আমরা সবাই রাজা বাস পথে...

  মো. রায়হান কবির ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দাদা-নাতির সম্পর্ক সব সময় একটু অন্যরকম হয়। দাদারা চান নাতিরা তাদের চিন্তা-চেতনা ধারণ করুক। এগিয়ে নিয়ে যাক তাদের সব শুভ চিন্তা এবং বংশের ধারা। তাই ঘুষ হিসেবে চকলেট কিংবা অন্য কোনো উপহারের বদলে হলেও দাদা বা নানারা তাদের নাতির হাত ধরেই হাঁটতে চান। আর এই পথচলার সুযোগেই নাতি-নাতনির মনে বপন করে যান তাদের উপদেশমূলক সব বার্তা।

অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার খলিল সাহেব তার নাতির কোমল হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যান। স্কুলে যাওয়ার পথে রাস্তার দু’ধারে যা দেখা যায় তার একটি ধারা বিবরণী তিনি নাতিকে দিতে থাকেন। বাসায় কাজের লোক থাকলেও নাতিকে স্কুল থেকে আনা-নেয়ার কাজটি তিনি বেশ উপভোগই করেন। তার উদ্দেশ্য নাতিকে তিনি একজন সচেতন এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবেন। স্কুলে যাওয়ার পথে এলাকার সরু গলি যেমন পড়ে, তেমনি পড়ে রাজপথও। খলিল সাহেব নাতিকে নানা নীতি কথা শিক্ষা দেন। যেমন, কখনও গাড়ি চলা অবস্থায় রাস্তা পার হবে না। রাস্তা পার হবে রাজা বা রাণীর মতো। অর্থাৎ যে পর্যন্ত ট্রাফিক রাস্তা পার হওয়ার সিগন্যাল না দেয় অথবা সেভাবে রাস্তা পারাপারের সুযোগ সৃষ্টি না হয় সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি নাতিকে আফসোস করে বলেন, এদেশের বেপরোয়া ড্রাইভারদের কথা। আক্ষেপ করে বলেন, ড্রাইভারদের যদি একটু মানবতা বোধ থাকত তবে এদেশে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমে যেত। বেঁচে যেত লাখো নিরীহ মানুষ।

জয়ের লক্ষ্যে : খলিল সাহেব অবসরে আছেন অল্প কিছুদিন হল। কিছুদিন আগেও যখন তিনি অফিস করতেন, তখন দেখতেন মানুষ কতটা যুদ্ধ করে বাসে ওঠার জন্য। একদিন ফার্মগেট থেকে মতিঝিলে যেতে বাসে ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন। অনেকক্ষণ পর একটা বাস যখন এলো তখন সবাই রীতিমতো হিংস্র। কে কার আগে উঠবে, কে কাকে ধাক্কা মারছে, কে পড়ে গেল কিংবা ব্যথা পেল- এসব চিন্তার কোনো বালাই নেই। সবার লক্ষ্য বাসের ওই সরু গেট। কেউ বাসের হ্যান্ডেল ধরে সেটা দখল করার চেষ্টা করছে। কেউ বাইরে থেকেই এক পা দরজায় উঠিয়ে দিয়ে সেটা দখলে নিয়ে নিচ্ছে। যারা একটু দুর্বল, তারা অন্য কোনো যাত্রীর কোমর ধরে দখল বজায় রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে মরিয়া হয়ে।

কিন্তু যুদ্ধে নারীদের কী হাল? সে হিসাব কেউ রাখে না। মুখে মানবিকতা, সামাজিকতার অনেক বুলি আওড়ালেও এই খলিল সাহেবও নারীদের কোনো রকমের সুযোগ না দিয়ে স্বার্থপরের মতো সবার আগে ওঠার এবং সিটে বসার চেষ্টা করতেন। কারণ, সব বাসে নারী ও প্রতিবন্ধীদের সিট মানা হয় না। মানা হয় না তুলনামূলক স্পর্শকাতর এই নারী এবং বুড়োদের প্রতি একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার রীতি। অথচ নিজের মেয়ে অথবা বাবা-দাদুরা যখন বাইরে যায় তখন কতই না উদ্বিগ্ন থাকেন গণপরিবহন নিয়ে। কিন্তু নিজে যখন সেই যুদ্ধের যোদ্ধা তখন শুধু একটাই চিন্তা কিভাবে যুদ্ধ জয় করে সিট দখলে নিতে হবে। বাসের জানালা দিয়ে আপাত ব্যর্থ নারী কিংবা কোনো মুরুব্বির করুণ মুখগুলোও তখন কোনো মায়া সৃষ্টি করতে পারে না। তাই নাতিকে যখন ড্রাইভারদের মানবিকতার প্রশ্ন তুলে কথা বলছিলেন, মনে মনে নিজের মানবিকতার ইতিহাসটাও কিভাবে যেন তার মনকে নাড়া দিয়ে গেল।

সবাই রাজা : ঢাকার রাস্তাগুলো আক্ষরিক অর্থেই রাজপথ। কারণ এ পথে শুধু রাজারাই চলাচল করেন। এখানে কেউ কারও নির্দেশনা মানেন না। কেউ কাউকে পরোয়া করেন না। ড্রাইভার ভাবেন না পথচারীর কথা। পথাচারী ভাবেন না নিজের নিরাপত্তার কথা। ফলে পথচারীরা হাঁটেন নিজের মতো করেই। ড্রাইভার গাড়ি চালান তার মতো করেই। সবাই এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ। কে কার আগে যাবেন?

খলিল সাহেব সেদিন রিকশা না পেয়ে নাতিকে নিয়ে হেঁটে আসছিলেন। রাজপথের এদিকটায় যানজট একটু বেশি। ফলে গাড়ি চলে থেমে থেমে। তাই দাদা আর ফুটওভার ব্রিজ না ধরে নাতিকে নিয়ে থেমে থাকা গাড়ির সামনে দিয়ে হাঁটা ধরলেন। এবার নাতি তার কোমল হাত দিয়ে দাদার শীর্ণ হাতে টান দিল। বলল, ‘দাদা ভাই, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করবে না?’

দাদা বললেন, ‘আবার অত উপরে উঠব দাদা ভাই, আমার কোমরে একটু ব্যথা আছে। চল নিচ দিয়েই যাই।’

এবার নাতি বলল, ‘সেদিন রিকশায় বসে যে বললে ওইসব বোকার দলের জন্য জ্যাম হয়, যারা ফুটওভার ব্রিজ থাকতেও নিচ দিয়ে যায়। ওদের বকলে কেন সেদিন? ওদেরও নিশ্চই কোমর ব্যথা ছিল!’

নাতির কথা শুনে লজ্জা পেলেন দাদা। নিজের যুক্তিতেই নিজে বোকা বনে গেলেন।

সে সময় একটা যাত্রী বোঝাই বাস এসে পড়লো নাকের ডগায়। হাত তুলে ড্রাইভারকে ইশারা করলেন বাসটা থামিয়ে নাতিসহ তাকে উদ্ধার করতে।

হেল্পার বাসের গেটে ঝেড়ে এক থাপ্পর মারলো। মানে ড্রাইভার সাবকে বাস থামানোর সংকেত। এক থাপড়ে ‘হল্ট’, দুই থাপ্পড়ে ‘গো’। ঢাকার রাস্তায় বাস স্টপেজের কোনো নির্দেশনা নেই বলে এভাবে বাস থামে যত্রতত্র। যাত্রী ওঠে, যাত্রী নামে-নিজ নিজ সুবিধেমতো। চাহিবা মাত্র বাস থামিয়ে যাত্রী না নামা হলে হেনস্তা হতে হয় হেল্পারকে।

অতএব খলিল সাহেবের হাতের ইশারায় থেমে গেল বাস। হেল্পারের বাজখাঁই ডাক- ব্রেকে ব্রেকে, বাচ্চা আছে। তারপর আর কী, যাত্রী গিজগিজ বাসে নাতিকে নিয়ে ধরে উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ হলো খলিল সাহেবের।

বাস ছুটে চলেছে। নাতি দেখলো রাস্তার পাশের এক বসতবাড়ির বারান্দা থেকে এক ভদ্দরলোক বাস থামানোর ইশারা করছেন, সঙ্গে তার ফুল ফ্যামিলি।

আবার বাসের বডিতে এক থাপ্পড়। হেল্পারের গলায় আওয়াজ, ওস্তাদ ব্রেকে!

বাসে হার্ড ব্রেক। একেবারে চাক্কা জাম। আন্ডা-বাচ্চা নিয়ে ঠেলে বাসের ভেতরে নিজেদের সঁপে দিল সেই ফুল ফ্যামিলি।

গন্তব্যে পৌঁছে নাতিসহ বাস থেকে নিষ্ক্রমণে রীতিমতো মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হলো খলিল সাহেবকে। একটু হলেই ভর্তা হয়ে যেত বাচ্চা নাতিটা।

বাসের কবল থেকে উদ্ধার পেয়ে নাতি দাদাকে প্রশ্ন করলো, পেপার পড়ে তুমি না কাল বললে দাদু, বাস স্টপেজ থাকলে ঢাকার জ্যাম অনেক কমবে?

দাদু একটু লজ্জা পেয়ে বললেন, নিয়মটা চালু হতে একটু সময় নিচ্ছে তো, তাই চান্সটা নেয়া আর কী!

পথ হোক প্রজার : খলিল সাহেব অবসরের পর অনেকটা সময় পাচ্ছেন জীবন নিয়ে ভাবার। জীবনকে নতুন করে দেখার। খলিল সাহেব নিজের আচরণে নিজেই অবাক। এত সব অনিয়ম নিজের অজান্তেই করেছেন! রাস্তার এপারে দাঁড়িয়ে অন্য পারের লোকের দোষ ধরেছেন, মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে বলে! অথচ রাস্তার এপারের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে নিজেই অন্যকে বকেছেন! অনিয়মের এই অদম্য প্রতিযোগিতায় তার মতো শিক্ষিত লোকেরা যদি প্রতিযোগী হন, তবে অর্ধ শিক্ষিত বা মূর্খ ওই ড্রাইভারকে দোষ দিয়ে লাভ কী?

দুটো পয়সার আশায় রাস্তায় দাঁড়ানো ওই ট্রাফিক পুলিশ যদি লাইসেন্সবিহীনকে চলতে দেয়, তবে লাইসেন্সবিহীনকে দোষ দিয়ে লাভ কী? খলিল সাহেবরা এই ঢাকায় অহরহ আছেন, যেমনি আছেন বাসের চাকায় পিষ্ট করে নির্লিপ্ত থাকা ড্রাইভারদের দল। প্রয়োজনের তাগিদে রাস্তার মাঝপথে ছুটে চলা তরুণ যেমন হতাশ করে, তেমনি সদ্য কৈশোর পেরনো বা কৈশোরে পা দেয়া ছেলে-মেয়ের ‘রাষ্ট্র মেরামত’ আমাদের আশাবাদী করে। খলিল সাহেবরা রাজপথের রাজার যেমন একজন দলিল, তেমনি নিজেও সে দলিলের অংশ না হয়ে প্রজার বেশে চলুন নিরাপদ

সড়ক পথে!

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter