শান্তি চাই শান্তি চাই
jugantor
রম্য রচনা
শান্তি চাই শান্তি চাই

  সত্যজিৎ বিশ্বাস  

১৬ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ছোটবেলায় রূপকথার গল্পে সেই যে পড়েছিলাম- অবশেষে রাজা, রানি, রাজপুত্র সবাই মিলে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল। সেই রূপকথার গল্প আজও আমাদের পিছু ছাড়ে না। কেউ ভালো থাকলে বলি, ওরা সুখে শান্তিতে বেশ আছে। বাস্তব দুনিয়া রূপকথার রাজ্য না। বড়ই কঠিন রাজ্য। এ রাজ্যে সুখের সঙ্গে শান্তি শব্দটা জুড়ে দেওয়া হয়েছে মানুষকে সান্ত্বনা দিতে। সুখ আর শান্তিতে আমেদুধে মিশে আছে, এমন একজনকে দেখান তো দেখি? তার গায়ের জামাটা গায়ে দিই।

ছেলেবেলায় আমি যে শুধু ডানপিটে ছিলাম তা নয়, বামপিঠেও ছিলাম। এর, ওর গাছের ফল চুরি করে পিঠের স্কুল ব্যাগে অনেক ভার বইতে পারতাম। অবশ্য পিঠের থেকে পেটের দিকেই নজর ছিল বেশি। জানতাম, পেট শান্তি তো জগৎ শান্তি। দিনশেষে শান্তিটাই আসল কথা। ধরা যে পড়তাম না, তা না। তখন নিজেকে বাচ্চা বলে দাবি করতাম। আহ, কী সুখ শান্তিতে ভরপুর ছিল দিনগুলো। যতই বড় হতে লাগলাম, শান্তিকে নিয়ে শান্তির মা যেন ততই দূরে সরে যেতে লাগল।

বাবুর কথা মনে আছে তো? কী বললেন? কোন বাবু? দেশে ১৬ বছরের নিচে বাবু আছে ১ লাখ, আর ১৬ বছরের ওপরে বাবু আছে ১৯ লাখ। এরই মধ্যে একটা বাবুকেও কী চেনেন না? তেমনই এক বাবুর কথা বলছি। ফুটবল খেলতে আর ষোড়শী মেয়ে দেখতে বড় ভালোবাসত বাবু। সেই ষোল বছর বয়স থেকেই। পাড়ার ফুটবল কোচ শাহীন ভাই বলতেন, ১৬ মানে (ংড়ষড়) সোলো পারফরমেন্স। ফুটবলকে সব সময় ষোড়শীর দৃষ্টিতে দেখবি। সেই শুরু, তারপর কত সময় পার হয়ে গেল, মোড়ের বুড়ো ভিখারি মরে গেল, তার পরের জেনারেশন এখন ভিক্ষায়। যুবক দোকানদারগুলো বুড়ো হয়ে গেল, মোড়ের টং দোকানদাররা রং দোকানদার হয়ে গেল, এমনকি বাবু বাবা হয়ে পাড়া ছেড়ে চলে গেল কিন্তু ষোড়শী প্রেম তাকে ছাড়ল না। রাস্তায় ষোড়শী দেখলে আজও আনন্দ বোধ করে। কেউ কেউ শান্তি খুঁজে পেলেও কেউ কেউ আবার অনেক খুঁজেও সন্ধান পায় না শান্তির। আমার বন্ধু খবির, গভীর অনুসন্ধান করেও শান্তি খুঁজে না পেয়ে হাজির হয়েছিল এক জ্যোতিষীর আস্তানায়।

খবির : বাবা, বিয়ে হয়ে গেল এক যুগ হলো, সংসারে খ্যাটখ্যাট লেগেই আছে।

জ্যোতিষী : স্বামী স্ত্রীতে বনিবনা হয় কবে শুনি?

খবির : তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু যে আশায় বিয়ে করলাম সেই জিনিসটাই তো খুঁজে পেলাম না এখনো।

জ্যোতিষী : কী জিনিস?

খবির : শান্তি। সংসারে শান্তি কই থাকে বাবা?

জ্যোতিষী : চিনি যেখানে থাকে।

খবির : তার মানে?

জ্যোতিষী : সংসারে বউরা রান্নাঘরের আলমিরার কোনো তাকে, কোনো বড় প্লাস্টিকের কৌটার ভেতরে কাচের বয়ামে ভরে তার মধ্যে চিনি রাখে তা যেমন কোনো স্বামী হাজার খুঁজেও বের করতে পারে না, তেমনি শান্তি কই থাকে, সেটাও কোনো স্বামীর পক্ষে জানা সম্ভব নয়!

শান্তি এমনই এক জিনিস। অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজলেও যারে পাওয়া যায় না। শুধু জ্যোতিষী কেন এর স্বাদ পাওয়া অনেক গুরু শিষ্যেরও সাধ্যের বাইরে।

শিষ্য : আচ্ছা গুরুদেব, জনারণ্যে নাকি বনারণ্যে কোথায় গেলে শান্তি পাওয়া যায়?

গুরুদেব : এটা নির্ভর করে জীবনসাথী কেমন, তার ওপর।

শিষ্য : তার মানে?

গুরুদেব : এ যেমন আমি গাছতলায়!

‘আপনি যদি আপনার স্ত্রী/স্বামীকে মনে যা আসে তা বলতে চান আবার সংসারে শান্তিও চান তবে তা ঘুমে স্বপ্নের মধ্যে বলুন।’ এ শান্তির বাণীটি কোন ভুক্তভোগী মনীষী দিয়েছিলেন এ মূহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না। তবে বাণী যে কতটা পাওয়ার ফুল সে নিশ্চয়ই ভুক্তভোগীদের আর বুঝিয়ে বলতে হবে না।

শান্তি কে না চায়? কিন্তু ক’জন তার নাগাল পায়? প্রয়াত সুবীর নন্দী একটা গানে হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে জানতে পেরেছিলেন, পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই। উনি বেঁচে থাকলে আরেকটা প্রশ্ন রাখার অনুরোধ জানাতাম, লক্ষ মনের কাছে প্রশ্ন রাখতে, পৃথিবীতে শান্তি বলে কিছু আছে কিনা!

রম্য রচনা

শান্তি চাই শান্তি চাই

 সত্যজিৎ বিশ্বাস 
১৬ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ছোটবেলায় রূপকথার গল্পে সেই যে পড়েছিলাম- অবশেষে রাজা, রানি, রাজপুত্র সবাই মিলে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল। সেই রূপকথার গল্প আজও আমাদের পিছু ছাড়ে না। কেউ ভালো থাকলে বলি, ওরা সুখে শান্তিতে বেশ আছে। বাস্তব দুনিয়া রূপকথার রাজ্য না। বড়ই কঠিন রাজ্য। এ রাজ্যে সুখের সঙ্গে শান্তি শব্দটা জুড়ে দেওয়া হয়েছে মানুষকে সান্ত্বনা দিতে। সুখ আর শান্তিতে আমেদুধে মিশে আছে, এমন একজনকে দেখান তো দেখি? তার গায়ের জামাটা গায়ে দিই।

ছেলেবেলায় আমি যে শুধু ডানপিটে ছিলাম তা নয়, বামপিঠেও ছিলাম। এর, ওর গাছের ফল চুরি করে পিঠের স্কুল ব্যাগে অনেক ভার বইতে পারতাম। অবশ্য পিঠের থেকে পেটের দিকেই নজর ছিল বেশি। জানতাম, পেট শান্তি তো জগৎ শান্তি। দিনশেষে শান্তিটাই আসল কথা। ধরা যে পড়তাম না, তা না। তখন নিজেকে বাচ্চা বলে দাবি করতাম। আহ, কী সুখ শান্তিতে ভরপুর ছিল দিনগুলো। যতই বড় হতে লাগলাম, শান্তিকে নিয়ে শান্তির মা যেন ততই দূরে সরে যেতে লাগল।

বাবুর কথা মনে আছে তো? কী বললেন? কোন বাবু? দেশে ১৬ বছরের নিচে বাবু আছে ১ লাখ, আর ১৬ বছরের ওপরে বাবু আছে ১৯ লাখ। এরই মধ্যে একটা বাবুকেও কী চেনেন না? তেমনই এক বাবুর কথা বলছি। ফুটবল খেলতে আর ষোড়শী মেয়ে দেখতে বড় ভালোবাসত বাবু। সেই ষোল বছর বয়স থেকেই। পাড়ার ফুটবল কোচ শাহীন ভাই বলতেন, ১৬ মানে (ংড়ষড়) সোলো পারফরমেন্স। ফুটবলকে সব সময় ষোড়শীর দৃষ্টিতে দেখবি। সেই শুরু, তারপর কত সময় পার হয়ে গেল, মোড়ের বুড়ো ভিখারি মরে গেল, তার পরের জেনারেশন এখন ভিক্ষায়। যুবক দোকানদারগুলো বুড়ো হয়ে গেল, মোড়ের টং দোকানদাররা রং দোকানদার হয়ে গেল, এমনকি বাবু বাবা হয়ে পাড়া ছেড়ে চলে গেল কিন্তু ষোড়শী প্রেম তাকে ছাড়ল না। রাস্তায় ষোড়শী দেখলে আজও আনন্দ বোধ করে। কেউ কেউ শান্তি খুঁজে পেলেও কেউ কেউ আবার অনেক খুঁজেও সন্ধান পায় না শান্তির। আমার বন্ধু খবির, গভীর অনুসন্ধান করেও শান্তি খুঁজে না পেয়ে হাজির হয়েছিল এক জ্যোতিষীর আস্তানায়।

খবির : বাবা, বিয়ে হয়ে গেল এক যুগ হলো, সংসারে খ্যাটখ্যাট লেগেই আছে।

জ্যোতিষী : স্বামী স্ত্রীতে বনিবনা হয় কবে শুনি?

খবির : তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু যে আশায় বিয়ে করলাম সেই জিনিসটাই তো খুঁজে পেলাম না এখনো।

জ্যোতিষী : কী জিনিস?

খবির : শান্তি। সংসারে শান্তি কই থাকে বাবা?

জ্যোতিষী : চিনি যেখানে থাকে।

খবির : তার মানে?

জ্যোতিষী : সংসারে বউরা রান্নাঘরের আলমিরার কোনো তাকে, কোনো বড় প্লাস্টিকের কৌটার ভেতরে কাচের বয়ামে ভরে তার মধ্যে চিনি রাখে তা যেমন কোনো স্বামী হাজার খুঁজেও বের করতে পারে না, তেমনি শান্তি কই থাকে, সেটাও কোনো স্বামীর পক্ষে জানা সম্ভব নয়!

শান্তি এমনই এক জিনিস। অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজলেও যারে পাওয়া যায় না। শুধু জ্যোতিষী কেন এর স্বাদ পাওয়া অনেক গুরু শিষ্যেরও সাধ্যের বাইরে।

শিষ্য : আচ্ছা গুরুদেব, জনারণ্যে নাকি বনারণ্যে কোথায় গেলে শান্তি পাওয়া যায়?

গুরুদেব : এটা নির্ভর করে জীবনসাথী কেমন, তার ওপর।

শিষ্য : তার মানে?

গুরুদেব : এ যেমন আমি গাছতলায়!

‘আপনি যদি আপনার স্ত্রী/স্বামীকে মনে যা আসে তা বলতে চান আবার সংসারে শান্তিও চান তবে তা ঘুমে স্বপ্নের মধ্যে বলুন।’ এ শান্তির বাণীটি কোন ভুক্তভোগী মনীষী দিয়েছিলেন এ মূহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না। তবে বাণী যে কতটা পাওয়ার ফুল সে নিশ্চয়ই ভুক্তভোগীদের আর বুঝিয়ে বলতে হবে না।

শান্তি কে না চায়? কিন্তু ক’জন তার নাগাল পায়? প্রয়াত সুবীর নন্দী একটা গানে হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে জানতে পেরেছিলেন, পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই। উনি বেঁচে থাকলে আরেকটা প্রশ্ন রাখার অনুরোধ জানাতাম, লক্ষ মনের কাছে প্রশ্ন রাখতে, পৃথিবীতে শান্তি বলে কিছু আছে কিনা!

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন