হরেক রকমের ক্ষমতা
jugantor
হরেক রকমের ক্ষমতা

  সাদিকুল নিয়োগী পন্নী  

২৫ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এক.

‘রোজ সকালে আমি আলতাফ স্যারের সঙ্গে হাঁটি। স্যারের পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে কয়জন হাঁটতে পারে!’ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব রক্ষক মকসুদ তার সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে কথাটি বলছিলেন। এমন সময় একটা ভ্রমণ বিলের খবর নিতে মকসুদের কাছে এলেন মিরাজ।

মকসুদের কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বললেন, ‘ভালোই তো ব্যয়াম হচ্ছে ভাই, আপনার পেটের চর্বি কমে যাবে।’

মিরাজের কথায় কর্ণপাত না করে মকসুদ পাশের সিটের শফিককে ধমক দিলেন। তা দেখে মিরাজ জানতে চাইলেন, ‘মেজাজ খারাপ নাকি ভাই?’

‘এই অফিসে ঠাণ্ডা মেজাজে কাজ করার কোনো উপায় আছে নাকি! আজকে অফিসে একটু দেরিতে এলাম। শফিক সাহেব ম্যানেজার স্যারের কাছে বিচার দিয়েছেন। বুদ্ধি না থাকলে যা হয় আর কি। আমার নামে বিচার দিলে কিছু হবে বলেন? যে স্যার আমার সঙ্গে হাঁটতে বের হন, তিনি কি আমার বিচার করবেন?’

‘ঠিক বলেছেন, কাছের না হলে আপনার এত কাছাকাছি তো স্যার হাঁটতেন না।’

‘আপনি মনে হয় আমার সঙ্গে মসকরা করছেন। স্যারের লোক শুনেও গুরুত্ব দিচ্ছেন না। আপনার ভ্রমণের বিল হয়নি, পরে আসেন।’

স্যারের সঙ্গে হাঁটার কারণে মকসুদের যেমন অফিসে দাপট বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে পেটের দাপটও। কারণ এখন তিনি কাজ না করে সারাদিন চেয়ারে বসে থাকেন। আর তাতে বুঁড়ির দাপট এতটাই বেড়েছে যে শার্টের মাঝের দুই বোতাম খোলা রেখেও সেটিকে সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মকসুদকে। মিরাজ কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বেরিয়ে এলেন।

দুই.

বদলি হয়ে নতুন অফিসে এসে মিরাজ প্রথম দিনই বিপাকে পড়লেন। এখানে অফিস সহায়ক থেকে শুরু করে ছোট, মাঝারি ও বড় অফিসার- এক একজন আমেরিকার প্রেডিডেন্টের চেয়ে বেশি ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করেন। মিরাজ সেদিন রমিজ নামে এক মাঝারি অফিসারের রুমে বসে আছেন। ওই রুমে আরও ছোট সাইজের বেশ কয়েকজন অফিসার বসা। রমিজ সবাইকে তার ক্ষমতার গল্প বলছেন, ‘আমি তো বড় স্যারের সঙ্গে ফুটবল খেলি। ফুটবলে লাথি দিতে গিয়ে কতবার যে স্যারের পায়ে পা লেগেছে তার হিসাব নেই। স্যার আমাকে অনেক পছন্দ করেন।’

ছোট সাইজের এক অফিসার বললেন, ‘এটা তো সাধারণ কথা না। কয়জনের কপালে আছে স্যারের পায়ের সঙ্গে পা লাগানো। অনেকেই তো স্যারদের পা ধরার পর্যন্ত সুযোগ পায় না। এজন্যই তো আমরা সবাই আপনাকে মান্য করি।’

কিছুক্ষণ পর রশ্মি নামে একজন রুমে এলেন। বাঁকা ঠোঁটের হাসি দিয়ে রমিজকে বললেন, ‘স্যার, আমার ফাইল সাইন করেছেন?’

রমিজ পাল্টা হাসি দিয়ে ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনার ফাইল আসার আগেই সাইন রেডি থাকে। ম্যানেজার স্যারকে বলবেন যেন আমার দিকে একটু সুনজর রাখেন।’

রশ্মি আরেক ঝলক হাসি দিয়ে ফাইল নিয়ে চলে গেলেন।

রমিজ তখন নিজ থেকেই বললেন, ‘এই মেয়ের ক্ষমতা অনেক। বড় বড় স্যারদের সঙ্গে কাজ করে। আর অফিসের যত অনুষ্ঠান হয় সে মঞ্চে থাকে।’

‘উনি কি উপস্থাপনা করেন নাকি স্যার?’ জানতে চাইলেন মিরাজ।

‘আরে তা না। স্টেজে বসা স্যারদের কিছু লাগলে এগিয়ে দেয়। কাউকে পদক দিলে সে ট্রেতে করে নিয়ে যায়। পত্র-পত্রিকাতেও তার ছবি ছাপা হয়।’

‘মানে স্যার সিনেমা বা নাটকের পাসিং শটের মতো?’

রমিজ ধমক দিয়ে বললেন, ‘মিরাজ সাহেব, আপনি এই অফিসে নতুন এসছেন। কার ক্ষমতা কোথায় বুঝতে সময় লাগবে। তাই বাঝে মন্তব্য করবেন না।’

‘জি স্যার।’ সবার ক্ষমতার গল্প শুনে মিরাজের গলা শুকিয়ে এলো। কারণ কোনো স্যারের সঙ্গে তার খেলাধুলার অভিজ্ঞতা নেই। আর মঞ্চে পাসিং দৃশ্যে অংশ নেয়ারও তার সুযোগ হয়নি। তাই তিনি পানি খাওয়ার কথা বলে নিজের রুমে চলে এলেন।

তিন.

মিরাজ বুঝতে পারলেন এই অফিসে টিকতে হলে স্যারদের সঙ্গে নানা রকম খেলাধুলায় অংশ নিতে হবে। তাই তিনি প্রথম মাসের বেতন পেয়ে নিজ খরচে একটা ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করলেন। অফিস ছুটির পর অফিস মাঠেই খেলার আয়োজন। মিরাজের দলে মফিজ ছাড়া তেমন কোনো অফিসার নেই। খেলা শুরু হলো। মাঠের চারপাশে অফিসের অনেক কর্মচারী দর্শক হিসাবে উপস্থিত। স্যারদের খেলা দেখলেও নাকি ক্ষমতা বাড়ে! তাই অনেকেই কাজ রেখে স্যারদের উৎসাহ দিতে মাঠে চলে এসেছেন।

রমিজ স্যার ব্যাটিং করবেন। মিরাজদের দলের ক্যাপ্টেন মফিজ বল করার দায়িত্ব দিলেন তাকে। মফিজ তার হাতে বল তুলে দেয়ার সময় কানে কানে বললেন, ‘বল করবেন স্লো। স্যারের ব্যাটে বল লাগলেই যেন বাউন্ডারি হয়। আমার আশপাশ দিয়ে বল গড়িয়ে গেলে প্রয়োজনে মাঠিতে গড়াগড়ি দেব কিন্তু বল ধরব না।’

খেলার মধ্যে আরেক খেলা। মিরাজের কাছে দুর্বোধ্য মনে হলো। মিরাজ দৌড়ে এসে বল করলেন। বল বাউন্স খেয়ে স্ট্যাম্প বা ব্যাট কোথাও টাচ না করে সোজা রমিজের নাকে আঘাত করল। রমিজ ব্যাট ফেলে হাত দিয়ে নাক চেপে বসে পড়লেন। মফিজ চিৎকার দিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে ছুটে গিয়ে স্যারের নাক চেপে ধরলেন। এভাবে একাধিকজনের চাপাচাপিতে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার গতি বেড়ে গেল। খবর পেয়ে অফিসের চিকিৎসক ছুটে এলেন। তিনি রমিজ স্যারের নাকে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন। খেলা ওই দিনের মতো শেষ। পরদিন থেকে মিরাজের আর খেলার সুযোগ হয়নি। কারণ রমিজ অফিসের বড় স্যারের সহযোগিতায় তাকে ব্যাটিং করে আগের অফিসে পাঠিয়ে দিলেন!

হরেক রকমের ক্ষমতা

 সাদিকুল নিয়োগী পন্নী 
২৫ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এক.

‘রোজ সকালে আমি আলতাফ স্যারের সঙ্গে হাঁটি। স্যারের পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে কয়জন হাঁটতে পারে!’ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব রক্ষক মকসুদ তার সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে কথাটি বলছিলেন। এমন সময় একটা ভ্রমণ বিলের খবর নিতে মকসুদের কাছে এলেন মিরাজ।

মকসুদের কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বললেন, ‘ভালোই তো ব্যয়াম হচ্ছে ভাই, আপনার পেটের চর্বি কমে যাবে।’

মিরাজের কথায় কর্ণপাত না করে মকসুদ পাশের সিটের শফিককে ধমক দিলেন। তা দেখে মিরাজ জানতে চাইলেন, ‘মেজাজ খারাপ নাকি ভাই?’

‘এই অফিসে ঠাণ্ডা মেজাজে কাজ করার কোনো উপায় আছে নাকি! আজকে অফিসে একটু দেরিতে এলাম। শফিক সাহেব ম্যানেজার স্যারের কাছে বিচার দিয়েছেন। বুদ্ধি না থাকলে যা হয় আর কি। আমার নামে বিচার দিলে কিছু হবে বলেন? যে স্যার আমার সঙ্গে হাঁটতে বের হন, তিনি কি আমার বিচার করবেন?’

‘ঠিক বলেছেন, কাছের না হলে আপনার এত কাছাকাছি তো স্যার হাঁটতেন না।’

‘আপনি মনে হয় আমার সঙ্গে মসকরা করছেন। স্যারের লোক শুনেও গুরুত্ব দিচ্ছেন না। আপনার ভ্রমণের বিল হয়নি, পরে আসেন।’

স্যারের সঙ্গে হাঁটার কারণে মকসুদের যেমন অফিসে দাপট বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে পেটের দাপটও। কারণ এখন তিনি কাজ না করে সারাদিন চেয়ারে বসে থাকেন। আর তাতে বুঁড়ির দাপট এতটাই বেড়েছে যে শার্টের মাঝের দুই বোতাম খোলা রেখেও সেটিকে সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মকসুদকে। মিরাজ কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বেরিয়ে এলেন।

দুই.

বদলি হয়ে নতুন অফিসে এসে মিরাজ প্রথম দিনই বিপাকে পড়লেন। এখানে অফিস সহায়ক থেকে শুরু করে ছোট, মাঝারি ও বড় অফিসার- এক একজন আমেরিকার প্রেডিডেন্টের চেয়ে বেশি ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করেন। মিরাজ সেদিন রমিজ নামে এক মাঝারি অফিসারের রুমে বসে আছেন। ওই রুমে আরও ছোট সাইজের বেশ কয়েকজন অফিসার বসা। রমিজ সবাইকে তার ক্ষমতার গল্প বলছেন, ‘আমি তো বড় স্যারের সঙ্গে ফুটবল খেলি। ফুটবলে লাথি দিতে গিয়ে কতবার যে স্যারের পায়ে পা লেগেছে তার হিসাব নেই। স্যার আমাকে অনেক পছন্দ করেন।’

ছোট সাইজের এক অফিসার বললেন, ‘এটা তো সাধারণ কথা না। কয়জনের কপালে আছে স্যারের পায়ের সঙ্গে পা লাগানো। অনেকেই তো স্যারদের পা ধরার পর্যন্ত সুযোগ পায় না। এজন্যই তো আমরা সবাই আপনাকে মান্য করি।’

কিছুক্ষণ পর রশ্মি নামে একজন রুমে এলেন। বাঁকা ঠোঁটের হাসি দিয়ে রমিজকে বললেন, ‘স্যার, আমার ফাইল সাইন করেছেন?’

রমিজ পাল্টা হাসি দিয়ে ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনার ফাইল আসার আগেই সাইন রেডি থাকে। ম্যানেজার স্যারকে বলবেন যেন আমার দিকে একটু সুনজর রাখেন।’

রশ্মি আরেক ঝলক হাসি দিয়ে ফাইল নিয়ে চলে গেলেন।

রমিজ তখন নিজ থেকেই বললেন, ‘এই মেয়ের ক্ষমতা অনেক। বড় বড় স্যারদের সঙ্গে কাজ করে। আর অফিসের যত অনুষ্ঠান হয় সে মঞ্চে থাকে।’

‘উনি কি উপস্থাপনা করেন নাকি স্যার?’ জানতে চাইলেন মিরাজ।

‘আরে তা না। স্টেজে বসা স্যারদের কিছু লাগলে এগিয়ে দেয়। কাউকে পদক দিলে সে ট্রেতে করে নিয়ে যায়। পত্র-পত্রিকাতেও তার ছবি ছাপা হয়।’

‘মানে স্যার সিনেমা বা নাটকের পাসিং শটের মতো?’

রমিজ ধমক দিয়ে বললেন, ‘মিরাজ সাহেব, আপনি এই অফিসে নতুন এসছেন। কার ক্ষমতা কোথায় বুঝতে সময় লাগবে। তাই বাঝে মন্তব্য করবেন না।’

‘জি স্যার।’ সবার ক্ষমতার গল্প শুনে মিরাজের গলা শুকিয়ে এলো। কারণ কোনো স্যারের সঙ্গে তার খেলাধুলার অভিজ্ঞতা নেই। আর মঞ্চে পাসিং দৃশ্যে অংশ নেয়ারও তার সুযোগ হয়নি। তাই তিনি পানি খাওয়ার কথা বলে নিজের রুমে চলে এলেন।

তিন.

মিরাজ বুঝতে পারলেন এই অফিসে টিকতে হলে স্যারদের সঙ্গে নানা রকম খেলাধুলায় অংশ নিতে হবে। তাই তিনি প্রথম মাসের বেতন পেয়ে নিজ খরচে একটা ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করলেন। অফিস ছুটির পর অফিস মাঠেই খেলার আয়োজন। মিরাজের দলে মফিজ ছাড়া তেমন কোনো অফিসার নেই। খেলা শুরু হলো। মাঠের চারপাশে অফিসের অনেক কর্মচারী দর্শক হিসাবে উপস্থিত। স্যারদের খেলা দেখলেও নাকি ক্ষমতা বাড়ে! তাই অনেকেই কাজ রেখে স্যারদের উৎসাহ দিতে মাঠে চলে এসেছেন।

রমিজ স্যার ব্যাটিং করবেন। মিরাজদের দলের ক্যাপ্টেন মফিজ বল করার দায়িত্ব দিলেন তাকে। মফিজ তার হাতে বল তুলে দেয়ার সময় কানে কানে বললেন, ‘বল করবেন স্লো। স্যারের ব্যাটে বল লাগলেই যেন বাউন্ডারি হয়। আমার আশপাশ দিয়ে বল গড়িয়ে গেলে প্রয়োজনে মাঠিতে গড়াগড়ি দেব কিন্তু বল ধরব না।’

খেলার মধ্যে আরেক খেলা। মিরাজের কাছে দুর্বোধ্য মনে হলো। মিরাজ দৌড়ে এসে বল করলেন। বল বাউন্স খেয়ে স্ট্যাম্প বা ব্যাট কোথাও টাচ না করে সোজা রমিজের নাকে আঘাত করল। রমিজ ব্যাট ফেলে হাত দিয়ে নাক চেপে বসে পড়লেন। মফিজ চিৎকার দিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে ছুটে গিয়ে স্যারের নাক চেপে ধরলেন। এভাবে একাধিকজনের চাপাচাপিতে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার গতি বেড়ে গেল। খবর পেয়ে অফিসের চিকিৎসক ছুটে এলেন। তিনি রমিজ স্যারের নাকে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন। খেলা ওই দিনের মতো শেষ। পরদিন থেকে মিরাজের আর খেলার সুযোগ হয়নি। কারণ রমিজ অফিসের বড় স্যারের সহযোগিতায় তাকে ব্যাটিং করে আগের অফিসে পাঠিয়ে দিলেন!

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন