বউ বনাম খালা
jugantor
বউ বনাম খালা

  রুবেল কান্তি নাথ  

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘দেখছেননি কারবার? মাথা-টাথা একদম গরম হইয়া আছে!’ সাত-সকালে ঘুম থেকে উঠেই মোতালেব ভাইয়ের কবলে পড়লাম। ভাইয়ের বলা কথাগুলোর আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারলাম না। তাই সভয়ে ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঠিক বুঝলাম না ভাই, কীসের কারবারের কথা বলছেন?’

মোতালেব ভাই একটুও দেরি না করে বলে বসলেন, ‘মুুরুব্বিরা কয়, গরিবের বউ নাকি সবার ভাবি!’

‘ঠিকই তো বলে ভাই। এখানে আবার ভুল কী দেখলেন?’

‘আরে, গরিবের বউ সবার ভাবি হইলে- আমার বউ রে সবাই ভাবি ডাকে ক্যান?’

‘এটা কী বলেন ভাই? ভাবিকে ভাবি ডাকবে না তো ডাকবেটা কী?’

‘আপনের মাথায় কেজি খানেক গোবর আছেনি মিয়া! আমি কই কী, আর আমার সারিন্দা বাজায় কী!’

সকাল বেলাতেই কেউ যদি এভাবে অহেতুক অপমান করে, তাহলে মেজাজ কেমন হয়; আপনারাই বলেন। কথা নেই, বার্তা নেই-বিনা মেঘে অপমান থুড়ি, বজ্রপাত হলো যেন মাথার ওপর। তবু রাগ হোক আর অপমান হোক, মুখ বুজে হজম করতেই হবে। প্রিয় মোতালেব ভাই বলে কথা। ভাইয়ের সঙ্গে রাগ করা বৃথা।

‘ভাই, আমি আপনাকে ভুল কী বলেছি?’ বিড়ালের মতো মিউ-মিউ করে বলি আমি।

‘গরিবের বউ সবার ভাবি হইলে, আমার বউ সবার ভাবি হইতে যাইবো ক্যান? আমি তো আর গরিব না!’ উত্তেজিত স্বরে কাঁপতে-কাঁপতে বললেন মোতালেব ভাই।

আসলেই তো! মোতালেব ভাই তো আর গরিব না। তার বউকে সবাই ভাবি ডাকবে কেন?

কিন্তু এই মানুষটাকে কে বোঝাবে, তার ভাই-বেরাদারের সংখ্যা অগুণতি। এই ভাই-বেরাদাররা তার বউয়ের দেবর হয় সম্পর্কে। নিয়ম অনুযায়ী সবাই তো তাকে ভাবিই ডাকবে।

২.

দু’দিন পর। বিকালে কাজ সেরে বাসায় ফিরছিলাম। দেখলাম, হন্তদন্ত হয়ে আমার দিকেই ছুটে আসছে বুলডোজার। মানে, রাগান্বিত মোতালেব ভাই। মনে-মনে ঘাবড়ে গেলেও নিজেকে স্বাভাবিক রাখলাম। ভাইয়ের কাছে দুর্বলতা প্রকাশ পেলে আমার খবর আছে!

‘কী হয়েছে ভাই?’ আগবাড়িয়ে আমিই জিজ্ঞেস করলাম।

‘কাম তো এহন উল্টা হইয়া গ্যাছে গা।’ ভাই বললেন।

‘কী রকম শুনি?’

‘এহন তো সবাই আমার বউরে খালাম্মা ডাকতেছে!’

‘কী!’ আশ্চর্য হওয়ার ভান করি আমি।

‘হ্যাঁ ভাই, সবাই দেখি এহন আপনের ভাবিরে খালাম্মা কইয়া ডাকতেছে!’

‘খালাম্মাকে খালাম্মা বলবে না তো বলবেটা কী?’

‘মানে?’ প্রায় চিৎকার করে উঠলেন মোতালেব ভাই।

আরেকটু হলেই তার চিৎকার শুনে আমি স্ট্রোক করে ফেলতাম। মুরুব্বিদের দোয়া আছে বলেই হয়তো এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম।

‘না মানে লোকে আপনার স্ত্রীকে ভাবি ডাকলেও দোষ, খালাম্মা ডাকলেও দোষ! তাহলে ওরা তাকে ডাকবেটা ‘কী?’

‘তাই বইলা খালাম্মা?’

‘আসলে হয়েছে কি জানেন, আপনি তো গরিব না। বিরাট ধনী মানুষ। ধনী মানুষদের স্ত্রীদের গরিবরা সাধারণত বেগম সাহেবা, মালকিন, খালাম্মা- এসব বলেই ডাকে।’

‘আমি ধনী মানুষ আপনেরে কইছে কেডায়?’ বলেই জিভে কামড় খেলেন ভাই। আবার বললেন, ‘ভাই, আপনে জ্ঞানী মানুষ। এই বিপদ থেইকা আমারে উদ্ধার করেন। আপনের ভাবির অত্যাচারে তো আমি ঘরে টিকতে পারতেছি না। কিছু একটা করেন ভাই।’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি বাসায় যান। আমি দেখছি কী করা যায়।’ বলে ভাইকে বিদায় করলাম।

এবার কিছু টাকা গচ্চা দিয়ে উদরপূর্তি করাতে হবে কয়েকজন ভাই-বেরাদারকে। যারা ‘ভাবি’ ডাকার বদলে ‘খালাম্মা’ ডাকতে-ডাকতে ইতিমধ্যে ভাবির কান ঝালাপালা করে ফেলেছে!

বউ বনাম খালা

 রুবেল কান্তি নাথ 
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘দেখছেননি কারবার? মাথা-টাথা একদম গরম হইয়া আছে!’ সাত-সকালে ঘুম থেকে উঠেই মোতালেব ভাইয়ের কবলে পড়লাম। ভাইয়ের বলা কথাগুলোর আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারলাম না। তাই সভয়ে ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঠিক বুঝলাম না ভাই, কীসের কারবারের কথা বলছেন?’

মোতালেব ভাই একটুও দেরি না করে বলে বসলেন, ‘মুুরুব্বিরা কয়, গরিবের বউ নাকি সবার ভাবি!’

‘ঠিকই তো বলে ভাই। এখানে আবার ভুল কী দেখলেন?’

‘আরে, গরিবের বউ সবার ভাবি হইলে- আমার বউ রে সবাই ভাবি ডাকে ক্যান?’

‘এটা কী বলেন ভাই? ভাবিকে ভাবি ডাকবে না তো ডাকবেটা কী?’

‘আপনের মাথায় কেজি খানেক গোবর আছেনি মিয়া! আমি কই কী, আর আমার সারিন্দা বাজায় কী!’

সকাল বেলাতেই কেউ যদি এভাবে অহেতুক অপমান করে, তাহলে মেজাজ কেমন হয়; আপনারাই বলেন। কথা নেই, বার্তা নেই-বিনা মেঘে অপমান থুড়ি, বজ্রপাত হলো যেন মাথার ওপর। তবু রাগ হোক আর অপমান হোক, মুখ বুজে হজম করতেই হবে। প্রিয় মোতালেব ভাই বলে কথা। ভাইয়ের সঙ্গে রাগ করা বৃথা।

‘ভাই, আমি আপনাকে ভুল কী বলেছি?’ বিড়ালের মতো মিউ-মিউ করে বলি আমি।

‘গরিবের বউ সবার ভাবি হইলে, আমার বউ সবার ভাবি হইতে যাইবো ক্যান? আমি তো আর গরিব না!’ উত্তেজিত স্বরে কাঁপতে-কাঁপতে বললেন মোতালেব ভাই।

আসলেই তো! মোতালেব ভাই তো আর গরিব না। তার বউকে সবাই ভাবি ডাকবে কেন?

কিন্তু এই মানুষটাকে কে বোঝাবে, তার ভাই-বেরাদারের সংখ্যা অগুণতি। এই ভাই-বেরাদাররা তার বউয়ের দেবর হয় সম্পর্কে। নিয়ম অনুযায়ী সবাই তো তাকে ভাবিই ডাকবে।

২.

দু’দিন পর। বিকালে কাজ সেরে বাসায় ফিরছিলাম। দেখলাম, হন্তদন্ত হয়ে আমার দিকেই ছুটে আসছে বুলডোজার। মানে, রাগান্বিত মোতালেব ভাই। মনে-মনে ঘাবড়ে গেলেও নিজেকে স্বাভাবিক রাখলাম। ভাইয়ের কাছে দুর্বলতা প্রকাশ পেলে আমার খবর আছে!

‘কী হয়েছে ভাই?’ আগবাড়িয়ে আমিই জিজ্ঞেস করলাম।

‘কাম তো এহন উল্টা হইয়া গ্যাছে গা।’ ভাই বললেন।

‘কী রকম শুনি?’

‘এহন তো সবাই আমার বউরে খালাম্মা ডাকতেছে!’

‘কী!’ আশ্চর্য হওয়ার ভান করি আমি।

‘হ্যাঁ ভাই, সবাই দেখি এহন আপনের ভাবিরে খালাম্মা কইয়া ডাকতেছে!’

‘খালাম্মাকে খালাম্মা বলবে না তো বলবেটা কী?’

‘মানে?’ প্রায় চিৎকার করে উঠলেন মোতালেব ভাই।

আরেকটু হলেই তার চিৎকার শুনে আমি স্ট্রোক করে ফেলতাম। মুরুব্বিদের দোয়া আছে বলেই হয়তো এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম।

‘না মানে লোকে আপনার স্ত্রীকে ভাবি ডাকলেও দোষ, খালাম্মা ডাকলেও দোষ! তাহলে ওরা তাকে ডাকবেটা ‘কী?’

‘তাই বইলা খালাম্মা?’

‘আসলে হয়েছে কি জানেন, আপনি তো গরিব না। বিরাট ধনী মানুষ। ধনী মানুষদের স্ত্রীদের গরিবরা সাধারণত বেগম সাহেবা, মালকিন, খালাম্মা- এসব বলেই ডাকে।’

‘আমি ধনী মানুষ আপনেরে কইছে কেডায়?’ বলেই জিভে কামড় খেলেন ভাই। আবার বললেন, ‘ভাই, আপনে জ্ঞানী মানুষ। এই বিপদ থেইকা আমারে উদ্ধার করেন। আপনের ভাবির অত্যাচারে তো আমি ঘরে টিকতে পারতেছি না। কিছু একটা করেন ভাই।’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি বাসায় যান। আমি দেখছি কী করা যায়।’ বলে ভাইকে বিদায় করলাম।

এবার কিছু টাকা গচ্চা দিয়ে উদরপূর্তি করাতে হবে কয়েকজন ভাই-বেরাদারকে। যারা ‘ভাবি’ ডাকার বদলে ‘খালাম্মা’ ডাকতে-ডাকতে ইতিমধ্যে ভাবির কান ঝালাপালা করে ফেলেছে!