বিরহের গান
jugantor
বিরহের গান

  মো. ফেরদৌস আহাদি  

১৮ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আড়াই বছরের ভাতিজার মুখে আমাকে ভাই ডাক শোনার পর আমার ছয় মাসের রিলেশন ব্রেক আপ হয়ে যায়! ডেটিংয়ে ভাতিজাকে নিয়ে গেলাম। ভাতিজা আমাদের দু’জনের মধ্যে বসলে দারুণ দেখাবে। তারিনকে আগেই বলে রেখেছিলাম, আমার ভাতিজাকে নিয়ে আসব।

দেখা হলো। তারিন ভাতিজার সঙ্গে কথাবার্তা বলল। খুনসুটি করল। আড্ডা হলো, রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়াও হলো। আসার সময় ভাতিজা আমাকে ভাই ডেকে বলল, ‘ভাইয়া, আমি আইসক্রিম খাব! তারিন তো এ কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল, ‘তুমি না বলছ, তোমার কোনো ছোট ভাই নাই!’

‘সত্যিই তো বলেছি। আমার ছোট কোনো ভাই নাই তো!’

‘তাহলে ও ভাই ডাকছে ক্যান?’

‘জানি না। সত্যি বলছি।’

‘যে প্রেমিকার কাছ থেকে কথা হাইড করে রাখে, তার সঙ্গে রিলেশন কন্টিনিউ করা যায় না। আজ থেকে আমাদের ব্রেকআপ!’

‘একটু বোঝার চেষ্টা করো। বিশ্বাস করো আমায়।’

‘তুমি আমাকে ফোন দিবা না আর। তোমাকে সবকিছু থেকে ব্লক করব আমি।’ এ বলে তারিন চলে গেল। দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাসায় ফিরলাম। ছয় মাসের রিলেশন সামান্য ‘ভাই’ ডাকে ব্রেক আপ! বাসায় এসে বাবা-মা, ভাই-ভাবির কাছে সব খুলে বললাম। তারা কেউ আমার কথা গায়েই লাগাল না।

‘মেয়ে তোর সঙ্গে রিলেশন কন্টিনিউ করতে চাচ্ছে না। তাই ব্রেক আপ করেছে। ভাই ডাকার জন্য কোনও মেয়ে ব্রেক আপ করতে পারে! বুঝিস না তুই!’ আরও কত কী বলল সবাই।

পরিবারের অবহেলায় ডিপ্রেশনে চলে গেলাম। বিরহের গান শোনা শুরু করলাম। আমার বিরহ জ্বালা চরম পর্যায়ে চলে যাওয়ায় বাসায় আমার বিয়ের কথা শুরু হলো। মেয়ে দেখার জন্য আমার অনুমতি নিল। আমি অনুমতি দিলাম। ব্রেক আপ হওয়ায় পেলাম দুঃখ, বিয়ে করে পাব আনন্দ! আনন্দ-দুঃখ কাটাকাটি, বিয়ে করে সংসার গড়ি। মনে মনে এ ভেবে নিলাম।

বাসা থেকে মেয়ে দেখে এসেছে। এবার চূড়ান্ত দেখা। ছেলের পছন্দ হলেই বিয়ে কনফার্ম। মেয়ে দেখতে আমি, বড় ভাই, বাবা, ভাবি, মামা, চাচা আর আমার সেই আড়াই বছরের ভাতিজা। ভাতিজাকে না নেওয়ার কথা বলেছিলাম প্রথমে। বললাম, ‘তার জন্য আমার ব্রেক আপ হয়েছে। মেয়ের বাড়িতে গিয়ে আবার কী বলে ফেলে বলা যায় না!’ কিন্তু বাসার কেউ আমার কথা শুনল না। অনেক অনুরোধ করলাম সবাইকে। ভাবিকে বললাম, ‘ও তো যখন-তখন প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলে!’

ভাবি বললেন, ‘সমস্যা নাই, ডায়াপার পরিয়ে নেব।’

মেয়ে আমার এবং আমাদের সবার পছন্দ হলো। আমাদের সব তথ্য কনের বাবার কাছে বলা হলো। দুই ভাই, বড় ভাই বিবাহিত, এটা তার বাচ্চা, আমার পেশা ইত্যাদি। এমন সময় ভাতিজা আমাকে সবার সামনে ফের ‘ভাই’ ডেকে বসল। মুহূর্তের মধ্যে বাসায় হইচই শুরু হয়ে গেল।

মেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। বাসার লোকজন একত্রিত হয়ে গেল। একজন বললেন, ‘ছেলের বাড়ির লোক মিথ্যাবাদী। ওরা মনে হয় কোনো চক্র! বিয়ের পর টাকা-পয়সা, স্বর্ণ-অলংকার নিয়ে পালাবে! আরেকজন বললেন, ‘আমি এরকম একটা চক্রের নাম শুনেছি, যারা মেয়ের পরিবারকে ছেলে আমেরিকায় থাকে, সেখানে বড় চাকরি করে, বিয়ের কিছুদিন পরই মেয়েকে নিয়ে যাবে-এসব বলে ইমপ্রেস করে বিয়ে করে মেয়ে নিয়ে ভেঙে যায়। পরে মেয়েদের বিক্রি করে দেয়! আরেকজন বললেন, ‘ভাগ্যিস বাচ্চা ছেলেটা মুখ খোলায় ধরা পড়ল। নয়তো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেত। শিশুরা কখনো মিথ্যা বলে না। পুলিশকে জানানো দরকার।’

এমন উদ্ভট কথাবার্তা শোনার পর আর বসে থাকার মানে হয় না। সবাই কোনো রকমে মেয়ের বাসা থেকে বের হয়ে এলাম।

বাসায় আসার পর চিৎকার করে বললাম, ‘আর একটু অপেক্ষা করলেই জেলের ভাত খেতে হতো। সেদিন তো আমার কথা বিশ্বাস করোনি। এবার বিশ্বাস হলো তো!’ এ বলে আমি আবার ডিপ্রেশনে চলে গেলাম। আবারও আমার সঙ্গী হলো বিচ্ছেদের গান! বিয়ে না করেও বিচ্ছেদ হওয়ার স্বাদ পাচ্ছি! কিছুদিন পর আবার বিরহ জ্বালা থেকে উদ্ধার করার জন্য বাসা থেকে বিয়ের কথাবার্তা শুরু করল। মেয়ের নাম ইসরাত। খুব সুন্দর মেয়ে। নর্থ সাউথে পড়ে। শেষ পর্যায়ে বিয়েটা হলো আমার। এবার ভাতিজাকে মেয়ে দেখা থেকে শুরু করে বরযাত্রী পর্যন্ত- কোথাও নেওয়া হলো না। ইসরাতকে নিয়ে আসার পর ভাতিজা সেই যে তার রুমে ঢুকেছে আর বের হচ্ছে না। নতুন চাচী পেয়ে বেশ খুশি সে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ইসরাত চিল্লাচিল্লি শুরু করল। বিয়ের দিনই নতুন বউয়ের চিল্লাচিল্লি! মোটেও ভালো নয়। সবাই দৌঁড়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে ইসরাত?’

‘ও না তোমার ভাতিজা!’

‘হ্যাঁ, ভাতিজাই তো।’

‘তাহলে ও আমায় ভাবি ডাকছে ক্যান?’

এ পর্যন্তই শুনলাম আমি। তারপর আর কিছু মনে নেই। আমি মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। জ্ঞান ফেরার পর ভাতিজাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি তোমার চাচিকে ভাবি ডাকলে কেন?’

‘তুমিও তো আমার আম্মুকে ভাবি ডাকো। আমি তোমায় কিছু বলি!’ ভাতিজার জবাব শুনে আমি নির্বাক হয়ে গেলাম।

ইসরাত অবশ্য এরই মধ্যে বাপের বাড়ি চলে গেছে। যাওয়ার আগে বলে গিয়েছে, ‘আমি চললাম। এ পাগলের কারখানায় আমার পক্ষে থাকা সম্ভব না! ভাতিজা চাচিকে ডাকে ভাবি এ কেমন পরিবার! এদের সঙ্গে কিছুদিন থাকলে তো আমি পাগল হয়ে যাবো!’

আমি নিজেকে মনে মনে সান্ত্বনা দিলাম, ‘এ পৃথিবীতে একা এসেছি, একাই যেতে হবে। কেউ কারো নয়।’ ভাবতে ভাবতে আমি আবারও চলে গেলাম ডিপ্রেশনে। শুনতে শুরু করলাম আবারও বিচ্ছেদের গান!

নিকলী, কিশোরগঞ্জ।

বিরহের গান

 মো. ফেরদৌস আহাদি 
১৮ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আড়াই বছরের ভাতিজার মুখে আমাকে ভাই ডাক শোনার পর আমার ছয় মাসের রিলেশন ব্রেক আপ হয়ে যায়! ডেটিংয়ে ভাতিজাকে নিয়ে গেলাম। ভাতিজা আমাদের দু’জনের মধ্যে বসলে দারুণ দেখাবে। তারিনকে আগেই বলে রেখেছিলাম, আমার ভাতিজাকে নিয়ে আসব।

দেখা হলো। তারিন ভাতিজার সঙ্গে কথাবার্তা বলল। খুনসুটি করল। আড্ডা হলো, রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়াও হলো। আসার সময় ভাতিজা আমাকে ভাই ডেকে বলল, ‘ভাইয়া, আমি আইসক্রিম খাব! তারিন তো এ কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল, ‘তুমি না বলছ, তোমার কোনো ছোট ভাই নাই!’

‘সত্যিই তো বলেছি। আমার ছোট কোনো ভাই নাই তো!’

‘তাহলে ও ভাই ডাকছে ক্যান?’

‘জানি না। সত্যি বলছি।’

‘যে প্রেমিকার কাছ থেকে কথা হাইড করে রাখে, তার সঙ্গে রিলেশন কন্টিনিউ করা যায় না। আজ থেকে আমাদের ব্রেকআপ!’

‘একটু বোঝার চেষ্টা করো। বিশ্বাস করো আমায়।’

‘তুমি আমাকে ফোন দিবা না আর। তোমাকে সবকিছু থেকে ব্লক করব আমি।’ এ বলে তারিন চলে গেল। দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাসায় ফিরলাম। ছয় মাসের রিলেশন সামান্য ‘ভাই’ ডাকে ব্রেক আপ! বাসায় এসে বাবা-মা, ভাই-ভাবির কাছে সব খুলে বললাম। তারা কেউ আমার কথা গায়েই লাগাল না।

‘মেয়ে তোর সঙ্গে রিলেশন কন্টিনিউ করতে চাচ্ছে না। তাই ব্রেক আপ করেছে। ভাই ডাকার জন্য কোনও মেয়ে ব্রেক আপ করতে পারে! বুঝিস না তুই!’ আরও কত কী বলল সবাই।

পরিবারের অবহেলায় ডিপ্রেশনে চলে গেলাম। বিরহের গান শোনা শুরু করলাম। আমার বিরহ জ্বালা চরম পর্যায়ে চলে যাওয়ায় বাসায় আমার বিয়ের কথা শুরু হলো। মেয়ে দেখার জন্য আমার অনুমতি নিল। আমি অনুমতি দিলাম। ব্রেক আপ হওয়ায় পেলাম দুঃখ, বিয়ে করে পাব আনন্দ! আনন্দ-দুঃখ কাটাকাটি, বিয়ে করে সংসার গড়ি। মনে মনে এ ভেবে নিলাম।

বাসা থেকে মেয়ে দেখে এসেছে। এবার চূড়ান্ত দেখা। ছেলের পছন্দ হলেই বিয়ে কনফার্ম। মেয়ে দেখতে আমি, বড় ভাই, বাবা, ভাবি, মামা, চাচা আর আমার সেই আড়াই বছরের ভাতিজা। ভাতিজাকে না নেওয়ার কথা বলেছিলাম প্রথমে। বললাম, ‘তার জন্য আমার ব্রেক আপ হয়েছে। মেয়ের বাড়িতে গিয়ে আবার কী বলে ফেলে বলা যায় না!’ কিন্তু বাসার কেউ আমার কথা শুনল না। অনেক অনুরোধ করলাম সবাইকে। ভাবিকে বললাম, ‘ও তো যখন-তখন প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলে!’

ভাবি বললেন, ‘সমস্যা নাই, ডায়াপার পরিয়ে নেব।’

মেয়ে আমার এবং আমাদের সবার পছন্দ হলো। আমাদের সব তথ্য কনের বাবার কাছে বলা হলো। দুই ভাই, বড় ভাই বিবাহিত, এটা তার বাচ্চা, আমার পেশা ইত্যাদি। এমন সময় ভাতিজা আমাকে সবার সামনে ফের ‘ভাই’ ডেকে বসল। মুহূর্তের মধ্যে বাসায় হইচই শুরু হয়ে গেল।

মেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। বাসার লোকজন একত্রিত হয়ে গেল। একজন বললেন, ‘ছেলের বাড়ির লোক মিথ্যাবাদী। ওরা মনে হয় কোনো চক্র! বিয়ের পর টাকা-পয়সা, স্বর্ণ-অলংকার নিয়ে পালাবে! আরেকজন বললেন, ‘আমি এরকম একটা চক্রের নাম শুনেছি, যারা মেয়ের পরিবারকে ছেলে আমেরিকায় থাকে, সেখানে বড় চাকরি করে, বিয়ের কিছুদিন পরই মেয়েকে নিয়ে যাবে-এসব বলে ইমপ্রেস করে বিয়ে করে মেয়ে নিয়ে ভেঙে যায়। পরে মেয়েদের বিক্রি করে দেয়! আরেকজন বললেন, ‘ভাগ্যিস বাচ্চা ছেলেটা মুখ খোলায় ধরা পড়ল। নয়তো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেত। শিশুরা কখনো মিথ্যা বলে না। পুলিশকে জানানো দরকার।’

এমন উদ্ভট কথাবার্তা শোনার পর আর বসে থাকার মানে হয় না। সবাই কোনো রকমে মেয়ের বাসা থেকে বের হয়ে এলাম।

বাসায় আসার পর চিৎকার করে বললাম, ‘আর একটু অপেক্ষা করলেই জেলের ভাত খেতে হতো। সেদিন তো আমার কথা বিশ্বাস করোনি। এবার বিশ্বাস হলো তো!’ এ বলে আমি আবার ডিপ্রেশনে চলে গেলাম। আবারও আমার সঙ্গী হলো বিচ্ছেদের গান! বিয়ে না করেও বিচ্ছেদ হওয়ার স্বাদ পাচ্ছি! কিছুদিন পর আবার বিরহ জ্বালা থেকে উদ্ধার করার জন্য বাসা থেকে বিয়ের কথাবার্তা শুরু করল। মেয়ের নাম ইসরাত। খুব সুন্দর মেয়ে। নর্থ সাউথে পড়ে। শেষ পর্যায়ে বিয়েটা হলো আমার। এবার ভাতিজাকে মেয়ে দেখা থেকে শুরু করে বরযাত্রী পর্যন্ত- কোথাও নেওয়া হলো না। ইসরাতকে নিয়ে আসার পর ভাতিজা সেই যে তার রুমে ঢুকেছে আর বের হচ্ছে না। নতুন চাচী পেয়ে বেশ খুশি সে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ইসরাত চিল্লাচিল্লি শুরু করল। বিয়ের দিনই নতুন বউয়ের চিল্লাচিল্লি! মোটেও ভালো নয়। সবাই দৌঁড়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে ইসরাত?’

‘ও না তোমার ভাতিজা!’

‘হ্যাঁ, ভাতিজাই তো।’

‘তাহলে ও আমায় ভাবি ডাকছে ক্যান?’

এ পর্যন্তই শুনলাম আমি। তারপর আর কিছু মনে নেই। আমি মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। জ্ঞান ফেরার পর ভাতিজাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি তোমার চাচিকে ভাবি ডাকলে কেন?’

‘তুমিও তো আমার আম্মুকে ভাবি ডাকো। আমি তোমায় কিছু বলি!’ ভাতিজার জবাব শুনে আমি নির্বাক হয়ে গেলাম।

ইসরাত অবশ্য এরই মধ্যে বাপের বাড়ি চলে গেছে। যাওয়ার আগে বলে গিয়েছে, ‘আমি চললাম। এ পাগলের কারখানায় আমার পক্ষে থাকা সম্ভব না! ভাতিজা চাচিকে ডাকে ভাবি এ কেমন পরিবার! এদের সঙ্গে কিছুদিন থাকলে তো আমি পাগল হয়ে যাবো!’

আমি নিজেকে মনে মনে সান্ত্বনা দিলাম, ‘এ পৃথিবীতে একা এসেছি, একাই যেতে হবে। কেউ কারো নয়।’ ভাবতে ভাবতে আমি আবারও চলে গেলাম ডিপ্রেশনে। শুনতে শুরু করলাম আবারও বিচ্ছেদের গান!

নিকলী, কিশোরগঞ্জ।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন