ভালো বাসায় ভালোবাসা
jugantor
রম্যগল্প
ভালো বাসায় ভালোবাসা

  জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য  

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সাব্বিরের নম্বর থেকে একটা মেসেজ এসেছে, ‘হ্যালো হ্যালো, কে বলছেন? এটা কি জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্যের নম্বর? হ্যালো, মাইক্রোফোন টেস্টিং ওয়ান টু থ্রি! মিসেস সাব্বির আহমেদ, হ্যালো!’

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। গাধাটার যে মাথা খারাপ তা জানতাম। এত খারাপ তা তো জানতাম না! এসব কী বলে!

আমি ফোন রেখে রান্নার কাজে মন দিলাম। আবার একটা টেক্সট এলো, ‘হ্যালো! তুমি কি জানো, তুমি কত ভালো একটা মেয়ে? আমার জীবনে তোমার মতো ভালো মেয়ে আমি কখনো দেখিনি! তাই তো তোমাকে ভালোবেসেছি। তাই তো তোমাকে বিয়ে করেছি! আমি চাইলেই অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে পারতাম। কিন্তু বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে রীতিমতো লড়াই করে তোমাকে বিয়ে করেছি। তুমি ভাবতেও পারবে না তোমাকে আমি কী পরিমাণ ভালোবাসি!’

আমি জবাব দিলাম, ‘আশ্চর্য! এতদিনে আমাকে এক লাইনের মেসেজ দিতেও হাত ব্যথা করত তোমার! আজ হঠাৎ কী হলো? নেশা করেছ? দেখো, ফাজলামি ভালো লাগছে না। বাড়ি আসো।’

সাব্বিরের রিপ্লাই, ‘বাড়ি তো আসবই। বাড়ি না এসে কোথায় যাবো! আমি যেখানেই যাই আর যা কিছু করি আমাকে ফিরতে হবে তোমার কাছে! তোমার কাছেই আমি শতবার ফিরে ফিরে আসতে চাই, ভালোবাসার বারণে, কারণে-অকারণে!’

‘থামো! ফালতু কবিতা শোনাবা না। তোমার কবিতার হাত জঘন্য!’

‘হ্যাঁ, আমি জানি! সবাই তোমার মতো এত সুন্দর কবিতা কি আর লিখতে পারে! আর আমি চাইও না তোমাকে কেউ টেক্কা দিয়ে যাক। তাই তো তোমার থেকে ভালো কবিতা আমি লিখতেও চাই না। আমি চাই তুমিই সেরা হও।’

আমি আর জবাব না দিয়ে ফোন অফ করে দিলাম। অনেক ফাজলামি হয়েছে। পাগলের প্রলাপ আর শুনব না। ফোনে না পেলে ঠিক বাসায় এসে হাজির হবে।

কদিন আগেই অনলাইনে একটা শাড়ি পছন্দ করেছিলাম। সেটা কেনার জন্য ওর কাছে কিছু টাকা চেয়েছি। আমার ধারণা ওইটা না দেওয়ার জন্য এসব বাহানা করছে।

সাব্বির দরজায় এসে বেল বাজাচ্ছে। দরজা খুলতেই মাথা নিচু করে আমাকে পাশ কাটিয়ে দৌড় দিল। এমনভাবে দৌড় দিয়েছে যেন আমি ওকে ঝাঁটা পিটা করব।

আমি ওর পেছন পেছন গেলাম। প্রশ্ন করলাম, ‘তোমার সমস্যা কী? উল্টাপাল্টা বকতেছিলে কেন, আর এখন এভাবে দৌড়ই বা দিয়েছ কেন?’

সাব্বির হড়বড় করে বলল, ‘কই! উল্টাপাল্টা কী করলাম? নিজের বউকে ভালোবাসি বলবো না!’

আমি আর কথা না বাড়িয়ে খাবার গরম করতে গেলাম। খেতে বসে ভাত মাখতে মাখতে সাব্বির নিচু গলায় বলল, ‘পাশের বাসায় যে চুমকী ভাবি আছে ওনার সঙ্গে বেশি মিশবা না।’

‘কেন?’

‘আমার ওনাকে ভালো লাগে না। কুটনি কুটনি চেহারা! দেখলেই মনে হয় বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে!’

‘আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কারোর চেহারা দেখে কী করে মনে হয় যে বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে?’

‘কী জানি! আমার ওনাকে দেখলে মনে হয় বানিয়ে বানিয়ে এখানকার কথা ওখানে বলে, অন্যের সংসার ভাঙার চেষ্টা করে। আমি যে তোমাকে ছাড়া কাউকে ভালোবাসি না সেটা নিশ্চয়ই তুমি জানো?’

আমি চোখ সরু করে বললাম, ‘সত্যি করে বলো তো, কী হয়েছে?’

‘আরে না! কী হবে? এখন মনে করো একরকম দেখতেও তো অনেক মানুষ হয়! এখন যদি পাশের বাসার চুমকী ভাবি এসে বলে যে, আমার মতো কাউকে দেখেছে একটা মেয়ের সঙ্গে, তাহলে কি তুমি তাই বিশ্বাস করবে? ধরো, আমিই হলাম কিন্তু! এমনও তো হতে পারে সেই মেয়েটা আমার বান্ধবী! মানে আজকে...’

সাব্বির আড়চোখে আমার দিকে তাকালো। আমি চোখ লাল করে ওর দিকে তাকিয়ে আছি। সাব্বির ভাঙা গলায় মিনমিন করে বলল, ‘মানে আজকে বহুদিন পর কলেজ লাইফের বান্ধবীর সঙ্গে দেখা হলো! ওর সঙ্গে কফিটফি খেলাম। এখন মনে করো, আমি বলার আগেই চুমকী ভাবি অন্যরকম করে ব্যাপারটা বলে দিতে পারে তাই না! বললে তুমি আবার আমাকে সন্দেহ করবে! এইজন্য বলছি আর কি! চুমকি ভাবির কথায় কান দিও না।’

আমি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, ‘আচ্ছা! তোমার কথা তো ঠিকই! অন্যের কথায় কান দিতে নাই! ওই মেয়েটা হয়তো তোমার পুরোনো বান্ধবীই ছিল। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতেই পারে!’

সাব্বির খুশি হয়ে মাথা নাড়লো। আমি বললাম, ‘কিন্তু নিজের সংসার ঠিক রাখতে হলে কী করতে হয় বলো তো?’

‘কী?’

‘মানে ধরো, চুমকী ভাবির বর তাকে অনেক দাম দিয়ে একটা বালুচরি শাড়ি গিফট করেছে। এখন সে যদি আমাকে সেইটা দেখায়, আর যদি আমি সেটার জন্য মানসিক অশান্তিতে থাকি, তারপর ধরো তোমাকে সেটা বলি কিন্তু তুমি কিনে না দাও, তাহলে তো আমাদের সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হবে তাই না! তাই মনে করো, সংসারে যাতে অশান্তি না আসে সেজন্য আমি আলমারি থেকে তোমার পঁচিশ হাজার টাকা নিয়ে একটা শাড়ি কিনে ফেললাম, তুমি নিশ্চয়ই রাগ করবা না তাই না?’

সাব্বির হতাশ চোখে তাকিয়ে আছে। তারপর আস্তে আস্তে বলল, ‘তাহলে ধরো, তুমি পরশু মেহমান আসবে বলে যে চিকেন রান্না করেছিলে সেটা যদি আমি গতকাল রাতে চুরি করে খেয়ে ফেলি তাহলে তুমিও নিশ্চয়ই রাগ করবা না! কোনো মেয়েই চাইবে না তার স্বামী অভুক্ত থাক!’

আমি বললাম, ‘তাহলে তোমার সাইড টেবিলের পাশে লুকিয়ে রাখা ইম্পর্টেট বিয়ারের বোতলগুলো আমি যদি ফেলে দিয়ে থাকি তাহলেও তুমি নিশ্চয়ই রাগ করবে না? কোনো মেয়েই চাইবে না তার স্বামীর লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হোক!’

সাব্বির ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। তারপর বলল, ‘আর কিছু?’

আমি হাসিমুখে বললাম, ‘তুমি যে আজ রাতে বন্ধুদের সঙ্গে নেশা করে আমাকে উল্টাপাল্টা মেসেজ দিয়েছিলে সেইটা বললে না? এটাও আমি জানি! এইজন্য আমি ডিশের লাইনের তার কেটে রেখেছি। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ম্যাচ দেখতে পারবা না!’

রম্যগল্প

ভালো বাসায় ভালোবাসা

 জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য 
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সাব্বিরের নম্বর থেকে একটা মেসেজ এসেছে, ‘হ্যালো হ্যালো, কে বলছেন? এটা কি জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্যের নম্বর? হ্যালো, মাইক্রোফোন টেস্টিং ওয়ান টু থ্রি! মিসেস সাব্বির আহমেদ, হ্যালো!’

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। গাধাটার যে মাথা খারাপ তা জানতাম। এত খারাপ তা তো জানতাম না! এসব কী বলে!

আমি ফোন রেখে রান্নার কাজে মন দিলাম। আবার একটা টেক্সট এলো, ‘হ্যালো! তুমি কি জানো, তুমি কত ভালো একটা মেয়ে? আমার জীবনে তোমার মতো ভালো মেয়ে আমি কখনো দেখিনি! তাই তো তোমাকে ভালোবেসেছি। তাই তো তোমাকে বিয়ে করেছি! আমি চাইলেই অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে পারতাম। কিন্তু বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে রীতিমতো লড়াই করে তোমাকে বিয়ে করেছি। তুমি ভাবতেও পারবে না তোমাকে আমি কী পরিমাণ ভালোবাসি!’

আমি জবাব দিলাম, ‘আশ্চর্য! এতদিনে আমাকে এক লাইনের মেসেজ দিতেও হাত ব্যথা করত তোমার! আজ হঠাৎ কী হলো? নেশা করেছ? দেখো, ফাজলামি ভালো লাগছে না। বাড়ি আসো।’

সাব্বিরের রিপ্লাই, ‘বাড়ি তো আসবই। বাড়ি না এসে কোথায় যাবো! আমি যেখানেই যাই আর যা কিছু করি আমাকে ফিরতে হবে তোমার কাছে! তোমার কাছেই আমি শতবার ফিরে ফিরে আসতে চাই, ভালোবাসার বারণে, কারণে-অকারণে!’

‘থামো! ফালতু কবিতা শোনাবা না। তোমার কবিতার হাত জঘন্য!’

‘হ্যাঁ, আমি জানি! সবাই তোমার মতো এত সুন্দর কবিতা কি আর লিখতে পারে! আর আমি চাইও না তোমাকে কেউ টেক্কা দিয়ে যাক। তাই তো তোমার থেকে ভালো কবিতা আমি লিখতেও চাই না। আমি চাই তুমিই সেরা হও।’

আমি আর জবাব না দিয়ে ফোন অফ করে দিলাম। অনেক ফাজলামি হয়েছে। পাগলের প্রলাপ আর শুনব না। ফোনে না পেলে ঠিক বাসায় এসে হাজির হবে।

কদিন আগেই অনলাইনে একটা শাড়ি পছন্দ করেছিলাম। সেটা কেনার জন্য ওর কাছে কিছু টাকা চেয়েছি। আমার ধারণা ওইটা না দেওয়ার জন্য এসব বাহানা করছে।

সাব্বির দরজায় এসে বেল বাজাচ্ছে। দরজা খুলতেই মাথা নিচু করে আমাকে পাশ কাটিয়ে দৌড় দিল। এমনভাবে দৌড় দিয়েছে যেন আমি ওকে ঝাঁটা পিটা করব।

আমি ওর পেছন পেছন গেলাম। প্রশ্ন করলাম, ‘তোমার সমস্যা কী? উল্টাপাল্টা বকতেছিলে কেন, আর এখন এভাবে দৌড়ই বা দিয়েছ কেন?’

সাব্বির হড়বড় করে বলল, ‘কই! উল্টাপাল্টা কী করলাম? নিজের বউকে ভালোবাসি বলবো না!’

আমি আর কথা না বাড়িয়ে খাবার গরম করতে গেলাম। খেতে বসে ভাত মাখতে মাখতে সাব্বির নিচু গলায় বলল, ‘পাশের বাসায় যে চুমকী ভাবি আছে ওনার সঙ্গে বেশি মিশবা না।’

‘কেন?’

‘আমার ওনাকে ভালো লাগে না। কুটনি কুটনি চেহারা! দেখলেই মনে হয় বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে!’

‘আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কারোর চেহারা দেখে কী করে মনে হয় যে বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে?’

‘কী জানি! আমার ওনাকে দেখলে মনে হয় বানিয়ে বানিয়ে এখানকার কথা ওখানে বলে, অন্যের সংসার ভাঙার চেষ্টা করে। আমি যে তোমাকে ছাড়া কাউকে ভালোবাসি না সেটা নিশ্চয়ই তুমি জানো?’

আমি চোখ সরু করে বললাম, ‘সত্যি করে বলো তো, কী হয়েছে?’

‘আরে না! কী হবে? এখন মনে করো একরকম দেখতেও তো অনেক মানুষ হয়! এখন যদি পাশের বাসার চুমকী ভাবি এসে বলে যে, আমার মতো কাউকে দেখেছে একটা মেয়ের সঙ্গে, তাহলে কি তুমি তাই বিশ্বাস করবে? ধরো, আমিই হলাম কিন্তু! এমনও তো হতে পারে সেই মেয়েটা আমার বান্ধবী! মানে আজকে...’

সাব্বির আড়চোখে আমার দিকে তাকালো। আমি চোখ লাল করে ওর দিকে তাকিয়ে আছি। সাব্বির ভাঙা গলায় মিনমিন করে বলল, ‘মানে আজকে বহুদিন পর কলেজ লাইফের বান্ধবীর সঙ্গে দেখা হলো! ওর সঙ্গে কফিটফি খেলাম। এখন মনে করো, আমি বলার আগেই চুমকী ভাবি অন্যরকম করে ব্যাপারটা বলে দিতে পারে তাই না! বললে তুমি আবার আমাকে সন্দেহ করবে! এইজন্য বলছি আর কি! চুমকি ভাবির কথায় কান দিও না।’

আমি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, ‘আচ্ছা! তোমার কথা তো ঠিকই! অন্যের কথায় কান দিতে নাই! ওই মেয়েটা হয়তো তোমার পুরোনো বান্ধবীই ছিল। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতেই পারে!’

সাব্বির খুশি হয়ে মাথা নাড়লো। আমি বললাম, ‘কিন্তু নিজের সংসার ঠিক রাখতে হলে কী করতে হয় বলো তো?’

‘কী?’

‘মানে ধরো, চুমকী ভাবির বর তাকে অনেক দাম দিয়ে একটা বালুচরি শাড়ি গিফট করেছে। এখন সে যদি আমাকে সেইটা দেখায়, আর যদি আমি সেটার জন্য মানসিক অশান্তিতে থাকি, তারপর ধরো তোমাকে সেটা বলি কিন্তু তুমি কিনে না দাও, তাহলে তো আমাদের সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হবে তাই না! তাই মনে করো, সংসারে যাতে অশান্তি না আসে সেজন্য আমি আলমারি থেকে তোমার পঁচিশ হাজার টাকা নিয়ে একটা শাড়ি কিনে ফেললাম, তুমি নিশ্চয়ই রাগ করবা না তাই না?’

সাব্বির হতাশ চোখে তাকিয়ে আছে। তারপর আস্তে আস্তে বলল, ‘তাহলে ধরো, তুমি পরশু মেহমান আসবে বলে যে চিকেন রান্না করেছিলে সেটা যদি আমি গতকাল রাতে চুরি করে খেয়ে ফেলি তাহলে তুমিও নিশ্চয়ই রাগ করবা না! কোনো মেয়েই চাইবে না তার স্বামী অভুক্ত থাক!’

আমি বললাম, ‘তাহলে তোমার সাইড টেবিলের পাশে লুকিয়ে রাখা ইম্পর্টেট বিয়ারের বোতলগুলো আমি যদি ফেলে দিয়ে থাকি তাহলেও তুমি নিশ্চয়ই রাগ করবে না? কোনো মেয়েই চাইবে না তার স্বামীর লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হোক!’

সাব্বির ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। তারপর বলল, ‘আর কিছু?’

আমি হাসিমুখে বললাম, ‘তুমি যে আজ রাতে বন্ধুদের সঙ্গে নেশা করে আমাকে উল্টাপাল্টা মেসেজ দিয়েছিলে সেইটা বললে না? এটাও আমি জানি! এইজন্য আমি ডিশের লাইনের তার কেটে রেখেছি। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ম্যাচ দেখতে পারবা না!’