চন্দ্রিমায় চন্দ্রগ্রহণ
jugantor
রম্যগল্প
চন্দ্রিমায় চন্দ্রগ্রহণ

  মোকাম্মেল হোসেন  

২৩ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নাম শুনেই লোকে আমাকে চিনে ফেলবে, এমন কামেল আদমী আমি নই। তাই ফাস্ট চান্সেই, মার্জনা করবেন, নিজের ঢোল নিজেকেই বাজাতে হচ্ছে। আমার নাম ইফতেখার উদ্দিন আকাশ, স্বাস্থ্য ভালো, উচ্চতা মানানসই, বয়স পঁচিশের কোঠায়, পড়ছি বিশ্ববিদ্যালয়ে, থাকি হলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশাল একটা প্রাঙ্গণে কোনো শিক্ষার্থী সাধারণত নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণায় দগ্ধ হয় না। কিন্তু আমি হচ্ছিলাম। আকাশজোড়া নিঃসঙ্গতা নিয়ে একজন ধার্মিক কিংবা দার্শনিক সুখী হতে পারেন, পারেন স্বরূপ অন্বেষণের দুরূহ পথ পাড়ি দিতে। কিন্তু এসব বাসনা আপাতত আমার নেই, আর সেজন্যই আমার হল থেকে মেয়েদের হলের মাঝখানের সামান্য এই মৃসণ পথটুকু অতিক্রম করতে গিয়ে বার বার হোঁচট খাই, আর আশা করতে থাকি এই বুঝি কেউ উদ্বেগ-আকুল কণ্ঠে বলে উঠল, লেগেছে? ব্যথা পেয়েছেন? আহা, কোথায় দেখি দেখি!

কিন্তু হায়, আমার এই অন্তহীন আশা কেবল সীমাহীন বেদনারই জন্ম দেয়; বেদনা উপশমের কোনো পথ বাতলে দেয় না।

এই অবস্থায় উপনীত হওয়ার পর আমার বয়সি সুহৃদগণ কেউ নেশা রাজ্যের রাজন রূপে অধিষ্ঠিত হয়, কেউ মানবী হৃদয়ের নিষ্ঠুরতা পরিমাপের জন্য কাব্যরথে সওয়ার হয়। আমি সওয়ার হলাম পত্রিকার পাতায়। মাসিক দেশপ্রেম পত্রিকায় নাম লিখিয়ে বক্ষপিঞ্জরে পুঞ্জীভূত বেদনাকে শব্দের আকারে বিন্যাস করে বললাম, মিতা হতে চাই। যে কোনো বয়সের ছেলে-মেয়েরা, ভাবি-খালা-ফুপুরা লিখুন। উত্তরের একশ’ ভাগ নিশ্চয়তা, ইত্যাদি ইত্যাদি।

সপ্তাহ অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই তিনটা চিঠি হাতে এসে পৌঁছলো যার সবই কচি কোমল হাতের নন্দিনী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে লেখা। বাইরের জেলা থেকে আসা দুটো চিঠির আমি কোনো উত্তর দিলাম না। ঢাকার কল্যাণপুর থেকে জনৈকা টিসা যে গালিভার সাইজের চিঠিটি আমাকে লিখল, তার উত্তর আমি লিখলাম আবেগের পক্সিক্ষরাজে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে। চিঠির উত্তর এলো কয়েকদিনের মধ্যেই এবং সুখের জ্যোৎস্নায় গোসল করতে করতে তার প্রতি-উত্তর আমি লিখলাম। এভাবে কয়েক পক্ষকাল চিঠি চালাচালি করার পর এক চিঠিতে আমি টিসাকে লিখলাম-প্রথমে চক্ষের মায়া, তারপর অন্তরের মায়া। তোমারে না দেইখ্যা তো আমি আমার অন্তরে মায়ার আবাদ করবার পারতাছি না। উত্তরে টিসা লিখল-বেশ, তুমি তাহলে সতেরো তারিখ রোববার আমার কলেজের সামনে আসো। আমি টিসার এই প্রস্তাব বাতিল করে দিয়ে লিখলাম-কলেজ হইলো জ্ঞান অর্জনের জায়গা। অইখানে মায়া-দর্শনের জাল বুনাটা ঠিক না। তার চেয়ে তুমি বাইশ তারিখ শুক্রবার বোটানিক্যাল গার্ডেনে চইল্যা আসো।

বোটানিক্যাল গার্ডেনে আমি কোথায় থাকব, আমার হাতে-পায়ে-গায়ে কী থাকবে, তার বিস্তারিত বিবরণ টিসাকে লিখে দিলাম। নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট স্থানে একটা লাল গোলাপ হাতে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। টিসা এলো আধঘণ্টা বিলম্বে। গোলাপসহ মোটামুটি দামি একটা উপহার টিসার হাতে তুলে দিলাম। খুশির আমেজে, খোশমেজাজে আমরা সারা বাগান হেঁটে বেড়ালাম, হাসলাম, গান গাইলাম। তারপর চার লাইনের একটা গীত সৃষ্টি করে টিসাকে উৎসর্গ করার পর সেই গীতের ভাবার্থ অনুযায়ী কিছুটা ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা চালাতেই টিসা বাধা দিয়ে বলল, ‘থামেন।’

‘দোহাই দেবী, অসময়ে থামাইয়া দিও না ট্রেন। ইস্টিশন অহনও অনেক দূর।’

‘আপনের আর ইস্টিশনে পৌঁছা হবে না।’

‘ক্যান?’

‘এইজন্য যে, আমি টিসা না।’

‘তুমি টিসা না, কী কও? তুমি তাইলে কেডা?’

‘আমি মমতাজ।’

‘মমতাজ? অসুবিধা নাই। আমি এফিডেফিট করমু। নিজেরে শাহজাহান হিসাবে ঘোষণা দিমু।’

‘লাভ নাই। আমার শাহজাহান আছে!’

‘এই কথা তুমি আগে কও নাই ক্যান?’

‘বলি নাই তার কারণ আছে।’

‘কী কারণ?’

‘কারণ আপনে যখন কলেজের সামনে দেখা করার প্রস্তাব বাতিল কইরা টিসাকে এইখানে আসতে বললেন, তখন টিসার সন্দেহ হইলো হয় আপনি নারী অপহরণকারী, নয়তো অন্য কোনো বদ-মতলব হাসিলকারী। কিন্তু আমি আপনের পাঠানো পাসপোর্ট সাইজের গোল আলু মার্কা ছবি দেখে মত দিলাম এ নিতান্তই ভদ্রলোক। তখন টিসা পাঁচশ’ টাকা বাজি ধরে বলল আজকের দিনটা আমি যদি আপনের সঙ্গে কাটাইতে পারি তাহলে ওই টাকাটা আমি পামু।’

‘টাকাটা তুমি পাইয়া গেলা মমতাজ।’

‘তাই তো মনে হচ্ছে।’

‘কিন্তু আমি কী পাইলাম?’

আমার এ প্রশ্ন মমতাজের মধ্যে কোনো ভাবান্তর নিয়ে এলো না। তবে প্রকৃতি সহমর্মিতা জানালো প্রকাশ্যে। যে বৃষ্টির জন্য আকুল ছিলাম আমি তা নেমে এলো হঠাৎ আকাশ থেকে করুণার জলধারা হয়ে, আমার অশ্রুধারার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হতে!

রম্যগল্প

চন্দ্রিমায় চন্দ্রগ্রহণ

 মোকাম্মেল হোসেন 
২৩ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নাম শুনেই লোকে আমাকে চিনে ফেলবে, এমন কামেল আদমী আমি নই। তাই ফাস্ট চান্সেই, মার্জনা করবেন, নিজের ঢোল নিজেকেই বাজাতে হচ্ছে। আমার নাম ইফতেখার উদ্দিন আকাশ, স্বাস্থ্য ভালো, উচ্চতা মানানসই, বয়স পঁচিশের কোঠায়, পড়ছি বিশ্ববিদ্যালয়ে, থাকি হলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশাল একটা প্রাঙ্গণে কোনো শিক্ষার্থী সাধারণত নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণায় দগ্ধ হয় না। কিন্তু আমি হচ্ছিলাম। আকাশজোড়া নিঃসঙ্গতা নিয়ে একজন ধার্মিক কিংবা দার্শনিক সুখী হতে পারেন, পারেন স্বরূপ অন্বেষণের দুরূহ পথ পাড়ি দিতে। কিন্তু এসব বাসনা আপাতত আমার নেই, আর সেজন্যই আমার হল থেকে মেয়েদের হলের মাঝখানের সামান্য এই মৃসণ পথটুকু অতিক্রম করতে গিয়ে বার বার হোঁচট খাই, আর আশা করতে থাকি এই বুঝি কেউ উদ্বেগ-আকুল কণ্ঠে বলে উঠল, লেগেছে? ব্যথা পেয়েছেন? আহা, কোথায় দেখি দেখি!

কিন্তু হায়, আমার এই অন্তহীন আশা কেবল সীমাহীন বেদনারই জন্ম দেয়; বেদনা উপশমের কোনো পথ বাতলে দেয় না।

এই অবস্থায় উপনীত হওয়ার পর আমার বয়সি সুহৃদগণ কেউ নেশা রাজ্যের রাজন রূপে অধিষ্ঠিত হয়, কেউ মানবী হৃদয়ের নিষ্ঠুরতা পরিমাপের জন্য কাব্যরথে সওয়ার হয়। আমি সওয়ার হলাম পত্রিকার পাতায়। মাসিক দেশপ্রেম পত্রিকায় নাম লিখিয়ে বক্ষপিঞ্জরে পুঞ্জীভূত বেদনাকে শব্দের আকারে বিন্যাস করে বললাম, মিতা হতে চাই। যে কোনো বয়সের ছেলে-মেয়েরা, ভাবি-খালা-ফুপুরা লিখুন। উত্তরের একশ’ ভাগ নিশ্চয়তা, ইত্যাদি ইত্যাদি।

সপ্তাহ অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই তিনটা চিঠি হাতে এসে পৌঁছলো যার সবই কচি কোমল হাতের নন্দিনী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে লেখা। বাইরের জেলা থেকে আসা দুটো চিঠির আমি কোনো উত্তর দিলাম না। ঢাকার কল্যাণপুর থেকে জনৈকা টিসা যে গালিভার সাইজের চিঠিটি আমাকে লিখল, তার উত্তর আমি লিখলাম আবেগের পক্সিক্ষরাজে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে। চিঠির উত্তর এলো কয়েকদিনের মধ্যেই এবং সুখের জ্যোৎস্নায় গোসল করতে করতে তার প্রতি-উত্তর আমি লিখলাম। এভাবে কয়েক পক্ষকাল চিঠি চালাচালি করার পর এক চিঠিতে আমি টিসাকে লিখলাম-প্রথমে চক্ষের মায়া, তারপর অন্তরের মায়া। তোমারে না দেইখ্যা তো আমি আমার অন্তরে মায়ার আবাদ করবার পারতাছি না। উত্তরে টিসা লিখল-বেশ, তুমি তাহলে সতেরো তারিখ রোববার আমার কলেজের সামনে আসো। আমি টিসার এই প্রস্তাব বাতিল করে দিয়ে লিখলাম-কলেজ হইলো জ্ঞান অর্জনের জায়গা। অইখানে মায়া-দর্শনের জাল বুনাটা ঠিক না। তার চেয়ে তুমি বাইশ তারিখ শুক্রবার বোটানিক্যাল গার্ডেনে চইল্যা আসো।

বোটানিক্যাল গার্ডেনে আমি কোথায় থাকব, আমার হাতে-পায়ে-গায়ে কী থাকবে, তার বিস্তারিত বিবরণ টিসাকে লিখে দিলাম। নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট স্থানে একটা লাল গোলাপ হাতে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। টিসা এলো আধঘণ্টা বিলম্বে। গোলাপসহ মোটামুটি দামি একটা উপহার টিসার হাতে তুলে দিলাম। খুশির আমেজে, খোশমেজাজে আমরা সারা বাগান হেঁটে বেড়ালাম, হাসলাম, গান গাইলাম। তারপর চার লাইনের একটা গীত সৃষ্টি করে টিসাকে উৎসর্গ করার পর সেই গীতের ভাবার্থ অনুযায়ী কিছুটা ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা চালাতেই টিসা বাধা দিয়ে বলল, ‘থামেন।’

‘দোহাই দেবী, অসময়ে থামাইয়া দিও না ট্রেন। ইস্টিশন অহনও অনেক দূর।’

‘আপনের আর ইস্টিশনে পৌঁছা হবে না।’

‘ক্যান?’

‘এইজন্য যে, আমি টিসা না।’

‘তুমি টিসা না, কী কও? তুমি তাইলে কেডা?’

‘আমি মমতাজ।’

‘মমতাজ? অসুবিধা নাই। আমি এফিডেফিট করমু। নিজেরে শাহজাহান হিসাবে ঘোষণা দিমু।’

‘লাভ নাই। আমার শাহজাহান আছে!’

‘এই কথা তুমি আগে কও নাই ক্যান?’

‘বলি নাই তার কারণ আছে।’

‘কী কারণ?’

‘কারণ আপনে যখন কলেজের সামনে দেখা করার প্রস্তাব বাতিল কইরা টিসাকে এইখানে আসতে বললেন, তখন টিসার সন্দেহ হইলো হয় আপনি নারী অপহরণকারী, নয়তো অন্য কোনো বদ-মতলব হাসিলকারী। কিন্তু আমি আপনের পাঠানো পাসপোর্ট সাইজের গোল আলু মার্কা ছবি দেখে মত দিলাম এ নিতান্তই ভদ্রলোক। তখন টিসা পাঁচশ’ টাকা বাজি ধরে বলল আজকের দিনটা আমি যদি আপনের সঙ্গে কাটাইতে পারি তাহলে ওই টাকাটা আমি পামু।’

‘টাকাটা তুমি পাইয়া গেলা মমতাজ।’

‘তাই তো মনে হচ্ছে।’

‘কিন্তু আমি কী পাইলাম?’

আমার এ প্রশ্ন মমতাজের মধ্যে কোনো ভাবান্তর নিয়ে এলো না। তবে প্রকৃতি সহমর্মিতা জানালো প্রকাশ্যে। যে বৃষ্টির জন্য আকুল ছিলাম আমি তা নেমে এলো হঠাৎ আকাশ থেকে করুণার জলধারা হয়ে, আমার অশ্রুধারার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হতে!

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন