শান্তি নাই
jugantor
রম্য গল্প
শান্তি নাই

  মোকাম্মেল হোসেন  

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মকবুল সাহেব বসে আছেন। আমার ধারণা, এবারও তিনি বড় ধরনের কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। আমার নিজেরই সমস্যার অন্ত নেই। এ অবস্থায় অন্যের সমস্যার কথা শুনতে ইচ্ছে করে না। দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বললাম-

: মামা, বলেন...

কোনো ভূমিকায় না গিয়ে আর্তনাদের সুরে মকবুল সাহেব বললেন-

: ভাইগ্না, শান্তি নাই!

মকবুল সাহেবের স্ত্রীর ডাকনাম শান্তি। চমকে উঠলাম। নাই মানে হেজ গন। সাধারণত মরবার আগে একটা শক্ত অসুখ-বিসুখ হওয়ার নিয়ম। সেরকম কিছু হলে আমি জানতাম। তবে কী তিনি বেমক্কা অক্কা পেয়ে গেলেন? কোনো নোটিশ ছাড়াই তার হাতে অনন্তপুরের টিকিট ধরিয়ে দেওয়া হলো? জোরে ইন্নালিল্লাহ পড়ার পর জানতে চাইলাম-

: ঘটনা কবে ঘটল! মামি কীভাবে মারা গেলেন?

আমার কথা শুনে মকবুল সাহেবের চোখ ছোট হয়ে গেল। বললেন-

: তোমার মামি মারা গেছে, এই কথা তোমারে কে বলল?

লে হালুয়া। এ দেখছি ধমক দিচ্ছে! দ্বিধাগ্রস্ত হলাম। স্ত্রীর শোকে মামার মাথা আউট হয়ে যায়নি তো? ক্ষীণকণ্ঠে বললাম-

: আপনেই তো বললেন...

মকবুল সাহেব ঠা-ঠা শব্দে হাসতে লাগলেন। পরে বললেন-

: একটা জ্যান্ত মানুষরে তুমি মাইরা ফেললা?

অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে কিছু বলার চেষ্টা করতেই মামা বললেন-

: আমি বলছি ‘বিলাই’; আর তুমি বুঝছ ‘কিলাই’। আরে! আমি ঘরের শান্তির কথা বলি নাই, মনের শান্তির কথা বলছি।

: মনে শান্তি না থাকলে বনে যান।

: বাহ! তোমার বুদ্ধি তো খুবই প্রখর। আমি আসলে বনে যাওয়ার নিয়ত কইরাই তোমার কাছে আসছি।

কথার কথা হিসাবে বনে যেতে বলেছি; কিন্তু এই লোক তো সত্যি সত্যি বনবাসী হওয়ার পরিকল্পনা করে বসে আছে! অবাক হয়ে বললাম-

: বনে গেলে আপনার সংসার দেখবে কে?

: সংসারের দায়িত্ব তোমার মামির কাছে হ্যান্ডওভার করছি।

: তাইলে তো আর কোনো সমস্যাই নাই। কোথায় যাবেন, ঠিক করেছেন?

: সুন্দরবনে গেলে কেমন হয়?

: মন্দ হয় না। তবে সেখানে এখনো কিছু রয়েল বেঙ্গল টাইগার অস্তিত্ব টিকাইয়া রাখছে। তা ছাড়া বনদস্যুদের হাতে ধরা খাইলে চাহিদা অনুযায়ী মুক্তিপণ দিতে হবে। না দিলে তারা আপনের মাথার খুলি দিয়া লুডু খেলবে, এইটা নিশ্চিত।

: সর্বনাশ! তাইলে উপায়?

কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকার পর বললাম-

: গ্রামে চইলা যান।

মকবুল সাহেব আপত্তি জানালেন। বললেন-

: ওরে বাপরে! গ্রাম এখন ‘শান্তির নীড়’ নাই। আগে যে ভিলেজ পলিটিক্স এনালগ সিস্টেমে হইত, এখন সেইটা ডিজিটাল পদ্ধতিতে হয়। শোন, কয়েকদিন আগে বেদে সম্প্রদায়রে লইয়া একটা টেলিফিল্ম দেখলাম। বাইদ্যাদের ওয়াটার-লাইফ দেইখা আমি অভিভূত হইছি। রাজধানীর আশপাশের একটা নদীতে জলটুঙ্গি নির্মাণ কইরা সেইখানে বাকি জীবন কাটাইলে কেমন হয়?

: মামা, টেলিভিশনে দেখা চিত্রের সঙ্গে বাস্তবের মিল পাওয়া দুষ্কর। আপনে সরেজমিনে গেলে দেখতে পাবেন-তুরাগের পানি আলকাতরার মতো। বুড়িগঙ্গার পানি পোড়া মবিলের মতো। আর শীতলক্ষ্যারে মনে হবে কচুরিপানার জঙ্গল। এ রকম পরিবেশে বাস করা কি সম্ভব? আপনে বরং বঙ্গোপসাগরে চইলা যান। সাগরের পরিবেশ এখন পর্যন্ত ভালো আছে।

: কিন্তু সেইখানে তো জলদস্যুদের ভয়ংকর উৎপাত। তারা আমারে খুন কইরা লাশ সাগরে ভাসাইয়া দিলে কে দেখবে? মরহুম হওয়ার পর একমুঠ মাটি পাব না, এইটা মাইনা নেওয়া কষ্টকর।

শুধু বিপদ নয়, যাকে বলে মহাবিপদ; মকবুল সাহেবকে নিয়ে হয়েছে সেই দশা। উঁচুস্বরে বললাম-

: মামা, আপনে যেভাবে শান্তি অন্বেষণ করতেছেন, টেকনাফ থেইকা তেঁতুলিয়া পর্যন্ত কোথাও তার দেখা পাবেন না। এ অবস্থায় দুইটা পথ খোলা আছে-এক. আপনে নন্দলাল হইয়া ঘরে বইসা থাকবেন। দুই. দেশের রাজনীতিক, আমলা, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবীদের মতো দুবাই-মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর-কানাডায় সেকেন্ড হোম নির্মাণ কইরা সেইখানে গোয়িং করবেন। কোনটা করতে চান, ভাইবা দেখেন।

রম্য গল্প

শান্তি নাই

 মোকাম্মেল হোসেন 
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মকবুল সাহেব বসে আছেন। আমার ধারণা, এবারও তিনি বড় ধরনের কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। আমার নিজেরই সমস্যার অন্ত নেই। এ অবস্থায় অন্যের সমস্যার কথা শুনতে ইচ্ছে করে না। দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বললাম-

: মামা, বলেন...

কোনো ভূমিকায় না গিয়ে আর্তনাদের সুরে মকবুল সাহেব বললেন-

: ভাইগ্না, শান্তি নাই!

মকবুল সাহেবের স্ত্রীর ডাকনাম শান্তি। চমকে উঠলাম। নাই মানে হেজ গন। সাধারণত মরবার আগে একটা শক্ত অসুখ-বিসুখ হওয়ার নিয়ম। সেরকম কিছু হলে আমি জানতাম। তবে কী তিনি বেমক্কা অক্কা পেয়ে গেলেন? কোনো নোটিশ ছাড়াই তার হাতে অনন্তপুরের টিকিট ধরিয়ে দেওয়া হলো? জোরে ইন্নালিল্লাহ পড়ার পর জানতে চাইলাম-

: ঘটনা কবে ঘটল! মামি কীভাবে মারা গেলেন?

আমার কথা শুনে মকবুল সাহেবের চোখ ছোট হয়ে গেল। বললেন-

: তোমার মামি মারা গেছে, এই কথা তোমারে কে বলল?

লে হালুয়া। এ দেখছি ধমক দিচ্ছে! দ্বিধাগ্রস্ত হলাম। স্ত্রীর শোকে মামার মাথা আউট হয়ে যায়নি তো? ক্ষীণকণ্ঠে বললাম-

: আপনেই তো বললেন...

মকবুল সাহেব ঠা-ঠা শব্দে হাসতে লাগলেন। পরে বললেন-

: একটা জ্যান্ত মানুষরে তুমি মাইরা ফেললা?

অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে কিছু বলার চেষ্টা করতেই মামা বললেন-

: আমি বলছি ‘বিলাই’; আর তুমি বুঝছ ‘কিলাই’। আরে! আমি ঘরের শান্তির কথা বলি নাই, মনের শান্তির কথা বলছি।

: মনে শান্তি না থাকলে বনে যান।

: বাহ! তোমার বুদ্ধি তো খুবই প্রখর। আমি আসলে বনে যাওয়ার নিয়ত কইরাই তোমার কাছে আসছি।

কথার কথা হিসাবে বনে যেতে বলেছি; কিন্তু এই লোক তো সত্যি সত্যি বনবাসী হওয়ার পরিকল্পনা করে বসে আছে! অবাক হয়ে বললাম-

: বনে গেলে আপনার সংসার দেখবে কে?

: সংসারের দায়িত্ব তোমার মামির কাছে হ্যান্ডওভার করছি।

: তাইলে তো আর কোনো সমস্যাই নাই। কোথায় যাবেন, ঠিক করেছেন?

: সুন্দরবনে গেলে কেমন হয়?

: মন্দ হয় না। তবে সেখানে এখনো কিছু রয়েল বেঙ্গল টাইগার অস্তিত্ব টিকাইয়া রাখছে। তা ছাড়া বনদস্যুদের হাতে ধরা খাইলে চাহিদা অনুযায়ী মুক্তিপণ দিতে হবে। না দিলে তারা আপনের মাথার খুলি দিয়া লুডু খেলবে, এইটা নিশ্চিত।

: সর্বনাশ! তাইলে উপায়?

কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকার পর বললাম-

: গ্রামে চইলা যান।

মকবুল সাহেব আপত্তি জানালেন। বললেন-

: ওরে বাপরে! গ্রাম এখন ‘শান্তির নীড়’ নাই। আগে যে ভিলেজ পলিটিক্স এনালগ সিস্টেমে হইত, এখন সেইটা ডিজিটাল পদ্ধতিতে হয়। শোন, কয়েকদিন আগে বেদে সম্প্রদায়রে লইয়া একটা টেলিফিল্ম দেখলাম। বাইদ্যাদের ওয়াটার-লাইফ দেইখা আমি অভিভূত হইছি। রাজধানীর আশপাশের একটা নদীতে জলটুঙ্গি নির্মাণ কইরা সেইখানে বাকি জীবন কাটাইলে কেমন হয়?

: মামা, টেলিভিশনে দেখা চিত্রের সঙ্গে বাস্তবের মিল পাওয়া দুষ্কর। আপনে সরেজমিনে গেলে দেখতে পাবেন-তুরাগের পানি আলকাতরার মতো। বুড়িগঙ্গার পানি পোড়া মবিলের মতো। আর শীতলক্ষ্যারে মনে হবে কচুরিপানার জঙ্গল। এ রকম পরিবেশে বাস করা কি সম্ভব? আপনে বরং বঙ্গোপসাগরে চইলা যান। সাগরের পরিবেশ এখন পর্যন্ত ভালো আছে।

: কিন্তু সেইখানে তো জলদস্যুদের ভয়ংকর উৎপাত। তারা আমারে খুন কইরা লাশ সাগরে ভাসাইয়া দিলে কে দেখবে? মরহুম হওয়ার পর একমুঠ মাটি পাব না, এইটা মাইনা নেওয়া কষ্টকর।

শুধু বিপদ নয়, যাকে বলে মহাবিপদ; মকবুল সাহেবকে নিয়ে হয়েছে সেই দশা। উঁচুস্বরে বললাম-

: মামা, আপনে যেভাবে শান্তি অন্বেষণ করতেছেন, টেকনাফ থেইকা তেঁতুলিয়া পর্যন্ত কোথাও তার দেখা পাবেন না। এ অবস্থায় দুইটা পথ খোলা আছে-এক. আপনে নন্দলাল হইয়া ঘরে বইসা থাকবেন। দুই. দেশের রাজনীতিক, আমলা, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবীদের মতো দুবাই-মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর-কানাডায় সেকেন্ড হোম নির্মাণ কইরা সেইখানে গোয়িং করবেন। কোনটা করতে চান, ভাইবা দেখেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন