মেঘ না চাইতেই জল
jugantor
রম্যগল্প
মেঘ না চাইতেই জল

  জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য  

০৪ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘আসুন আসুন, ভেতরে এসে বসুন।’ বাইরে থেকে দেরি করে ফিরে আম্মুর মধুমিশ্রিত ব্যবহার দেখে বুকে ধাক্কার মতো লাগবে না এমন মেয়ে বাংলাদেশে নাই! আমারও ধাক্কাটা লাগল। যদিও লাগার কোনো কারণ নাই। আম্মুর এক ধরনের অ্যামেনেশিয়ার মতো আছে। মাঝেমধ্যে সব ভুলে যান, পরক্ষনেই সবকিছু মনে পড়ে স্বাভাবিক হয়ে যান।

কোনো কোনো দিন কলেজ থেকে বাসায় ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায়। কারণটা সিয়াম। নতুন রিলেশন। সহজে ছাড়তে চায় না। বাসায় এসে যখন ডোর বেল চাপি মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকি আম্মু যেন আমাকে চিনতে না পারেন। বেশিরভাগ দিনই তাই হয়! দীর্ঘ সময়ের অদর্শনে আম্মু আমাকে হঠাৎ করে মনে করতে পারেন না। আমি জামাকাপড় চেঞ্জ করে হাতমুখ ধুইতে ধুইতে আম্মুর সব মনে পড়ে যায়। তখন দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলেন, ‘জমিদারের বাচ্চা! কখন উঠবেন? দুপুর যে হয়ে গেল সে খেয়াল আছে?’

এভাবেই চলছিল দিন। একদিন সিয়াম বলল, আমার বাসায় আসতে চায়। আমার আব্বু-আম্মুর সঙ্গে দেখা করে নিজের একটা গুড ইমপ্রেশন তাদের ওপর ফেলতে চায়। ছেলে বন্ধু জিনিসটা আব্বু মোটামুটি নিতে পারলেও আম্মু একেবারেই পারেন না। রাগী গলায় বলেন, ‘আমার বাপের বংশে এ রকম বেলেল্লাপনা কখনো ছিল না। তোর বাপের কথা অবশ্য আলাদা, তার বংশে এসব ছিল বলেই তোর মেজো ফুপু পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে। আমার আব্বা হলে এসব কখনোই মেনে নিতেন না।’

যাই হোক, সাতপাঁচ নানা দিক ভেবে সিয়ামকে না করলাম না। শুধু বললাম, ‘আম্মুর একটু ভুলে যাওয়ার বাতিক আছে, বুঝে শুনে কথা বলবে।’

পরদিন সিয়ামকে নিয়ে বাসায় এলাম। এ সময় আব্বু বাসাতেই থাকেন। তবে আজ অফিসে কী যেন হয়েছে, দুপুরে খেতেও আসেনি।

যথারীতি আম্মু দরজা খুলে খুশি খুশি গলায় বললেন, ‘আসেন আসেন! এত দেরি যে! জ্যাম ছিল নাকি?’

আমি ঢোক গিলে বললাম, ‘জি ছিল। এইটা আমার বন্ধু সিয়াম।’

আম্মু হাসিমুখে বললেন, ‘আসেন আসেন, ভেতরে এসে ঠান্ডা হয়ে বসেন।? কী খাবেন?’

সিয়ামকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখে আমি ঘরে গিয়ে বাথরুমে ঢুকে হাতমুখ ধুতে ধুতেই আম্মু এসে দরজায় ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘বসার ঘরে গুন্ডামতো একটা ছেলে বসে আছে, কে রে?’

আমি দুঃখী গলায় বললাম, ‘কী বলো আম্মু? আব্বুর অফিস থেকে এসেছে টিফিন নিয়ে যেতে। আব্বুর কলিগ। আব্বু তো দুপুরে খায় নাই!’ ‘তাহলে ছেলেটাকে খেয়ে যেতে বলি? দুপুর করে এসেছে!’

‘বলো।’

খেয়েদেয়ে পেটমোটা এক টিফিন নিয়ে সিয়াম বিদায় হলো। চলে যাওয়ার পর আম্মু বললেন, ‘ছেলেটা কিন্তু খুব মজার! মনটাও ভালো। বিয়ে হয়ে গেছে নাকি শুনতে হবে তো তোর আব্বুর কাছে!’

আমি কিছু বললাম না। আম্মুরও ব্যাপারটা আব্বু আসা পর্যন্ত আর মনে রইল না। সপ্তাহখানেক পর এক শুক্রবার সিয়াম আবার এলো। সেদিন আব্বু বাসায় ছিল। আব্বুকে সব খুলে বললাম কলিগের ব্যাপারটা। কাজেই সিয়াম হাসিমুখে অনেকক্ষণ গল্প করল। আম্মু ওর জন্য গাজরের হালুয়া করল, আমি হেল্প করলাম। তারপর টিফিন ভর্তি গাজরের হালুয়া নিয়ে সিয়াম বিদায় হলো।

এভাবে সিয়াম সপ্তাহে প্রায় দুই-তিন দিন করে প্রায়?ই আসতে লাগল। আম্মু খুব খুশি হন। বলেন, ‘ছেলেটা মেসে থাকে, ভালোমন্দ আর খেতে পায় কই!’ এইজন্য সে যে কদিন আসে ভালো ভালো রান্না হয় বাসায়।

আমরা যখন মোটামুটি শিওর হয়ে গেছি আর কোনো সমস্যা হবে না তখন একদিন হঠাৎ দরজা খুলে আমাদের দু’জনকে এক সঙ্গে দেখে আম্মু গম্ভীর হয়ে গেলেন। আমি বরাবরের মতোই হাসিমুখে আম্মু প্রশ্ন করার আগেই বললাম, ‘ভালো আছেন? আসতে একটু দেরি হয়ে গেল, রাস্তায় আজ যা জ্যাম! আজ একুশে ফেব্রুয়ারি তো!’

আম্মু জবাব দিলেন না। আমরা পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। সিয়ামকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে আমি আমার ঘরে এলাম। অমনি মা জননী হাজির, ‘তুই আমার কাছে মিথ্যা কথা বলছিস কেন? বল, মিথ্যা কোন সাহসে তুই আমার কাছে বললি? কোন সাহসে তুই বললি আজ একুশে ফেব্রুয়ারি! কী ভেবেছিস তুই! তোর মা পাগল? আজ তোর বাপ আসুক, লাই দিয়ে দিয়ে মেয়েকে মাথায় তুলেছে!’

আমি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে না ফেলতেই দেখি দরজার কাছে সিয়াম দাঁড়িয়ে আছে। আম্মু ওকে দেখে নির্ভরতার গলায় নালিশ জানালেন, ‘দেখ তো বাবা, মেয়েটা আমার কাছে মিথ্যা বলে কোথায় কোথায় কোন আলতু ফালতু ছেলের সঙ্গে ঘোরে! সারা রাত দেখি ফিসফিস করে ফোনে গল্প করে!’

তারপরই কথা ঘুরিয়ে হঠাৎ বললেন, ‘আমার মেয়েকে তোমার কেমন লাগে?’

সিয়াম ঢোক গিলে বলল, ‘ইয়ে মানে ভালোই তো!’

‘আজ ওর বাপ আসুক, তোমাদের বিয়ের কথা বলব। প্রায়ই তোমরা দেখি গল্প কর, একসঙ্গে বাসায় আস। দেখে চোখটা জুড়িয়ে যায়!’ হ

রম্যগল্প

মেঘ না চাইতেই জল

 জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য 
০৪ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘আসুন আসুন, ভেতরে এসে বসুন।’ বাইরে থেকে দেরি করে ফিরে আম্মুর মধুমিশ্রিত ব্যবহার দেখে বুকে ধাক্কার মতো লাগবে না এমন মেয়ে বাংলাদেশে নাই! আমারও ধাক্কাটা লাগল। যদিও লাগার কোনো কারণ নাই। আম্মুর এক ধরনের অ্যামেনেশিয়ার মতো আছে। মাঝেমধ্যে সব ভুলে যান, পরক্ষনেই সবকিছু মনে পড়ে স্বাভাবিক হয়ে যান।

কোনো কোনো দিন কলেজ থেকে বাসায় ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায়। কারণটা সিয়াম। নতুন রিলেশন। সহজে ছাড়তে চায় না। বাসায় এসে যখন ডোর বেল চাপি মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকি আম্মু যেন আমাকে চিনতে না পারেন। বেশিরভাগ দিনই তাই হয়! দীর্ঘ সময়ের অদর্শনে আম্মু আমাকে হঠাৎ করে মনে করতে পারেন না। আমি জামাকাপড় চেঞ্জ করে হাতমুখ ধুইতে ধুইতে আম্মুর সব মনে পড়ে যায়। তখন দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলেন, ‘জমিদারের বাচ্চা! কখন উঠবেন? দুপুর যে হয়ে গেল সে খেয়াল আছে?’

এভাবেই চলছিল দিন। একদিন সিয়াম বলল, আমার বাসায় আসতে চায়। আমার আব্বু-আম্মুর সঙ্গে দেখা করে নিজের একটা গুড ইমপ্রেশন তাদের ওপর ফেলতে চায়। ছেলে বন্ধু জিনিসটা আব্বু মোটামুটি নিতে পারলেও আম্মু একেবারেই পারেন না। রাগী গলায় বলেন, ‘আমার বাপের বংশে এ রকম বেলেল্লাপনা কখনো ছিল না। তোর বাপের কথা অবশ্য আলাদা, তার বংশে এসব ছিল বলেই তোর মেজো ফুপু পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে। আমার আব্বা হলে এসব কখনোই মেনে নিতেন না।’

যাই হোক, সাতপাঁচ নানা দিক ভেবে সিয়ামকে না করলাম না। শুধু বললাম, ‘আম্মুর একটু ভুলে যাওয়ার বাতিক আছে, বুঝে শুনে কথা বলবে।’

পরদিন সিয়ামকে নিয়ে বাসায় এলাম। এ সময় আব্বু বাসাতেই থাকেন। তবে আজ অফিসে কী যেন হয়েছে, দুপুরে খেতেও আসেনি।

যথারীতি আম্মু দরজা খুলে খুশি খুশি গলায় বললেন, ‘আসেন আসেন! এত দেরি যে! জ্যাম ছিল নাকি?’

আমি ঢোক গিলে বললাম, ‘জি ছিল। এইটা আমার বন্ধু সিয়াম।’

আম্মু হাসিমুখে বললেন, ‘আসেন আসেন, ভেতরে এসে ঠান্ডা হয়ে বসেন।? কী খাবেন?’

সিয়ামকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখে আমি ঘরে গিয়ে বাথরুমে ঢুকে হাতমুখ ধুতে ধুতেই আম্মু এসে দরজায় ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘বসার ঘরে গুন্ডামতো একটা ছেলে বসে আছে, কে রে?’

আমি দুঃখী গলায় বললাম, ‘কী বলো আম্মু? আব্বুর অফিস থেকে এসেছে টিফিন নিয়ে যেতে। আব্বুর কলিগ। আব্বু তো দুপুরে খায় নাই!’ ‘তাহলে ছেলেটাকে খেয়ে যেতে বলি? দুপুর করে এসেছে!’

‘বলো।’

খেয়েদেয়ে পেটমোটা এক টিফিন নিয়ে সিয়াম বিদায় হলো। চলে যাওয়ার পর আম্মু বললেন, ‘ছেলেটা কিন্তু খুব মজার! মনটাও ভালো। বিয়ে হয়ে গেছে নাকি শুনতে হবে তো তোর আব্বুর কাছে!’

আমি কিছু বললাম না। আম্মুরও ব্যাপারটা আব্বু আসা পর্যন্ত আর মনে রইল না। সপ্তাহখানেক পর এক শুক্রবার সিয়াম আবার এলো। সেদিন আব্বু বাসায় ছিল। আব্বুকে সব খুলে বললাম কলিগের ব্যাপারটা। কাজেই সিয়াম হাসিমুখে অনেকক্ষণ গল্প করল। আম্মু ওর জন্য গাজরের হালুয়া করল, আমি হেল্প করলাম। তারপর টিফিন ভর্তি গাজরের হালুয়া নিয়ে সিয়াম বিদায় হলো।

এভাবে সিয়াম সপ্তাহে প্রায় দুই-তিন দিন করে প্রায়?ই আসতে লাগল। আম্মু খুব খুশি হন। বলেন, ‘ছেলেটা মেসে থাকে, ভালোমন্দ আর খেতে পায় কই!’ এইজন্য সে যে কদিন আসে ভালো ভালো রান্না হয় বাসায়।

আমরা যখন মোটামুটি শিওর হয়ে গেছি আর কোনো সমস্যা হবে না তখন একদিন হঠাৎ দরজা খুলে আমাদের দু’জনকে এক সঙ্গে দেখে আম্মু গম্ভীর হয়ে গেলেন। আমি বরাবরের মতোই হাসিমুখে আম্মু প্রশ্ন করার আগেই বললাম, ‘ভালো আছেন? আসতে একটু দেরি হয়ে গেল, রাস্তায় আজ যা জ্যাম! আজ একুশে ফেব্রুয়ারি তো!’

আম্মু জবাব দিলেন না। আমরা পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। সিয়ামকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে আমি আমার ঘরে এলাম। অমনি মা জননী হাজির, ‘তুই আমার কাছে মিথ্যা কথা বলছিস কেন? বল, মিথ্যা কোন সাহসে তুই আমার কাছে বললি? কোন সাহসে তুই বললি আজ একুশে ফেব্রুয়ারি! কী ভেবেছিস তুই! তোর মা পাগল? আজ তোর বাপ আসুক, লাই দিয়ে দিয়ে মেয়েকে মাথায় তুলেছে!’

আমি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে না ফেলতেই দেখি দরজার কাছে সিয়াম দাঁড়িয়ে আছে। আম্মু ওকে দেখে নির্ভরতার গলায় নালিশ জানালেন, ‘দেখ তো বাবা, মেয়েটা আমার কাছে মিথ্যা বলে কোথায় কোথায় কোন আলতু ফালতু ছেলের সঙ্গে ঘোরে! সারা রাত দেখি ফিসফিস করে ফোনে গল্প করে!’

তারপরই কথা ঘুরিয়ে হঠাৎ বললেন, ‘আমার মেয়েকে তোমার কেমন লাগে?’

সিয়াম ঢোক গিলে বলল, ‘ইয়ে মানে ভালোই তো!’

‘আজ ওর বাপ আসুক, তোমাদের বিয়ের কথা বলব। প্রায়ই তোমরা দেখি গল্প কর, একসঙ্গে বাসায় আস। দেখে চোখটা জুড়িয়ে যায়!’ হ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন