আইনস্টাইনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল!
jugantor
রম্যগল্প
আইনস্টাইনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল!

  মাসুদ রানা আশিক  

১৮ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তেত্রিশ বছরের জীবনে এমন কথাও শুনতে হবে কস্মিনকালেও ভাবিনি। বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খেতে পারে! শিয়াল-কুকুর এক সঙ্গে ডিনারে শামিল হতে পারে! পিঁপড়ার কামড়ে হাতি আহত হতে পারে! গন্ডারকে কাতুকুতু দিলে সঙ্গে সঙ্গেই হাসতে পারে! মানুষ হেঁটে হেঁটে আকাশে গমন করতে পারে! এসব তবু বিশ্বাস করা যায়!

কিন্তু আহসান যেটা বলল সেটা কেউ বিশ্বাস করবে এমনটা হতে পারে না। কিন্তু আহসান বলছে, কথাটা নাকি বিশ্বাসযোগ্য! সে অবশ্য শিরোনামটুকু বলেছে। এখনো বিস্তারিত আসেনি। সম্ভবত আহসানের বিস্তারিত সংবাদটা কিছুক্ষণ পরে আসে। না হলে শিরোনাম বলে এভাবে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয় না। ও আসলে কী করছে সেটাও ঠিক বুঝতে পারছি না। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছি দুজন। অথচ আহসান স্ট্যাচু অব লিবার্টির মতো স্থির দাঁড়িয়ে মোবাইলে কিছু একটা দেখছে। আমি আহসানকে বললাম, ‘বন্ধু, কিছু একটা বল। তুই যে কথা বলেছিস সেটা তো বিশ্বাসযোগ্য নয়। যদি আমাকে বিশ্বাস গ্লাসে করে গুলিয়ে খাওয়ানো হয়, তবুও বিশ্বাস করব না।’

‘সেটা তোর বিষয়। তবে আমি যেটা বলেছি সেটা একবিন্দু মিথ্যা না। যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য ছাড়া মিথ্যা বলিব না।’

আমি কিছুটা হতাশ হলাম। এমন হতাশ অতীতে হয়েছি বলে মনে করতে পারলাম না। কিন্তু আহসানের কথার সত্যতা না পাওয়া পর্যন্ত আমি যেতে চাইছি না।

‘আচ্ছা দোস্ত, দেখ তো এই লোকটাকে তুই চিনিস কিনা?’ মোবাইলটা আমার দিকে এগিয়ে দিল আহসান। আমি কৌতূহল নিয়ে তাকালাম মোবাইলের দিকে। ছবিটা ঝাপসা। তবে খুবই চেনা মুখ। মনে হচ্ছে কোথায় যেন দেখেছি। কিন্তু এ মুহূর্তে ঠিক মনে করতে পারছি না। মাথায় উশকোখুশকো চুল। বড় গোঁফ। চেহারায় চিন্তার স্পষ্ট রেখা বিদ্যমান। মাথা চুলকাতে লাগলাম আমি। গভীর মনোযোগের সহিত লোকটাকে চেনার চেষ্টা করছি। পথে-ঘাটে, রাস্তায়, কোনো চায়ের দোকানে কিংবা রেল স্টেশন অথবা বাস স্ট্যান্ডে দেখেছি কিনা মনে করতে পারছি না। কিংবা আমাদের কোনো পূর্বপুরুষ! হতে পারে আমাদের মহল্লার কোনো মুরব্বি। নাহ, কোনোভাবেই তো মনে করতে পারছি না।

অতঃপর ব্যর্থ হতে হলো আমাকে। বললাম, ‘লোকটা কে রে? আমাদের বন্ধুদের বয়স তো এত হওয়ার কথা না। লোকটাকে অনেক বয়স্ক মনে হচ্ছে। আবার এটাও মনে হচ্ছে লোকটা খুবই টেনশনে আছেন। চুলগুলোর অবস্থা দেখেছিস? চেহারাও কেমন যেন বিক্ষুব্ধ। মনে হচ্ছে লোকটার শরীরের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে।’

‘তুই কি বলছিস! ও আমার বন্ধু মানুষ! তার মানে তোরও বন্ধু। তবে সম্ভবত তোর সঙ্গে কথা হয়নি লোকটার। না হলে আমি যে কথাটা বলেছি সেটা তুই অবশ্যই বিশ্বাস করতি।’

‘ওহ হো, হ্যাঁ মনে পড়েছে। লোকটাকে আমি বইয়ের পাতায় দেখেছি। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন! তাই না রে বন্ধু?’

‘ইউরেকা! এই তো তুই মনে করতে পেরেছিস। আমাদের বন্ধু মানুষ! তাকে তুই চিনতে পারছিস না এটা ভেবেই তো আমার খারাপ লাগছিল।’

‘তুই জানিস উনি কত আগে মারা গিয়েছেন? তিনি আমাদের বন্ধু হয় কীভাবে বল তো! আইনস্টাইন স্যার কোন কালে আমাদের বন্ধু ছিল?’ কিছুটা টিপ্পনি কাটি আমি।

‘না রে দোস্ত, তুই কিন্তু ভুল বুঝছিস। তোকে শিরোনামেই তো বললাম, আইনস্টাইনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে! তুই তো বিশ্বাসই করতে চাইছিস না। আজ থেকে নয়। সেই অনেক দিন আগে থেকেই সে আমার বন্ধু। জানিস দোস্ত, লোকটা খুব ভালো কথা বলে। অনেকটা উপদেশমূলক কথাবার্তা।’

বিরক্ত ধরে গেল আমার। মনে হচ্ছে আহসান ব্যাটার পশ্চাৎদেশে কষে একটা লাথি মারি। আইনস্টাইনের সঙ্গে ওর নাকি কথা হয়েছে! চিৎকার করে বললাম, ‘পাগল কি গাছে ধরে রে আহসান! বিজ্ঞানী আইনস্টাইন তোর বন্ধু হলো কীভাবে! আর উনার সঙ্গে তোর কথাই বা হলো কীভাবে?’

এবার আহসান তার মোবাইলটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখ দোস্ত, আইনস্টাইন আমার ফেসবুক বন্ধু। আমি যখন ফেসবুক ব্যবহার শুরু করি তখন থেকেই আমার ফ্রেন্ড লিস্টে আইনস্টাইন আছে। চ্যাটিংয়ে আমি আর বন্ধু আইনস্টাইন অনেক কথা বলেছি। চ্যাটিং লিস্টটা দেখ। লোকটা কত উপদেশ দিয়েছে আমাকে। এই যে এখানে দাঁড়িয়ে থেকেও তো চ্যাটিং করলাম।’

আমি আহসানের মোবাইলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম। সেই ২০১০ সাল থেকে আইনস্টাইন আর আহসান বন্ধু! ওরা দুজন ফেসবুক ফ্রেন্ড!

রম্যগল্প

আইনস্টাইনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল!

 মাসুদ রানা আশিক 
১৮ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তেত্রিশ বছরের জীবনে এমন কথাও শুনতে হবে কস্মিনকালেও ভাবিনি। বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খেতে পারে! শিয়াল-কুকুর এক সঙ্গে ডিনারে শামিল হতে পারে! পিঁপড়ার কামড়ে হাতি আহত হতে পারে! গন্ডারকে কাতুকুতু দিলে সঙ্গে সঙ্গেই হাসতে পারে! মানুষ হেঁটে হেঁটে আকাশে গমন করতে পারে! এসব তবু বিশ্বাস করা যায়!

কিন্তু আহসান যেটা বলল সেটা কেউ বিশ্বাস করবে এমনটা হতে পারে না। কিন্তু আহসান বলছে, কথাটা নাকি বিশ্বাসযোগ্য! সে অবশ্য শিরোনামটুকু বলেছে। এখনো বিস্তারিত আসেনি। সম্ভবত আহসানের বিস্তারিত সংবাদটা কিছুক্ষণ পরে আসে। না হলে শিরোনাম বলে এভাবে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয় না। ও আসলে কী করছে সেটাও ঠিক বুঝতে পারছি না। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছি দুজন। অথচ আহসান স্ট্যাচু অব লিবার্টির মতো স্থির দাঁড়িয়ে মোবাইলে কিছু একটা দেখছে। আমি আহসানকে বললাম, ‘বন্ধু, কিছু একটা বল। তুই যে কথা বলেছিস সেটা তো বিশ্বাসযোগ্য নয়। যদি আমাকে বিশ্বাস গ্লাসে করে গুলিয়ে খাওয়ানো হয়, তবুও বিশ্বাস করব না।’

‘সেটা তোর বিষয়। তবে আমি যেটা বলেছি সেটা একবিন্দু মিথ্যা না। যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য ছাড়া মিথ্যা বলিব না।’

আমি কিছুটা হতাশ হলাম। এমন হতাশ অতীতে হয়েছি বলে মনে করতে পারলাম না। কিন্তু আহসানের কথার সত্যতা না পাওয়া পর্যন্ত আমি যেতে চাইছি না।

‘আচ্ছা দোস্ত, দেখ তো এই লোকটাকে তুই চিনিস কিনা?’ মোবাইলটা আমার দিকে এগিয়ে দিল আহসান। আমি কৌতূহল নিয়ে তাকালাম মোবাইলের দিকে। ছবিটা ঝাপসা। তবে খুবই চেনা মুখ। মনে হচ্ছে কোথায় যেন দেখেছি। কিন্তু এ মুহূর্তে ঠিক মনে করতে পারছি না। মাথায় উশকোখুশকো চুল। বড় গোঁফ। চেহারায় চিন্তার স্পষ্ট রেখা বিদ্যমান। মাথা চুলকাতে লাগলাম আমি। গভীর মনোযোগের সহিত লোকটাকে চেনার চেষ্টা করছি। পথে-ঘাটে, রাস্তায়, কোনো চায়ের দোকানে কিংবা রেল স্টেশন অথবা বাস স্ট্যান্ডে দেখেছি কিনা মনে করতে পারছি না। কিংবা আমাদের কোনো পূর্বপুরুষ! হতে পারে আমাদের মহল্লার কোনো মুরব্বি। নাহ, কোনোভাবেই তো মনে করতে পারছি না।

অতঃপর ব্যর্থ হতে হলো আমাকে। বললাম, ‘লোকটা কে রে? আমাদের বন্ধুদের বয়স তো এত হওয়ার কথা না। লোকটাকে অনেক বয়স্ক মনে হচ্ছে। আবার এটাও মনে হচ্ছে লোকটা খুবই টেনশনে আছেন। চুলগুলোর অবস্থা দেখেছিস? চেহারাও কেমন যেন বিক্ষুব্ধ। মনে হচ্ছে লোকটার শরীরের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে।’

‘তুই কি বলছিস! ও আমার বন্ধু মানুষ! তার মানে তোরও বন্ধু। তবে সম্ভবত তোর সঙ্গে কথা হয়নি লোকটার। না হলে আমি যে কথাটা বলেছি সেটা তুই অবশ্যই বিশ্বাস করতি।’

‘ওহ হো, হ্যাঁ মনে পড়েছে। লোকটাকে আমি বইয়ের পাতায় দেখেছি। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন! তাই না রে বন্ধু?’

‘ইউরেকা! এই তো তুই মনে করতে পেরেছিস। আমাদের বন্ধু মানুষ! তাকে তুই চিনতে পারছিস না এটা ভেবেই তো আমার খারাপ লাগছিল।’

‘তুই জানিস উনি কত আগে মারা গিয়েছেন? তিনি আমাদের বন্ধু হয় কীভাবে বল তো! আইনস্টাইন স্যার কোন কালে আমাদের বন্ধু ছিল?’ কিছুটা টিপ্পনি কাটি আমি।

‘না রে দোস্ত, তুই কিন্তু ভুল বুঝছিস। তোকে শিরোনামেই তো বললাম, আইনস্টাইনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে! তুই তো বিশ্বাসই করতে চাইছিস না। আজ থেকে নয়। সেই অনেক দিন আগে থেকেই সে আমার বন্ধু। জানিস দোস্ত, লোকটা খুব ভালো কথা বলে। অনেকটা উপদেশমূলক কথাবার্তা।’

বিরক্ত ধরে গেল আমার। মনে হচ্ছে আহসান ব্যাটার পশ্চাৎদেশে কষে একটা লাথি মারি। আইনস্টাইনের সঙ্গে ওর নাকি কথা হয়েছে! চিৎকার করে বললাম, ‘পাগল কি গাছে ধরে রে আহসান! বিজ্ঞানী আইনস্টাইন তোর বন্ধু হলো কীভাবে! আর উনার সঙ্গে তোর কথাই বা হলো কীভাবে?’

এবার আহসান তার মোবাইলটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখ দোস্ত, আইনস্টাইন আমার ফেসবুক বন্ধু। আমি যখন ফেসবুক ব্যবহার শুরু করি তখন থেকেই আমার ফ্রেন্ড লিস্টে আইনস্টাইন আছে। চ্যাটিংয়ে আমি আর বন্ধু আইনস্টাইন অনেক কথা বলেছি। চ্যাটিং লিস্টটা দেখ। লোকটা কত উপদেশ দিয়েছে আমাকে। এই যে এখানে দাঁড়িয়ে থেকেও তো চ্যাটিং করলাম।’

আমি আহসানের মোবাইলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম। সেই ২০১০ সাল থেকে আইনস্টাইন আর আহসান বন্ধু! ওরা দুজন ফেসবুক ফ্রেন্ড!

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন