শান্তি বাবুর সমস্যা
jugantor
রম্যগল্প
শান্তি বাবুর সমস্যা

  সত্যজিৎ বিশ্বাস  

২৫ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘কাজের মধ্যে দুই, খাই আর শুই, অকর্মার ধাড়ি একটা! তুমি যাবে, নাকি আমিই গিয়ে নিয়ে আসব?’ গীতা দেবীর এই ঝাড়ি খাওয়ার পর বিকেলে আর চা-নাস্তা খাওয়া লাগে না। ঝাড়িতেই পেট ভরে যায়। সপ্তাহের একমাত্র ছুটির দিনে শান্তি বাবু ভাতঘুমের হাই তুলতে তুলতে হনহন করে হাঁটা শুরু করলেন বাজারের দিকে।

বাজারে পৌঁছেই পুষে রাখা রাগ নিয়ে ফুঁসে উঠলেন মুদিদোকানদারের ওপর। কষে এক ঝাড়ি মেরে বললেন, ‘দে ব্যাটা তাড়াতাড়ি।’

দোকানদার অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী দেব দাদা?’

প্রশ্ন শুনে শান্তি বাবু মাথা চুলকাতে শুরু করলেন। তাই তো, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তো গিন্নিকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি কীসের জন্য বাজারে পাঠাল এই অবেলায়?

মাসের মধ্যে তিন-চারটা দিন থাকে অহেতুক ঝাড়ি খাবার দিন। এ মাসে চারদিন খাওয়া হয়ে যাওয়ায় সেই কোটা ফিলআপ হয়ে গেছে বলেই ভেবেছিলেন শান্তি রঞ্জন। এখন তো মনে হচ্ছে এ মাসটা লিপ ইয়ার মাস। লিপ ইয়ার মাসের ব্যাপারটা বড় অদ্ভুত! সময়ের হিসাবে বেখেয়ালি থাকার জন্য চার বছরে লিপ ইয়ারে একদিন বাড়ে। আর বউয়ের সঙ্গে লিপ ইয়ারে মানে ঠোঁটে-কানে বেখেয়ালি থাকলে মাসে কয়দিন যে ঝাড়ি খাবার দিন বাড়ে তার ঠিক ঠিকানা নেই।

সেজন্য অন্তত বউয়ের ঠোঁট নাড়ার সময় কান থাকতে হয় খুবই সজাগ। না থাকলে কী হয় সেটা এখন বয়সের ভারে হাঁপাতে হাঁপাতে হাঁটু কাঁপাতে কাঁপাতে টের পাচ্ছেন শান্তি বাবু। আসার আগে গিন্নি ঠিক কী আনতে বলেছিলেন, অজস্রবার মাথা চুলকিয়েও মনে করতে পারলেন না।

করোনা ইফেক্ট কিনা কে জানে! ইদানীং আর আগের মতো বউয়ের কথা মাথায় কিংবা কানে কোথাও ঢুকছে না। সাইড কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে। এ কথা কাউকে বলা যায়? বলা বাদ দিয়ে তাই একাগ্রচিত্তে ভাবতে বসলেন। গত পরশুই বাজারের লিস্টির প্রতিটা আইটেমে দাগ দিয়ে দিয়ে এক সপ্তাহের বাজার করে এনেছেন। এর মধ্যে আবার অতি জরুরি কী দরকার পড়ল কে জানে?

মাথা চুলকানোতে একেবারেই যে কিছু লাভ হয়নি তা না। শান্তি বাবু হাতের দিকে তাকালেন। প্রায় ফাঁকা মাথাকে আরও ফাঁকা করে আঙুলে চলে এসেছে গোটা কয়েক চুল, আর দুটো উপায়। বাকি সব ঝেড়ে ফেলে উপায় দুটো নিয়ে এবার ভাবতে শুরু করলেন।

উপায় নম্বর এক-সোজা ঘরে ফিরে বউয়ের কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়ে বাজারে কী লাগবে আবার জানতে চাওয়া। কিন্তু তাতে অমনোযোগী শ্রোতা হওয়ার কারণে ঝড়ো হাওয়াসহ মুহুর্মুহু যে ঝাড়ি বর্ষণ হবে, শান্তি বাবু তাতে স্পষ্ট অশান্তির ছায়া দেখতে পেলেন।

উপায় নম্বর দুই-গত দু’তিন ডাইনিং টেবিলে যা উঠে আসেনি অর্থাৎ বউয়ের অতি পছন্দের ছোটমাছ বাজার থেকে কিনে আনা। নিজে দুই নম্বর না হলেও এ সমস্যা উত্তরণে দুই নম্বুরি উপায়টাই পছন্দ হলো বেশি।

কাঁচাবাজার পার হয়ে মাছবাজারে ঢুকলেন শান্তি বাবু। গতকাল খেতে বসে গিন্নি কী আকুতিই না করেছিলেন ছোটমাছের জন্য। আজ ছোটমাছ নিয়ে গেলে নিশ্চয়ই খুশির চোটে কী আনতে পাঠিয়েছিলেন ভুলেই যাবেন। ভুলে না গেলেও মাছ কেনার পর আর টাকা ছিল না বলে কাটিয়েও দেওয়া যাবে। দাম একটু বেশি হলেও তাই এক কেজি কাচকি মাছ কিনে বাজি জেতা পাক্কা জুয়াড়ির হাসি হেসে বাসার দিকে রওনা দিলেন।

বাসায় ঢোকা মাত্রই তেড়ে আসলেন গিন্নি, ‘কী ব্যাপার, এক ঘণ্টার জন্য কোথায় উধাও হলে? সত্যি করে বলো তো গিয়েছিলে কোথায়? ছাদেও তো যাওনি।’

‘ছাদে! ছাদে যাব কেন? তুমি না বাজারে যেতে বললে?’ অবাক হয়ে কাউন্টার এটাকে চলে গেলেন শান্তি বাবু, ‘তুমি বলোনি, তুমি যাবে, নাকি আমিই গিয়ে নিয়ে আসব?’

চোখ দুটো সরু করে স্ক্যানিং শুরু করে দিলেন গিন্নি, ‘তোমাকে কখন বললাম বাজারে যেতে? বলেছিলাম, কাপড় আনতে ছাদে তুমি যাবে, নাকি আমিই গিয়ে নিয়ে আসব? সত্যি করে বলো তো, সমস্যাটা কী তোমার?’

এমনিতে চারদিকে কত হাজার হাজার সমস্যা কিলবিল করে। অথচ এই জরুরি সময়ে আকাশ, পাতাল খুঁজেও শান্তি বাবু কোনো মোক্ষম সমস্যা খুঁজে পেলেন না!

রম্যগল্প

শান্তি বাবুর সমস্যা

 সত্যজিৎ বিশ্বাস 
২৫ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘কাজের মধ্যে দুই, খাই আর শুই, অকর্মার ধাড়ি একটা! তুমি যাবে, নাকি আমিই গিয়ে নিয়ে আসব?’ গীতা দেবীর এই ঝাড়ি খাওয়ার পর বিকেলে আর চা-নাস্তা খাওয়া লাগে না। ঝাড়িতেই পেট ভরে যায়। সপ্তাহের একমাত্র ছুটির দিনে শান্তি বাবু ভাতঘুমের হাই তুলতে তুলতে হনহন করে হাঁটা শুরু করলেন বাজারের দিকে।

বাজারে পৌঁছেই পুষে রাখা রাগ নিয়ে ফুঁসে উঠলেন মুদিদোকানদারের ওপর। কষে এক ঝাড়ি মেরে বললেন, ‘দে ব্যাটা তাড়াতাড়ি।’

দোকানদার অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী দেব দাদা?’

প্রশ্ন শুনে শান্তি বাবু মাথা চুলকাতে শুরু করলেন। তাই তো, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তো গিন্নিকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি কীসের জন্য বাজারে পাঠাল এই অবেলায়?

মাসের মধ্যে তিন-চারটা দিন থাকে অহেতুক ঝাড়ি খাবার দিন। এ মাসে চারদিন খাওয়া হয়ে যাওয়ায় সেই কোটা ফিলআপ হয়ে গেছে বলেই ভেবেছিলেন শান্তি রঞ্জন। এখন তো মনে হচ্ছে এ মাসটা লিপ ইয়ার মাস। লিপ ইয়ার মাসের ব্যাপারটা বড় অদ্ভুত! সময়ের হিসাবে বেখেয়ালি থাকার জন্য চার বছরে লিপ ইয়ারে একদিন বাড়ে। আর বউয়ের সঙ্গে লিপ ইয়ারে মানে ঠোঁটে-কানে বেখেয়ালি থাকলে মাসে কয়দিন যে ঝাড়ি খাবার দিন বাড়ে তার ঠিক ঠিকানা নেই।

সেজন্য অন্তত বউয়ের ঠোঁট নাড়ার সময় কান থাকতে হয় খুবই সজাগ। না থাকলে কী হয় সেটা এখন বয়সের ভারে হাঁপাতে হাঁপাতে হাঁটু কাঁপাতে কাঁপাতে টের পাচ্ছেন শান্তি বাবু। আসার আগে গিন্নি ঠিক কী আনতে বলেছিলেন, অজস্রবার মাথা চুলকিয়েও মনে করতে পারলেন না।

করোনা ইফেক্ট কিনা কে জানে! ইদানীং আর আগের মতো বউয়ের কথা মাথায় কিংবা কানে কোথাও ঢুকছে না। সাইড কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে। এ কথা কাউকে বলা যায়? বলা বাদ দিয়ে তাই একাগ্রচিত্তে ভাবতে বসলেন। গত পরশুই বাজারের লিস্টির প্রতিটা আইটেমে দাগ দিয়ে দিয়ে এক সপ্তাহের বাজার করে এনেছেন। এর মধ্যে আবার অতি জরুরি কী দরকার পড়ল কে জানে?

মাথা চুলকানোতে একেবারেই যে কিছু লাভ হয়নি তা না। শান্তি বাবু হাতের দিকে তাকালেন। প্রায় ফাঁকা মাথাকে আরও ফাঁকা করে আঙুলে চলে এসেছে গোটা কয়েক চুল, আর দুটো উপায়। বাকি সব ঝেড়ে ফেলে উপায় দুটো নিয়ে এবার ভাবতে শুরু করলেন।

উপায় নম্বর এক-সোজা ঘরে ফিরে বউয়ের কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়ে বাজারে কী লাগবে আবার জানতে চাওয়া। কিন্তু তাতে অমনোযোগী শ্রোতা হওয়ার কারণে ঝড়ো হাওয়াসহ মুহুর্মুহু যে ঝাড়ি বর্ষণ হবে, শান্তি বাবু তাতে স্পষ্ট অশান্তির ছায়া দেখতে পেলেন।

উপায় নম্বর দুই-গত দু’তিন ডাইনিং টেবিলে যা উঠে আসেনি অর্থাৎ বউয়ের অতি পছন্দের ছোটমাছ বাজার থেকে কিনে আনা। নিজে দুই নম্বর না হলেও এ সমস্যা উত্তরণে দুই নম্বুরি উপায়টাই পছন্দ হলো বেশি।

কাঁচাবাজার পার হয়ে মাছবাজারে ঢুকলেন শান্তি বাবু। গতকাল খেতে বসে গিন্নি কী আকুতিই না করেছিলেন ছোটমাছের জন্য। আজ ছোটমাছ নিয়ে গেলে নিশ্চয়ই খুশির চোটে কী আনতে পাঠিয়েছিলেন ভুলেই যাবেন। ভুলে না গেলেও মাছ কেনার পর আর টাকা ছিল না বলে কাটিয়েও দেওয়া যাবে। দাম একটু বেশি হলেও তাই এক কেজি কাচকি মাছ কিনে বাজি জেতা পাক্কা জুয়াড়ির হাসি হেসে বাসার দিকে রওনা দিলেন।

বাসায় ঢোকা মাত্রই তেড়ে আসলেন গিন্নি, ‘কী ব্যাপার, এক ঘণ্টার জন্য কোথায় উধাও হলে? সত্যি করে বলো তো গিয়েছিলে কোথায়? ছাদেও তো যাওনি।’

‘ছাদে! ছাদে যাব কেন? তুমি না বাজারে যেতে বললে?’ অবাক হয়ে কাউন্টার এটাকে চলে গেলেন শান্তি বাবু, ‘তুমি বলোনি, তুমি যাবে, নাকি আমিই গিয়ে নিয়ে আসব?’

চোখ দুটো সরু করে স্ক্যানিং শুরু করে দিলেন গিন্নি, ‘তোমাকে কখন বললাম বাজারে যেতে? বলেছিলাম, কাপড় আনতে ছাদে তুমি যাবে, নাকি আমিই গিয়ে নিয়ে আসব? সত্যি করে বলো তো, সমস্যাটা কী তোমার?’

এমনিতে চারদিকে কত হাজার হাজার সমস্যা কিলবিল করে। অথচ এই জরুরি সময়ে আকাশ, পাতাল খুঁজেও শান্তি বাবু কোনো মোক্ষম সমস্যা খুঁজে পেলেন না!

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন