ভাষা যখন ভাসে!
jugantor
ভাষা যখন ভাসে!

  মো. রায়হান কবির  

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্রদের তাদের শিক্ষক-শিক্ষিকার তত্ত্বাবধানে একুশের প্রভাত ফেরিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সেই ফেরি স্কুলের শ্রেণি অনুযায়ী ভাগ হয়ে মিছিলে হাঁটছে। হঠাৎ এক ছাত্র রাস্তায় মাস্ক ছাড়া বেশ কিছু মানুষ আর তাদের ভিড় দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘ও ভাই, মারো মুঝে মারো (ভাই, মার আমাকে মার)!’

ক্রিকেটে পাকিস্তান দলের পরাজয় সহ্য করতে না পেরে তাদের এক দর্শক ক্ষোভ উগরে দিয়ে উর্দুতে কথাগুলো বলেছিলেন। অন্তর্জাল বা ইন্টারনেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় সেটা। আর সেই উর্দু ভাইরাস আমাদের মাঝেও সংক্রমিত হয়।

সে যাই হোক, একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছোট ভাই’র মুখে উর্দু শুনে ওদের এক বড় ভাই ক্ষেপে গেল। তার সঙ্গে থাকা শিক্ষককে বলল, ‘স্যার, আমার মাথায় কিন্তু ‘খুন’ উঠে গেছে! ওরা একুশে ফেব্র“য়ারির প্রভাত ফেরিতে এসে উর্দু বলে, কত বড় নিগগা!’

শুনে এবার শিক্ষক ক্ষেপে গেলেন, ‘তুমিই বা এসব কী বলছ? রক্ত না বলে হিন্দিতে খুন বলছ! আবার কী সব নিগগা ফিগগা! রাবিশ!’ এসব দেখে পাশ থেকে এক বয়স্ক লোক বলে উঠলেন, ‘যাদের উদ্দেশ্যে এ প্রভাত ফেরি, পরপার থেকে তারা যদি আপনাদের এ আলোচনা শুনে থাকেন, তবে তারা হয়তো মনে মনে বলছেন, ভাগ্যিস সেদিন শহীদ হয়েছিলাম, তা না হলে আজকে মরে যেতাম!’

বাংলা বিষয়ের প্রশ্নের ওপর লেখা থাকে সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণ দূষণীয়। এ সাবধান বাণী শুধু বাংলা প্রশ্নপত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি ফেসবুকের দেয়ালে (ওয়াল) সেঁটে দেওয়া যেত তবে আজকে বাংলা ভাষার এত বড় সর্বনাশ হতো না। ফেসবুক বা ইন্টারনেটের সুবাদে মানুষ বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের এবং তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়। আর বর্তমান প্রন্ম মজা নিতে কোথাও কোনো ত্র“টি রাখে না। কাউকে হেয় বা ছোট করতে (পড়ুন পচাতে) তারা বিভিন্ন ভাষা ব্যবহার করে থাকে। সাধু-চলিত ভাষার বিপরীতে এরই মধ্যে নতুন ফেসবুক ভাষারও উদ্ভাবন করে ফেলেছে তারা। ফলে ওদের কাছে ‘জীবন’ এখন ‘গেবন’, ‘কী একটা’ এখন ‘কীয়েক্টা’! এমন শব্দ আরও আছে।

আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের বারটা বেজেছে অনেক আগেই। ফলে আমাদের দর্শক, বলা চলে তরুণ প্রন্ম এখন পাশের দেশের হিন্দি, তামিল, তেলেগু-এমনকি মালায়াম ভাষার ছায়াছবিও দেখে। আর সেসব ছবি দেখে তাদের ভাষা সম্পর্কেও একটা ছোটখাটো প্রশিক্ষণ নিয়ে নেয়। তাই আজকাল কেমন আছো ধরনের কথার চেয়ে তারা পাঞ্জাবি সিনেমা থেকে ধার করে বলে ‘সাত শ্রি আকাল’!

এসব ভাষা শুনে যে কারোই মনে হতে পারে আমাদের দেশের ভাষায় কি শব্দের আকাল পড়েছে? ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্র“য়ারি উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদিতে মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। সাইনবোর্ড, ব্যানার তো পরের কথা, অনেক মানুষের ব্যক্তি জীবনেরই অংশ হয়ে গেছে এখন মিশ্র ভাষা।

এখন তো ভয় এ প্রন্ম থেকে যে কবি-সাহিত্যিক বের হবেন তাদের নিয়ে। একসময় ভালোবাসার মানুষটিকে ডাকা হতো প্রিয়তমা, প্রিয় এসব মধুর শব্দে। আর এখন এর বিপরীতে চলে এসেছে ধ্বংসাÍক ‘ক্র্যাশ’। হ্যাঁ, এখন প্রেমিকা বা ভালোবাসার মানুষকে ক্র্যাশ ডাকা আধুনিকতার প্রতীক হয়ে পড়েছে অনেকের কাছে! অথচ উড়োজাহাজ কিংবা গাড়ি দুর্ঘটনাকে বোঝাতেই এই ক্র্যাশ শব্দের উদ্ভব। তাই এই ‘ক্র্যাশ প্রন্ম ’ তাদের লেখায় কীভাবে ‘গেবন’ আর ‘ক্র্যাশ’কে তুলে ধরে সেটাই দেখার বিষয়।

বিপরীত চিত্রও আছে। এ প্রন্ম ই কিন্তু ক্রিকেটে ‘বাংলাওয়াশ’কে পরিমার্জিত করে ‘বাংলাবাঁশ’-এ রূপ দিয়েছে। এ দেশের একজন জনপ্রতিনিধির বহুল আলোচিত সংলাপ ‘খেলা হবে’ এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও বেশ জনপ্রিয়! সুতরাং বাংলাতেই সব অনুভূতি প্রকাশ সম্ভব। শুধু বাংলাকে ‘ক্র্যাশ’-এর হাত থেকে উদ্ধার করে ‘প্রিয়তমা’র আসনে বসাতে হবে!

ভাষা যখন ভাসে!

 মো. রায়হান কবির 
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্রদের তাদের শিক্ষক-শিক্ষিকার তত্ত্বাবধানে একুশের প্রভাত ফেরিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সেই ফেরি স্কুলের শ্রেণি অনুযায়ী ভাগ হয়ে মিছিলে হাঁটছে। হঠাৎ এক ছাত্র রাস্তায় মাস্ক ছাড়া বেশ কিছু মানুষ আর তাদের ভিড় দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘ও ভাই, মারো মুঝে মারো (ভাই, মার আমাকে মার)!’

ক্রিকেটে পাকিস্তান দলের পরাজয় সহ্য করতে না পেরে তাদের এক দর্শক ক্ষোভ উগরে দিয়ে উর্দুতে কথাগুলো বলেছিলেন। অন্তর্জাল বা ইন্টারনেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় সেটা। আর সেই উর্দু ভাইরাস আমাদের মাঝেও সংক্রমিত হয়।

সে যাই হোক, একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছোট ভাই’র মুখে উর্দু শুনে ওদের এক বড় ভাই ক্ষেপে গেল। তার সঙ্গে থাকা শিক্ষককে বলল, ‘স্যার, আমার মাথায় কিন্তু ‘খুন’ উঠে গেছে! ওরা একুশে ফেব্র“য়ারির প্রভাত ফেরিতে এসে উর্দু বলে, কত বড় নিগগা!’

শুনে এবার শিক্ষক ক্ষেপে গেলেন, ‘তুমিই বা এসব কী বলছ? রক্ত না বলে হিন্দিতে খুন বলছ! আবার কী সব নিগগা ফিগগা! রাবিশ!’ এসব দেখে পাশ থেকে এক বয়স্ক লোক বলে উঠলেন, ‘যাদের উদ্দেশ্যে এ প্রভাত ফেরি, পরপার থেকে তারা যদি আপনাদের এ আলোচনা শুনে থাকেন, তবে তারা হয়তো মনে মনে বলছেন, ভাগ্যিস সেদিন শহীদ হয়েছিলাম, তা না হলে আজকে মরে যেতাম!’

বাংলা বিষয়ের প্রশ্নের ওপর লেখা থাকে সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণ দূষণীয়। এ সাবধান বাণী শুধু বাংলা প্রশ্নপত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি ফেসবুকের দেয়ালে (ওয়াল) সেঁটে দেওয়া যেত তবে আজকে বাংলা ভাষার এত বড় সর্বনাশ হতো না। ফেসবুক বা ইন্টারনেটের সুবাদে মানুষ বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের এবং তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়। আর বর্তমান প্রন্ম মজা নিতে কোথাও কোনো ত্র“টি রাখে না। কাউকে হেয় বা ছোট করতে (পড়ুন পচাতে) তারা বিভিন্ন ভাষা ব্যবহার করে থাকে। সাধু-চলিত ভাষার বিপরীতে এরই মধ্যে নতুন ফেসবুক ভাষারও উদ্ভাবন করে ফেলেছে তারা। ফলে ওদের কাছে ‘জীবন’ এখন ‘গেবন’, ‘কী একটা’ এখন ‘কীয়েক্টা’! এমন শব্দ আরও আছে।

আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের বারটা বেজেছে অনেক আগেই। ফলে আমাদের দর্শক, বলা চলে তরুণ প্রন্ম এখন পাশের দেশের হিন্দি, তামিল, তেলেগু-এমনকি মালায়াম ভাষার ছায়াছবিও দেখে। আর সেসব ছবি দেখে তাদের ভাষা সম্পর্কেও একটা ছোটখাটো প্রশিক্ষণ নিয়ে নেয়। তাই আজকাল কেমন আছো ধরনের কথার চেয়ে তারা পাঞ্জাবি সিনেমা থেকে ধার করে বলে ‘সাত শ্রি আকাল’!

এসব ভাষা শুনে যে কারোই মনে হতে পারে আমাদের দেশের ভাষায় কি শব্দের আকাল পড়েছে? ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্র“য়ারি উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদিতে মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। সাইনবোর্ড, ব্যানার তো পরের কথা, অনেক মানুষের ব্যক্তি জীবনেরই অংশ হয়ে গেছে এখন মিশ্র ভাষা।

এখন তো ভয় এ প্রন্ম থেকে যে কবি-সাহিত্যিক বের হবেন তাদের নিয়ে। একসময় ভালোবাসার মানুষটিকে ডাকা হতো প্রিয়তমা, প্রিয় এসব মধুর শব্দে। আর এখন এর বিপরীতে চলে এসেছে ধ্বংসাÍক ‘ক্র্যাশ’। হ্যাঁ, এখন প্রেমিকা বা ভালোবাসার মানুষকে ক্র্যাশ ডাকা আধুনিকতার প্রতীক হয়ে পড়েছে অনেকের কাছে! অথচ উড়োজাহাজ কিংবা গাড়ি দুর্ঘটনাকে বোঝাতেই এই ক্র্যাশ শব্দের উদ্ভব। তাই এই ‘ক্র্যাশ প্রন্ম ’ তাদের লেখায় কীভাবে ‘গেবন’ আর ‘ক্র্যাশ’কে তুলে ধরে সেটাই দেখার বিষয়।

বিপরীত চিত্রও আছে। এ প্রন্ম ই কিন্তু ক্রিকেটে ‘বাংলাওয়াশ’কে পরিমার্জিত করে ‘বাংলাবাঁশ’-এ রূপ দিয়েছে। এ দেশের একজন জনপ্রতিনিধির বহুল আলোচিত সংলাপ ‘খেলা হবে’ এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও বেশ জনপ্রিয়! সুতরাং বাংলাতেই সব অনুভূতি প্রকাশ সম্ভব। শুধু বাংলাকে ‘ক্র্যাশ’-এর হাত থেকে উদ্ধার করে ‘প্রিয়তমা’র আসনে বসাতে হবে!