যানজটে যান তবে সবে...
jugantor
যানজটে যান তবে সবে...

  শফিক হাসান  

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অল্পতেই মাথায় জট লেগে যায় রাজীব হাসানের। লাগে সহজে, খোলে না কিছুতেই! ভেতরের সূক্ষ্ম ও মোটা তারগুলো উপর্যুপরি পেঁচিয়ে যেতে থাকলে অপ্রকৃতস্থের মতো আচরণ করে। যেমন এখন হলো।

এক ঘণ্টা সাড়ে একুশ মিনিট বসে থাকার পরও লোকাল বাসটি এগোল না এক ইঞ্চি। কিছুদিন থেকেই যানজট বেড়েছে। কয়েক মাস আগেও পরিস্থিতি এতটা অসহনীয় ছিল না। তিন ঘণ্টায় অনায়াসে এক কিলোমিটার পথ পেরোনো যাবে-অলিখিত নিশ্চয়তা ছিল। ভবিষ্যৎ-চিত্র চিন্তা করেই হয়তো দূরদর্শী বাউল শাহ আবদুল করিম গীত রচনা করেছিলেন-আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম...।

চান্দিতে অদ্ভুতুড়ে নাচন অনুভূত হতে থাকলে রাজীব হাঁক দেয়-‘ওই কন্ডাক্টর, এইডা বাস চালাস নাকি শালা-দুলাভাই মশকরা করস?’

গায়ে হাওয়া লাগাতে রাস্তায় নামা কন্ডাক্টর জবাব দিল-‘গাড়ি চালায় ওস্তাদে; আমি ভাড়া তুলি।’

‘তোর বাসের শিকড় গজায়া গেছে, ভাড়া তোলস ক্যান! সবার টাকা ফেরত দে, নাইমা যাক।’

‘শিকড়-বাকড়ে পানি দিতে অয়। এর লাইগ্যা টাকা লাগে। মিনারেল ওয়াটারের দাম বাড়ছে না!’

কন্ডাক্টরের রসিকতায় কেউ কান দিল না। উল্টো পরিবহণ শ্রমিকদের চরিত্র-ঠিকুজি নিয়ে আলোচনায় মাতল। প্রথমে সাধারণ এবং অসাধারণ যাত্রীরা ভেবেছিল, এই ড্রাইভার বুঝি মুনি-ঋষি শ্রেণির, কোনো গালমন্দেই অ্যাংরি রিঅ্যাক্ট দেয় না। ভুল ভাঙল দড়াম করে। রাজীবকে উদ্দেশ করে ড্রাইভার বলল, ‘ভাইজান কোন জাগায় নামবেন?’

লুকিং গ্লাসেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে সে। আক্রমণের আঁচ অনুভব করে রাজীব জবাব দিল-‘ফার্মগেট।’

‘তয় ফারমের মুরগির মতন ঝিমান ক্যান! হাঁটা দেন। ঠ্যাং তো লগেই আছে!’

সিট না পেয়ে রড ধরে দাঁড়িয়ে ছিল এক ব্যাকরণ তাত্ত্বিক। প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করা এই যাত্রী উপযাচক হয়ে জবাব দিল-‘মুরগি নয়, শব্দটা হবে মোরগ। মানে হচ্ছে, কাউকে অপছন্দ করলে তার লিঙ্গ পরিবর্তন করে দেওয়া এক ধরনের বৈষম্য।’ রাজীব কিংবা ড্রাইভার কেউই যুক্তিবাজের ধারে-কাছে গেল না। রাজীব জবাব দিল-‘১৫ টাকা ভাড়া দিছি কি হাঁটনের লাইগ্যা?’

‘দেড় ঘণ্টা সিটে বইয়া আছেন। তারপরও ট্যাকা শোধ অয় নাই?’

চড়া গলায় জবাব দেওয়া হলো না। পাশের সিটের মুরব্বি বলে উঠলেন-‘লকডাউনের দিনগুলোই ভালো ছিল রে! গাড়ি নাই যানজটও নাই। যানজট থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে সারা বছরই লকডাউন রাখা উচিত।’

‘বেশি বুঝতে যাইয়েন না চাচা। অর্থনীতির কতটুকু বোঝেন?’ পেছনের সিট থেকে ফোঁড়ন কাটল একজন। জবাব পেতেও দেরি হলো না-‘তুমি তো পণ্ডিত। বলো দেখি, ইকনোমিকসের ইংরেজি কী?’

অনাকাক্সিক্ষত বাতচিতে রাজীবের মাথার জট আরও কয়েক স্তর পুরু হলো। জটাজাল পেঁচাতে থাকলে পাশ থেকে ভেসে এল সদ্য-তরুণের বিরক্তি-‘সবাই মিলে গরুবাজার বসিয়ে দিলেন কেন? বাসায় শান্তিমতো ফেসবুকিং করতে পারি না। বাসে এসেছি, এখানেও শান্তি দিচ্ছেন না।’

বিপরীত আসনের তরুণ মুখ খুলল এবার-‘আমার মতো কানে হেডফোন গুঁজে নাও। ক্যাটরিনা কাইফের সিনেমা অর্ধেক দেখে ফেলেছি। যানজট জিন্দাবাদ।’

‘অপর দেশের অপসংস্কৃতিচর্চা কেন! আমাদের পরীমনির সিনেমা ভালো লাগে না?’

মাঝামাঝি আসনের সংস্কৃতি ও মানবাধিকারে বিশ্বাসী ভদ্রলোকের কথা যানজটের যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিল অনেককেই। নীরব দর্শক-শ্রোতা সবাই ঠোঁট চালাল। এটা এমন ইস্যু, বোবাও বাগ্মী হয়ে ওঠে!

তাল মিলিয়ে রাজীব বলে, ‘আহা, নায়িকা একখান ছিল শাবানা! পর্দায় চোখের যত পানি ঢালছেন, এত পানি শেওড়াপাড়া-কাজীপাড়ার বন্যায়ও অয় না!’

সদ্য-তরুণ সিনেমাবিষয়ক আলোচনায় না গিয়ে বলল, ‘যানজট প্রযুক্তি সহায়ক। সবারই উচিত ফেসবুকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া। সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানো।’

এক রূপসীর খেদোক্তি মনোযোগ কাড়ল অনেকের-‘এতটা ঘণ্টা অপেক্ষা করছি, একটা আচারওয়ালা মুখপোড়াও এলো না এখনো!’

আলোচনা একসময় থামে বটে। এক ঘণ্টা পর গাড়ি আরও তিন ইঞ্চি পথ পেরোয়। কালো ধোঁয়া গলগল করে বেরোনোর সুযোগ পায় না। টপাটপ কয়েকজন যাত্রী নেমে যায়; এরা উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়-আধা ঘণ্টার হাঁটাপথে কয়েক ঘণ্টা বসে থাকা সময়ের অপচয়।

চাকা ছেড়ে পেছনের সিটে সটান শুয়ে পড়ে ড্রাইভার। যাত্রীদের উদ্দেশে বলে, ‘সিগন্যাল ছাড়লে কেউ আমারে ডাইকেন না। এক মিনিটের লাইগা ঘুম নষ্ট করুম না। রাইতে ভালা ঘুম অয় নাই।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই নাকডাকার ঘর-ঘরররর... আওয়াজ পাওয়া গেল। রাজীব ভাবল, নেমে বাসার দিকে হাঁটা দিলে কেমন হয়? কিন্তু সে কোথায় যাচ্ছিল, বাসাইবা কোথায় নিয়েছে মনে করতে পারল না কিছুই!

যানজটে যান তবে সবে...

 শফিক হাসান 
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অল্পতেই মাথায় জট লেগে যায় রাজীব হাসানের। লাগে সহজে, খোলে না কিছুতেই! ভেতরের সূক্ষ্ম ও মোটা তারগুলো উপর্যুপরি পেঁচিয়ে যেতে থাকলে অপ্রকৃতস্থের মতো আচরণ করে। যেমন এখন হলো।

এক ঘণ্টা সাড়ে একুশ মিনিট বসে থাকার পরও লোকাল বাসটি এগোল না এক ইঞ্চি। কিছুদিন থেকেই যানজট বেড়েছে। কয়েক মাস আগেও পরিস্থিতি এতটা অসহনীয় ছিল না। তিন ঘণ্টায় অনায়াসে এক কিলোমিটার পথ পেরোনো যাবে-অলিখিত নিশ্চয়তা ছিল। ভবিষ্যৎ-চিত্র চিন্তা করেই হয়তো দূরদর্শী বাউল শাহ আবদুল করিম গীত রচনা করেছিলেন-আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম...।

চান্দিতে অদ্ভুতুড়ে নাচন অনুভূত হতে থাকলে রাজীব হাঁক দেয়-‘ওই কন্ডাক্টর, এইডা বাস চালাস নাকি শালা-দুলাভাই মশকরা করস?’

গায়ে হাওয়া লাগাতে রাস্তায় নামা কন্ডাক্টর জবাব দিল-‘গাড়ি চালায় ওস্তাদে; আমি ভাড়া তুলি।’

‘তোর বাসের শিকড় গজায়া গেছে, ভাড়া তোলস ক্যান! সবার টাকা ফেরত দে, নাইমা যাক।’

‘শিকড়-বাকড়ে পানি দিতে অয়। এর লাইগ্যা টাকা লাগে। মিনারেল ওয়াটারের দাম বাড়ছে না!’

কন্ডাক্টরের রসিকতায় কেউ কান দিল না। উল্টো পরিবহণ শ্রমিকদের চরিত্র-ঠিকুজি নিয়ে আলোচনায় মাতল। প্রথমে সাধারণ এবং অসাধারণ যাত্রীরা ভেবেছিল, এই ড্রাইভার বুঝি মুনি-ঋষি শ্রেণির, কোনো গালমন্দেই অ্যাংরি রিঅ্যাক্ট দেয় না। ভুল ভাঙল দড়াম করে। রাজীবকে উদ্দেশ করে ড্রাইভার বলল, ‘ভাইজান কোন জাগায় নামবেন?’

লুকিং গ্লাসেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে সে। আক্রমণের আঁচ অনুভব করে রাজীব জবাব দিল-‘ফার্মগেট।’

‘তয় ফারমের মুরগির মতন ঝিমান ক্যান! হাঁটা দেন। ঠ্যাং তো লগেই আছে!’

সিট না পেয়ে রড ধরে দাঁড়িয়ে ছিল এক ব্যাকরণ তাত্ত্বিক। প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করা এই যাত্রী উপযাচক হয়ে জবাব দিল-‘মুরগি নয়, শব্দটা হবে মোরগ। মানে হচ্ছে, কাউকে অপছন্দ করলে তার লিঙ্গ পরিবর্তন করে দেওয়া এক ধরনের বৈষম্য।’ রাজীব কিংবা ড্রাইভার কেউই যুক্তিবাজের ধারে-কাছে গেল না। রাজীব জবাব দিল-‘১৫ টাকা ভাড়া দিছি কি হাঁটনের লাইগ্যা?’

‘দেড় ঘণ্টা সিটে বইয়া আছেন। তারপরও ট্যাকা শোধ অয় নাই?’

চড়া গলায় জবাব দেওয়া হলো না। পাশের সিটের মুরব্বি বলে উঠলেন-‘লকডাউনের দিনগুলোই ভালো ছিল রে! গাড়ি নাই যানজটও নাই। যানজট থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে সারা বছরই লকডাউন রাখা উচিত।’

‘বেশি বুঝতে যাইয়েন না চাচা। অর্থনীতির কতটুকু বোঝেন?’ পেছনের সিট থেকে ফোঁড়ন কাটল একজন। জবাব পেতেও দেরি হলো না-‘তুমি তো পণ্ডিত। বলো দেখি, ইকনোমিকসের ইংরেজি কী?’

অনাকাক্সিক্ষত বাতচিতে রাজীবের মাথার জট আরও কয়েক স্তর পুরু হলো। জটাজাল পেঁচাতে থাকলে পাশ থেকে ভেসে এল সদ্য-তরুণের বিরক্তি-‘সবাই মিলে গরুবাজার বসিয়ে দিলেন কেন? বাসায় শান্তিমতো ফেসবুকিং করতে পারি না। বাসে এসেছি, এখানেও শান্তি দিচ্ছেন না।’

বিপরীত আসনের তরুণ মুখ খুলল এবার-‘আমার মতো কানে হেডফোন গুঁজে নাও। ক্যাটরিনা কাইফের সিনেমা অর্ধেক দেখে ফেলেছি। যানজট জিন্দাবাদ।’

‘অপর দেশের অপসংস্কৃতিচর্চা কেন! আমাদের পরীমনির সিনেমা ভালো লাগে না?’

মাঝামাঝি আসনের সংস্কৃতি ও মানবাধিকারে বিশ্বাসী ভদ্রলোকের কথা যানজটের যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিল অনেককেই। নীরব দর্শক-শ্রোতা সবাই ঠোঁট চালাল। এটা এমন ইস্যু, বোবাও বাগ্মী হয়ে ওঠে!

তাল মিলিয়ে রাজীব বলে, ‘আহা, নায়িকা একখান ছিল শাবানা! পর্দায় চোখের যত পানি ঢালছেন, এত পানি শেওড়াপাড়া-কাজীপাড়ার বন্যায়ও অয় না!’

সদ্য-তরুণ সিনেমাবিষয়ক আলোচনায় না গিয়ে বলল, ‘যানজট প্রযুক্তি সহায়ক। সবারই উচিত ফেসবুকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া। সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানো।’

এক রূপসীর খেদোক্তি মনোযোগ কাড়ল অনেকের-‘এতটা ঘণ্টা অপেক্ষা করছি, একটা আচারওয়ালা মুখপোড়াও এলো না এখনো!’

আলোচনা একসময় থামে বটে। এক ঘণ্টা পর গাড়ি আরও তিন ইঞ্চি পথ পেরোয়। কালো ধোঁয়া গলগল করে বেরোনোর সুযোগ পায় না। টপাটপ কয়েকজন যাত্রী নেমে যায়; এরা উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়-আধা ঘণ্টার হাঁটাপথে কয়েক ঘণ্টা বসে থাকা সময়ের অপচয়।

চাকা ছেড়ে পেছনের সিটে সটান শুয়ে পড়ে ড্রাইভার। যাত্রীদের উদ্দেশে বলে, ‘সিগন্যাল ছাড়লে কেউ আমারে ডাইকেন না। এক মিনিটের লাইগা ঘুম নষ্ট করুম না। রাইতে ভালা ঘুম অয় নাই।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই নাকডাকার ঘর-ঘরররর... আওয়াজ পাওয়া গেল। রাজীব ভাবল, নেমে বাসার দিকে হাঁটা দিলে কেমন হয়? কিন্তু সে কোথায় যাচ্ছিল, বাসাইবা কোথায় নিয়েছে মনে করতে পারল না কিছুই!

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন