যমজ বাচ্চা
jugantor
রম্যগল্প
যমজ বাচ্চা

  জামসেদুর রহমান সজীব  

০১ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঘুমানোর চেষ্টা করব আর ফোন কল আসবে না, এটা অসম্ভব। ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি এসেছি। কিন্তু একবারও শান্তির ঘুম নসিবে জোটেনি। যখনই ঘুমানোর চেষ্টা করি, এর-ওর কল আসে। আজকে বন্ধু সৌমিকের কল পেলাম। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বললাম, ‘হ্যাঁ দোস্ত বল।’

‘সকাল বাজে নয়টা। তুই দেখি ঘুমাচ্ছিস এখনো। গ্রামে কি কেবল ঘুমাইতে আসছিস? বন্ধু-বান্ধবের খোঁজখবর কিছু রাখোস ব্যাটা?’

‘বন্ধু-বান্ধবের জ্বালাতেই তো ঘুমাতে পারি না।’

‘এমনে মরার মতো ঘুমাইলে দেখবি একদিন লাশ ভেবে তোকে দাফন করে ফেলছে!’

‘তাও ভালো। বেঁচে থাকতে ঘুমাতে পারি না। দাফনের পর যদি শান্তি মতো একটু ঘুমাতে পারি!’

‘ধুর ব্যাটা! কাজের কথা শোন, পায়েসের বাড়ি যাচ্ছি। ওগো নাকি জমজ বাচ্চা হইছে। তুই হাত-মুখ ধুয়ে চলে আয়। এখন রাখি।’

এই বলে কল কেটে দিল সৌমিক। পায়েস বলতে সে কায়েসের কথা বলেছে। আমাদের বাল্যকালের বন্ধু। ওর নাকি বাচ্চা হয়েছে। মানে, এটা কীভাবে সম্ভব? ভাবতে গিয়ে মস্তিষ্কের নাট-বল্টু সব ঢিলা হয়ে আসলো।

আমার আশ্চর্য হবার পেছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণ আছে। সেটা বোঝাতে গেলে আগে কায়েস সম্পর্কে বলতে হবে। বন্ধু মহলের সবচাইতে বোকা প্রাণী হলো এই কায়েস। আদর করে তাকে আমরা পায়েস ডাকি। ছেলেটা বিয়ে করেছে এক বছরও হয়নি। বড়জোর সাত মাস হবে হয়তো। এই অল্প সময়ে ওর মতো বোকার হদ্দ কীভাবে বাচ্চা নিল আমার ভাবনাতে কিছু আসে না।

অফিস থেকে ছুটি নিতে পারিনি বিধায় কায়েসের বিয়েতে যাওয়া হয়নি। এ নিয়ে তার অভিমানের শেষ নেই। এতটাই রেগে ছিল যে, কায়েসের বিয়ের পর ওর ছোট বোনের বিয়ে হলো, তার কিছুদিন পর ওর বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করল, অথচ কোনো অনুষ্ঠানেই আমাকে দাওয়াত দেয়নি।

ফ্রেশ হয়ে বেরোলাম বাসা থেকে। তারপর মনে হলো, কায়েসের বাসায় খালি হাতে যাওয়া ঠিক হবে না। এই ভেবে বাজারে গিয়ে দুজন নবজাতকের জন্য পোশাক কিনলাম। যাত্রাপথে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় সবসময়ই ঢিলাঢালা প্যান্ট পরতো কায়েস। দৌড়াতে গেলে বারবার খুলে যেত। কেউ কেউ নিজ গরজে ওর প্যান্ট ধরে রাখতো, যাতে খুলে না যায়। আজ সেই বন্ধু নিজে দুটো বাচ্চার বাপ। তাদের জন্য শার্ট-প্যান্ট নিয়ে যাচ্ছি। এটা এক অদ্ভুত অনুভূতি।

ঘণ্টা খানেক পরের অবস্থা, কায়েসের বাসায় গেস্টরুমে বসে আছি। সৌমিক হ্যাবলা কান্তের মতো তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওর দৃষ্টিভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, যেন মানুষ নয়, ভূত দেখছে। কায়েসের বাসায় আসার পর থেকে কী ঘটছে কিছুই বুঝতে পারছি না। বাচ্চার পোশাক হাতে তুলে দেওয়ার পর মুগুর নিয়ে তেড়ে এসেছিল সে। অকথ্য ভাষায় গাল-মন্দও করেছে। ভাগ্যিস সৌমিক উপস্থিত ছিল। কায়েসকে সে না ঠেকালে মেরে আমার মাথা ফাটিয়ে দিত নিশ্চিত। কিন্তু আমি এখনো বুঝে উঠতে পারলাম না আমার কী দোষ!

‘তোর কি সত্যিই মরার শখ হইছে? কী চাস, আমরা সবাই মিলে তোকে দাফন করব?’ বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করল সৌমিক।

‘আরে আজব! তোরা এসব কী শুরু করলি? কায়েস আমাকে মারতে আসে, আবার তুই বলছিস মরার কথা। আমি তো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।’

এমন সময় কায়েসের স্ত্রী এসে উপস্থিত। এসেই আমার কোলে দুটি ছাগলের বাচ্চা তুলে দিল। বিস্ময়ে কোটর থেকে চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। ছাগলের বাচ্চা দুটির পরনে আমার কিনে আনা পোশাক।

‘আপনার কথা অনেক শুনছি। একসাথে খেলছেন, খাইছেন, ছোট থেকে বড় হইছেন। অনেক ভালো বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও আমাদের বিয়ের দিন আসেন নাই। এতদিন পর যদিও-বা আসলেন, এসে বন্ধুকে অপমান করলেন। মানলাম আমার স্বামী বোকাসোকা মানুষ, তাই বলে এমনটা না করলেও পারতেন। বন্ধুর বাড়িতে মানুষ ফলমূল-মিষ্টি নিয়ে আসে। আর আপনি আসছেন ছাগলের জন্য পোশাক কিনে। ছি! ছি!’

কায়েসের স্ত্রী একটানা কথাগুলো বলল। এই পুরোটা সময় আমি কখনো সৌমিকের দিকে, কখনো ছাগলের দিকে, কখনো আবার কায়েসের স্ত্রীর দিকে তাকিয়েছি। নিজেকে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা মনে হচ্ছে। এরপর কোনোমতে সবার চোখের আড়ালে বাসা থেকে বেরিয়ে আসলাম। খানিক বাদে সৌমিকের কল।

‘কী রে, তুই কই?’

‘হাটে যাই। দেখি আজ নিজেকে ছাগল পরিচয়ে বেচতে পারি কিনা!’

‘পরে গেলে হতো না? ভাবি পায়েস রান্না করেছিল।’

‘পায়েস তুই কায়েসের সাথে খা। দয়া করে আমাকে আর কল দিস না।’

কল কেটে দিয়ে দ্রুত পা চালাতে লাগলাম। আজকের এই লজ্জা নিয়ে কতদিন বেঁচে থাকতে হবে কে জানে। এখন থেকে ফোন কলে খুব সাবধানে কথা বলতে হবে। মানুষের ওপর আর বিশ্বাস নেই। বলে এক, ঘটে আরেক।

রম্যগল্প

যমজ বাচ্চা

 জামসেদুর রহমান সজীব 
০১ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঘুমানোর চেষ্টা করব আর ফোন কল আসবে না, এটা অসম্ভব। ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি এসেছি। কিন্তু একবারও শান্তির ঘুম নসিবে জোটেনি। যখনই ঘুমানোর চেষ্টা করি, এর-ওর কল আসে। আজকে বন্ধু সৌমিকের কল পেলাম। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বললাম, ‘হ্যাঁ দোস্ত বল।’

‘সকাল বাজে নয়টা। তুই দেখি ঘুমাচ্ছিস এখনো। গ্রামে কি কেবল ঘুমাইতে আসছিস? বন্ধু-বান্ধবের খোঁজখবর কিছু রাখোস ব্যাটা?’

‘বন্ধু-বান্ধবের জ্বালাতেই তো ঘুমাতে পারি না।’

‘এমনে মরার মতো ঘুমাইলে দেখবি একদিন লাশ ভেবে তোকে দাফন করে ফেলছে!’

‘তাও ভালো। বেঁচে থাকতে ঘুমাতে পারি না। দাফনের পর যদি শান্তি মতো একটু ঘুমাতে পারি!’

‘ধুর ব্যাটা! কাজের কথা শোন, পায়েসের বাড়ি যাচ্ছি। ওগো নাকি জমজ বাচ্চা হইছে। তুই হাত-মুখ ধুয়ে চলে আয়। এখন রাখি।’

এই বলে কল কেটে দিল সৌমিক। পায়েস বলতে সে কায়েসের কথা বলেছে। আমাদের বাল্যকালের বন্ধু। ওর নাকি বাচ্চা হয়েছে। মানে, এটা কীভাবে সম্ভব? ভাবতে গিয়ে মস্তিষ্কের নাট-বল্টু সব ঢিলা হয়ে আসলো।

আমার আশ্চর্য হবার পেছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণ আছে। সেটা বোঝাতে গেলে আগে কায়েস সম্পর্কে বলতে হবে। বন্ধু মহলের সবচাইতে বোকা প্রাণী হলো এই কায়েস। আদর করে তাকে আমরা পায়েস ডাকি। ছেলেটা বিয়ে করেছে এক বছরও হয়নি। বড়জোর সাত মাস হবে হয়তো। এই অল্প সময়ে ওর মতো বোকার হদ্দ কীভাবে বাচ্চা নিল আমার ভাবনাতে কিছু আসে না।

অফিস থেকে ছুটি নিতে পারিনি বিধায় কায়েসের বিয়েতে যাওয়া হয়নি। এ নিয়ে তার অভিমানের শেষ নেই। এতটাই রেগে ছিল যে, কায়েসের বিয়ের পর ওর ছোট বোনের বিয়ে হলো, তার কিছুদিন পর ওর বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করল, অথচ কোনো অনুষ্ঠানেই আমাকে দাওয়াত দেয়নি।

ফ্রেশ হয়ে বেরোলাম বাসা থেকে। তারপর মনে হলো, কায়েসের বাসায় খালি হাতে যাওয়া ঠিক হবে না। এই ভেবে বাজারে গিয়ে দুজন নবজাতকের জন্য পোশাক কিনলাম। যাত্রাপথে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় সবসময়ই ঢিলাঢালা প্যান্ট পরতো কায়েস। দৌড়াতে গেলে বারবার খুলে যেত। কেউ কেউ নিজ গরজে ওর প্যান্ট ধরে রাখতো, যাতে খুলে না যায়। আজ সেই বন্ধু নিজে দুটো বাচ্চার বাপ। তাদের জন্য শার্ট-প্যান্ট নিয়ে যাচ্ছি। এটা এক অদ্ভুত অনুভূতি।

ঘণ্টা খানেক পরের অবস্থা, কায়েসের বাসায় গেস্টরুমে বসে আছি। সৌমিক হ্যাবলা কান্তের মতো তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওর দৃষ্টিভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, যেন মানুষ নয়, ভূত দেখছে। কায়েসের বাসায় আসার পর থেকে কী ঘটছে কিছুই বুঝতে পারছি না। বাচ্চার পোশাক হাতে তুলে দেওয়ার পর মুগুর নিয়ে তেড়ে এসেছিল সে। অকথ্য ভাষায় গাল-মন্দও করেছে। ভাগ্যিস সৌমিক উপস্থিত ছিল। কায়েসকে সে না ঠেকালে মেরে আমার মাথা ফাটিয়ে দিত নিশ্চিত। কিন্তু আমি এখনো বুঝে উঠতে পারলাম না আমার কী দোষ!

‘তোর কি সত্যিই মরার শখ হইছে? কী চাস, আমরা সবাই মিলে তোকে দাফন করব?’ বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করল সৌমিক।

‘আরে আজব! তোরা এসব কী শুরু করলি? কায়েস আমাকে মারতে আসে, আবার তুই বলছিস মরার কথা। আমি তো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।’

এমন সময় কায়েসের স্ত্রী এসে উপস্থিত। এসেই আমার কোলে দুটি ছাগলের বাচ্চা তুলে দিল। বিস্ময়ে কোটর থেকে চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। ছাগলের বাচ্চা দুটির পরনে আমার কিনে আনা পোশাক।

‘আপনার কথা অনেক শুনছি। একসাথে খেলছেন, খাইছেন, ছোট থেকে বড় হইছেন। অনেক ভালো বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও আমাদের বিয়ের দিন আসেন নাই। এতদিন পর যদিও-বা আসলেন, এসে বন্ধুকে অপমান করলেন। মানলাম আমার স্বামী বোকাসোকা মানুষ, তাই বলে এমনটা না করলেও পারতেন। বন্ধুর বাড়িতে মানুষ ফলমূল-মিষ্টি নিয়ে আসে। আর আপনি আসছেন ছাগলের জন্য পোশাক কিনে। ছি! ছি!’

কায়েসের স্ত্রী একটানা কথাগুলো বলল। এই পুরোটা সময় আমি কখনো সৌমিকের দিকে, কখনো ছাগলের দিকে, কখনো আবার কায়েসের স্ত্রীর দিকে তাকিয়েছি। নিজেকে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা মনে হচ্ছে। এরপর কোনোমতে সবার চোখের আড়ালে বাসা থেকে বেরিয়ে আসলাম। খানিক বাদে সৌমিকের কল।

‘কী রে, তুই কই?’

‘হাটে যাই। দেখি আজ নিজেকে ছাগল পরিচয়ে বেচতে পারি কিনা!’

‘পরে গেলে হতো না? ভাবি পায়েস রান্না করেছিল।’

‘পায়েস তুই কায়েসের সাথে খা। দয়া করে আমাকে আর কল দিস না।’

কল কেটে দিয়ে দ্রুত পা চালাতে লাগলাম। আজকের এই লজ্জা নিয়ে কতদিন বেঁচে থাকতে হবে কে জানে। এখন থেকে ফোন কলে খুব সাবধানে কথা বলতে হবে। মানুষের ওপর আর বিশ্বাস নেই। বলে এক, ঘটে আরেক।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন