ধারাবাহিক রম্য টল ঞঅখক

ব্রেকফাস্টের ব্রেকডাউন

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শায়ের খান

চিকির পিঠের ফিতা বাঁধতে গিয়ে বেশ বিপদে পড়ল টল। বিপদটা বাঁধা নিয়ে না, বাঁধার স্টাইল নিয়ে। গেরো যেভাবে ইচ্ছা মারা যায়। কিন্তু সে তো আর ঘোড়ার লাগাম বাঁধছে না। তার উপর বেশ সাবধানে হাত চালাতে হচ্ছে। কোনোভাবেই আঙুল পিঠে লাগানো যাবে না। মেয়েদের স্কিন সেনসিটিভ। চিকির তাড়ায় হাত চালাল। চটাচট এক স্টাইলে বেঁধে ফেলল। থ্যাংক্স বলে চিকি কি যেন ভেবে হাতের ইশারায় টলকে থামতে বলে বলল, ‘তাং ফাং রাইটার, আপনি কি ড্রাইভ করতে পারেন?’ হেসে টল বলে, ‘পারব না কেন? আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স আপ টু ডেট। রিসেন্টলি বাচ্চা ছেলেমেয়েদের আক্রমণে ৪ বার লাইসেন্স দেখিয়েছি।’ খুশি হয়ে চিকি বলে, ‘চটপট রেডি হয়ে যান। আপনি ড্রাইভ করে নিয়ে যাবেন আমাকে ব্রেকফাস্টে।’ একটু থমকে চিন্তা করে টল। চটপট নিচে চলে যায়।

টল রেডি হতে হতে ভাবে, এত ভোরে সেজেগুজে বাইরে ব্রেকফাস্টের কী হল? বাসায় এমন কোনো ব্রেকফাস্ট আইটেম নাই, যা শহরে পাওয়া যায় না। পুরনো ঢাকার পরোটা, শাহী হালুয়া বা তন্দুরি, নেহারি হলে আলাদা কথা ছিল। বেরিয়ে আসে টল। চিকির ‘ওয়াও’ চিৎকারে বাস্তবে ফিরে। চিকি উত্তেজিত ভাবে বলে, ‘মিস্টার তাং ফাং, আপনি তো আস্ত খ্যাত্তুশ ছিলেন। এত স্মার্টলি ড্রেস আপ করতে পারেন? স্ট্রেঞ্জ!’ টল কোনো রিঅ্যাকশন দেখায় না। চিকি ওকে টিজ করছে। টিট ফর ট্যাট।

‘কুকিজ এন কফিজ’ শপটা বেশ ছিমছাম। বড় স্পেসে এখানে ওখানে ছোট ছোট টেবিলে দু’একজন করে বসা। চিকি অপরাধীর সুরে টলকে বলে, ‘তাং ফাং, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড!’ টল থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘আই ডোন্ট। ওই টেবিলেই বসছি। আপনার বান্ধবীরা আসবে।’ টলের সুবিধাই হয়েছে। সবকিছু অবজার্ভ করা যাবে। ওয়েটারদের ব্যবহারে বোঝা যায়, চিকি এখানে রেগুলার।

মাসট্যাং ঘোড়ার মতো ঠক ঠক স্টাইলে দু’জন লেডি ঢুকল। ক্যাটরিনা কাইফ আর কারেন্ট মাধুরী দীক্ষিত। ক্যাটরিনার দুই হাতে দুই গোবদা গাবদা ছেলে স্কুল ইউনিফর্মে। সাক্ষাৎ চায়নিজ প্যান্ডা। ডান হাতেরটা ছুড়ে দিল চিকির দিকে। উইকেট কিপারের মতো লুফে নিলো চিকি। আর তারপর বুকে জড়িয়ে ধরে ভীষণ আদর। চোখে, মুখে, নাকে, গালে! চিকি ওকে এত আদর করছে কেন? বাকি পান্ডাকে তো করছে না? চিন্তা ভাঙল ওয়েটারের কফি সারভিংয়ে। টলের প্রশ্নবোধকে ওয়েটার চিকিকে দেখিয়ে বলল, ‘ম্যাম।’

ক্যাটরিনা আর মাধুরী অস্থিরভাবে মোবাইলের টাচস্ক্রিন ঘষছে। ওদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বলছে, কারও এখানে আসার কথা ছিল, মিস করেছে।

এখানে সামনে একটা ছোট ব্যালকনি আছে যেখানে বসে এক ছাগল এই ভোরেই সিসা টানছে। ব্যালকনিটাকে সিসা লাউঞ্জ হিসেবেই ব্যবহার করছে ওরা। ক্যাটরিনার ফ্রি পান্ডাটা দৌড়ে সিসা কেড়ে নিয়ে মোমবাতি নেভানোর মতো দুই ফুঁ দিয়ে ‘হি হি হি’ করে আবার মায়েদের দিকে দৌড় দিয়েছে! রাগে ছাগলটা ঘুরে চোখ কটমট করে তাকায়। কিন্তু তিন মুম্বাই সুপারস্টার দেখেই বাচ্চাটার ওপর মায়া জেগে ওঠে। আদরের হাত নাড়া দেয়। মিষ্টি হেসে পাইপ তুলে নিয়ে মুছে আবার সিসা টানতে থাকে রাম ছাগলটা। চিকি কখন যে পাশে এসে বসেছে, টের পায়নি। বলে, ‘টল, আমাদের উঠতে হবে। ফ্রেন্ডসরা ‘টপিংস’ এ ব্রেকফাস্ট করতে চাচ্ছে। চলেন।’

সম্মোহিতের মতো উঠে টল। জীবনে এমন ব্রেকফাস্ট দেখেনি টল। মনে হচ্ছে ব্রেকফাস্ট না, কোরবানির গরু খুঁজতে বেরিয়েছে। কয়েকটা কুকিজে কামড় দিয়ে আধা মগ কফি খেয়ে গোল্ড কার্ড চার্জ করে রেসের ঘোড়ার মতো লাইন দিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্টের জন্য দৌড়াচ্ছে সবাই!

টপিংস-এর পরিবেশটা জমজমাট। ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়ে থেকে ছোট বয়সী, মাঝবয়সী, সব বয়সীতে ঠাঁসা। কে কার চাচা, কে কার বয়ফ্রেন্ড, বোঝা টাফ। এখানেও এত ব্রেকফাস্ট? আগের মতোই টল একা একটা টেবিলে বসেছে। তবে শেয়ার করতে হয়েছে একটা মেয়ের সঙ্গে। অসুবিধা হয় নাই। মেয়েটা একবার শুধু মাথা তুলে বলেছে- প্লিজ। তারপর নন স্টপ মোবাইলে।

চিকিদের টেবিলে ক্যাটরিনার ফোন বাজে। খুশি খুশি ঠোঁটে ফোন রিসিভ করে। দূরের টেবিলে তাকায়। হেসে হাত উঠায় ব্যাটসম্যান তামিম ইকবাল টাইপের দেখতে একজন। যেন ব্রেকফাস্টের সেঞ্চুরি করেছে। ক্যাটরিনা হাফ ছেড়ে বাঁচে। বাঁচে অন্যরাও। শেষমেশ পাওয়া গেল ব্রেকফাস্ট! ক্যাটরিনার ফ্রি পান্ডাটা পিছু পিছু দৌড় লাগাতে চাইল। ধরে ফেলল মাধুরী। এগুলো যেন মুখস্থ। ত্যাঁদড় পান্ডার ঘাড়ে কেশর ধরার মতো শক্ত করে ধরে আছে মাধুরী, আর গোবদা পান্ডা ‘আম্মু আম্মু, মম মম’ করে ছুটতে চাচ্ছে! চিকি ওকে ঠাণ্ডা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এখানেও বাধ্য হয়ে আধা কাপ তিতা ব্ল্যাক কফি গিলতে হয়েছে টলের।

লিফটের গোড়ায় সবাই যখন নামতে যাবে, চিকি টলকে দেখিয়ে বলে, ‘ওহ, লেট মি ইনট্রডিউস।’ থামিয়ে দেয় টল। বাকিটা নিজেই বলে, ‘আই এম হার ড্রইভার।’ ক্যাটরিনা, মাধুরী হেসে দেয়। চোখ ঘুরিয়ে মজা করে মাধুরী বলে, ‘মিস্টার তাং ফাং রাইটার, আমরা সবাই কিন্তু ফেসবুক ফ্রেন্ডস। মাইন্ড ইট, হা-হা-হা!’

যখন গাড়িতে বাসায় ফিরছে চিকি এবং টল, তখন লাঞ্চ টাইম পার হতে চলেছে। টলের মাথায় নানা প্রশ্ন। চিকির কোলের সেই বাচ্চাটা কে? ওর বাচ্চা? ওর কি বিয়ে হয়েছে? নবাবকে জিজ্ঞেস করতে হবে। ওর ফ্রেন্ডসদের মধ্যে মাধুরীকে বয়সে অনেক বড় আর ক্যাটরিনাকে চিকির অনেক ছোট মনে হয়েছে। বয়সের এমন এদিক-সেদিকে কি এত ক্লোজ ফ্রেন্ডশিপ হয়? এদিকে চিকির ফোনে টুং টাং করে নোটিফিকেশনের আওয়াজ আসছে। চিকি পড়ছে আর রাগে টলের দিকে বারবার তাকাচ্ছে। টলের চোখ এড়ায় না সেটা। ড্রাইভ করলে ওর ৬ জোড়া চোখ জš§ নেয়। গম্ভীর গলায় চিকি বলে, ‘মিস্টার তাং ফাং, ড্রেসের ফিতা বাঁধা আর জুতার ফিতা বাঁধা কি এক?’

টল : ডিপেন্ডস অন সিচুয়েশন।

চিকি : কেমন?

টল : গরুর দুধ আর ছাগলের দুধের মতো।

চিকি : মানে?

টল : আলাদা খেলে ডিফারেন্ট, কিন্তু চায়ে মেশালে বোঝা যায় না। ডিপেন্ডস অন সিচুয়েশন।

টলের সঙ্গে পারা যাবে না, জানে চিকি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরে তাকায়।

বাসার গেট আজ হাঁ করে খোলা। ভেতরে গাড়ি ঢোকাতে যাবে, ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে টল! গাড়ি বের করার জন্য জাস্ট টান দিয়েছিল চিকির সেই খাটাশ ভাই জ্যাকি। বেবুনের মতো চিৎকার করে বলে, ‘টেইক ব্যাক ইওর ব্লাডি কার বাইট্টা হারামি!’

আস্তে করে গাড়ি ব্যাক গিয়ারে নিয়ে আসে টল। ইচ্ছে করে ‘ক্যা-অ্যা-অ্যা’ শব্দ করে টান দিয়ে রকেটের মতো বেরিয়ে যায় জ্যাকি, দুই বন্ধুসহ। একেবারে মাফ চাওয়ার সুরে চিকি বলে, ‘প্লিজ মিস্টার রাইটার!’ হেসে টল বলে, ‘প্লিজ কেন? ও তো সেন্সে নেই। আর এগুলো দেখভাল করা তো আমারই দায়িত্ব। মাই জব!’

আস্তে করে গাড়ি ভেতরে ঢুকতে থাকে। সিকিউরিটি গোলাম চিৎকার করে বলে, ‘সা-লা-ম দে!’

বাকি তিন সিকিউরিটি খটাশ করে সালাম ঠুকে! (চলবে)