বিজ্ঞান আলীর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব
jugantor
বিজ্ঞান আলীর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব

  বিনোদন ডেস্ক  

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

: ভাইজানের নামটা কি জানতে পারি?

: বিজ্ঞান আলী।

: দেশ?

: বাংলাদেশ।

তেরছা হাসি ঠোঁটের গণ্ডি পার হয়ে বিজ্ঞান আলীর সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল। বুঝলাম, ত্যাঁদড় আছে। অপমান হজম করে বললাম-

: সাকিন?

: সাকিন না, বিজ্ঞান; বিজ্ঞান আলী।

চ্যানেল পাল্টিয়ে হাসি এবার চলে এলো মুখে। বিজ্ঞান আলীর এলেম বৃদ্ধির অভিপ্রায়ে বললাম-

: সাকিন মানে গেরাম।

: গেরাম! অঃ, গেরাম অইল শ্রীফলতলী।

গাজীপুর জেলার শ্রীফলতলী গ্রামের এই কিশোর, বাপ-মা যার নাম রেখেছে বিজ্ঞান আলী; গত সাড়ে চার বছর ধরে মহিলা জ্যোতিষী জর্জিনা চৌধুরীর দ্বাররক্ষী। মাস কাবারে বেতন চার হাজার টাকা; থাকা-খাওয়া ফ্রি। জ্যোতিষ শাস্ত্রে আমার বিশ্বাস আছে, কী নেই-সেই বিতর্কে না গিয়ে জর্জিনা চৌধুরীর দরবারে তশরিফ রাখার প্রেক্ষাপট পাঠকদের জানাতে চাই।

সপ্তাহখানেক আগে বৈকালিক চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়াতেই দরজায় দুমদাম শব্দ। দরজা ফাঁক করে দেখি-হুরমুজ আলী। ঝড়ের কবলে পড়া পাখির মতো বিধ্বস্ত চেহারা। পরিবেশ হালকা করার উদ্দেশে দরবারি স্টাইলে অভ্যর্থনা জানালাম-

: আসুন, আসুন; আসতে আজ্ঞা হোক।

: ঠাট্টা করছো?

হুরমুজ আলীর কান্নাভেজা কণ্ঠ শুনে মা কালীর মতো জিভে কামড় বসালাম। বললাম-

: নাউজুল্লিবাহ!

: তাহলে চলো।

: কোথায়?

: উকিলের কাছে।

হাসতে গিয়েও সামলে নিলাম। মুখে গাম্ভীর্যের কলুপ এঁটে জিজ্ঞেস করলাম-

: আবারও ঝগড়া হয়েছে?

: হয়েছে মানে? সকাল থেকে পাঁচবার। এইমাত্র পঞ্চম রাউন্ড শেষ করে এলাম।

: বলো কী! ঘটনা তো তাহলে সত্যিই জটিল!

: অবশ্যই জটিল। আমি নিতান্ত ভদ্রলোক বলে মারাÍক কিছু ঘটেনি। অন্য কেউ হলে আজ একটা খুনোখুনি হয়ে যেত।

হুরমুজ আলী হাঁপাতে থাকে। চোখ কপালে তুলে বললাম-

: সত্যি বলছো?

: ইয়েস! আই অ্যাম এ জেন্টেলম্যান। ভদ্রলোকেরা কখনো জবানে পট্টি মারে না।

: তাহলে ...

সিদ্ধান্তহীনতায় আমার চোয়াল ঝুলে পড়তেই হুরমুজ আলী তাগাদা দিল-

: চলো! আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। দুষ্টু গাভীর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো। উফ! জীবনটা নরকের কয়লা হয়ে গেছে!

: আচ্ছা, বিকল্প কোনো চিন্তা করা যায় না?

: কী রকম?

আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল হুরমুজ আলী। জোরে শ্বাস টেনে বললাম-

: এই যেমন ধরো, একেবারে কাটাকাটির মধ্যে না গিয়ে ঝগড়া না হওয়ার কোনো দাওয়াই যদি...

: ঝগড়া না হওয়ার কোনো ওষুধ আছে নাকি?

হুরমুজ আলীর চোখে-মুখে প্রত্যাশার রোদ-ছায়া খেলা করছে। বিজ্ঞের মতো বললাম-

: আছে মানে? দরবারে মা, দরবারে বাবা, সর্পরাজ, তন্ত্র সম্রাট, মুশকিল আসান, জ্যোতিষ নক্ষত্র ইত্যাদিতে বোঝাই এ ঢাকা শহর। এরা তোমার দাম্পত্যজীবনের সব মুশকিল আসান করে দেবে।

: তাই নাকি! এমনটা হলে অবশ্য মন্দ হয় না। হাজার হলেও প্রায় এগার বছরের প্রেমের সেভিংস নিয়ে বিয়ে করেছি।

ওই দিনের পত্রিকা ঘেঁটে চব্বিশজন সাধক-সাধিকার ঠিকানা পাওয়া গেল, যারা মানুষের মুশকিল নিরাময়ে অব্যর্থ দাওয়াই সরবরাহ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এদের মধ্যে হুরমুজ আলীর পছন্দ মহিলা জ্যোতিষী জর্জিনা চৌধুরীকে। হুরমুজের যুক্তি-একজন মহিলা কেন কারণে-অকারণে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে, এর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ শেষে সমস্যার উত্তম সমাধান মহিলা সাধক যতটা নিপুণভাবে দিতে পারবেন, পুরুষ সাধকরা তা পারবেন না। অকাট্য যুক্তি। ওইদিনই সন্ধ্যার পর আমরা জর্জিনা চৌধুরীর দরবারে হাজির হলাম। জর্জিনা চৌধুরীর কক্ষে ঢোকার পর অভ্যর্থনা কক্ষের এক পাশে বসে বিজ্ঞান আলীর সঙ্গে সংলাপ বিনিময় হচ্ছিল, যা পাঠক ইতোমধ্যে অবগত হয়েছেন। সংলাপ বিনিময়ের এক পর্যায়ে বিজ্ঞান আলী সহজ হয়ে উঠল। তার কাছে জানতে চাইলাম-

: ব্যবসা কেমন চলছে তোমার ম্যাডামের?

: ব্যবসা তো জমজমাট। কিন্তু...

: কিন্তু কী?

: সমস্যা সমাধানের আশা লইয়া মানুষ যার কাছে আসে, তিনি নিজেই সমস্যার গোডাউন।

: কী রকম!

: আগে আপনের বন্ধুর বিষয়টা কী বলেন।

: দাম্পত্য কলহ।

আমার কথা শুনে বিজ্ঞান আলী আপন মনে কিছুক্ষণ হাসল। তারপর বলল-

: দাম্পত্য কলহ নিরসনে যার কাছে আসছেন; আমার জানা মতে, তিনি এই পর্যন্ত তিনবার স্বামী বদল করেছেন। শেষবার তিন নম্বর স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে সারা রাত এই চেম্বারে বসে কাটাইছেন।

: তাই নাকি?

: হু।

বিজ্ঞান আলী হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। দীর্ঘক্ষণ পর ডানেবামে তাকিয়ে পরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিতে সে বলল-

: আপনেরে একটা কথা বলি। পাথরে কোনো সমাধান নাই।

: তাহলে কিসে সমাধান?

: ভালোবাসায়।

mokamia@hotmail.com

বিজ্ঞান আলীর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব

 বিনোদন ডেস্ক 
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

: ভাইজানের নামটা কি জানতে পারি?

: বিজ্ঞান আলী।

: দেশ?

: বাংলাদেশ।

তেরছা হাসি ঠোঁটের গণ্ডি পার হয়ে বিজ্ঞান আলীর সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল। বুঝলাম, ত্যাঁদড় আছে। অপমান হজম করে বললাম-

: সাকিন?

: সাকিন না, বিজ্ঞান; বিজ্ঞান আলী।

চ্যানেল পাল্টিয়ে হাসি এবার চলে এলো মুখে। বিজ্ঞান আলীর এলেম বৃদ্ধির অভিপ্রায়ে বললাম-

: সাকিন মানে গেরাম।

: গেরাম! অঃ, গেরাম অইল শ্রীফলতলী।

গাজীপুর জেলার শ্রীফলতলী গ্রামের এই কিশোর, বাপ-মা যার নাম রেখেছে বিজ্ঞান আলী; গত সাড়ে চার বছর ধরে মহিলা জ্যোতিষী জর্জিনা চৌধুরীর দ্বাররক্ষী। মাস কাবারে বেতন চার হাজার টাকা; থাকা-খাওয়া ফ্রি। জ্যোতিষ শাস্ত্রে আমার বিশ্বাস আছে, কী নেই-সেই বিতর্কে না গিয়ে জর্জিনা চৌধুরীর দরবারে তশরিফ রাখার প্রেক্ষাপট পাঠকদের জানাতে চাই।

সপ্তাহখানেক আগে বৈকালিক চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়াতেই দরজায় দুমদাম শব্দ। দরজা ফাঁক করে দেখি-হুরমুজ আলী। ঝড়ের কবলে পড়া পাখির মতো বিধ্বস্ত চেহারা। পরিবেশ হালকা করার উদ্দেশে দরবারি স্টাইলে অভ্যর্থনা জানালাম-

: আসুন, আসুন; আসতে আজ্ঞা হোক।

: ঠাট্টা করছো?

হুরমুজ আলীর কান্নাভেজা কণ্ঠ শুনে মা কালীর মতো জিভে কামড় বসালাম। বললাম-

: নাউজুল্লিবাহ!

: তাহলে চলো।

: কোথায়?

: উকিলের কাছে।

হাসতে গিয়েও সামলে নিলাম। মুখে গাম্ভীর্যের কলুপ এঁটে জিজ্ঞেস করলাম-

: আবারও ঝগড়া হয়েছে?

: হয়েছে মানে? সকাল থেকে পাঁচবার। এইমাত্র পঞ্চম রাউন্ড শেষ করে এলাম।

: বলো কী! ঘটনা তো তাহলে সত্যিই জটিল!

: অবশ্যই জটিল। আমি নিতান্ত ভদ্রলোক বলে মারাÍক কিছু ঘটেনি। অন্য কেউ হলে আজ একটা খুনোখুনি হয়ে যেত।

হুরমুজ আলী হাঁপাতে থাকে। চোখ কপালে তুলে বললাম-

: সত্যি বলছো?

: ইয়েস! আই অ্যাম এ জেন্টেলম্যান। ভদ্রলোকেরা কখনো জবানে পট্টি মারে না।

: তাহলে ...

সিদ্ধান্তহীনতায় আমার চোয়াল ঝুলে পড়তেই হুরমুজ আলী তাগাদা দিল-

: চলো! আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। দুষ্টু গাভীর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো। উফ! জীবনটা নরকের কয়লা হয়ে গেছে!

: আচ্ছা, বিকল্প কোনো চিন্তা করা যায় না?

: কী রকম?

আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল হুরমুজ আলী। জোরে শ্বাস টেনে বললাম-

: এই যেমন ধরো, একেবারে কাটাকাটির মধ্যে না গিয়ে ঝগড়া না হওয়ার কোনো দাওয়াই যদি...

: ঝগড়া না হওয়ার কোনো ওষুধ আছে নাকি?

হুরমুজ আলীর চোখে-মুখে প্রত্যাশার রোদ-ছায়া খেলা করছে। বিজ্ঞের মতো বললাম-

: আছে মানে? দরবারে মা, দরবারে বাবা, সর্পরাজ, তন্ত্র সম্রাট, মুশকিল আসান, জ্যোতিষ নক্ষত্র ইত্যাদিতে বোঝাই এ ঢাকা শহর। এরা তোমার দাম্পত্যজীবনের সব মুশকিল আসান করে দেবে।

: তাই নাকি! এমনটা হলে অবশ্য মন্দ হয় না। হাজার হলেও প্রায় এগার বছরের প্রেমের সেভিংস নিয়ে বিয়ে করেছি।

ওই দিনের পত্রিকা ঘেঁটে চব্বিশজন সাধক-সাধিকার ঠিকানা পাওয়া গেল, যারা মানুষের মুশকিল নিরাময়ে অব্যর্থ দাওয়াই সরবরাহ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এদের মধ্যে হুরমুজ আলীর পছন্দ মহিলা জ্যোতিষী জর্জিনা চৌধুরীকে। হুরমুজের যুক্তি-একজন মহিলা কেন কারণে-অকারণে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে, এর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ শেষে সমস্যার উত্তম সমাধান মহিলা সাধক যতটা নিপুণভাবে দিতে পারবেন, পুরুষ সাধকরা তা পারবেন না। অকাট্য যুক্তি। ওইদিনই সন্ধ্যার পর আমরা জর্জিনা চৌধুরীর দরবারে হাজির হলাম। জর্জিনা চৌধুরীর কক্ষে ঢোকার পর অভ্যর্থনা কক্ষের এক পাশে বসে বিজ্ঞান আলীর সঙ্গে সংলাপ বিনিময় হচ্ছিল, যা পাঠক ইতোমধ্যে অবগত হয়েছেন। সংলাপ বিনিময়ের এক পর্যায়ে বিজ্ঞান আলী সহজ হয়ে উঠল। তার কাছে জানতে চাইলাম-

: ব্যবসা কেমন চলছে তোমার ম্যাডামের?

: ব্যবসা তো জমজমাট। কিন্তু...

: কিন্তু কী?

: সমস্যা সমাধানের আশা লইয়া মানুষ যার কাছে আসে, তিনি নিজেই সমস্যার গোডাউন।

: কী রকম!

: আগে আপনের বন্ধুর বিষয়টা কী বলেন।

: দাম্পত্য কলহ।

আমার কথা শুনে বিজ্ঞান আলী আপন মনে কিছুক্ষণ হাসল। তারপর বলল-

: দাম্পত্য কলহ নিরসনে যার কাছে আসছেন; আমার জানা মতে, তিনি এই পর্যন্ত তিনবার স্বামী বদল করেছেন। শেষবার তিন নম্বর স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে সারা রাত এই চেম্বারে বসে কাটাইছেন।

: তাই নাকি?

: হু।

বিজ্ঞান আলী হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। দীর্ঘক্ষণ পর ডানেবামে তাকিয়ে পরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিতে সে বলল-

: আপনেরে একটা কথা বলি। পাথরে কোনো সমাধান নাই।

: তাহলে কিসে সমাধান?

: ভালোবাসায়।

mokamia@hotmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন