ডাক্তার ইন ডাক্তার আউট
jugantor
রম্যগল্প
ডাক্তার ইন ডাক্তার আউট

  মোকাম্মেল হোসেন  

০৩ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সদ্য পাশ করা নবীন ডাক্তার আলী আকবরের একটা ব্যবস্থা হলো। ব্যবস্থাটা আহামরি কিছু না; কিন্তু আলী আকবর এতেই খুশি। যে কোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জনে তা প্রয়োগের ক্ষেত্র যদি পাওয়া না যায়, তাহলে এর চেয়ে বেদনার আর কিছু হতে পারে না। বেদনার সাগরে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হওয়ার আগেই রোগমুক্তি ফার্মেসির মালিক আফসার মিয়া আলী আকবরকে উদ্ধার করলেন। ঠিক হলো, উপার্জনের পুরোটাই নিজের পকেটে রাখার অধিকারী হয়ে বিকাল পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ফার্মেসিতে বসে রোগী দেখবে আলী আকবর। বিনিময়ে ফার্মেসির বিক্রি যাতে বাড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখবে সে।

ডা. ডোনান কোয়েল রোগী না পেয়ে শার্লক হোমসের মতো কালজয়ী গোয়েন্দা উপন্যাস লিখেছিলেন। তেমনি দীর্ঘদিন রোগী না পাওয়া আলী আকবরও কালজয়ী কিছু সৃষ্টি করতে মনস্থ করল। স্কুল জীবনে টুকটাক পদ্য লেখার অভ্যাস ছিল। কবিতাকে অবলম্বন করেই কালের ভেলায় সওয়ার হলো সে। প্রেসক্রিপসন লেখার প্যাডগুলো এক সময় ভরে উঠল নানা কিসিমের পদাবতে। কিন্তু লিখতে লিখতে ক্লান্ত-শ্রান্ত-অবসন্ন আলী আকবর পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকদের তার সৃষ্টির গভীরতা সম্পর্কে বোঝাতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হলো।

ব্যর্থ আলী আকবর এ লাইনে ইস্তফা দিয়ে নতুন লাইনে গাড়ি চালানোর সিদ্ধান্ত নিল। নতুন এ লাইন হচ্ছে প্রেমের লাইন। সে চিন্তা করে দেখল, মজনুকে বাংলাদেশের যত মানুষ চেনে, নিউটনকে তার লাখ ভাগের এক ভাগ মানুষও চিনে না। মজনুর নামে অমরত্বের ‘নিশান’ ওড়ানোর সংকল্প করার পর আলী আকবরের ‘নিশানা’ হলো আফসার মিয়ার বড় মেয়ে মুমিনুন্নেছা কলেজের ছাত্রী মুন্নি। প্রেমের আগরবাতি জ্বেলে আলী আকবর যখন মুন্নির হৃদয়-মন্দিরের বন্ধ কপাট খোলার উপায় অনুসন্ধান করছে, তখন দৈবের সহযোগিতা পাওয়া গেল। খবর এলো, রান্না করতে গিয়ে মুন্নির হাত পুড়ে গেছে। মুন্নির ক্ষতস্থানে ক্রিম মেখে দিয়ে ব্যান্ডেজ করার পর আলী আকবর তাকে বলল-

: তোমারে একটা ধাঁধাঁ জিজ্ঞাসা করি?

: কী ধাঁধাঁ?

: আগুনে ঘরবাড়ি, বনজঙ্গল, লোহালক্কড়, কাপড়চোপড়; এমনকি মানুষের হাতও পুড়ে। কিন্তু পৃথিবীতে এমন একটা জিনিস আছে, যা আগুন ছাড়াই পোড়ে!

: এটা বলা এমন কঠিন কী! এটা হচ্ছে মন। মানুষের মন দগ্ধ হইতে আগুন লাগে না আকবর ভাই।

: তুমি তো দেখছি অনেক বুদ্ধিমান!

: ব্যাকরণে ভুল করলেন। আমার ক্ষেত্রে বলতে হবে বুদ্ধিমতি।

: ও ঠিক, বুদ্ধিমতি; ডাক্তারি পড়তে গিয়া ভাষাজ্ঞান সব গুবলেট হইয়া গেছে।

ভাষাজ্ঞান গুবলেট হওয়া সত্ত্বেও আলী আকবরের প্রেমের ট্যাবলেট মুন্নি খেল এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মুন্নি যতটা না কাহিল হলো, তারচেয়ে অনেক বেশি কাহিল হলো আলী আকবর নিজে। বিকেলবেলা এখন আর সে ফার্মেসিতে বসে না; এর বদলে মুন্নিকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় বিপিন পার্কে, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে অথবা নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ায় ব্রহ্মপুত্রের বুকে। এ সময় একদিন বিসিএস লিখিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করায় আলী আকবর পরীক্ষা দিতে ঢাকায় এলো। তবে মুন্নির ভাবনা মস্তিষ্কের কোষগুলোয় ক্ষণে ক্ষণে ধাক্কা মারায় পরীক্ষা তেমন জুৎ হলো না। অবশেষে পরীক্ষা শেষ হলো এবং কালবিলম্ব না করে ওইদিনই ময়মনসিংহে পৌঁছে মুন্নিদের বাসায় গেল সে। আফসার মিয়া বাসায় ছিলেন। উদভ্রান্ত আলী আকবরকে দেখে তিনি বললেন-

: আরে ডাকতর সাব যে! কী খবর?

: ভালা। এদিকের কী খবর?

: মাশা আল্লাহ ভালা। একটা সুখবর আছে।

: কী?

: মুন্নির বিয়াটা দিয়া ফেললাম। জামাই কানাডা প্রবাসী, ইঞ্জিনিয়ার; খুবই দেখনদার ছেলে।

: মুন্নিরে বিয়া দিয়া দিছুইন?

: হ।

: এই বিয়াতে মুন্নির মত ছিল?

: সর্বনাশ! এই যুগের মাইয়া না? মতামত না লইয়া বিয়া দেওনের উপায় আছে?

এর পরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। কিছুক্ষণের মধ্যেই আফসার মিয়ার বাসার সামনে একটা অ্য্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়াল এবং অচেতন আকবর আলীকে পেটের ভেতর পুরে হাসপাতাল অভিমুখে দৌড়াতে লাগল।

mokamia@hotmail.com

রম্যগল্প

ডাক্তার ইন ডাক্তার আউট

 মোকাম্মেল হোসেন 
০৩ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সদ্য পাশ করা নবীন ডাক্তার আলী আকবরের একটা ব্যবস্থা হলো। ব্যবস্থাটা আহামরি কিছু না; কিন্তু আলী আকবর এতেই খুশি। যে কোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জনে তা প্রয়োগের ক্ষেত্র যদি পাওয়া না যায়, তাহলে এর চেয়ে বেদনার আর কিছু হতে পারে না। বেদনার সাগরে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হওয়ার আগেই রোগমুক্তি ফার্মেসির মালিক আফসার মিয়া আলী আকবরকে উদ্ধার করলেন। ঠিক হলো, উপার্জনের পুরোটাই নিজের পকেটে রাখার অধিকারী হয়ে বিকাল পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ফার্মেসিতে বসে রোগী দেখবে আলী আকবর। বিনিময়ে ফার্মেসির বিক্রি যাতে বাড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখবে সে।

ডা. ডোনান কোয়েল রোগী না পেয়ে শার্লক হোমসের মতো কালজয়ী গোয়েন্দা উপন্যাস লিখেছিলেন। তেমনি দীর্ঘদিন রোগী না পাওয়া আলী আকবরও কালজয়ী কিছু সৃষ্টি করতে মনস্থ করল। স্কুল জীবনে টুকটাক পদ্য লেখার অভ্যাস ছিল। কবিতাকে অবলম্বন করেই কালের ভেলায় সওয়ার হলো সে। প্রেসক্রিপসন লেখার প্যাডগুলো এক সময় ভরে উঠল নানা কিসিমের পদাবতে। কিন্তু লিখতে লিখতে ক্লান্ত-শ্রান্ত-অবসন্ন আলী আকবর পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকদের তার সৃষ্টির গভীরতা সম্পর্কে বোঝাতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হলো।

ব্যর্থ আলী আকবর এ লাইনে ইস্তফা দিয়ে নতুন লাইনে গাড়ি চালানোর সিদ্ধান্ত নিল। নতুন এ লাইন হচ্ছে প্রেমের লাইন। সে চিন্তা করে দেখল, মজনুকে বাংলাদেশের যত মানুষ চেনে, নিউটনকে তার লাখ ভাগের এক ভাগ মানুষও চিনে না। মজনুর নামে অমরত্বের ‘নিশান’ ওড়ানোর সংকল্প করার পর আলী আকবরের ‘নিশানা’ হলো আফসার মিয়ার বড় মেয়ে মুমিনুন্নেছা কলেজের ছাত্রী মুন্নি। প্রেমের আগরবাতি জ্বেলে আলী আকবর যখন মুন্নির হৃদয়-মন্দিরের বন্ধ কপাট খোলার উপায় অনুসন্ধান করছে, তখন দৈবের সহযোগিতা পাওয়া গেল। খবর এলো, রান্না করতে গিয়ে মুন্নির হাত পুড়ে গেছে। মুন্নির ক্ষতস্থানে ক্রিম মেখে দিয়ে ব্যান্ডেজ করার পর আলী আকবর তাকে বলল-

: তোমারে একটা ধাঁধাঁ জিজ্ঞাসা করি?

: কী ধাঁধাঁ?

: আগুনে ঘরবাড়ি, বনজঙ্গল, লোহালক্কড়, কাপড়চোপড়; এমনকি মানুষের হাতও পুড়ে। কিন্তু পৃথিবীতে এমন একটা জিনিস আছে, যা আগুন ছাড়াই পোড়ে!

: এটা বলা এমন কঠিন কী! এটা হচ্ছে মন। মানুষের মন দগ্ধ হইতে আগুন লাগে না আকবর ভাই।

: তুমি তো দেখছি অনেক বুদ্ধিমান!

: ব্যাকরণে ভুল করলেন। আমার ক্ষেত্রে বলতে হবে বুদ্ধিমতি।

: ও ঠিক, বুদ্ধিমতি; ডাক্তারি পড়তে গিয়া ভাষাজ্ঞান সব গুবলেট হইয়া গেছে।

ভাষাজ্ঞান গুবলেট হওয়া সত্ত্বেও আলী আকবরের প্রেমের ট্যাবলেট মুন্নি খেল এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মুন্নি যতটা না কাহিল হলো, তারচেয়ে অনেক বেশি কাহিল হলো আলী আকবর নিজে। বিকেলবেলা এখন আর সে ফার্মেসিতে বসে না; এর বদলে মুন্নিকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় বিপিন পার্কে, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে অথবা নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ায় ব্রহ্মপুত্রের বুকে। এ সময় একদিন বিসিএস লিখিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করায় আলী আকবর পরীক্ষা দিতে ঢাকায় এলো। তবে মুন্নির ভাবনা মস্তিষ্কের কোষগুলোয় ক্ষণে ক্ষণে ধাক্কা মারায় পরীক্ষা তেমন জুৎ হলো না। অবশেষে পরীক্ষা শেষ হলো এবং কালবিলম্ব না করে ওইদিনই ময়মনসিংহে পৌঁছে মুন্নিদের বাসায় গেল সে। আফসার মিয়া বাসায় ছিলেন। উদভ্রান্ত আলী আকবরকে দেখে তিনি বললেন-

: আরে ডাকতর সাব যে! কী খবর?

: ভালা। এদিকের কী খবর?

: মাশা আল্লাহ ভালা। একটা সুখবর আছে।

: কী?

: মুন্নির বিয়াটা দিয়া ফেললাম। জামাই কানাডা প্রবাসী, ইঞ্জিনিয়ার; খুবই দেখনদার ছেলে।

: মুন্নিরে বিয়া দিয়া দিছুইন?

: হ।

: এই বিয়াতে মুন্নির মত ছিল?

: সর্বনাশ! এই যুগের মাইয়া না? মতামত না লইয়া বিয়া দেওনের উপায় আছে?

এর পরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। কিছুক্ষণের মধ্যেই আফসার মিয়ার বাসার সামনে একটা অ্য্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়াল এবং অচেতন আকবর আলীকে পেটের ভেতর পুরে হাসপাতাল অভিমুখে দৌড়াতে লাগল।

mokamia@hotmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন