ভাদ্রমাসের তালপাকা গরমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারের গরম
jugantor
মলাট বৃত্তান্ত
ভাদ্রমাসের তালপাকা গরমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারের গরম

  মোকাম্মেল হোসেন  

১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

টয়লেট থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে পুনরায় ব্যস্ত ভঙ্গিতে টয়লেটের দিকে দৌড় দিতেই আতরজান অবাক হয়ে বলল-

: আবার কী হইল!

: আইসা বলতেছি...

টয়লেট থেকে প্রত্যাবর্তন শেষে আতরজানের কাছে রিপোর্ট করলাম। সবকিছু শোনার পর তার চেহারায় দুশ্চিন্তার ছায়া পড়ল। মমতাময়ীর গলায় বলল-

: আইজ আর বাজারে যাওয়ার দরকার নাই। তুমি বিছানায় যাইয়া চুপচাপ শুইয়া পড়। আমি স্যালাইনের ব্যবস্থা করতেছি।

: কিন্তু বাজার না করলে...

: বাজারের চিন্তা রাখ তো; তোমারে যা বলছি, তাই কর।

বিছানায় শুয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লবণ-গুড়ের স্যালাইন হজম করে ছুটির দিনটা মন্দ কাটল না। পরের সপ্তাহে নাশতা শেষ করার সুযোগও পেলাম না; তার আগেই ‘খবর’ হয়ে গেল। আমাকে টয়লেটে ঢুকতে দেখে আতরজান হৈ হৈ করে উঠল। বলল-

: আশ্চর্য! খাওয়ার মাঝখানে পোলাপানের মতো কেউ টয়লেটে দৌড় দেয়? তোমার যতসব আজব কারবার!

টয়লেট থেকে ফিরে খাবার টেবিলে গেলাম না। শরীরে কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। আমার আচরণে আতরজান খুবই অবাক হলো। গভীরভাবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করার পর জিজ্ঞেস করল-

: আইজ আবার কী হইল!

: গত সপ্তাহের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। তবে এইবারের অবস্থা আরও ভয়াবহ। হাই-ভোল্টেজ।

: নাশতাটা শেষ কর।

: নাশতা আর খাব না। এক গ্লাস পানি দেও। পানি খাইয়া একটু সুস্থির হইয়া বাজারে রওনা দেই।

: এই অবস্থায় বাজারে যাবা?

: অসুবিধা নাই।

: না, না। তুমি রেস্টে থাক।

কিন্তু পরের সপ্তাহেও একই লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ায় আতরজানের চেহারা থমথমে ভাব ধারণ করল। চোখে চোখ রেখে সে প্রশ্ন করল-

: বাইছা বাইছা কেবল ছুটির দিনেই তোমার পাতলা পায়খানা শুরু হয়, বিষয় কী?

হাঁপানি রোগীর মতো কয়েকবার দম টেনে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললাম-

: ক্যামনে বলব? রোগব্যাধি কি আমার সঙ্গে পরামর্শ কইরা আসে?

: রোগব্যাধি, না ভং? কিছুক্ষণ পরপর টয়লেটে বিছানা পাতলেই পাতলা পায়খানা হইয়া যায়?

: সন্দেহ হইলে একটা কাচের বয়াম আন। পরেরবার পাতলা পায়খানার স্যাম্পল নিয়া আসব।

: খাজুকি আলাপ বাদ দিয়া বিছানা ছাইড়া উঠ। ঘরে বিচিকলা আছে। খাইয়া টাইট হইয়া বাজারে যাও।

: এই অবস্থায় বাজারে যাইয়া কাপড়-চোপড় ছেড়াবেড়া কইরা দশজনের সামনে হাসির খোরাক হই-এইটা কি তুমি চাও? এই সপ্তাহটা কোনোমতে পার কইরা দেও। রাইফেলের গুলি মিস হইতে পারে; কিন্তু সামনের সপ্তাহে বাজারে যাওয়া মিস নাই। হানড্রেড পার্সেন্ট গ্যারান্টি।

পরদিন অফিসে গিয়ে শুনলাম, সহকর্মী বদরউদ্দিন সাহেবের পা ভেঙে গেছে। ছুটির পর এক কেজি আপেল নিয়ে তাকে দেখতে হাসপাতালে গেলাম। কথাবার্তার এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলাম-

: ঠ্যাং ভাঙলেন কীভাবে?

: আর বইলেন না। চাইছি ব্যাঙ; পাইছি হাতি।

: বুঝলাম না।

: বুঝাইতে গেলে তো অনেক কথা বলতে হয়। পারিবারিক বিষয়াদিও চইলা আসে।

: তাইলে থাক।

: না, না; আপনেরে বলতে অসুবিধা নাই। দুঃখের কথা কী বলব ভাই! একে তো ভাদ্র মাসের তালপাকা গরম। এর সঙ্গে যুক্ত হইছে বাজারের গরম। ডাবল গরমের চাপ থেইকা একটু নিস্তার পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করলাম- মাবুদ! আমারে জ্বরজারি একটা কিছু দিয়া দেও, যাতে কিছুদিনের জন্য বাজারে যাইতে না হয়। উপরওয়ালার কী লীলা দেখেন- আর্জি পেশ করার পর ১২ ঘণ্টাও যায় নাই, ফুটপাতের একটা গর্তে পইড়া পা ভাঙছি।

বদরউদ্দিন সাহেবের কথা শুনে হেসে উঠলাম। বেদনামাখা গলায় বদরউদ্দিন সাহেব বললেন-

: আপনে হাসতেছেন!

: জি। কারণ, আমরা দু’জন একই পথের পথিক; অথচ ফল হইছে ভিন্ন।

: মানে?

: মানে হইল, দুই গরমের ঠেলায় আপনার মতো আমিও ফাঁপরে ছিলাম। এমন সময় একটা আবিষ্কার আমারে স্বস্তির পথ দেখাইছে।

: কী রকম?

: বাসায় পানি ফোটানোর পর পান করার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এই মাসের প্রথম সপ্তাহে ভুল কইরা কল থেইকা ওয়াসার সাপ্লাই করা কাঁচা পানি পান কইরা ফেলছিলাম। নাশতা কইরা বাজারে রওনা হওয়ার সময় পেটের পাইপলাইনে গরগর আওয়াজ উঠল। এরপর আষাঢ় মাইসা ঢলের মতো ডাইরেক্ট অ্যাকশন শুরু হইয়া গেল। দেখলাম-পদ্ধতিটা অতি চমৎকার। এরপর থেইকা ছুটির দিন ভোরবেলা চুপিচুপি পেটের মধ্যে কয়েক গ্লাস সাপ্লাইয়ের পানি ডাইরেক্ট চালান কইরা পরপর তিন সপ্তাহ আরামেই ছিলাম।

আমার কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বদরউদ্দিন সাহেব বললেন-

: ভাই, ভাদ্র মাস শেষ হইলে গরমও নিশ্চয়ই কমবে; কিন্তু বাজারের গরমের অবসান সহসা ঘটবে বইলা তো মনে হইতেছে না।

মলাট বৃত্তান্ত

ভাদ্রমাসের তালপাকা গরমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারের গরম

 মোকাম্মেল হোসেন 
১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

টয়লেট থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে পুনরায় ব্যস্ত ভঙ্গিতে টয়লেটের দিকে দৌড় দিতেই আতরজান অবাক হয়ে বলল-

: আবার কী হইল!

: আইসা বলতেছি...

টয়লেট থেকে প্রত্যাবর্তন শেষে আতরজানের কাছে রিপোর্ট করলাম। সবকিছু শোনার পর তার চেহারায় দুশ্চিন্তার ছায়া পড়ল। মমতাময়ীর গলায় বলল-

: আইজ আর বাজারে যাওয়ার দরকার নাই। তুমি বিছানায় যাইয়া চুপচাপ শুইয়া পড়। আমি স্যালাইনের ব্যবস্থা করতেছি।

: কিন্তু বাজার না করলে...

: বাজারের চিন্তা রাখ তো; তোমারে যা বলছি, তাই কর।

বিছানায় শুয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লবণ-গুড়ের স্যালাইন হজম করে ছুটির দিনটা মন্দ কাটল না। পরের সপ্তাহে নাশতা শেষ করার সুযোগও পেলাম না; তার আগেই ‘খবর’ হয়ে গেল। আমাকে টয়লেটে ঢুকতে দেখে আতরজান হৈ হৈ করে উঠল। বলল-

: আশ্চর্য! খাওয়ার মাঝখানে পোলাপানের মতো কেউ টয়লেটে দৌড় দেয়? তোমার যতসব আজব কারবার!

টয়লেট থেকে ফিরে খাবার টেবিলে গেলাম না। শরীরে কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। আমার আচরণে আতরজান খুবই অবাক হলো। গভীরভাবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করার পর জিজ্ঞেস করল-

: আইজ আবার কী হইল!

: গত সপ্তাহের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। তবে এইবারের অবস্থা আরও ভয়াবহ। হাই-ভোল্টেজ।

: নাশতাটা শেষ কর।

: নাশতা আর খাব না। এক গ্লাস পানি দেও। পানি খাইয়া একটু সুস্থির হইয়া বাজারে রওনা দেই।

: এই অবস্থায় বাজারে যাবা?

: অসুবিধা নাই।

: না, না। তুমি রেস্টে থাক।

কিন্তু পরের সপ্তাহেও একই লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ায় আতরজানের চেহারা থমথমে ভাব ধারণ করল। চোখে চোখ রেখে সে প্রশ্ন করল-

: বাইছা বাইছা কেবল ছুটির দিনেই তোমার পাতলা পায়খানা শুরু হয়, বিষয় কী?

হাঁপানি রোগীর মতো কয়েকবার দম টেনে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললাম-

: ক্যামনে বলব? রোগব্যাধি কি আমার সঙ্গে পরামর্শ কইরা আসে?

: রোগব্যাধি, না ভং? কিছুক্ষণ পরপর টয়লেটে বিছানা পাতলেই পাতলা পায়খানা হইয়া যায়?

: সন্দেহ হইলে একটা কাচের বয়াম আন। পরেরবার পাতলা পায়খানার স্যাম্পল নিয়া আসব।

: খাজুকি আলাপ বাদ দিয়া বিছানা ছাইড়া উঠ। ঘরে বিচিকলা আছে। খাইয়া টাইট হইয়া বাজারে যাও।

: এই অবস্থায় বাজারে যাইয়া কাপড়-চোপড় ছেড়াবেড়া কইরা দশজনের সামনে হাসির খোরাক হই-এইটা কি তুমি চাও? এই সপ্তাহটা কোনোমতে পার কইরা দেও। রাইফেলের গুলি মিস হইতে পারে; কিন্তু সামনের সপ্তাহে বাজারে যাওয়া মিস নাই। হানড্রেড পার্সেন্ট গ্যারান্টি।

পরদিন অফিসে গিয়ে শুনলাম, সহকর্মী বদরউদ্দিন সাহেবের পা ভেঙে গেছে। ছুটির পর এক কেজি আপেল নিয়ে তাকে দেখতে হাসপাতালে গেলাম। কথাবার্তার এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলাম-

: ঠ্যাং ভাঙলেন কীভাবে?

: আর বইলেন না। চাইছি ব্যাঙ; পাইছি হাতি।

: বুঝলাম না।

: বুঝাইতে গেলে তো অনেক কথা বলতে হয়। পারিবারিক বিষয়াদিও চইলা আসে।

: তাইলে থাক।

: না, না; আপনেরে বলতে অসুবিধা নাই। দুঃখের কথা কী বলব ভাই! একে তো ভাদ্র মাসের তালপাকা গরম। এর সঙ্গে যুক্ত হইছে বাজারের গরম। ডাবল গরমের চাপ থেইকা একটু নিস্তার পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করলাম- মাবুদ! আমারে জ্বরজারি একটা কিছু দিয়া দেও, যাতে কিছুদিনের জন্য বাজারে যাইতে না হয়। উপরওয়ালার কী লীলা দেখেন- আর্জি পেশ করার পর ১২ ঘণ্টাও যায় নাই, ফুটপাতের একটা গর্তে পইড়া পা ভাঙছি।

বদরউদ্দিন সাহেবের কথা শুনে হেসে উঠলাম। বেদনামাখা গলায় বদরউদ্দিন সাহেব বললেন-

: আপনে হাসতেছেন!

: জি। কারণ, আমরা দু’জন একই পথের পথিক; অথচ ফল হইছে ভিন্ন।

: মানে?

: মানে হইল, দুই গরমের ঠেলায় আপনার মতো আমিও ফাঁপরে ছিলাম। এমন সময় একটা আবিষ্কার আমারে স্বস্তির পথ দেখাইছে।

: কী রকম?

: বাসায় পানি ফোটানোর পর পান করার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এই মাসের প্রথম সপ্তাহে ভুল কইরা কল থেইকা ওয়াসার সাপ্লাই করা কাঁচা পানি পান কইরা ফেলছিলাম। নাশতা কইরা বাজারে রওনা হওয়ার সময় পেটের পাইপলাইনে গরগর আওয়াজ উঠল। এরপর আষাঢ় মাইসা ঢলের মতো ডাইরেক্ট অ্যাকশন শুরু হইয়া গেল। দেখলাম-পদ্ধতিটা অতি চমৎকার। এরপর থেইকা ছুটির দিন ভোরবেলা চুপিচুপি পেটের মধ্যে কয়েক গ্লাস সাপ্লাইয়ের পানি ডাইরেক্ট চালান কইরা পরপর তিন সপ্তাহ আরামেই ছিলাম।

আমার কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বদরউদ্দিন সাহেব বললেন-

: ভাই, ভাদ্র মাস শেষ হইলে গরমও নিশ্চয়ই কমবে; কিন্তু বাজারের গরমের অবসান সহসা ঘটবে বইলা তো মনে হইতেছে না।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন