প্রেম করোনা প্রেম করোনা, খোকন ঘুমায় ঘাটে!
jugantor
ভ্যালেন্টাইন রঙ্গ
প্রেম করোনা প্রেম করোনা, খোকন ঘুমায় ঘাটে!
আজ তো ভ্যালেন্টাইন ডে! আমার জন্য কী এনেছো? * ফুল এনেছি। মানে তাজা ফুলকপি! কিছুক্ষণ দেখে ভালো করে রান্না করবে।

  মো. রায়হান কবির  

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাচেলরদের মেসগুলোতে যে একবার থাকে, জীবনে আর তাকে কোনো কিছুর ট্রেনিং নেওয়ার দরকার পড়ে না। যেসব অভিভাবক অলস সন্তানদের নিয়ে বিপাকে আছেন, তারা অন্তত একবার তাদের সন্তানকে কিছু দিনের জন্য মেসে থাকার সুযোগ দিয়ে দেখতে পারেন।

মেসকে একটা ‘ইনস্টিটিউশন’ বললেও কম বলা হবে। কেননা ইনস্টিটিউশন আপনাকে কিতাবি শিক্ষা দেবে। আর মেস লাইফ আপনাকে দেবে বাস্তব শিক্ষা। শিক্ষাজীবন শেষে চাকরির জন্য যারা চেষ্টা করেন, তারা চাকরিতে ঢোকার পর যে সম্ভাব্য জেলাসি কিংবা কূটকৌশলের মুখোমুখি হওয়ার কথা তা তারা মেস লাইফ থেকে আগেই শিখে ফেলেন।

নিজের অজান্তে মেস লাইফ এ ধরনের অনেক কিছুই আপনাকে শিক্ষা দিয়ে দেবে। কেননা এখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের, বিভিন্ন ধরনের মানুষের সমাবেশ ঘটে। আবার বেকার, চাকরিজীবী, বুদ্ধিজীবী কবি-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদের সমন্বয়েও এসব মেস পরিপূর্ণ থাকে অনেক সময়।

মেহেদি, হারুন এবং খোকন- এ তিনজনের বসবাস ফার্মগেটের একটি মেসে। এক রুমের বাসিন্দা তারা, যাকে বলা হয় রুমমেট। তিন রুমের এ মেসের মোট সদস্য সংখ্যা ১০-১২ জন। ফলে এই মেস সর্বদাই গমগম করে। কেউ উচ্চস্বরে মোবাইলে কথা বলে, তো কেউ ঘরের এক কোণে এমন নিচু স্বরে কথা বলে যে, কেউ তার নাগালের মধ্যে থাকলেও সেই কথা বুঝতে পারে না। নিচু স্বরে কথা বলায় এক্সপার্ট হারুন। শুধু নিচু স্বরেই নয়, নানা যুক্তি এবং মিষ্টতা মিলিয়ে কথা বলে সে। ফলে এ মেসে আর কারও বসন্ত কিংবা ভ্যালেন্টাইন আসুক বা না আসুক হারুনের জীবনে চিরকালই বসন্ত।

হারুন বেশ ট্রেন্ডি। বসন্তে বাসন্তি কালার পাঞ্জাবি, ভ্যালেন্টাইনে লাল টি-শার্ট কিংবা পহেলা ফাল্গ–নে পরার জন্য হলুদ পাঞ্জাবি সর্বদা আয়রন করা থাকে তার। ভালোবাসার বিভিন্ন পার্বণে হারুনের খালি হাতে বের হয়ে হাত ভর্তি গিফটসহ ফেরা একসময় অন্যদের চোখে সয়ে যায়। অথচ এই মেসের কত বাসিন্দাই না রাতের পর রাত জেগে ফেসবুকিং আর মেসেজ আদান-প্রদান করেও কোনো বসন্তে কিংবা ভ্যালেন্টাইন ডে’তে একবার ডেটিং পর্যন্ত করতে পারলো না গিফট তো দূরের কথা!

মেসে কয়েকজন চাকরিজীবীও আছেন। তারা পকেটে ক্রেডিট কার্ড নিয়ে ঘোরেন আর ক্রেডিট কার্ডে ভ্যালেন্টাইন ডে’র কাপল অফার দেখে আফসোস করেন, ‘আহা, আজ একজন প্রেমিকা নেই বলে...!’ ওদিকে হারুন পকেটে শুধু রিকশা ভাড়া আর কয়েকটা সিগারেট কেনার পয়সা নিয়ে বের হয়েও ঠিকই ডেটিং সেরে আসে। ভ্যালেন্টাইন ডে’র রাতে যখন সে ফেরে তার পাঁচ হাত দূর থেকে ভেসে আসা সুগন্ধিতে বোঝা যায় এক প্রেমিক পুরুষের আগমন ঘটছে। আর বাকিরা তখন ল্যাপটপ কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনকে টিভি বানিয়ে ভ্যালেন্টাইন ডে’র নাটক দেখায় মশগুল।

এভাবেই কাটছিল দিনগুলো। হারুনের প্রেমিকারা জানে হারুন স্টুডেন্ট, ফলে তার পক্ষে খরচ করা সম্ভব নয়। তাই তারাই রেস্টুরেন্টে বিল পে করে, আবার গিফটও দেয়। ওদিকে ছাত্র থাকার সুবাদে হারুন শুধু চকলেট আর ফুল দিয়েই কাজ সারে। করোনাকালেও হারুনের প্রেম থেমে নেই। বরং লকডাউনকে সে কাজে লাগিয়েছে দারুণভাবে। এবার হারুনের বেশ কয়েকটি ডেটিং আছে। আর ডেটিংও যেনতেন জায়গায় নয়। এবার প্রমোশন পেয়ে পাঁচ তারকা হোটেলের কাপল-লাঞ্চ এবং ডিনারের অফার পর্যন্ত এসে গেছে। অন্যান্য বার ডেটিং সেরে এসে গল্প শোনাতো। কিন্তু এবার আবেগের অতিশায্যে এবং নিজের সক্ষমতা দেখাতে সবার সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করে হারুন। দুপুরে কোথায় খাবে, কিংবা রাতের ডিনারে কী কী থাকবে- তাও দেখাচ্ছিল কাপল প্যাকেজের টিকিট পড়ে পড়ে! এসব দেখে শুনে অন্যদের জ্বলুনি শুরু হওয়াটাই স্বাভাবিক।

মেসের সবচেয়ে নিরীহ গোছের ছেলেটা বলে উঠল, ‘মেহেদি ভাই, হারুনের কারিকুরি সব ভণ্ডুল করার একটা দারুণ প্ল্যান আছে আমার কাছে। আপনি শুধু ৫০০-৬০০ টাকা খরচ করতে পারবেন?’

মেহেদি হারুনের রুমমেট। হারুনের প্রেমের ঘ্যানঘ্যানানি মেহেদিকেই সহ্য করতে হয় বেশি। তাই মেহেদি বলল, ‘মাত্র ৫০০-৬০০ টাকা? তুমি যদি ওর সব প্ল্যান ভণ্ডুল করতে পারো, তোমাকে আজকে রাতে ভরপেট কাচ্চি খাওয়াবো!’

এবার নিরীহ পাভেল বলল, ‘ভাই, আপনার রুমের খোকন ভাই আর আমার রুমের আমি জ্বর আর কাশির ভাব ধরে থাকব। আর আপনি গিয়ে বাড়িওয়ালাকে বলবেন, আমাদের দু’জনের মনে হয় করোনা হয়েছে! এক ফ্ল্যাটে দুজনের অবস্থা শুনে উনি নির্ঘাত আমাদের এই ফ্লোর লকডাউন করে দেবেন। আর আজকেই আমরা করোনা টেস্ট করাবো। ব্যস, পরশু যখন আমাদের সবার নেগেটিভ রেজাল্ট আসবে, লকডাউনও ছুটে যাবে! মাঝখান থেকে হারুন ভাই ভ্যালেন্টাইন ডে’তে আটকা পড়বে মেসে! কেমন প্লান বলুন তো?’

মেহেদি উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে বলল, ‘জীবনে অনেকবার নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গের কথা শুনেছি; কিন্তু আজ মেসে এসে হাতে-কলমে শিখলাম। আইডিয়া খারাপ না! খোকন, তুই কম্বল মুড়ি দিয়ে এখনই ঘুমিয়ে পড়!’ মেহেদী ততক্ষণে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসতে থাকে।

ভ্যালেন্টাইন রঙ্গ

প্রেম করোনা প্রেম করোনা, খোকন ঘুমায় ঘাটে!

আজ তো ভ্যালেন্টাইন ডে! আমার জন্য কী এনেছো? * ফুল এনেছি। মানে তাজা ফুলকপি! কিছুক্ষণ দেখে ভালো করে রান্না করবে।
 মো. রায়হান কবির 
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাচেলরদের মেসগুলোতে যে একবার থাকে, জীবনে আর তাকে কোনো কিছুর ট্রেনিং নেওয়ার দরকার পড়ে না। যেসব অভিভাবক অলস সন্তানদের নিয়ে বিপাকে আছেন, তারা অন্তত একবার তাদের সন্তানকে কিছু দিনের জন্য মেসে থাকার সুযোগ দিয়ে দেখতে পারেন।

মেসকে একটা ‘ইনস্টিটিউশন’ বললেও কম বলা হবে। কেননা ইনস্টিটিউশন আপনাকে কিতাবি শিক্ষা দেবে। আর মেস লাইফ আপনাকে দেবে বাস্তব শিক্ষা। শিক্ষাজীবন শেষে চাকরির জন্য যারা চেষ্টা করেন, তারা চাকরিতে ঢোকার পর যে সম্ভাব্য জেলাসি কিংবা কূটকৌশলের মুখোমুখি হওয়ার কথা তা তারা মেস লাইফ থেকে আগেই শিখে ফেলেন।

নিজের অজান্তে মেস লাইফ এ ধরনের অনেক কিছুই আপনাকে শিক্ষা দিয়ে দেবে। কেননা এখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের, বিভিন্ন ধরনের মানুষের সমাবেশ ঘটে। আবার বেকার, চাকরিজীবী, বুদ্ধিজীবী কবি-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদের সমন্বয়েও এসব মেস পরিপূর্ণ থাকে অনেক সময়।

মেহেদি, হারুন এবং খোকন- এ তিনজনের বসবাস ফার্মগেটের একটি মেসে। এক রুমের বাসিন্দা তারা, যাকে বলা হয় রুমমেট। তিন রুমের এ মেসের মোট সদস্য সংখ্যা ১০-১২ জন। ফলে এই মেস সর্বদাই গমগম করে। কেউ উচ্চস্বরে মোবাইলে কথা বলে, তো কেউ ঘরের এক কোণে এমন নিচু স্বরে কথা বলে যে, কেউ তার নাগালের মধ্যে থাকলেও সেই কথা বুঝতে পারে না। নিচু স্বরে কথা বলায় এক্সপার্ট হারুন। শুধু নিচু স্বরেই নয়, নানা যুক্তি এবং মিষ্টতা মিলিয়ে কথা বলে সে। ফলে এ মেসে আর কারও বসন্ত কিংবা ভ্যালেন্টাইন আসুক বা না আসুক হারুনের জীবনে চিরকালই বসন্ত।

হারুন বেশ ট্রেন্ডি। বসন্তে বাসন্তি কালার পাঞ্জাবি, ভ্যালেন্টাইনে লাল টি-শার্ট কিংবা পহেলা ফাল্গ–নে পরার জন্য হলুদ পাঞ্জাবি সর্বদা আয়রন করা থাকে তার। ভালোবাসার বিভিন্ন পার্বণে হারুনের খালি হাতে বের হয়ে হাত ভর্তি গিফটসহ ফেরা একসময় অন্যদের চোখে সয়ে যায়। অথচ এই মেসের কত বাসিন্দাই না রাতের পর রাত জেগে ফেসবুকিং আর মেসেজ আদান-প্রদান করেও কোনো বসন্তে কিংবা ভ্যালেন্টাইন ডে’তে একবার ডেটিং পর্যন্ত করতে পারলো না গিফট তো দূরের কথা!

মেসে কয়েকজন চাকরিজীবীও আছেন। তারা পকেটে ক্রেডিট কার্ড নিয়ে ঘোরেন আর ক্রেডিট কার্ডে ভ্যালেন্টাইন ডে’র কাপল অফার দেখে আফসোস করেন, ‘আহা, আজ একজন প্রেমিকা নেই বলে...!’ ওদিকে হারুন পকেটে শুধু রিকশা ভাড়া আর কয়েকটা সিগারেট কেনার পয়সা নিয়ে বের হয়েও ঠিকই ডেটিং সেরে আসে। ভ্যালেন্টাইন ডে’র রাতে যখন সে ফেরে তার পাঁচ হাত দূর থেকে ভেসে আসা সুগন্ধিতে বোঝা যায় এক প্রেমিক পুরুষের আগমন ঘটছে। আর বাকিরা তখন ল্যাপটপ কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনকে টিভি বানিয়ে ভ্যালেন্টাইন ডে’র নাটক দেখায় মশগুল।

এভাবেই কাটছিল দিনগুলো। হারুনের প্রেমিকারা জানে হারুন স্টুডেন্ট, ফলে তার পক্ষে খরচ করা সম্ভব নয়। তাই তারাই রেস্টুরেন্টে বিল পে করে, আবার গিফটও দেয়। ওদিকে ছাত্র থাকার সুবাদে হারুন শুধু চকলেট আর ফুল দিয়েই কাজ সারে। করোনাকালেও হারুনের প্রেম থেমে নেই। বরং লকডাউনকে সে কাজে লাগিয়েছে দারুণভাবে। এবার হারুনের বেশ কয়েকটি ডেটিং আছে। আর ডেটিংও যেনতেন জায়গায় নয়। এবার প্রমোশন পেয়ে পাঁচ তারকা হোটেলের কাপল-লাঞ্চ এবং ডিনারের অফার পর্যন্ত এসে গেছে। অন্যান্য বার ডেটিং সেরে এসে গল্প শোনাতো। কিন্তু এবার আবেগের অতিশায্যে এবং নিজের সক্ষমতা দেখাতে সবার সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করে হারুন। দুপুরে কোথায় খাবে, কিংবা রাতের ডিনারে কী কী থাকবে- তাও দেখাচ্ছিল কাপল প্যাকেজের টিকিট পড়ে পড়ে! এসব দেখে শুনে অন্যদের জ্বলুনি শুরু হওয়াটাই স্বাভাবিক।

মেসের সবচেয়ে নিরীহ গোছের ছেলেটা বলে উঠল, ‘মেহেদি ভাই, হারুনের কারিকুরি সব ভণ্ডুল করার একটা দারুণ প্ল্যান আছে আমার কাছে। আপনি শুধু ৫০০-৬০০ টাকা খরচ করতে পারবেন?’

মেহেদি হারুনের রুমমেট। হারুনের প্রেমের ঘ্যানঘ্যানানি মেহেদিকেই সহ্য করতে হয় বেশি। তাই মেহেদি বলল, ‘মাত্র ৫০০-৬০০ টাকা? তুমি যদি ওর সব প্ল্যান ভণ্ডুল করতে পারো, তোমাকে আজকে রাতে ভরপেট কাচ্চি খাওয়াবো!’

এবার নিরীহ পাভেল বলল, ‘ভাই, আপনার রুমের খোকন ভাই আর আমার রুমের আমি জ্বর আর কাশির ভাব ধরে থাকব। আর আপনি গিয়ে বাড়িওয়ালাকে বলবেন, আমাদের দু’জনের মনে হয় করোনা হয়েছে! এক ফ্ল্যাটে দুজনের অবস্থা শুনে উনি নির্ঘাত আমাদের এই ফ্লোর লকডাউন করে দেবেন। আর আজকেই আমরা করোনা টেস্ট করাবো। ব্যস, পরশু যখন আমাদের সবার নেগেটিভ রেজাল্ট আসবে, লকডাউনও ছুটে যাবে! মাঝখান থেকে হারুন ভাই ভ্যালেন্টাইন ডে’তে আটকা পড়বে মেসে! কেমন প্লান বলুন তো?’

মেহেদি উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে বলল, ‘জীবনে অনেকবার নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গের কথা শুনেছি; কিন্তু আজ মেসে এসে হাতে-কলমে শিখলাম। আইডিয়া খারাপ না! খোকন, তুই কম্বল মুড়ি দিয়ে এখনই ঘুমিয়ে পড়!’ মেহেদী ততক্ষণে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসতে থাকে।