গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা
jugantor
রম্য গল্প
গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা

  জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য  

২৭ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘আচ্ছা লাবণ্য, তুমি কী কর?’

আমি গম্ভীর গলায় জবাব দিলাম, ‘আমি চিন্তা করি।’

‘কী চিন্তা কর?’

‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা করি। দেশের সব লেটেস্ট নিউজগুলো তো আমাকেই সবার আগে আগে ফেসবুকে আপডেট দিতে হয়! সেখান থেকে শেয়ার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।’

সদ্য বিসিএস ক্যাডার হওয়া অনিক অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। আমরা বসে আছি রেস্টুরেন্টে। আজকাল নতুন একটা রীতি হয়েছে। কনে দেখাদেখি বাড়িতে না হয়ে রেস্টুরেন্টে হচ্ছে। আমার জন্য ভালো হয়েছে। মন খুলে আলাপ করা যাবে। ইদানীং আমার কর্মকাণ্ডে আমার কোনো ফ্রেন্ডই বেশিদিন লাস্টিং করছে না।

অনিক অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘আমি জানতে চাইছি এমনিতে তুমি কী কর? পড়াশোনা ছাড়া তোমার আর হবি কী?’

আমি পুনরায় এক?ই জবাব দিলাম।

অনিক বলল, ‘ঘরে বসে এত কী চিন্তা কর?’

‘এত কী চিন্তা করি মানে! আমার চিন্তার শেষ আছে? এই ধরেন সকালে উঠে ফুচকা খাব না চটপটি, এইটা চিন্তা করি। তারপর চা খাব না কফি! কফি কি ক্রিম মিশিয়ে খাব না ব্ল্যাক! তারপর মুভি দেখতে বসে চিন্তা করি তামিল দেখব না তেলেগু! কাটাপ্পা কেন বাহুবালীকে মেরেছিল! অনুশকা শেট্টি বেশি সুন্দর না সামান্থা! সালমান খানের কি ক্যাটরিনার সঙ্গে রিলেশন চলে! দীপিকার বরের ড্রেসিং সেন্স এত খারাপ কেন! সারেগামাপায় অনুশকা ফার্স্ট হলো না কেন! আর্জেন্টিনা সাপোর্টাররা কী দেখে আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করে! আর্জেন্টিনা জিতলে ব্রাজিল সাপোর্টাররা হিংসায় জ্বলে পুড়ে কেন! জয়া আহসান আর রশিদ খানের বয়স কেন বাড়ে না! তারপর ধরেন...!’

অনিক আমাকে থামিয়ে দিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে শুরু করল। কী আশ্চর্য! কথা বলছি আমি দম আটকে গেছে তার!

‘লাবণ্য, আমার সম্ভবত হার্ট অ্যাটাক হবে!’

বলতে বলতে অনিক বুকে হাত দিল। আমি জ্ঞান দেয়ার ভঙ্গিতে বললাম, ‘নো টেনশন! হার্ট অ্যাটাক হলে হবে! ৮০% মুভিতে দেখা যায় হার্ট অ্যাটাক হলে মানুষ মরে না। আপনার হার্ট অ্যাটাক হলে আমি রক্ত দেব। রক্ত নিয়ে ভাববেন না।’

‘রক্ত নিয়ে ভাবব না কেন?’

‘কারণ এখন আমি আপনার নায়িকা! আপনার যা কিছু হোক রক্ত দিয়ে আপনাকে বাঁচানো আমার দায়িত্ব! বাই দ্য ওয়ে, আপনার রক্তের গ্রুপ কী?’

অনিক বুক থেকে হাত নামিয়ে সোজা হয়ে বসল। আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য কী?’

আমি হাসিমুখে বললাম, ‘ওয়ান মিলিয়ন লাইক। ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে ওয়ান মিলিয়ন লাইক পেতে চাই। তারপর ধরেন, তামিল আর তেলেগু যত মুভি আছে সব দেখে শেষ করতে চাই। তারপর চাই যে, আমার যে বর হবে মানে আপনি! আমরা দু’জন একটা জোশ কাপল পিক তুলব সেটি ফেসবুকে মিনিমাম ত্রিশ হাজার লাইক পাবে!’

অনিক হতাশ চোখে তাকিয়ে আছে। তারপর বলল, ‘সরি! এ বিয়েটা হচ্ছে না।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কেন হচ্ছে না? বিয়ে না হলে তো আপনার সঙ্গে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আমি আলোচনা করতে পারব না! আমার কোনো বন্ধুও নাই। এইগুলা আলোচনা করার জন্য আমার আপনাকে চাই।’

‘তুমি কখনো বিসিএস দেওয়ার ব্যাপারে ভেবেছ? চাকরি-বাকরি এসবের ব্যাপারে?’

‘চাকরি! কী বলেন! আপনি তো চাকরি করবেনই! আপনার ইনকামে আমাদের হবে না?’

‘হ্যাঁ, তা হবে। তাই বলে কি তুমি চাকরির চিন্তা করবা না?’

‘এই দেশে দরিদ্র আর বেকারত্বের হার সম্পর্কে আপনার ধারণা আছে? কত ছেলে আছে তার চাকরির ওপরে তার পুরো পরিবার আশা করে আছে। যেহেতু আপনার ইনকামে আমাদের সংসার চলে যাবে সুতরাং কেন আমি চাকরির বাজারে একটা জায়গা অকারণে দখল করে বসে থাকব? সেটি অন্য একটা বেকার ছেলের জন্য ছেড়ে দেওয়া ভালো!’

‘এজন্য তুমি বিশ্ববিদ্যালয়েও এডমিশন পরীক্ষা দাওনি?’ অনিক বিস্মিত।

‘অবশ্যই! খামোখা একজন মেধাবী ছাত্রের সিট দখল করে কী লাভ! আর তা ছাড়া আমার জরুরি কাজ থাকে।’

‘কী এমন কাজ থাকে তোমার?’

‘বাহ! এতক্ষণ কী বললাম? দেশের লেটেস্ট আপডেটগুলো নিয়ে ফেসবুকে আলোচনা-সমালোচনা করা, সাউথ ইন্ডিয়ান মুভি নিয়ে গবেষণা আর...!’

অনিক আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা! আমার একটু কাজ আছে! পরে কথা হবে?’ বলেই দৌড় লাগালো। আমি উঠলাম না। বসে বসে একটা গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা করতে লাগলাম। মানুষ যখন একেবারেই চলে যাবে তখন বলবে, গুডবাই! কিন্তু বাঙালি বলে, পরে কথা হবে! কেন?

রম্য গল্প

গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা

 জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য 
২৭ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘আচ্ছা লাবণ্য, তুমি কী কর?’

আমি গম্ভীর গলায় জবাব দিলাম, ‘আমি চিন্তা করি।’

‘কী চিন্তা কর?’

‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা করি। দেশের সব লেটেস্ট নিউজগুলো তো আমাকেই সবার আগে আগে ফেসবুকে আপডেট দিতে হয়! সেখান থেকে শেয়ার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।’

সদ্য বিসিএস ক্যাডার হওয়া অনিক অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। আমরা বসে আছি রেস্টুরেন্টে। আজকাল নতুন একটা রীতি হয়েছে। কনে দেখাদেখি বাড়িতে না হয়ে রেস্টুরেন্টে হচ্ছে। আমার জন্য ভালো হয়েছে। মন খুলে আলাপ করা যাবে। ইদানীং আমার কর্মকাণ্ডে আমার কোনো ফ্রেন্ডই বেশিদিন লাস্টিং করছে না।

অনিক অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘আমি জানতে চাইছি এমনিতে তুমি কী কর? পড়াশোনা ছাড়া তোমার আর হবি কী?’

আমি পুনরায় এক?ই জবাব দিলাম।

অনিক বলল, ‘ঘরে বসে এত কী চিন্তা কর?’

‘এত কী চিন্তা করি মানে! আমার চিন্তার শেষ আছে? এই ধরেন সকালে উঠে ফুচকা খাব না চটপটি, এইটা চিন্তা করি। তারপর চা খাব না কফি! কফি কি ক্রিম মিশিয়ে খাব না ব্ল্যাক! তারপর মুভি দেখতে বসে চিন্তা করি তামিল দেখব না তেলেগু! কাটাপ্পা কেন বাহুবালীকে মেরেছিল! অনুশকা শেট্টি বেশি সুন্দর না সামান্থা! সালমান খানের কি ক্যাটরিনার সঙ্গে রিলেশন চলে! দীপিকার বরের ড্রেসিং সেন্স এত খারাপ কেন! সারেগামাপায় অনুশকা ফার্স্ট হলো না কেন! আর্জেন্টিনা সাপোর্টাররা কী দেখে আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করে! আর্জেন্টিনা জিতলে ব্রাজিল সাপোর্টাররা হিংসায় জ্বলে পুড়ে কেন! জয়া আহসান আর রশিদ খানের বয়স কেন বাড়ে না! তারপর ধরেন...!’

অনিক আমাকে থামিয়ে দিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে শুরু করল। কী আশ্চর্য! কথা বলছি আমি দম আটকে গেছে তার!

‘লাবণ্য, আমার সম্ভবত হার্ট অ্যাটাক হবে!’

বলতে বলতে অনিক বুকে হাত দিল। আমি জ্ঞান দেয়ার ভঙ্গিতে বললাম, ‘নো টেনশন! হার্ট অ্যাটাক হলে হবে! ৮০% মুভিতে দেখা যায় হার্ট অ্যাটাক হলে মানুষ মরে না। আপনার হার্ট অ্যাটাক হলে আমি রক্ত দেব। রক্ত নিয়ে ভাববেন না।’

‘রক্ত নিয়ে ভাবব না কেন?’

‘কারণ এখন আমি আপনার নায়িকা! আপনার যা কিছু হোক রক্ত দিয়ে আপনাকে বাঁচানো আমার দায়িত্ব! বাই দ্য ওয়ে, আপনার রক্তের গ্রুপ কী?’

অনিক বুক থেকে হাত নামিয়ে সোজা হয়ে বসল। আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য কী?’

আমি হাসিমুখে বললাম, ‘ওয়ান মিলিয়ন লাইক। ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে ওয়ান মিলিয়ন লাইক পেতে চাই। তারপর ধরেন, তামিল আর তেলেগু যত মুভি আছে সব দেখে শেষ করতে চাই। তারপর চাই যে, আমার যে বর হবে মানে আপনি! আমরা দু’জন একটা জোশ কাপল পিক তুলব সেটি ফেসবুকে মিনিমাম ত্রিশ হাজার লাইক পাবে!’

অনিক হতাশ চোখে তাকিয়ে আছে। তারপর বলল, ‘সরি! এ বিয়েটা হচ্ছে না।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কেন হচ্ছে না? বিয়ে না হলে তো আপনার সঙ্গে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আমি আলোচনা করতে পারব না! আমার কোনো বন্ধুও নাই। এইগুলা আলোচনা করার জন্য আমার আপনাকে চাই।’

‘তুমি কখনো বিসিএস দেওয়ার ব্যাপারে ভেবেছ? চাকরি-বাকরি এসবের ব্যাপারে?’

‘চাকরি! কী বলেন! আপনি তো চাকরি করবেনই! আপনার ইনকামে আমাদের হবে না?’

‘হ্যাঁ, তা হবে। তাই বলে কি তুমি চাকরির চিন্তা করবা না?’

‘এই দেশে দরিদ্র আর বেকারত্বের হার সম্পর্কে আপনার ধারণা আছে? কত ছেলে আছে তার চাকরির ওপরে তার পুরো পরিবার আশা করে আছে। যেহেতু আপনার ইনকামে আমাদের সংসার চলে যাবে সুতরাং কেন আমি চাকরির বাজারে একটা জায়গা অকারণে দখল করে বসে থাকব? সেটি অন্য একটা বেকার ছেলের জন্য ছেড়ে দেওয়া ভালো!’

‘এজন্য তুমি বিশ্ববিদ্যালয়েও এডমিশন পরীক্ষা দাওনি?’ অনিক বিস্মিত।

‘অবশ্যই! খামোখা একজন মেধাবী ছাত্রের সিট দখল করে কী লাভ! আর তা ছাড়া আমার জরুরি কাজ থাকে।’

‘কী এমন কাজ থাকে তোমার?’

‘বাহ! এতক্ষণ কী বললাম? দেশের লেটেস্ট আপডেটগুলো নিয়ে ফেসবুকে আলোচনা-সমালোচনা করা, সাউথ ইন্ডিয়ান মুভি নিয়ে গবেষণা আর...!’

অনিক আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা! আমার একটু কাজ আছে! পরে কথা হবে?’ বলেই দৌড় লাগালো। আমি উঠলাম না। বসে বসে একটা গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা করতে লাগলাম। মানুষ যখন একেবারেই চলে যাবে তখন বলবে, গুডবাই! কিন্তু বাঙালি বলে, পরে কথা হবে! কেন?

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন