পেঁয়াজ নিয়ে আওয়াজ
jugantor
পেঁয়াজ নিয়ে আওয়াজ

  অয়েজুল হক  

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পান্নু মিয়া প্রতি বছর দাম কম থাকার সময় পেঁয়াজ-রসুন কিনে রাখেন। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ৭০ কেজি পেঁয়াজ কিনেছিলেন কুড়ি টাকা দরে। হুট করে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ঘরে থাকা সব পেঁয়াজ নিয়ে ছুটলেন বাজারে। বউ নিপার বিনীত অনুরোধ, ‘ঘরে অন্তত পাঁচ-দশ কেজি পেঁয়াজ রেখে যাও।’

পান্নু মিয়া মুখে মধুর হাসি নিয়ে বলে, ‘আধা কেজি রেখেছি। কয়েক দিনে হুট করে পেঁয়াজের দাম পড়ে যাবে।’

‘যদি না পড়ে!’

‘পড়বে মানে, একদম ধড়াশ করে পড়বে!’

নিপা শুধু স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কুড়ি টাকার পেঁয়াজ পঞ্চাশ টাকা দরে বিক্রি। কড়কড়ে টাকা নিয়ে হাসি মুখে বাড়ি ফেরে পান্নু মিয়া। দিন কয়েকের ভেতর পেঁয়াজের দাম বেড়ে সেঞ্চুরি পেরিয়ে যায়। বাড়ির পেঁয়াজ শেষ হতেই বউয়ের চিৎকার। পান্নু মিয়ার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। সকাল-বিকাল, সন্ধ্যা-রাতে পেঁয়াজ পেঁয়াজ করে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে, ‘পেঁয়াজের দাম পড়েছে? হলো তো এবার!’

নিপার কথা শুনে পান্নু মিয়া চুপ করে ভাবে, দাম তো কিছুতেই পড়ছে না। বরং শতক পেরিয়ে আকাশের দিকে উঠছে তরতর করে। কুড়ি টাকায় কেনা পেঁয়াজে লাভ হয়েছিল কেজিতে ত্রিশ টাকা। এখন কিনতে গেলে প্রতি কেজিতে লস হবে পঞ্চাশ টাকা! এমনিতেই বুক ফেটে যাবার মতো অবস্থা। তার ওপর বউয়ের শ্রাব্য-অশ্রাব্য কথা। তাই সে বউকে সান্ত্বনার বাণী শোনায়, ‘সবুরে মেওয়া ফলে!’

শুনে ফোঁস করে ওঠে বউ, ‘মেওয়া ফলার দরকার নাই, পেঁয়াজ চাই।’

‘বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আসছে।’

‘রাখ তোমার বিদেশ। বাজার একটুখানি পথ, সেখান থেকে পেঁয়াজ আসতে পারছে না। আর বিদেশ থেকে আসবে পেঁয়াজ!’

মহিলা কী বোঝে কে জানে! নাকি তার চিৎকার দেওয়া রোগ হয়েছে! বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আসার পর টিসিবি সাশ্রয়ী মূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে। ব্যাগ হাতে পান্নু মিয়া লম্বা লাইনে সিরিয়াল দেয়। দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে দুই কেজি পেঁয়াজ কিনে। খুশিতে বাড়ি নিয়ে বউয়ের হাতে দিয়ে বলে, ‘এই নাও তোমার পেঁয়াজ।’

নিপা ভাবলেশহীন মূর্তির মতো পেঁয়াজগুলো রান্নাঘরে রেখে আসে। পেঁয়াজ শোকে পাথর টাইপ ভাব। বিকাল বেলা ঘটে আরেক কাণ্ড। প্রতিবেশী সাবুরা বেগমের চড়া আওয়াজ, ‘মানুষ মানুষের সঙ্গে এভাবে মশকরা করে! ছিঃ! ওয়াক থু!’

নিপাও চিৎকার করে, ‘অভদ্র মহিলা। আর কোনোদিন এ বাড়ি আসবেন না।’

‘বাড়ির নিকুচি করি। ওয়াক থু!’

মহিলা হনহন করে বেরিয়ে যায়। ঘটনা গুরুতর কিছু না। নিপা ভুলক্রমে বিদেশি পেঁয়াজ আপেল মনে করে আপ্যায়ন করেছে। ঘটনা প্রকাশিত হবার পর পান্নুর লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট করে যুদ্ধ করে আনা পেঁয়াজগুলো নদর্মায় নিক্ষিপ্ত হয়। নিপা ঝাঁঝালো আওয়াজে বলতে থাকে, ‘আপেলের ভেতর পেঁয়াজের রস! ভাবা যায়! আজ যদি পেঁয়াজ না আনো বাড়ি থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেব। আমি না পারলে পাড়ার লোক ডাকব।’

পান্নু মিয়া বসে বসে ভাবেন, আজ সত্তর, কাল একশ, পরশু দেড়শ তারপর দুইশ। হায়রে পেঁয়াজ! শেষমেশ মাথায় একটা বুদ্ধি আসে তার। নিজের বিক্রি করা পেঁয়াজগুলো বিক্রিত দামে ফেরত নিয়ে আসবে। পরদিন বাজারের সেই দোকানে গিয়ে দোকানদারকে বলল, ‘আমার পেঁয়াজ বিক্রি করব না। ফেরত দিন।’

‘মানে!’

‘ওই যে, ৭০ কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করেছিলাম সেগুলো ফেরত নিতে এসেছি।’

দোকানদার মুহূর্তে জ্বলে ওঠেন, ‘ফাজলামো জায়গা বুঝে করবেন।’

‘ফাজলামো! আমার পেঁয়াজ আমি বিক্রি করব না, এইখানে ফাজলামোর কী আছে?’

‘ফালতু ক্যাচাল, এই ভাগেন তো।’

পান্নু মিয়া আর সহ্য করতে পারে না, ‘ভাগেন মানে! তোমার কেনা রাস্তার উপর দাঁড়াইছি? দোকান থেকে বাইর হ। তোরে আজ পেঁয়াজ বিক্রি শিখিয়ে দেব।’

‘একদম আওয়াজ করবেন না বলে দিলাম। মুখ টিপে ভোতা বানিয়ে দেব।’

‘কী! আমার মুখ টিপবি? ওরে বদমাশ...!’

চিৎকার, আওয়াজ শুনে আশপাশের লোকজন জড়ো হলো। লোকজন কিছু বুঝে উঠতে পারে না। দু’জনই শুধু পেঁয়াজ পেঁয়াজ করছে। দোকানদার নেমে আসতেই পান্নু মিয়ার সঙ্গে তুমুল ধস্তাধস্তি শুরু হলো। অনেক কষ্টে দু’জনকে সরায় কৌতূহলী জনতা। ঘটনা কী? জানতে চায় সবাই। সে প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। দু’জন সমানে চিৎকার করে যাচ্ছে, ‘আমার পেঁয়াজ, আমার পেঁয়াজ!’

পেঁয়াজ নিয়ে আওয়াজ

 অয়েজুল হক 
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পান্নু মিয়া প্রতি বছর দাম কম থাকার সময় পেঁয়াজ-রসুন কিনে রাখেন। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ৭০ কেজি পেঁয়াজ কিনেছিলেন কুড়ি টাকা দরে। হুট করে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ঘরে থাকা সব পেঁয়াজ নিয়ে ছুটলেন বাজারে। বউ নিপার বিনীত অনুরোধ, ‘ঘরে অন্তত পাঁচ-দশ কেজি পেঁয়াজ রেখে যাও।’

পান্নু মিয়া মুখে মধুর হাসি নিয়ে বলে, ‘আধা কেজি রেখেছি। কয়েক দিনে হুট করে পেঁয়াজের দাম পড়ে যাবে।’

‘যদি না পড়ে!’

‘পড়বে মানে, একদম ধড়াশ করে পড়বে!’

নিপা শুধু স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কুড়ি টাকার পেঁয়াজ পঞ্চাশ টাকা দরে বিক্রি। কড়কড়ে টাকা নিয়ে হাসি মুখে বাড়ি ফেরে পান্নু মিয়া। দিন কয়েকের ভেতর পেঁয়াজের দাম বেড়ে সেঞ্চুরি পেরিয়ে যায়। বাড়ির পেঁয়াজ শেষ হতেই বউয়ের চিৎকার। পান্নু মিয়ার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। সকাল-বিকাল, সন্ধ্যা-রাতে পেঁয়াজ পেঁয়াজ করে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে, ‘পেঁয়াজের দাম পড়েছে? হলো তো এবার!’

নিপার কথা শুনে পান্নু মিয়া চুপ করে ভাবে, দাম তো কিছুতেই পড়ছে না। বরং শতক পেরিয়ে আকাশের দিকে উঠছে তরতর করে। কুড়ি টাকায় কেনা পেঁয়াজে লাভ হয়েছিল কেজিতে ত্রিশ টাকা। এখন কিনতে গেলে প্রতি কেজিতে লস হবে পঞ্চাশ টাকা! এমনিতেই বুক ফেটে যাবার মতো অবস্থা। তার ওপর বউয়ের শ্রাব্য-অশ্রাব্য কথা। তাই সে বউকে সান্ত্বনার বাণী শোনায়, ‘সবুরে মেওয়া ফলে!’

শুনে ফোঁস করে ওঠে বউ, ‘মেওয়া ফলার দরকার নাই, পেঁয়াজ চাই।’

‘বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আসছে।’

‘রাখ তোমার বিদেশ। বাজার একটুখানি পথ, সেখান থেকে পেঁয়াজ আসতে পারছে না। আর বিদেশ থেকে আসবে পেঁয়াজ!’

মহিলা কী বোঝে কে জানে! নাকি তার চিৎকার দেওয়া রোগ হয়েছে! বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আসার পর টিসিবি সাশ্রয়ী মূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে। ব্যাগ হাতে পান্নু মিয়া লম্বা লাইনে সিরিয়াল দেয়। দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে দুই কেজি পেঁয়াজ কিনে। খুশিতে বাড়ি নিয়ে বউয়ের হাতে দিয়ে বলে, ‘এই নাও তোমার পেঁয়াজ।’

নিপা ভাবলেশহীন মূর্তির মতো পেঁয়াজগুলো রান্নাঘরে রেখে আসে। পেঁয়াজ শোকে পাথর টাইপ ভাব। বিকাল বেলা ঘটে আরেক কাণ্ড। প্রতিবেশী সাবুরা বেগমের চড়া আওয়াজ, ‘মানুষ মানুষের সঙ্গে এভাবে মশকরা করে! ছিঃ! ওয়াক থু!’

নিপাও চিৎকার করে, ‘অভদ্র মহিলা। আর কোনোদিন এ বাড়ি আসবেন না।’

‘বাড়ির নিকুচি করি। ওয়াক থু!’

মহিলা হনহন করে বেরিয়ে যায়। ঘটনা গুরুতর কিছু না। নিপা ভুলক্রমে বিদেশি পেঁয়াজ আপেল মনে করে আপ্যায়ন করেছে। ঘটনা প্রকাশিত হবার পর পান্নুর লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট করে যুদ্ধ করে আনা পেঁয়াজগুলো নদর্মায় নিক্ষিপ্ত হয়। নিপা ঝাঁঝালো আওয়াজে বলতে থাকে, ‘আপেলের ভেতর পেঁয়াজের রস! ভাবা যায়! আজ যদি পেঁয়াজ না আনো বাড়ি থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেব। আমি না পারলে পাড়ার লোক ডাকব।’

পান্নু মিয়া বসে বসে ভাবেন, আজ সত্তর, কাল একশ, পরশু দেড়শ তারপর দুইশ। হায়রে পেঁয়াজ! শেষমেশ মাথায় একটা বুদ্ধি আসে তার। নিজের বিক্রি করা পেঁয়াজগুলো বিক্রিত দামে ফেরত নিয়ে আসবে। পরদিন বাজারের সেই দোকানে গিয়ে দোকানদারকে বলল, ‘আমার পেঁয়াজ বিক্রি করব না। ফেরত দিন।’

‘মানে!’

‘ওই যে, ৭০ কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করেছিলাম সেগুলো ফেরত নিতে এসেছি।’

দোকানদার মুহূর্তে জ্বলে ওঠেন, ‘ফাজলামো জায়গা বুঝে করবেন।’

‘ফাজলামো! আমার পেঁয়াজ আমি বিক্রি করব না, এইখানে ফাজলামোর কী আছে?’

‘ফালতু ক্যাচাল, এই ভাগেন তো।’

পান্নু মিয়া আর সহ্য করতে পারে না, ‘ভাগেন মানে! তোমার কেনা রাস্তার উপর দাঁড়াইছি? দোকান থেকে বাইর হ। তোরে আজ পেঁয়াজ বিক্রি শিখিয়ে দেব।’

‘একদম আওয়াজ করবেন না বলে দিলাম। মুখ টিপে ভোতা বানিয়ে দেব।’

‘কী! আমার মুখ টিপবি? ওরে বদমাশ...!’

চিৎকার, আওয়াজ শুনে আশপাশের লোকজন জড়ো হলো। লোকজন কিছু বুঝে উঠতে পারে না। দু’জনই শুধু পেঁয়াজ পেঁয়াজ করছে। দোকানদার নেমে আসতেই পান্নু মিয়ার সঙ্গে তুমুল ধস্তাধস্তি শুরু হলো। অনেক কষ্টে দু’জনকে সরায় কৌতূহলী জনতা। ঘটনা কী? জানতে চায় সবাই। সে প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। দু’জন সমানে চিৎকার করে যাচ্ছে, ‘আমার পেঁয়াজ, আমার পেঁয়াজ!’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন