কাউন্টার অপারেশন
jugantor
রম্যগল্প
কাউন্টার অপারেশন

  চণ্ডীচরণ দাস  

০১ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সন্ধ্যায় বাইরে থেকে জড়ানো গলায় ‘বন্ধু তিনদিন তোর বাড়িত গেলাম...’ গীতখানা কানে আসতেই সবিতা বুঝল আজ কর্তার পেটে ধেনো পড়েছে। মনটা আনন্দে নেচে উঠল সবিতার। মাসের এই দিনটায় বাবুর মেজাজ হয়ে যায় ফুরফুরে, এসেই নেতিয়ে পড়ে বিছানায়। মানুষটা এমনিতে এসব খায় না, বলে, ‘বেকার পয়সা নষ্ট।’ কিন্তু মাসমাইনের দিন কী যে হয় কে জানে! তখন বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায় পড়ে মৌতাত করে আসে। আর ঘরে এসে কী করে আর কী বলে, পরের দিন মনে থাকে না।

অবশ্য অন্য সময় খাবেনই বা কী করে? বাবু এক নম্বরের হাড় কৃপন, হাত দিয়ে জল গলে না। দু’তিনটের বেশি জামা-প্যান্ট নেই। বলে, ‘বেকার বেশি কিনে পয়সা নষ্ট করে কী লাভ?’ বৌকেও আজ পর্যন্ত একটা ভালো কাপড় কিনে দেয়নি। বলে, ‘বিয়েতে পাওয়া কাপড়গুলো পচছে, আর দরকার কী?’ দুঃখের কথা কী বলব! বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত একবার কক্সবাজারের সী বিচ ছাড়া কোত্থাও ঘুরতে নিয়ে যায়নি। বলে, ‘কী দরকার বেকার গাঁটের পয়সা খরচ করে বিপদ ডেকে আনার? চারদিকে যা এক্সিডেন্ট হচ্ছে!’

দরজা খুলে দিতে বাবু টলতে টলতে ঘরে ঢুকলেন। সবিতা ধরে নিয়ে বসাল। কাছে গিয়ে জুতো মোজা খুলে দিতে বসতেই মাথায় এক হাত বুলিয়ে বাবু জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন আছ প্রাণেশ্বরী?’

‘মরণ! ভীমরতি!’ মনে মনে বলতে বলতে জুতো-জোড়া সরিয়ে রেখে করুণ স্বরে সবিতা বলল, ‘আর কেমন থাকব? তুমি তো ফিরেও দেখো না, হাতে তুলে একটা জিনিসও এনে দাও না!’

বাবু অমনি বলে উঠলেন, ‘বলো তোমার কী চাই? সব পাবে, সব এনে দেব।’ বলতে বলতে হাত-পা ছড়িয়ে সোফায় এলিয়ে পড়লেন। অবস্থা আয়ত্তের বাইরে বুঝে সবিতা ধরে ধরে তুলে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল।

মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত বুঝতে পেরে সবিতার অপারেশান শুরু হলো। পকেট থেকে পার্সটা বের করে পরিমাণমতো মালকড়ি বের করে নিয়ে আস্তে আস্তে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারটা খুলে, একটা খামের মধ্যে রেখে দিয়ে, ড্রয়ারটা বন্ধ করে চাবিটা তার ভ্যানিটি ব্যাগে রাখল। আর বাকি টাকাসহ পার্সটা বাবুর পকেটেই আবার ঢুকিয়ে দিল। জানে সকালবেলা উঠে পকেটে পার্স না পেলে তুলকালাম করবে।

পরদিন সকালবেলায় দশটা বাজতে বাবু যথারীতি চান করে খেয়েদেয়ে অফিস চলে গেলেন। বেরিয়ে যেতে ড্রয়ার খুলে দেখেই সবিতার মূর্ছা যাওয়ার অবস্থা, খামটাই নেই! কে নিল? তার স্পষ্ট মনে আছে কাল অপারেশনের পর টাকাটা ওখানেই রেখে চাবি দিয়ে দিয়েছিল। ঘরে কোনো চাকরবাকর নেই, বাইরের লোকও কেউ আসেনি আজ। তাহলে কি ওই নিয়েছে? কিন্তু ও ওইরকম মাতাল অবস্থায় জানবে কী করে যে সবিতাই ওর পকেট থেকে টাকা সরিয়েছে? ড্রয়ারের চাবিই বা পাবে কোথায়? এর আগে তো কখনো এরকম হয়নি!

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে চা খেতে খেতে তবু একবার সবিতা জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁ গো, আমার ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে একটা খাম ছিল দেখেছ?’

বাবু উত্তর না দিয়ে গোঁফের ফাঁকে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন। সবিতা বুঝল কিছু একটা রহস্য আছে। চেপে ধরতে অবশেষে রহস্য ফাঁস করলেন বাবু, ‘ভেবে পাচ্ছিলাম না প্রতি মাসে মাইনের পার্স রাতের মধ্যে হালকা হয়ে যায় কী করে? তাই কাল আর ওসব খাইনি, এমনি অভিনয় করছিলাম ব্যাপারখানা কী দেখতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম আসল রহস্য। তাই সকাল বেলায় সুযোগ বুঝে করলাম আমার কাউন্টার অপারেশন।’ বলে হো-হো করে হেসে উঠলেন।

সবিতার তখন ‘ধরণী দ্বিধা হও’ অবস্থা।

বাবু ব্যাপারটা আঁচ করে কাছে টেনে বললেন, ‘এত মন খারাপ করছ কেন? এই নাও পার্স, তোমার ক্ষতি সুদসহ পূরণ করে নাও।’

কর্তার মুখে এমন অভূতপূর্ব কথা শুনে সবিতার তো নেত্র বিস্ফারিত। খুশিতে মনটা নেচে উঠল। মুচকি হেসে ‘যুগ যুগ জিও’ বলে খপাৎ করে পার্সটা তুলে নিয়ে ঘরে ছুটল অপারেশন সারতে।

শ্রীপুর বাণীপল্লী, কলকাতা।

রম্যগল্প

কাউন্টার অপারেশন

 চণ্ডীচরণ দাস 
০১ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সন্ধ্যায় বাইরে থেকে জড়ানো গলায় ‘বন্ধু তিনদিন তোর বাড়িত গেলাম...’ গীতখানা কানে আসতেই সবিতা বুঝল আজ কর্তার পেটে ধেনো পড়েছে। মনটা আনন্দে নেচে উঠল সবিতার। মাসের এই দিনটায় বাবুর মেজাজ হয়ে যায় ফুরফুরে, এসেই নেতিয়ে পড়ে বিছানায়। মানুষটা এমনিতে এসব খায় না, বলে, ‘বেকার পয়সা নষ্ট।’ কিন্তু মাসমাইনের দিন কী যে হয় কে জানে! তখন বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায় পড়ে মৌতাত করে আসে। আর ঘরে এসে কী করে আর কী বলে, পরের দিন মনে থাকে না।

অবশ্য অন্য সময় খাবেনই বা কী করে? বাবু এক নম্বরের হাড় কৃপন, হাত দিয়ে জল গলে না। দু’তিনটের বেশি জামা-প্যান্ট নেই। বলে, ‘বেকার বেশি কিনে পয়সা নষ্ট করে কী লাভ?’ বৌকেও আজ পর্যন্ত একটা ভালো কাপড় কিনে দেয়নি। বলে, ‘বিয়েতে পাওয়া কাপড়গুলো পচছে, আর দরকার কী?’ দুঃখের কথা কী বলব! বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত একবার কক্সবাজারের সী বিচ ছাড়া কোত্থাও ঘুরতে নিয়ে যায়নি। বলে, ‘কী দরকার বেকার গাঁটের পয়সা খরচ করে বিপদ ডেকে আনার? চারদিকে যা এক্সিডেন্ট হচ্ছে!’

দরজা খুলে দিতে বাবু টলতে টলতে ঘরে ঢুকলেন। সবিতা ধরে নিয়ে বসাল। কাছে গিয়ে জুতো মোজা খুলে দিতে বসতেই মাথায় এক হাত বুলিয়ে বাবু জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন আছ প্রাণেশ্বরী?’

‘মরণ! ভীমরতি!’ মনে মনে বলতে বলতে জুতো-জোড়া সরিয়ে রেখে করুণ স্বরে সবিতা বলল, ‘আর কেমন থাকব? তুমি তো ফিরেও দেখো না, হাতে তুলে একটা জিনিসও এনে দাও না!’

বাবু অমনি বলে উঠলেন, ‘বলো তোমার কী চাই? সব পাবে, সব এনে দেব।’ বলতে বলতে হাত-পা ছড়িয়ে সোফায় এলিয়ে পড়লেন। অবস্থা আয়ত্তের বাইরে বুঝে সবিতা ধরে ধরে তুলে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল।

মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত বুঝতে পেরে সবিতার অপারেশান শুরু হলো। পকেট থেকে পার্সটা বের করে পরিমাণমতো মালকড়ি বের করে নিয়ে আস্তে আস্তে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারটা খুলে, একটা খামের মধ্যে রেখে দিয়ে, ড্রয়ারটা বন্ধ করে চাবিটা তার ভ্যানিটি ব্যাগে রাখল। আর বাকি টাকাসহ পার্সটা বাবুর পকেটেই আবার ঢুকিয়ে দিল। জানে সকালবেলা উঠে পকেটে পার্স না পেলে তুলকালাম করবে।

পরদিন সকালবেলায় দশটা বাজতে বাবু যথারীতি চান করে খেয়েদেয়ে অফিস চলে গেলেন। বেরিয়ে যেতে ড্রয়ার খুলে দেখেই সবিতার মূর্ছা যাওয়ার অবস্থা, খামটাই নেই! কে নিল? তার স্পষ্ট মনে আছে কাল অপারেশনের পর টাকাটা ওখানেই রেখে চাবি দিয়ে দিয়েছিল। ঘরে কোনো চাকরবাকর নেই, বাইরের লোকও কেউ আসেনি আজ। তাহলে কি ওই নিয়েছে? কিন্তু ও ওইরকম মাতাল অবস্থায় জানবে কী করে যে সবিতাই ওর পকেট থেকে টাকা সরিয়েছে? ড্রয়ারের চাবিই বা পাবে কোথায়? এর আগে তো কখনো এরকম হয়নি!

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে চা খেতে খেতে তবু একবার সবিতা জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁ গো, আমার ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে একটা খাম ছিল দেখেছ?’

বাবু উত্তর না দিয়ে গোঁফের ফাঁকে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন। সবিতা বুঝল কিছু একটা রহস্য আছে। চেপে ধরতে অবশেষে রহস্য ফাঁস করলেন বাবু, ‘ভেবে পাচ্ছিলাম না প্রতি মাসে মাইনের পার্স রাতের মধ্যে হালকা হয়ে যায় কী করে? তাই কাল আর ওসব খাইনি, এমনি অভিনয় করছিলাম ব্যাপারখানা কী দেখতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম আসল রহস্য। তাই সকাল বেলায় সুযোগ বুঝে করলাম আমার কাউন্টার অপারেশন।’ বলে হো-হো করে হেসে উঠলেন।

সবিতার তখন ‘ধরণী দ্বিধা হও’ অবস্থা।

বাবু ব্যাপারটা আঁচ করে কাছে টেনে বললেন, ‘এত মন খারাপ করছ কেন? এই নাও পার্স, তোমার ক্ষতি সুদসহ পূরণ করে নাও।’

কর্তার মুখে এমন অভূতপূর্ব কথা শুনে সবিতার তো নেত্র বিস্ফারিত। খুশিতে মনটা নেচে উঠল। মুচকি হেসে ‘যুগ যুগ জিও’ বলে খপাৎ করে পার্সটা তুলে নিয়ে ঘরে ছুটল অপারেশন সারতে।

শ্রীপুর বাণীপল্লী, কলকাতা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন