরের গার্লফ্রেন্ড জরিনা না?’

‘হ! আমি সাব্বিরের মোছওয়ালা প্রেমিকা। সাব্বিররে বইলা দিও তার মোছওয়ালা প্রেমিকা ফোন দিছিল!’

সাব্বির গোছল থেকে ওঠার পর তাকে বললাম, ‘তোর মোছওয়ালা প্রেমিকা ফোন দিছিল!’

সাব্বির কললিস্ট চেক করে মাঠেই বসে পড়ল, ‘তুই এইডা কী করছস? আমার বাপেরে কী কইছস?’

আমি বললাম, ‘তোর বাপ সেইটা আমি জানব কীভাবে? তুই-ই তো বলেছিস, বাবা-ভাইয়া নামে প্রেমিকার নাম্বার সেভ করা থাকে!’

তারপর সেদিন সাব্বির আমায় যা কেলাল না! এখনও অমাবস্যা পূর্ণিমায় শরীর ব্যথা করে।

এরপর অনেকদিন দেখা-সাক্ষাৎ নাই। একদিন এক আত্মীয়কে দেখতে হাসপাতালে গেছি। তার পাশের বেডে এক রোগীর সারা দেহ ব্যান্ডেজে মোড়ানো। ভালো করে তাকাতেই দেখি সাব্বির, ‘তোর এ অবস্থা হইল কেমনে?’

‘অজ্ঞান পার্টি ধরছিল।’

‘অজ্ঞান পার্টি তোরে পিটাইয়া এই অবস্থা করছে?’

‘না রে ভাই! অজ্ঞান পার্টি অজ্ঞান কইরা জিনিসপত্র নিয়া হাসপাতালের সামনে ফালাইয়া গেছিল। তারপর এক এক কইরা আমার পনের জন প্রেমিকারে ফোন দিয়া কইছে আমি এক্সিডেন্ট কইরা হাসপাতালে ভর্তি!’

‘ঠিকই তো আছে। সে তো ফোন দিছে তোর বাপ-ভাইয়ের নাম্বারে। সে কি জানে, ওইপারে তোর প্রেমিকা বইসা আছে? তো তোর হাড়গোড় ভাঙল কেমনে?’

‘জ্ঞান ফেরার পর দেখি সামনে পনের জন প্রেমিকা। তারাই নিজ দায়িত্বে মাইরা আবার অজ্ঞান করছে!’

ভাটিকাশর বড়বাড়ি, সদর, ময়মনসিংহ।

পাঠক রম্য

বন্ধু যখন বিশ্বপ্রেমিক

 হোসাইন আহমেদ অলিভ 
১০ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ একসঙ্গে কয়টি প্রেম করতে পারে? দুটি, চারটি, পাঁচটি? আমার বন্ধু সাব্বির এক্ষেত্রে রেকর্ড করে ফেলেছে। সে একই সময়ে একসঙ্গে পনেরো জন প্রেমিকা ম্যানেজ করে চলে।

তার মোবাইলের কন্টাক্টলিস্ট চেক করলে দেখা যায় ভাইয়া এক, ভাইয়া দুই, বাবা দুই, বাবা পাঁচ- এরকম সিরিয়াল দিয়ে দুই ডজন নাম্বার সেভ করা। একবার তার মেসে গেছি। সে ঢুকেছে গোসল করতে। তখন তার ফোনে কল এলো ভাইয়া এক-এর। আমি সরল মনে ফোন রিসিভ করে সালাম দিয়ে বললাম, ‘ভাইয়া, সাব্বির তো গোসলে ঢুকেছে। একটু পরে ফোন দিন।’

‘শালা, কারে ভাইয়া ডাকস? আমারে কি তোর ভাইয়া মনে হয়?’ ওপাশ থেকে এক মেয়ে কণ্ঠ ঝেড়ে দিয়ে ফোন কেটে দিল।

সাব্বিরের ভাইয়া কবে থেকে মেয়ে হয়ে গেল সেটা ভেবে আমার মাথা নষ্ট হওয়ার জোগাড়! সাব্বির গোসলখানা থেকে বের হতেই চেপে ধরলাম, ‘হারামি, তোর ভাই যে জেন্ডার চেঞ্জ করে মেয়ে হইছে সেটা আমায় বললি না কেন?’

সাব্বির তো অবাক, ‘আমার ভাই মেয়ে হয়ে গেছে তোকে কে বলল?’

‘তোর ভাই ফোন করেছিল। ভাইয়া ডাকায় রাগ করে ফোন কেটে দিল।’

সাব্বির ছোঁ মেরে মোবাইল হাতে নিয়েই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল, ‘তুই কী করছস এইটা? তুই শালা আমার ব্রেকআপের ব্যবস্থা করছস।’

আমি ভেবেই পেলাম না তার ভাইয়ার সঙ্গে আমি কিভাবে ব্রেকআপ করালাম। এতক্ষণে সে অপরপাশে ফোন দিয়ে ‘জানপাখি’, ‘জান্টুস’, ‘ফুলপাখি’ বলা শুরু করে দিয়েছে। এতক্ষণে আমার ভাইয়া রহস্য উদ্ধার হলো।

সে ফোন রাখার পর চেপে ধরলাম, ‘তুই যে প্রেম করস এইডা কি আমারে কইছস? আবার প্রেমিকার নাম্বার ভাইয়া নামে সেভ কইরা রাখস?’

সে লজ্জায় মিইয়ে গেল, ‘দোস্ত, আসলে আগেই কইবার চাইছিলাম। লজ্জায় কইতে পারি নাই!’

সাব্বির আমাকে বোঝাল প্রেমিকাকে ভাইয়া নামে সেভ করার রহস্য, ‘বর্তমানে প্রেম করে ধরা খাওয়ার হাত থেকে বাঁচার এটাই নিঞ্জা টেকনিক। প্রেমিকার নাম্বার সবাই বাবা, ভাইয়ার নামেই সেভ করে রাখে!’

আমিও এই গুপ্তবিদ্যা জেনে বিজ্ঞ হয়ে বাড়ি ফিরে গেলাম।

পরদিন খেলা ছিল। খেলার পর সবাই মাঠের পাশের পুকুরে নামল গোসল করতে। আমি সাঁতার পারি না। তাই পাড়ে বসে সবার গোসল করা দেখছি। পাহারাদার সূত্রে সবার মোবাইল আমার কাছে। এমন সময় সাব্বিরের ফোনে কল এলো। বাবা নামে একজন কল করেছে। আমিও অভিজ্ঞ ব্যক্তির মতো ফোন রিসিভ করে বললাম, ‘ভাবি, সাব্বির তো গোসল করে! গোসল শেষ হলে বলব আপনি ফোন করেছিলেন। তা ভাবি আমাদের ট্রিট দেবেন কবে?’

‘দেওয়াচ্ছি তোর ট্রিট! আগে বল ভাবি কে?’ ওপাশ থেকে পুরুষ কণ্ঠের গর্জন শুনে আমার ভিমরি খাওয়ার জোগাড়!

আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘আপনি সাব্বিরের গার্লফ্রেন্ড জরিনা না?’

‘হ! আমি সাব্বিরের মোছওয়ালা প্রেমিকা। সাব্বিররে বইলা দিও তার মোছওয়ালা প্রেমিকা ফোন দিছিল!’

সাব্বির গোছল থেকে ওঠার পর তাকে বললাম, ‘তোর মোছওয়ালা প্রেমিকা ফোন দিছিল!’

সাব্বির কললিস্ট চেক করে মাঠেই বসে পড়ল, ‘তুই এইডা কী করছস? আমার বাপেরে কী কইছস?’

আমি বললাম, ‘তোর বাপ সেইটা আমি জানব কীভাবে? তুই-ই তো বলেছিস, বাবা-ভাইয়া নামে প্রেমিকার নাম্বার সেভ করা থাকে!’

তারপর সেদিন সাব্বির আমায় যা কেলাল না! এখনও অমাবস্যা পূর্ণিমায় শরীর ব্যথা করে।

এরপর অনেকদিন দেখা-সাক্ষাৎ নাই। একদিন এক আত্মীয়কে দেখতে হাসপাতালে গেছি। তার পাশের বেডে এক রোগীর সারা দেহ ব্যান্ডেজে মোড়ানো। ভালো করে তাকাতেই দেখি সাব্বির, ‘তোর এ অবস্থা হইল কেমনে?’

‘অজ্ঞান পার্টি ধরছিল।’

‘অজ্ঞান পার্টি তোরে পিটাইয়া এই অবস্থা করছে?’

‘না রে ভাই! অজ্ঞান পার্টি অজ্ঞান কইরা জিনিসপত্র নিয়া হাসপাতালের সামনে ফালাইয়া গেছিল। তারপর এক এক কইরা আমার পনের জন প্রেমিকারে ফোন দিয়া কইছে আমি এক্সিডেন্ট কইরা হাসপাতালে ভর্তি!’

‘ঠিকই তো আছে। সে তো ফোন দিছে তোর বাপ-ভাইয়ের নাম্বারে। সে কি জানে, ওইপারে তোর প্রেমিকা বইসা আছে? তো তোর হাড়গোড় ভাঙল কেমনে?’

‘জ্ঞান ফেরার পর দেখি সামনে পনের জন প্রেমিকা। তারাই নিজ দায়িত্বে মাইরা আবার অজ্ঞান করছে!’

ভাটিকাশর বড়বাড়ি, সদর, ময়মনসিংহ।