বিয়ের দাওয়াত
jugantor
পাঠক রস
বিয়ের দাওয়াত

  শামীম শাহাবুদ্দীন  

১৪ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের মদন ভাই উদার প্রকৃতির লোক। মানে দিলখোলা মানুষ। মদন ভাইয়ের কাছে কেউ কোনো প্রয়োজনে এসে খালি হাতে ফেরত গেছে-এমন কথা তার শত্রুও বলতে পারবে না!

মদন ভাইয়ের সুন্দরী শ্যালিকা জবা। পাড়ার পরিচিত মুখ। আজ তার বিয়ে। তো বড় ভাইয়ের শ্যালিকার বিয়ে, আমরা না এসে পারি! আমরা বলতে আমি, আলম, সিদ্দিক, রাসেল ও বাবুসহ আরও কয়েকজন। আমরা অবশ্য দাওয়াত পাইনি! তাতে কী? আমাদের তো একটা বিবেচনাবোধ আছে! নাকি?

বড় ভাই ব্যস্ত মানুষ, দাওয়াত-টাওয়াত দিতে হয়তো ভুলে গেছেন। পাড়ার পোলাপান হিসাবে বড় ভাইয়ের শ্যালিকার বিয়েতে একটু আমোদ-ফুর্তি করব, দু’চারটা ডাল-ভাত খাব। তা না হলে দু’দিন পরে হয়তো দেখা যাবে বিয়েতে না যাওয়ার কারণে বড় ভাই মাইন্ড করে বসেছেন! সেটা কি ভালো দেখাবে?

বড় ভাইয়ের কথা বাদ দিলাম। উনি তো (জবা) আমাদের বেয়াইন, মানে পাড়াতো বেয়াইন। বেয়াইনের বিয়েতে আসব না? এতটা অকৃতজ্ঞ আমরা কবে ছিলাম!

আসার সময় অবশ্য তাড়াহুড়ার কারণে আমরা গিফট আনতে পারিনি। আমাদের এরকম ভুলভাল কাজের ব্যাপারে মদন ভাই মোটামোটি অবগত আছেন।

সকাল থেকে পেটে দানাপানি কিছু পড়েনি। সবাই মিলে বেয়াইনের সঙ্গে দেখা করা দরকার। সৌজন্য সাক্ষাৎও হলো, মিষ্টি খাওয়াও হলো। বেয়াইন তো আর আমাদের খালি মুখে ফেরাতে পারবে না! দেখা করার উদ্দেশ্যে যেই পা বাড়িয়েছি, অমনি দেখি বড় ভাই সামনে এসে হাজির! তিনি আমাদের দেখে বললেন, ‘তোমরা এসে ভালোই করেছ। গরু কাটার জন্য কসাই বলে রেখেছিলাম, ওরা আসতে দেরি করছে। পুকুরপাড়ে গরু বাঁধা আছে, তোমরা এটাকে জবাই করে কেটে কুটে সাইজ কর। আমি তোমাদের জন্য পানি-মুড়ির ব্যবস্থা করছি।’

খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। খালি পেটে আস্ত গরু কেটে সাইজ করতে হবে? কী আর করা! বড় ভাইয়ের কথা তো আর ফেলতে পারি না। সবাই মিলে কাজে লেগে গেলাম।

গরু কাটাকুটি শেষ। এবার খাওয়ার পালা। পেটের ক্ষুধায় চোখে ধোঁয়া উড়ছে, আর নড়তে পারছি না। দেখি বড় ভাই এদিকেই আসছেন। তার হাতের তালুতে একটি খাঁচার মধ্যে গোটা দশেক ডাব এবং ডাবের উপরে একটি মুড়ির প্যাকেট। ডাব দেখে মনটা খুশিতে নেচে উঠল। এই না হলে বড় ভাই!

তিনি হাত থেকে খাঁচা নামিয়ে আমাদের সামনে রাখলেন এবং বললেন, ‘তোমরা আসার আগে মেহমানকে ডাবের পানি খেতে দিয়েছিলাম। ভাবলাম এগুলো নষ্ট করে লাভ নেই। এক কাজ কর, ডাবগুলোকে মাঝখানে ফেড়ে শাঁস বের করে নাও। তারপর মুড়ির সঙ্গে শাঁস মেখে খাও। খুবই টেস্টি।’

রাজু বলল, ‘হ ভাই; হেব্বি টেস!’

ওর কথা শুনে মনে হলো ফাজিলটার পেছনে কষে দুটো লাথি দিই! কিন্তু পেটের ক্ষুধায় উঠে দাঁড়াতে পারছি না! বাবু বলল, ‘ভাই, আমরা ভাবলাম আপনি ঠান্ডা-ঠুন্ডা মানে কোল্ড ড্রিংকস জাতীয় কিছু খাওয়াবেন!’

‘বোকা ছেলে! ওসব কি কেউ খায়? ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশানো ওই রঙিন পানি আমাকে কখনো খেতে দেখেছ? বড় ভাই হিসাবে আমি তো তোমাদের ওরকম জিনিস খাওয়াতে পারি না!’

সাকিব মুখে সিরিয়াসনেস এনে বলল, ‘না ভাই, পারেন না।’

রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে। সাকিবকে বললাম, ‘এ্যাই, তুই মুখ বন্ধ করবি? বড় ভাইকে বলতে দে।’

বড় ভাই একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে বললেন, ‘সামনের বছর আমার ছোট শালির বিয়ে। তোমাদের আগাম দাওয়াত দিয়ে রাখলাম। তোমরা সবাই আসবে কিন্তু, কেমন?’ এই বলে তিনি আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অন্যদিকে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমরাও হাঁড়ির মতো মুখ কালো করে যার যার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।

রবি বলল, ‘ছোট বেয়াইনের বিয়েতে কিন্তু গিফট নিয়ে যেতে হবে, ভুল করা যাবে না।’ বললাম, ‘রাখ তোর গিফট! ওরকম পাড়াতো বেয়াইনের কপালে ঝাঁটা মারি! ক্ষিধেয় আমার পেট জ্বলে যাচ্ছে! আর উনি কিনা আছেন উনার বেয়াইনকে গিফট দেওয়ার ধান্ধায়!’

পুরানা পল্টন, ঢাকা।

পাঠক রস

বিয়ের দাওয়াত

 শামীম শাহাবুদ্দীন 
১৪ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের মদন ভাই উদার প্রকৃতির লোক। মানে দিলখোলা মানুষ। মদন ভাইয়ের কাছে কেউ কোনো প্রয়োজনে এসে খালি হাতে ফেরত গেছে-এমন কথা তার শত্রুও বলতে পারবে না!

মদন ভাইয়ের সুন্দরী শ্যালিকা জবা। পাড়ার পরিচিত মুখ। আজ তার বিয়ে। তো বড় ভাইয়ের শ্যালিকার বিয়ে, আমরা না এসে পারি! আমরা বলতে আমি, আলম, সিদ্দিক, রাসেল ও বাবুসহ আরও কয়েকজন। আমরা অবশ্য দাওয়াত পাইনি! তাতে কী? আমাদের তো একটা বিবেচনাবোধ আছে! নাকি?

বড় ভাই ব্যস্ত মানুষ, দাওয়াত-টাওয়াত দিতে হয়তো ভুলে গেছেন। পাড়ার পোলাপান হিসাবে বড় ভাইয়ের শ্যালিকার বিয়েতে একটু আমোদ-ফুর্তি করব, দু’চারটা ডাল-ভাত খাব। তা না হলে দু’দিন পরে হয়তো দেখা যাবে বিয়েতে না যাওয়ার কারণে বড় ভাই মাইন্ড করে বসেছেন! সেটা কি ভালো দেখাবে?

বড় ভাইয়ের কথা বাদ দিলাম। উনি তো (জবা) আমাদের বেয়াইন, মানে পাড়াতো বেয়াইন। বেয়াইনের বিয়েতে আসব না? এতটা অকৃতজ্ঞ আমরা কবে ছিলাম!

আসার সময় অবশ্য তাড়াহুড়ার কারণে আমরা গিফট আনতে পারিনি। আমাদের এরকম ভুলভাল কাজের ব্যাপারে মদন ভাই মোটামোটি অবগত আছেন।

সকাল থেকে পেটে দানাপানি কিছু পড়েনি। সবাই মিলে বেয়াইনের সঙ্গে দেখা করা দরকার। সৌজন্য সাক্ষাৎও হলো, মিষ্টি খাওয়াও হলো। বেয়াইন তো আর আমাদের খালি মুখে ফেরাতে পারবে না! দেখা করার উদ্দেশ্যে যেই পা বাড়িয়েছি, অমনি দেখি বড় ভাই সামনে এসে হাজির! তিনি আমাদের দেখে বললেন, ‘তোমরা এসে ভালোই করেছ। গরু কাটার জন্য কসাই বলে রেখেছিলাম, ওরা আসতে দেরি করছে। পুকুরপাড়ে গরু বাঁধা আছে, তোমরা এটাকে জবাই করে কেটে কুটে সাইজ কর। আমি তোমাদের জন্য পানি-মুড়ির ব্যবস্থা করছি।’

খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। খালি পেটে আস্ত গরু কেটে সাইজ করতে হবে? কী আর করা! বড় ভাইয়ের কথা তো আর ফেলতে পারি না। সবাই মিলে কাজে লেগে গেলাম।

গরু কাটাকুটি শেষ। এবার খাওয়ার পালা। পেটের ক্ষুধায় চোখে ধোঁয়া উড়ছে, আর নড়তে পারছি না। দেখি বড় ভাই এদিকেই আসছেন। তার হাতের তালুতে একটি খাঁচার মধ্যে গোটা দশেক ডাব এবং ডাবের উপরে একটি মুড়ির প্যাকেট। ডাব দেখে মনটা খুশিতে নেচে উঠল। এই না হলে বড় ভাই!

তিনি হাত থেকে খাঁচা নামিয়ে আমাদের সামনে রাখলেন এবং বললেন, ‘তোমরা আসার আগে মেহমানকে ডাবের পানি খেতে দিয়েছিলাম। ভাবলাম এগুলো নষ্ট করে লাভ নেই। এক কাজ কর, ডাবগুলোকে মাঝখানে ফেড়ে শাঁস বের করে নাও। তারপর মুড়ির সঙ্গে শাঁস মেখে খাও। খুবই টেস্টি।’

রাজু বলল, ‘হ ভাই; হেব্বি টেস!’

ওর কথা শুনে মনে হলো ফাজিলটার পেছনে কষে দুটো লাথি দিই! কিন্তু পেটের ক্ষুধায় উঠে দাঁড়াতে পারছি না! বাবু বলল, ‘ভাই, আমরা ভাবলাম আপনি ঠান্ডা-ঠুন্ডা মানে কোল্ড ড্রিংকস জাতীয় কিছু খাওয়াবেন!’

‘বোকা ছেলে! ওসব কি কেউ খায়? ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশানো ওই রঙিন পানি আমাকে কখনো খেতে দেখেছ? বড় ভাই হিসাবে আমি তো তোমাদের ওরকম জিনিস খাওয়াতে পারি না!’

সাকিব মুখে সিরিয়াসনেস এনে বলল, ‘না ভাই, পারেন না।’

রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে। সাকিবকে বললাম, ‘এ্যাই, তুই মুখ বন্ধ করবি? বড় ভাইকে বলতে দে।’

বড় ভাই একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে বললেন, ‘সামনের বছর আমার ছোট শালির বিয়ে। তোমাদের আগাম দাওয়াত দিয়ে রাখলাম। তোমরা সবাই আসবে কিন্তু, কেমন?’ এই বলে তিনি আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অন্যদিকে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমরাও হাঁড়ির মতো মুখ কালো করে যার যার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।

রবি বলল, ‘ছোট বেয়াইনের বিয়েতে কিন্তু গিফট নিয়ে যেতে হবে, ভুল করা যাবে না।’ বললাম, ‘রাখ তোর গিফট! ওরকম পাড়াতো বেয়াইনের কপালে ঝাঁটা মারি! ক্ষিধেয় আমার পেট জ্বলে যাচ্ছে! আর উনি কিনা আছেন উনার বেয়াইনকে গিফট দেওয়ার ধান্ধায়!’

পুরানা পল্টন, ঢাকা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন