মশা মারা...
jugantor
মশা মারা...

  সত্যজিৎ বিশ্বাস  

১০ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আদনান উল্লাহ সাহেব এখন আর শুধু আদনান সাহেব নন। তিনি এখন এলাকার নির্বাচিত এমপি আদনান উল্লাহ। নির্বাচিত হয়ে ফুলের মালা পরতে পরতে ঘাড়ে এলার্জি হয়ে গেছে। তারপরও প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় হাসি মুখে ফুলের মালা পরে যাচ্ছেন। পরার পরে যে খুলে রাখবেন, তারও কোনো জো নেই। কুরবানির গরুর মতো মালা পরে দাঁত বের করে সবার সঙ্গে ছবি তুলতে হয়। হাতে হাতে মিলিয়ে, কারও কারও সঙ্গে বুকে বুক মিলিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে হয়। জনগণ হলো ভোট লক্ষ্মী। যত কষ্টই হোক লক্ষ্মীকে তো আর দূরে ঠেলা যায় না।

একটু অবসর পেয়ে জিরিয়ে নিচ্ছিলেন এমপি আদনান সাহেব। এমন সময় বত্রিশ দাঁত বের করে হাসতে হাসতে সামনে এলো তার খাস পিএস মকবুল উল্লাহ। মকবুল উল্লাহ সম্পর্কে ভাইস্তা হয়। এসব পোস্টে প্রচণ্ড নির্ভরযোগ্য, শিয়ালের মতো ধূর্ত নিজের লোক না নিলে চলে না। এ ছেলেটার সেই এলেম আছে। নির্বাচনী ভাষণের স্ক্রিপ্ট থেকে শুরু করে এলাকার মানুষের উদ্দেশে ব্যক্তিগত নির্বাচনী ইশতেহারও সে তৈরি করে দিয়েছে। সেই ইশতেহার দেখে সাধারণ মানুষ তো বটেই, আদনান উল্লাহ সাহেবের নিজেরই মাথা খারাপ অবস্থা!

ইশতেহারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় নির্বাচনী ইশতেহার ছিল, ‘হে দেশবাসী, আমি আদনান আপনাদের কথা দিচ্ছি, এই যে এত মশা দেখছেন, মশাতঙ্কে আতঙ্কিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, আমি নির্বাচিত হলে এই শহরে আর কোনো মশা থাকবে না। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা যেভাবে বাঁশির জাদুতে শহরের সব ইঁদুর দূর করেছিল, আমিও তেমনি শহরের সব মশা দূর করে দেবো। আপনারা জীবনেও যা দেখেননি, আমাকে নির্বাচিত করলে তা দেখবেন। আমিই হবো দেশের প্রথম মশক নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী!’ সেই ঐতিহাসিক ইশতেহার শুনে মানুষের হাততালি আর বন্ধ হয় না।

মকবুলকে চোখের সামনে দেখে আদনান সাহেব হাসতে পারলেন না। মিটিং, মিছিলে যে শুধু গলা ফেটেছে তা না, চিন্তায় মাথার তালুও ফেটে যাচ্ছে।

‘মকবুল রে, বলার সময় তো লম্বা গলায় বলে এসেছি। এখন কী হবে বল?’

‘কেন, লম্বা গলা ফুলের মালায় ভরে যাবে। সবাই আপনার সঙ্গে গ্রুপ ছবি তুলবে, সেলফি তুলবে।’

‘আরে ধুর! আমার দেওয়া প্রতিশ্রুতির কী হবে? মন্ত্রিসভা তো গঠন হবে কয়েকদিনের মধ্যেই।’

‘ও, এই ব্যাপার। আপনার কিচ্ছু চিন্তা করতে হবে না। আপনি ধরে নেন মন্ত্রী হয়ে গেছেন।’

‘কী যে বলিস, ওপর মহলে আমার তো কোনো চ্যানেলই নাই। আমি কী করে মন্ত্রী হবো? তাছাড়া ঝানুঝানু ব্যক্তিরা অভিজ্ঞতার ঝুলি হাতে মন্ত্রী হওয়ার জন্য বসে আছেন, আমাকে কেন মন্ত্রী বানাবে?’

‘এই তো মূল জায়গা ধরে ফেলেছেন। এই জন্যই আপনি মন্ত্রী হবেন।’

‘মূল জায়গা ধরে ফেলেছি মানে? ফাজলামি করিস?’

‘ফাজলামি করব কেন? আপনিই বলেন, আপনি কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে এমপি হয়েছেন? বলেছেন, আমিই হবো দেশের প্রথম মশক নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী। তো, এই রকম কোনো মন্ত্রণালয় কী আছে? আছে, মশা মন্ত্রণালয়?’

‘না নেই।’

‘যে বিষয়ক কোনো মন্ত্রণালয়-ই নেই, সেই মন্ত্রণালয়ের ঝানু ব্যক্তি কে?’

‘কে?’

‘যে প্রথম এমন কোনো মন্ত্রণালয়ের স্বপ্ন দেখে, সে। এই কথাটাই আপনি ওপর মহলে পেশ করবেন। মশা এমন একটা স্পর্শকাতর আমজনতা মার্কা ইস্যু কেউ দ্বিমত পোষণ করার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া সবাই চমক দেখাতে পছন্দ করে। ঠিকমত বোঝাতে পারলে আপনিই হবেন নতুন মন্ত্রণালয়ের নতুন চমক!’

ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের ড্রেন থেকে কয়েকটা মশা উড়ে এলো। মকবুল লাফ দিয়ে উঠে বলল, ‘দেখলেন তো, প্রস্তাব শুনেই নতুন মন্ত্রীকে বরণ করার জন্য মশারা কেমন দল বেঁধে চলে এসেছে!’

আদনান উল্লাহ সাহেব চমকিত দৃষ্টিতে একবার মশার দিকে আরেকবার মকবুল উল্লাহর দিকে তাকাতে লাগালেন।

মশা মারা...

 সত্যজিৎ বিশ্বাস 
১০ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আদনান উল্লাহ সাহেব এখন আর শুধু আদনান সাহেব নন। তিনি এখন এলাকার নির্বাচিত এমপি আদনান উল্লাহ। নির্বাচিত হয়ে ফুলের মালা পরতে পরতে ঘাড়ে এলার্জি হয়ে গেছে। তারপরও প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় হাসি মুখে ফুলের মালা পরে যাচ্ছেন। পরার পরে যে খুলে রাখবেন, তারও কোনো জো নেই। কুরবানির গরুর মতো মালা পরে দাঁত বের করে সবার সঙ্গে ছবি তুলতে হয়। হাতে হাতে মিলিয়ে, কারও কারও সঙ্গে বুকে বুক মিলিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে হয়। জনগণ হলো ভোট লক্ষ্মী। যত কষ্টই হোক লক্ষ্মীকে তো আর দূরে ঠেলা যায় না।

একটু অবসর পেয়ে জিরিয়ে নিচ্ছিলেন এমপি আদনান সাহেব। এমন সময় বত্রিশ দাঁত বের করে হাসতে হাসতে সামনে এলো তার খাস পিএস মকবুল উল্লাহ। মকবুল উল্লাহ সম্পর্কে ভাইস্তা হয়। এসব পোস্টে প্রচণ্ড নির্ভরযোগ্য, শিয়ালের মতো ধূর্ত নিজের লোক না নিলে চলে না। এ ছেলেটার সেই এলেম আছে। নির্বাচনী ভাষণের স্ক্রিপ্ট থেকে শুরু করে এলাকার মানুষের উদ্দেশে ব্যক্তিগত নির্বাচনী ইশতেহারও সে তৈরি করে দিয়েছে। সেই ইশতেহার দেখে সাধারণ মানুষ তো বটেই, আদনান উল্লাহ সাহেবের নিজেরই মাথা খারাপ অবস্থা!

ইশতেহারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় নির্বাচনী ইশতেহার ছিল, ‘হে দেশবাসী, আমি আদনান আপনাদের কথা দিচ্ছি, এই যে এত মশা দেখছেন, মশাতঙ্কে আতঙ্কিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, আমি নির্বাচিত হলে এই শহরে আর কোনো মশা থাকবে না। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা যেভাবে বাঁশির জাদুতে শহরের সব ইঁদুর দূর করেছিল, আমিও তেমনি শহরের সব মশা দূর করে দেবো। আপনারা জীবনেও যা দেখেননি, আমাকে নির্বাচিত করলে তা দেখবেন। আমিই হবো দেশের প্রথম মশক নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী!’ সেই ঐতিহাসিক ইশতেহার শুনে মানুষের হাততালি আর বন্ধ হয় না।

মকবুলকে চোখের সামনে দেখে আদনান সাহেব হাসতে পারলেন না। মিটিং, মিছিলে যে শুধু গলা ফেটেছে তা না, চিন্তায় মাথার তালুও ফেটে যাচ্ছে।

‘মকবুল রে, বলার সময় তো লম্বা গলায় বলে এসেছি। এখন কী হবে বল?’

‘কেন, লম্বা গলা ফুলের মালায় ভরে যাবে। সবাই আপনার সঙ্গে গ্রুপ ছবি তুলবে, সেলফি তুলবে।’

‘আরে ধুর! আমার দেওয়া প্রতিশ্রুতির কী হবে? মন্ত্রিসভা তো গঠন হবে কয়েকদিনের মধ্যেই।’

‘ও, এই ব্যাপার। আপনার কিচ্ছু চিন্তা করতে হবে না। আপনি ধরে নেন মন্ত্রী হয়ে গেছেন।’

‘কী যে বলিস, ওপর মহলে আমার তো কোনো চ্যানেলই নাই। আমি কী করে মন্ত্রী হবো? তাছাড়া ঝানুঝানু ব্যক্তিরা অভিজ্ঞতার ঝুলি হাতে মন্ত্রী হওয়ার জন্য বসে আছেন, আমাকে কেন মন্ত্রী বানাবে?’

‘এই তো মূল জায়গা ধরে ফেলেছেন। এই জন্যই আপনি মন্ত্রী হবেন।’

‘মূল জায়গা ধরে ফেলেছি মানে? ফাজলামি করিস?’

‘ফাজলামি করব কেন? আপনিই বলেন, আপনি কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে এমপি হয়েছেন? বলেছেন, আমিই হবো দেশের প্রথম মশক নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী। তো, এই রকম কোনো মন্ত্রণালয় কী আছে? আছে, মশা মন্ত্রণালয়?’

‘না নেই।’

‘যে বিষয়ক কোনো মন্ত্রণালয়-ই নেই, সেই মন্ত্রণালয়ের ঝানু ব্যক্তি কে?’

‘কে?’

‘যে প্রথম এমন কোনো মন্ত্রণালয়ের স্বপ্ন দেখে, সে। এই কথাটাই আপনি ওপর মহলে পেশ করবেন। মশা এমন একটা স্পর্শকাতর আমজনতা মার্কা ইস্যু কেউ দ্বিমত পোষণ করার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া সবাই চমক দেখাতে পছন্দ করে। ঠিকমত বোঝাতে পারলে আপনিই হবেন নতুন মন্ত্রণালয়ের নতুন চমক!’

ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের ড্রেন থেকে কয়েকটা মশা উড়ে এলো। মকবুল লাফ দিয়ে উঠে বলল, ‘দেখলেন তো, প্রস্তাব শুনেই নতুন মন্ত্রীকে বরণ করার জন্য মশারা কেমন দল বেঁধে চলে এসেছে!’

আদনান উল্লাহ সাহেব চমকিত দৃষ্টিতে একবার মশার দিকে আরেকবার মকবুল উল্লাহর দিকে তাকাতে লাগালেন।