আফসার সাহেবের গরু কেনা
jugantor
রম্যগল্প
আফসার সাহেবের গরু কেনা

  মো. রায়হান কবির  

১৮ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কুরবানির জন্য গরু কিনতে গিয়ে ঝামেলায় পড়ে গেলেন আফসার সাহেব। স্ত্রীকে বলে এসেছেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে গরু কিনবেন। তবে হাটে এসে বুঝতে পারলেন ইচ্ছা থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কঠিন। কেননা নিজেকে নিয়ন্ত্রণের অধিকার সবারই আছে, কিন্তু অন্যকে তো আর নিয়ন্ত্রণ করা যায় না?

আগে গরুর হাটে দুই শ্রেণির লোক আসতেন-ক্রেতা এবং দর্শক। আর এখন? কেউ আসে গরুর সঙ্গে সেলফি তুলতে, কেউ টিকটক ভিডিও কিংবা ইউটিউবের জন্য কনটেন্ট বানাতে। তাতে যদি কেউ নিজ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে চায়ও, তা সম্ভব হয় না। তারপরও আফসার সাহেব যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে গরু দেখছিলেন। কিন্তু সমস্যা ওই এক জায়গাতেই, আফসার সাহেব মনমতো গরু পাচ্ছিলেন না। গজ ফিতা এনে গরুর এক পা থেকে অন্য পায়ের দূরত্ব মাপছিলেন, কিন্তু কোনো গরুই আফসার সাহেবের মনমতো হচ্ছিল না।

অনেকে আফসার সাহেবের এই টেকনিক আবার নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক উপায়ে গরুর ওজন মাপার টেকনিক কিনা সেটা জানার জন্য আশপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। এতে আফসার সাহেব আরও বিরক্ত হলেন। কিছু পাবলিক কোনো গরুর পেছনে একটু বেশি পরিমাণে গোবর দেখলেও ভিড় করে! আর সেখানে আফসার সাহেব গরুর এক পা থেকে অন্য পায়ের দূরত্ব মাপছেন ভিড় তো হবেই।

তার কা- দেখে এক বেপারি বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘স্যার, আপনের মাপন লাগব না, আমরা স্কেলে মাইপ্পা দিমু কত ওজন হয়। আপনি গজ ফিতা রাইখা এবার দরদাম করেন।’

আফসার সাহেব বললেন, ‘দরদাম পরে হবে, আমি চাই এমন গরু, যার এক পা, অন্য পা থেকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্বে থাকবে!’

‘স্যার, কিছু মনে কইরেন না, আপনি গরু কিনবেন না গরুর পা কিনবেন? এত পা পা করলে কসাই’র কাছ থেকে গিয়া শুধু গরুর পায়া কিনেন গা, আমাগো জ্বলাইয়েন না! পা মাইপ্পা গরু কিনতে এই পয়লা দেখলাম।’

আফসার সাহেবের কথা শুনে আশপাশের ইউটিউবার, টিকটকারদের আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। এখন তারা উট-গরু রেখে আফসার সাহেবের পিছু নিল। একজন আবার সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুক লাইভে চলে গেল। বলল, ‘এইমাত্র আমরা দেখতে পেলাম জনৈক আফসার সাহেবকে, যিনি শুধু গরুর পায়ের দূরত্ব মেপে গরুর ভুঁড়ি, কলিজা, গিলা ছাড়া মাংসের ওজন মাপতে পারেন! এই টেকনিক সম্বন্ধে আমরা একটু পর বিস্তারিত আরও জানব, দর্শক আমার সঙ্গেই থাকুন!’

এবার আফসার সাহেব প্রত্যাশার কাছাকাছি একটি গরু পেয়ে গেলেন। আফসার সাহেবকে গরুর বেপারির সঙ্গে দরদাম করতে দেখে এবার সব ইউটিউবার, টিকটকার চলে এলো। একজন জিজ্ঞেস করল, ‘এই গরুর ওজন কত হবে আপনি এখন বলে দিন, আমরা কুরবানির দিন আপনার বাসায় গিয়ে বাকিটা মিলিয়ে নেব।’

‘গরুর পা মেপে কি গরুর ওজন মাপা যায়? সেটার জন্য তো আলাদা সূত্র আছে।’

এবার সবাই সমস্বরে বলল, ‘তাহলে আপনি পা মাপছিলেন কেন?’

‘যাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা যায়। আমরা দুইজন মাত্র কসাই ভাড়া করি, সঙ্গে আমি আর আমার ছেলেও কাজ করি। তাই গরুর চামড়া ছাড়াবার সময় যাতে কসাইর কাছ থেকে অন্তত তিন ফুট দূরে থাকা যায়, তাই গরুর এক পা থেকে অন্য পায়ের দূরত্ব মাপছিলাম। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে না!’

উত্তর শুনে অনেকেই হতাশ হলেন। তারা ভেবেছিলেন গরুর ওজন মাপার নতুন কোনো কৌশল। আবার একপক্ষ খুশি হলো, স্বাস্থ্যবিধি মানার নতুন এক কৌশল পাওয়া গেল! কিন্তু যে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে কথা হচ্ছিল ইউটিউবাররা সেটাই নষ্ট করছিল। আফসার সাহেবকে প্রায় ঘিরে ফেলল।

আফসার সাহেব বললেন, ‘আপনারা তো সোশ্যাল মিডিয়ার লোক। অনেক খোঁজ রাখেন। দু’তিন দিন আগে যে আলোচিত এক লোকাল লিডার স্বাস্থ্যবিধি মেনে তার এলাকায় ঈদের শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করেছিলেন সেই ভাইরাল ভিডিও দেখেছেন?’

প্রায় সবাই বললেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই!’

‘তাহলে আমাকে ঠিকমতো গরু কিনতে দিন আর আমার কাছ থেকে দূরে থাকুন।’ কথা পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই আফসার সাহেবের চারদিক পুরোপুরি খালি হয়ে গেল! আফসার সাহেব বুঝতে পারেন না, পৃথিবীজুড়ে যে একটা মহামারি চলছে তা নিয়ে কিছু লোকের কোনো চিন্তাই নাই! প্রয়োজন ছাড়াই ভিড় করছেন সর্বত্র! কী আশ্চর্য!

রম্যগল্প

আফসার সাহেবের গরু কেনা

 মো. রায়হান কবির 
১৮ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কুরবানির জন্য গরু কিনতে গিয়ে ঝামেলায় পড়ে গেলেন আফসার সাহেব। স্ত্রীকে বলে এসেছেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে গরু কিনবেন। তবে হাটে এসে বুঝতে পারলেন ইচ্ছা থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কঠিন। কেননা নিজেকে নিয়ন্ত্রণের অধিকার সবারই আছে, কিন্তু অন্যকে তো আর নিয়ন্ত্রণ করা যায় না?

আগে গরুর হাটে দুই শ্রেণির লোক আসতেন-ক্রেতা এবং দর্শক। আর এখন? কেউ আসে গরুর সঙ্গে সেলফি তুলতে, কেউ টিকটক ভিডিও কিংবা ইউটিউবের জন্য কনটেন্ট বানাতে। তাতে যদি কেউ নিজ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে চায়ও, তা সম্ভব হয় না। তারপরও আফসার সাহেব যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে গরু দেখছিলেন। কিন্তু সমস্যা ওই এক জায়গাতেই, আফসার সাহেব মনমতো গরু পাচ্ছিলেন না। গজ ফিতা এনে গরুর এক পা থেকে অন্য পায়ের দূরত্ব মাপছিলেন, কিন্তু কোনো গরুই আফসার সাহেবের মনমতো হচ্ছিল না।

অনেকে আফসার সাহেবের এই টেকনিক আবার নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক উপায়ে গরুর ওজন মাপার টেকনিক কিনা সেটা জানার জন্য আশপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। এতে আফসার সাহেব আরও বিরক্ত হলেন। কিছু পাবলিক কোনো গরুর পেছনে একটু বেশি পরিমাণে গোবর দেখলেও ভিড় করে! আর সেখানে আফসার সাহেব গরুর এক পা থেকে অন্য পায়ের দূরত্ব মাপছেন ভিড় তো হবেই।

তার কা- দেখে এক বেপারি বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘স্যার, আপনের মাপন লাগব না, আমরা স্কেলে মাইপ্পা দিমু কত ওজন হয়। আপনি গজ ফিতা রাইখা এবার দরদাম করেন।’

আফসার সাহেব বললেন, ‘দরদাম পরে হবে, আমি চাই এমন গরু, যার এক পা, অন্য পা থেকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্বে থাকবে!’

‘স্যার, কিছু মনে কইরেন না, আপনি গরু কিনবেন না গরুর পা কিনবেন? এত পা পা করলে কসাই’র কাছ থেকে গিয়া শুধু গরুর পায়া কিনেন গা, আমাগো জ্বলাইয়েন না! পা মাইপ্পা গরু কিনতে এই পয়লা দেখলাম।’

আফসার সাহেবের কথা শুনে আশপাশের ইউটিউবার, টিকটকারদের আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। এখন তারা উট-গরু রেখে আফসার সাহেবের পিছু নিল। একজন আবার সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুক লাইভে চলে গেল। বলল, ‘এইমাত্র আমরা দেখতে পেলাম জনৈক আফসার সাহেবকে, যিনি শুধু গরুর পায়ের দূরত্ব মেপে গরুর ভুঁড়ি, কলিজা, গিলা ছাড়া মাংসের ওজন মাপতে পারেন! এই টেকনিক সম্বন্ধে আমরা একটু পর বিস্তারিত আরও জানব, দর্শক আমার সঙ্গেই থাকুন!’

এবার আফসার সাহেব প্রত্যাশার কাছাকাছি একটি গরু পেয়ে গেলেন। আফসার সাহেবকে গরুর বেপারির সঙ্গে দরদাম করতে দেখে এবার সব ইউটিউবার, টিকটকার চলে এলো। একজন জিজ্ঞেস করল, ‘এই গরুর ওজন কত হবে আপনি এখন বলে দিন, আমরা কুরবানির দিন আপনার বাসায় গিয়ে বাকিটা মিলিয়ে নেব।’

‘গরুর পা মেপে কি গরুর ওজন মাপা যায়? সেটার জন্য তো আলাদা সূত্র আছে।’

এবার সবাই সমস্বরে বলল, ‘তাহলে আপনি পা মাপছিলেন কেন?’

‘যাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা যায়। আমরা দুইজন মাত্র কসাই ভাড়া করি, সঙ্গে আমি আর আমার ছেলেও কাজ করি। তাই গরুর চামড়া ছাড়াবার সময় যাতে কসাইর কাছ থেকে অন্তত তিন ফুট দূরে থাকা যায়, তাই গরুর এক পা থেকে অন্য পায়ের দূরত্ব মাপছিলাম। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে না!’

উত্তর শুনে অনেকেই হতাশ হলেন। তারা ভেবেছিলেন গরুর ওজন মাপার নতুন কোনো কৌশল। আবার একপক্ষ খুশি হলো, স্বাস্থ্যবিধি মানার নতুন এক কৌশল পাওয়া গেল! কিন্তু যে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে কথা হচ্ছিল ইউটিউবাররা সেটাই নষ্ট করছিল। আফসার সাহেবকে প্রায় ঘিরে ফেলল।

আফসার সাহেব বললেন, ‘আপনারা তো সোশ্যাল মিডিয়ার লোক। অনেক খোঁজ রাখেন। দু’তিন দিন আগে যে আলোচিত এক লোকাল লিডার স্বাস্থ্যবিধি মেনে তার এলাকায় ঈদের শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করেছিলেন সেই ভাইরাল ভিডিও দেখেছেন?’

প্রায় সবাই বললেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই!’

‘তাহলে আমাকে ঠিকমতো গরু কিনতে দিন আর আমার কাছ থেকে দূরে থাকুন।’ কথা পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই আফসার সাহেবের চারদিক পুরোপুরি খালি হয়ে গেল! আফসার সাহেব বুঝতে পারেন না, পৃথিবীজুড়ে যে একটা মহামারি চলছে তা নিয়ে কিছু লোকের কোনো চিন্তাই নাই! প্রয়োজন ছাড়াই ভিড় করছেন সর্বত্র! কী আশ্চর্য!

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন