গরুর হাটে গুপ্তদা
jugantor
রম্যগল্প
গরুর হাটে গুপ্তদা

  সাইফুল ইসলাম জুয়েল  

১৮ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘পকেট সাবধান!’ গরুর হাটে ঢোকার সময় ভিড়ের মাঝে কে যেন কথাটা বলে উঠল। গুপ্তদা ইতিউতি তাকিয়ে মুচকি হেসে সামনে পা বাড়ালেন। পেছনে আমরা চারজন তার সেই বিকট দর্শন যন্ত্রটা টেনে বেড়াচ্ছি।

ভেতরে ঢোকার পর হিটলু জানতে চাইল, ‘গুপ্তদা, তখন ওভাবে মুচকি মুচকি হাসছিলে যে...!’

গুপ্তদা স্মিত হেসে বললেন, ‘পকেটমার বলছে পকেট সাবধান। কিন্তু ও বেটা জানে না, আজ গরুর হাটে কে প্রবেশ করেছে। এখন ওরই বরং সাবধান হওয়াটা বেশি জরুরি।’

‘কেন গুপ্তদা?’ রবার্টের প্রশ্ন। প্রত্যুত্তরে গুপ্তদা কিছু না বলে উলটো তাড়া দেখিয়ে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি মেশিনটাকে সামনে নিয়ে চল, লেট হয়ে যাচ্ছে।’

প্রথমে গুপ্তদা কয়েকটা ছাগল পছন্দ করলেন। তারপর সেগুলোকে ওয়েট মেশিনের ওপর চড়ালেন।

‘গুপ্তদা, তুমি কিন্তু গরু কিনতে এসেছ!’ মনে করিয়ে দিল বল্টু।

গুপ্তদা আস্তে করে বললেন, ‘দেখে নিলাম, মেশিনটা ঠিকঠাক কাজ করছে নাকি বেশি ওজন দিচ্ছে। তাহলে যে লসে পড়ে যাব।’

এরপর গুপ্তদা বেশ বেছে-টেছে একটা গরু পছন্দ করলেন। অনেক কষ্টে গরুটাকে মেশিনের ওপর ওঠানোর পর গুপ্তদা মোবাইলের ক্যালকুলেটরে কী-কী সব হিসাব করে, পকেট থেকে টাকা বের করে, বারবার গুনে গরু বিক্রেতার হাতে সেগুলো গুঁজে দিলেন।

বিক্রেতা অবাক, ‘আমি তো দামই বললাম না। টাকা দিচ্ছেন কোন হিসাবে?’

‘হিসাব তো সহজই। প্রথমে গরুর ওজন মাপলাম। তারপর বাজারে গরুর কেজি দর অনুযায়ী আস্ত গরুটার দাম নির্ণয় করলাম...।’

‘হি হি...ভাইজান মনে হয় জীবনে প্রথমবার কুরবানির গরু কিনতে আইছেন।’

‘হ্যাঁ। কিন্তু তাতে সমস্যাটা কী?’

গরুর বিক্রেতা অমায়িক। বললেন, ‘ভাইজানরে দুইখান খাস কথা কই। প্রথমত, কেজি অনুযায়ী গরুর মাপ কিন্তুক আমরাই দিই। আমাদের মাপ আর আপনাগোর মাপ কখনো এক হইব না। আর কুরবানির গরুর দাম একটু বেশিই হয়।’

‘তাহলে আপনিই গরুটার ওজন মাপুন। আর বলুন- আপনাদের এই বাড়তি দর কত?’

‘গরুর হাটে পাল্লা নিয়া আসি নাই। আর, খাশ কথা হইল- আমি গরু ওজনে মাইপা বেচুম না।’

কী আর করা, গুপ্তদা ‘অমায়িক’ গরু বিক্রেতাকে রেখে আরেকজনের কাছে গেলেন। সে তার গরু ওজনে বিক্রি করতে এক পায়ে খাড়া! লক্ষ করলাম- একমাত্র তার গরুগুলোরই মুখ খোলা। অন্যসব গরুর মুখে ঠুঁই (স্থানভেদে গুমাই/ঠুশি/গোমাই/ টোনা/কাইর/কাফাইয়া ইত্যাদি নাম এর) লাগানো, যাতে না খেতে পারে। গরুর হাটে আনার আগে বিক্রেতা তার গরুগুলোকে ভরপেট খাইয়েছে। সেই ভোজনপর্ব এখনো অব্যাহত আছে।

গুপ্তদা বিক্রেতার বাড়তি দরেই রাজি হলেন। কিন্তু এবার মুশকিল বাধল গরুটাকে ওয়েট মেশিনে তোলা নিয়ে। কোনোভাবেই সে ওটার ওপর চড়বে না। হয়তো পেট ফাটিয়ে খেয়ে এখন তার কষ্ট করতে মন চাইছে না। জাবর কাটতে পারলে ভালো হতো!

গুপ্তদা গরুটাকে ওয়েট মেশিনের ওপর চড়াতে গিয়ে একটু বেশিই জোরাজুরি করলেন। যার ফলস্বরূপ গরুটা গেল ক্ষেপে। গরুর এক গুঁতোয় গুপ্তদা গেলেন উড়ে! স্বয়ং তারই জায়গা হলো ওয়েট মেশিনের ওপর!

এতক্ষণ আশপাশে দাঁড়িয়ে অনেকেই গুপ্তদার কর্মকা- দেখছিলেন। কে যেন হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘এই গরুটার কত দাম হলো?’

রবার্ট মেশিনে গুপ্তদার ওজন দেখে নিয়ে মোবাইলের ক্যালকুলেটরে হিসাব করে বলল, ‘পাক্কা ছাপ্পান্ন হাজার টাকা।’

হঠাৎ গরুর হাটে চাঞ্চল্য। কে যেন বললেন, ‘সাবধান, মোবাইল কোর্ট এসেছে। মাস্ক পরা না পেলে জায়গা হবে সোজা চৌদ্দ শিকের আন্দার (ভেতর)।’

গুপ্তদা ততক্ষণে ওয়েট মেশিন থেকে নেমে পড়েছেন। আমাদের কানের কাছে বিড়বিড় করে বললেন, ‘এক্সট্রা মাস্ক আছে? আমারটা গরুর গুঁতোয় ছিঁড়ে গেছে রে।’

আমরা ‘না’ বলাতে গুপ্তদা করুণ মুখে এদিক-ওদিকে তাকাতে লাগলেন। ততক্ষণে মোবাইল কোর্ট আমাদের সামনে এসে হাজির।

তারা একজন পকেটমারকে পাকড়াও করেছে। যে কিনা পকেটমার কাম জাল টাকার কারবারি। কিন্তু গুপ্তদা কোথায়?

একটু পর গুপ্তদার দেখা মিলল। গরুর মুখ থেকে মাস্ক (পরুন- ঠুঁই) খুলে নিয়ে সেটা নিজের মুখে চাপিয়ে কতগুলো গরুর মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি!

ম্যাজিস্ট্রেট মহাশয় রসিক মানুষ। তিনি গরু বিক্রেতার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই গরুটাকে আবার বিক্রি করে দেবেন না যেন! একে জাদুঘরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে!’ বলতে বলতে নিজের হাতে রাখা মাস্কের বক্স থেকে একটা মাস্ক বের করে, বন্ধুসুলভ হাসি হেসে গুপ্তদার দিকে মাস্কটা বাড়িয়ে ধরলেন তিনি।

রম্যগল্প

গরুর হাটে গুপ্তদা

 সাইফুল ইসলাম জুয়েল 
১৮ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘পকেট সাবধান!’ গরুর হাটে ঢোকার সময় ভিড়ের মাঝে কে যেন কথাটা বলে উঠল। গুপ্তদা ইতিউতি তাকিয়ে মুচকি হেসে সামনে পা বাড়ালেন। পেছনে আমরা চারজন তার সেই বিকট দর্শন যন্ত্রটা টেনে বেড়াচ্ছি।

ভেতরে ঢোকার পর হিটলু জানতে চাইল, ‘গুপ্তদা, তখন ওভাবে মুচকি মুচকি হাসছিলে যে...!’

গুপ্তদা স্মিত হেসে বললেন, ‘পকেটমার বলছে পকেট সাবধান। কিন্তু ও বেটা জানে না, আজ গরুর হাটে কে প্রবেশ করেছে। এখন ওরই বরং সাবধান হওয়াটা বেশি জরুরি।’

‘কেন গুপ্তদা?’ রবার্টের প্রশ্ন। প্রত্যুত্তরে গুপ্তদা কিছু না বলে উলটো তাড়া দেখিয়ে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি মেশিনটাকে সামনে নিয়ে চল, লেট হয়ে যাচ্ছে।’

প্রথমে গুপ্তদা কয়েকটা ছাগল পছন্দ করলেন। তারপর সেগুলোকে ওয়েট মেশিনের ওপর চড়ালেন।

‘গুপ্তদা, তুমি কিন্তু গরু কিনতে এসেছ!’ মনে করিয়ে দিল বল্টু।

গুপ্তদা আস্তে করে বললেন, ‘দেখে নিলাম, মেশিনটা ঠিকঠাক কাজ করছে নাকি বেশি ওজন দিচ্ছে। তাহলে যে লসে পড়ে যাব।’

এরপর গুপ্তদা বেশ বেছে-টেছে একটা গরু পছন্দ করলেন। অনেক কষ্টে গরুটাকে মেশিনের ওপর ওঠানোর পর গুপ্তদা মোবাইলের ক্যালকুলেটরে কী-কী সব হিসাব করে, পকেট থেকে টাকা বের করে, বারবার গুনে গরু বিক্রেতার হাতে সেগুলো গুঁজে দিলেন।

বিক্রেতা অবাক, ‘আমি তো দামই বললাম না। টাকা দিচ্ছেন কোন হিসাবে?’

‘হিসাব তো সহজই। প্রথমে গরুর ওজন মাপলাম। তারপর বাজারে গরুর কেজি দর অনুযায়ী আস্ত গরুটার দাম নির্ণয় করলাম...।’

‘হি হি...ভাইজান মনে হয় জীবনে প্রথমবার কুরবানির গরু কিনতে আইছেন।’

‘হ্যাঁ। কিন্তু তাতে সমস্যাটা কী?’

গরুর বিক্রেতা অমায়িক। বললেন, ‘ভাইজানরে দুইখান খাস কথা কই। প্রথমত, কেজি অনুযায়ী গরুর মাপ কিন্তুক আমরাই দিই। আমাদের মাপ আর আপনাগোর মাপ কখনো এক হইব না। আর কুরবানির গরুর দাম একটু বেশিই হয়।’

‘তাহলে আপনিই গরুটার ওজন মাপুন। আর বলুন- আপনাদের এই বাড়তি দর কত?’

‘গরুর হাটে পাল্লা নিয়া আসি নাই। আর, খাশ কথা হইল- আমি গরু ওজনে মাইপা বেচুম না।’

কী আর করা, গুপ্তদা ‘অমায়িক’ গরু বিক্রেতাকে রেখে আরেকজনের কাছে গেলেন। সে তার গরু ওজনে বিক্রি করতে এক পায়ে খাড়া! লক্ষ করলাম- একমাত্র তার গরুগুলোরই মুখ খোলা। অন্যসব গরুর মুখে ঠুঁই (স্থানভেদে গুমাই/ঠুশি/গোমাই/ টোনা/কাইর/কাফাইয়া ইত্যাদি নাম এর) লাগানো, যাতে না খেতে পারে। গরুর হাটে আনার আগে বিক্রেতা তার গরুগুলোকে ভরপেট খাইয়েছে। সেই ভোজনপর্ব এখনো অব্যাহত আছে।

গুপ্তদা বিক্রেতার বাড়তি দরেই রাজি হলেন। কিন্তু এবার মুশকিল বাধল গরুটাকে ওয়েট মেশিনে তোলা নিয়ে। কোনোভাবেই সে ওটার ওপর চড়বে না। হয়তো পেট ফাটিয়ে খেয়ে এখন তার কষ্ট করতে মন চাইছে না। জাবর কাটতে পারলে ভালো হতো!

গুপ্তদা গরুটাকে ওয়েট মেশিনের ওপর চড়াতে গিয়ে একটু বেশিই জোরাজুরি করলেন। যার ফলস্বরূপ গরুটা গেল ক্ষেপে। গরুর এক গুঁতোয় গুপ্তদা গেলেন উড়ে! স্বয়ং তারই জায়গা হলো ওয়েট মেশিনের ওপর!

এতক্ষণ আশপাশে দাঁড়িয়ে অনেকেই গুপ্তদার কর্মকা- দেখছিলেন। কে যেন হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘এই গরুটার কত দাম হলো?’

রবার্ট মেশিনে গুপ্তদার ওজন দেখে নিয়ে মোবাইলের ক্যালকুলেটরে হিসাব করে বলল, ‘পাক্কা ছাপ্পান্ন হাজার টাকা।’

হঠাৎ গরুর হাটে চাঞ্চল্য। কে যেন বললেন, ‘সাবধান, মোবাইল কোর্ট এসেছে। মাস্ক পরা না পেলে জায়গা হবে সোজা চৌদ্দ শিকের আন্দার (ভেতর)।’

গুপ্তদা ততক্ষণে ওয়েট মেশিন থেকে নেমে পড়েছেন। আমাদের কানের কাছে বিড়বিড় করে বললেন, ‘এক্সট্রা মাস্ক আছে? আমারটা গরুর গুঁতোয় ছিঁড়ে গেছে রে।’

আমরা ‘না’ বলাতে গুপ্তদা করুণ মুখে এদিক-ওদিকে তাকাতে লাগলেন। ততক্ষণে মোবাইল কোর্ট আমাদের সামনে এসে হাজির।

তারা একজন পকেটমারকে পাকড়াও করেছে। যে কিনা পকেটমার কাম জাল টাকার কারবারি। কিন্তু গুপ্তদা কোথায়?

একটু পর গুপ্তদার দেখা মিলল। গরুর মুখ থেকে মাস্ক (পরুন- ঠুঁই) খুলে নিয়ে সেটা নিজের মুখে চাপিয়ে কতগুলো গরুর মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি!

ম্যাজিস্ট্রেট মহাশয় রসিক মানুষ। তিনি গরু বিক্রেতার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই গরুটাকে আবার বিক্রি করে দেবেন না যেন! একে জাদুঘরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে!’ বলতে বলতে নিজের হাতে রাখা মাস্কের বক্স থেকে একটা মাস্ক বের করে, বন্ধুসুলভ হাসি হেসে গুপ্তদার দিকে মাস্কটা বাড়িয়ে ধরলেন তিনি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন