আমি পাগল না
jugantor
রম্যগল্প
আমি পাগল না

  আনিকা তাহসিন হাফসা  

০৬ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিয়ের রাতে জামাই জিজ্ঞেস করল, ‘ও আমার মিষ্টি বউ, বলো তো কী গিফট নিবা?’

আমি উৎসাহী কণ্ঠে বললাম, ‘আমাকে একটা ঝাঁটা এনে দিতে পারবে?’ আমার কথা শুনে জামাই অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল।

‘কী হলো? যাও আনো! তোমার রুমটা এত্ত নোংরা! আমার গা ম্যাজম্যাজ করছে এখানে বসে থাকতে।’ অনেক কষ্টে রাগ সামলে সে আমাকে একটা ঝাঁটা এনে দিল। সারা ঘর পরিষ্কার করে যখন ঘুমোতে যাব জামাই তখন কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘ইশ কী সুন্দর তুমি!’

ওকে ঝামটা মেরে সরিয়ে দিয়ে নাক কুঁচকে বললাম, ‘খবরদার আমার গায়ে হাত দেবে না বলে দিলাম! গা থেকে ঘামের গন্ধ আসছে। কী নোংরা গো তুমি! যাও, আগে পরিষ্কার কিছু পরে এসো!’ আমার কথা শুনে সে পরপর কয়েকবার কাপড় বদলে এলো। কিন্তু কোনো কাপড়ই আমার কাছে পরিষ্কার মনে হলো না। আমার স্বভাবে অতিষ্ঠ হয়ে সে বলল, ‘তুমি কি পাগল?’

আমি ধমক দিয়ে বললাম, ‘পাগল কেন হব? আমি শুধু একটু বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আমার এই স্বভাব দেখেই তো তোমার মা আমাকে পছন্দ করেছিল।’ শুনে কিছু না বলেই ঘুমিয়ে পড়ল সে।

বেশ কাটছিল দিনগুলো। দেখতে দেখতেই এক বছর পেরিয়ে গেল। জামাইকে প্রায়ই ব্যবসার কাজে শহরের বাইরে যেতে হয়। বেশিরভাগ সময় বাইরেই থাকে। বলতে গেলে শান্তিতেই আছি। সারা দিন ঘরদোর পরিষ্কার করে ঝকঝকে তকতকে করে রাখি। মাঝে মাঝে শাশুড়ি আসেন পরিদর্শনের জন্য। আমার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দেখে মুগ্ধ হন বরাবরই। তবে মাঝে মাঝে ননদ এলে খোঁটা দিয়ে কথা শোনায়, ‘ভাবী, তুমি দেখি ধুতে ধুতে প্লেটের ডিজাইনগুলোও তুলে ফেলেছ!’

এসবে আমি কান দিই না। ঘরদোর পরিষ্কার করে বেশ কাটছিল আমার দিনগুলো। শুধু জামাই যখন থাকে, তখন একটু সমস্যা হয়। একটা মানুষ এতটা অপরিচ্ছন্ন কী করে হয়! তার ওপর রোজ নোংরা শরীর নিয়ে কাছে আসতে চায়! জোরসে ধমক দিয়ে সরিয়ে দিই আমি! তখন বিরক্ত হয়ে বলে, ‘তোমার মাথায় গুরুতর সমস্যা!’ ওকে বারবার বুঝাই, আমি শুধু একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করি কিন্তু সে বুঝতেই চায় না!

একদিন লাবণ্য আপুর কল এলো।

‘কী রে, কী করছিস?’

‘এই তো আপু, বাথরুম পরিষ্কার করি। ও যা নোংরা করে গেছে কী আর বলব!’

‘তুই ওই বাথরুমই পরিষ্কার কর! এদিকে তোর স্বামীর মন যে নোংরা হয়ে আছে! সেটা পরিষ্কার করবি না?’

‘কী বলছ এসব?’

‘ঠিকই বলছি। এই তো, একটু আগে দেখলাম সুন্দরমতো একটা মেয়ের সঙ্গে রিকশায় হাত ধরাধরি করে যাচ্ছে।’

‘ও যা করে করুক! বাসায় না এলেই হলো! ও আসলেই বাসা নোংরা হবে।’

‘তুই কি পাগল!’

‘না আপু ! আমি শুধু একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।’

‘শোন! একটু ভেবে দেখ, একবার তোর স্বামী নতুন বউ আনলে তোর কাজ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে! তোকে তোর, তোর জামাই আর ওই থার্ড পার্সনের ময়লাও পরিষ্কার করতে হবে!’

আপুর কথা শুনে আমি রীতিমতো আঁতকে উঠলাম। কাঁদতে কাঁদতে আব্বুকে কল দিলাম। জামাইকে নিয়ে মিটিং বসল। সেখানে আমার শ্বশুরবাড়ি ও বাপের বাড়ির সবাই উপস্থিত। সবাই মিলে ওকে চেপে ধরায় সে সত্যিটা বলতে বাধ্য হলো। আসলে মাসখানেক আগে ও ইমু নামের মেয়েটাকে বিয়ে করেছে। ব্যবসার কথা বলে ওর কাছে যেত। জামাইয়ের এ কথা শুনে আমি রেগে আগুন হয়ে ওর ওপর রীতিমতো ঝাঁপিয়ে পড়লাম। কলার ধরে ধমক দিয়ে বললাম, ‘তোর এত্ত বড় সাহস! তুই কী ভেবেছিস? তোর নোংরা, ময়লা, ঘর, কাপড় পরিষ্কার করি বলে তোর সেকেন্ড বউয়েরও করব? নেভার!’

জামাই কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘তুমি পাগল! ইউ হ্যাভ গন ম্যাড!’ সবাই আমাকে টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে আনল। আর আমি চিৎকার করে যাচ্ছি, ‘তুই একটা নোংরা অপরিচ্ছন্ন কীট!’

তারপর প্রায় একমাস হতে চলল আমি পাগলা গারদে ভর্তি। আমাকে ডিভোর্স দিয়ে জামাই ইমুকে ঘরে তুলেছে। তবে এখন আমার অবস্থা কাহিল! আগে তো শুধু জামাইয়ের ঘর পরিষ্কার করতে হতো, এখন সব পেশেন্টদের রুম পরিষ্কার করতে হয়! কী একটা অবস্থা! নার্স-আয়ারা বলে, আমি নাকি পাগল! আমি ওদের বারবার বলি, ‘আমি পাগল না, আমি শুধু একটু বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।’

রম্যগল্প

আমি পাগল না

 আনিকা তাহসিন হাফসা 
০৬ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিয়ের রাতে জামাই জিজ্ঞেস করল, ‘ও আমার মিষ্টি বউ, বলো তো কী গিফট নিবা?’

আমি উৎসাহী কণ্ঠে বললাম, ‘আমাকে একটা ঝাঁটা এনে দিতে পারবে?’ আমার কথা শুনে জামাই অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল।

‘কী হলো? যাও আনো! তোমার রুমটা এত্ত নোংরা! আমার গা ম্যাজম্যাজ করছে এখানে বসে থাকতে।’ অনেক কষ্টে রাগ সামলে সে আমাকে একটা ঝাঁটা এনে দিল। সারা ঘর পরিষ্কার করে যখন ঘুমোতে যাব জামাই তখন কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘ইশ কী সুন্দর তুমি!’

ওকে ঝামটা মেরে সরিয়ে দিয়ে নাক কুঁচকে বললাম, ‘খবরদার আমার গায়ে হাত দেবে না বলে দিলাম! গা থেকে ঘামের গন্ধ আসছে। কী নোংরা গো তুমি! যাও, আগে পরিষ্কার কিছু পরে এসো!’ আমার কথা শুনে সে পরপর কয়েকবার কাপড় বদলে এলো। কিন্তু কোনো কাপড়ই আমার কাছে পরিষ্কার মনে হলো না। আমার স্বভাবে অতিষ্ঠ হয়ে সে বলল, ‘তুমি কি পাগল?’

আমি ধমক দিয়ে বললাম, ‘পাগল কেন হব? আমি শুধু একটু বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আমার এই স্বভাব দেখেই তো তোমার মা আমাকে পছন্দ করেছিল।’ শুনে কিছু না বলেই ঘুমিয়ে পড়ল সে।

বেশ কাটছিল দিনগুলো। দেখতে দেখতেই এক বছর পেরিয়ে গেল। জামাইকে প্রায়ই ব্যবসার কাজে শহরের বাইরে যেতে হয়। বেশিরভাগ সময় বাইরেই থাকে। বলতে গেলে শান্তিতেই আছি। সারা দিন ঘরদোর পরিষ্কার করে ঝকঝকে তকতকে করে রাখি। মাঝে মাঝে শাশুড়ি আসেন পরিদর্শনের জন্য। আমার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দেখে মুগ্ধ হন বরাবরই। তবে মাঝে মাঝে ননদ এলে খোঁটা দিয়ে কথা শোনায়, ‘ভাবী, তুমি দেখি ধুতে ধুতে প্লেটের ডিজাইনগুলোও তুলে ফেলেছ!’

এসবে আমি কান দিই না। ঘরদোর পরিষ্কার করে বেশ কাটছিল আমার দিনগুলো। শুধু জামাই যখন থাকে, তখন একটু সমস্যা হয়। একটা মানুষ এতটা অপরিচ্ছন্ন কী করে হয়! তার ওপর রোজ নোংরা শরীর নিয়ে কাছে আসতে চায়! জোরসে ধমক দিয়ে সরিয়ে দিই আমি! তখন বিরক্ত হয়ে বলে, ‘তোমার মাথায় গুরুতর সমস্যা!’ ওকে বারবার বুঝাই, আমি শুধু একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করি কিন্তু সে বুঝতেই চায় না!

একদিন লাবণ্য আপুর কল এলো।

‘কী রে, কী করছিস?’

‘এই তো আপু, বাথরুম পরিষ্কার করি। ও যা নোংরা করে গেছে কী আর বলব!’

‘তুই ওই বাথরুমই পরিষ্কার কর! এদিকে তোর স্বামীর মন যে নোংরা হয়ে আছে! সেটা পরিষ্কার করবি না?’

‘কী বলছ এসব?’

‘ঠিকই বলছি। এই তো, একটু আগে দেখলাম সুন্দরমতো একটা মেয়ের সঙ্গে রিকশায় হাত ধরাধরি করে যাচ্ছে।’

‘ও যা করে করুক! বাসায় না এলেই হলো! ও আসলেই বাসা নোংরা হবে।’

‘তুই কি পাগল!’

‘না আপু ! আমি শুধু একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।’

‘শোন! একটু ভেবে দেখ, একবার তোর স্বামী নতুন বউ আনলে তোর কাজ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে! তোকে তোর, তোর জামাই আর ওই থার্ড পার্সনের ময়লাও পরিষ্কার করতে হবে!’

আপুর কথা শুনে আমি রীতিমতো আঁতকে উঠলাম। কাঁদতে কাঁদতে আব্বুকে কল দিলাম। জামাইকে নিয়ে মিটিং বসল। সেখানে আমার শ্বশুরবাড়ি ও বাপের বাড়ির সবাই উপস্থিত। সবাই মিলে ওকে চেপে ধরায় সে সত্যিটা বলতে বাধ্য হলো। আসলে মাসখানেক আগে ও ইমু নামের মেয়েটাকে বিয়ে করেছে। ব্যবসার কথা বলে ওর কাছে যেত। জামাইয়ের এ কথা শুনে আমি রেগে আগুন হয়ে ওর ওপর রীতিমতো ঝাঁপিয়ে পড়লাম। কলার ধরে ধমক দিয়ে বললাম, ‘তোর এত্ত বড় সাহস! তুই কী ভেবেছিস? তোর নোংরা, ময়লা, ঘর, কাপড় পরিষ্কার করি বলে তোর সেকেন্ড বউয়েরও করব? নেভার!’

জামাই কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘তুমি পাগল! ইউ হ্যাভ গন ম্যাড!’ সবাই আমাকে টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে আনল। আর আমি চিৎকার করে যাচ্ছি, ‘তুই একটা নোংরা অপরিচ্ছন্ন কীট!’

তারপর প্রায় একমাস হতে চলল আমি পাগলা গারদে ভর্তি। আমাকে ডিভোর্স দিয়ে জামাই ইমুকে ঘরে তুলেছে। তবে এখন আমার অবস্থা কাহিল! আগে তো শুধু জামাইয়ের ঘর পরিষ্কার করতে হতো, এখন সব পেশেন্টদের রুম পরিষ্কার করতে হয়! কী একটা অবস্থা! নার্স-আয়ারা বলে, আমি নাকি পাগল! আমি ওদের বারবার বলি, ‘আমি পাগল না, আমি শুধু একটু বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন