বক্ররেখা

আমরা আসলে এমনই

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ইমন চৌধুরী

মাঝরাস্তায় একজন যাত্রী তুলতেই রেগে গেল মাহতাব। হেল্পারকে কষে একটা গালিও দিল। পাশের সিট থেকে মাহতাবের পুরনো বন্ধু তৌফিক খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এভাবে গালি দিস না। শুনতে ভালো লাগে না।’

‘ভালো লাগে না মানে! গালি তো কম হয়ে গেছে, ওদের ধরে ধরে মারা উচিত। এটা কি স্টপেজ? মাঝ রাস্তায় এইভাবে যাত্রী ওঠানো বেআইনি। আমাদের অবশ্যই প্রতিবাদ করা উচিত।’

‘তা তো করাই উচিত। কিন্তু প্রতিবাদ করার মতো নৈতিক অবস্থান কি আমাদের আছে?’

‘কেন নেই? চোখের সামনে অনিয়ম দেখার পরও আমরা প্রতিবাদ করবো না? আমরা চুপ থাকি দেখেই তো ওরা সাহস পায়।’

‘আজ সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে আমরা কোথায় থেকে বাসে উঠেছি তোর কি মনে আছে?’

‘মনে থাকবে না কেন, আমাদের বাসার সামনে থেকেই উঠেছি।’

‘আমাদের বাসার সামনে কি কোনো বাস স্টপেজ আছে? নেই। যদিও ঢাকা শহরে এখন আর বাস স্টপেজের কোনো বালাই নেই।

তারপরও মিনিট দুয়েক হাঁটলেই সামনে একটা স্ট্যান্ড ছিল। আমরা হেঁটে সেখানে যেতে পারতাম। সেটা না করে আমরা বাসার সামনে দাঁড়িয়েই বাস থামিয়ে উঠেছি। এই লোকটাও ঠিক একই কাজটা করছে। যে অনিয়ম আমরা করেছি সেই একই অনিয়ম এই লোকটাও করছে। বাসের ড্রাইভারও করছে। সুতরাং প্রতিবাদ করার আগে নিজেকে শোধরাতে হবে সবার আগে।’

মাহতাব চুপ হয়ে গেল। হঠাৎ তার চোখের সামনে একের পর এক টুকরো টুকরো দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগল। ওভারব্রিজ থাকার পরও নিয়মিত রাস্তা দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে মাহতাব। রাস্তা পার হতে হতে মোবাইলে কথা বলছে। ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় গাড়ির সঙ্গে শরীর ঘেঁষে হাঁটছে। হাতে থাকা পরিত্যক্ত আবর্জনা ছুড়ে ফেলছে যত্রতত্র।

মাহতাবকে চুপ থাকতে দেখে তৌফিক মুখ খুলল,‘কী ভাবছিস এত?’

‘কিছু না।’

মাহতাব একটা মুচকি হাসি দিল। ঠিক তখনই বাস থামল একটি নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডে। একজন সুপারভাইজর উঠল গাড়িতে। গুনে দেখল যাত্রীর সংখ্যা। কাগজে সই করে নেমে গেল। নামার সময় বাসের হেল্পার তার হাতে দশ টাকার একটা নোট গুজে দিল। এটা একটা অলিখিত নিয়ম। সুপারভাইজরকে দশ টাকা দিলে গাড়িতে যতজন যাত্রী তারচেয়ে কয়েকজন কম দেখিয়ে সুপারভাইজর কাগজে সই করে দেয়। এই কয়েকজনের টাকা ঢুকে চালক এবং হেল্পারের পকেটে। যাত্রীদের চোখের সামনে এই দুর্নীতি চলছে দিনের পর দিন। মাহতাবের কি প্রতিবাদ করা উচিত?

এই তো গতকালও অফিসের একটা কাজে দশ হাজার টাকা কমিশন নিয়েছে মাহতাব। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি। কোনো রকম ঘুষ ছাড়াই ফাইলটা ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল তার। আজও একটা পার্টি থেকে হাজার দশেক টাকা পাওয়ার কথা। সুপারভাইজারের এই অপকর্মের বিরুদ্ধে মাহতাবের কি প্রতিবাদ করা উচিত? তার কি সেই নৈতিক অবস্থান আছে? একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মাহতাব।

ভাবতে ভাবতে অফিসের সামনে চলে এলো দুই বন্ধু। হেল্পারকে বাস থামাতে নির্দেশ দিয়েই হুড়মুড় করে বাস থেকে নামল দুজন। কিন্তু কেন যেন বাস থেকে নামতে খুব লজ্জা হচ্ছিল মাহতাবের। তার অফিসের সামনে কোনো বাস স্টপেজ নেই। এখানে বাস থামানো সম্পূর্ণ অনৈতিক। মাত্র দু’তিন মিনিট হাঁটলেই একটা বাস স্ট্যান্ড আছে। সবাই সেখানে নামবে। মাহতাবও তো সেখানে নামতে পারত। কয়েক কদম হেঁটে অফিসে ঢুকতে পারত। মাথা নিচু করে অফিসে প্রবেশ করল মাহতাব। অফিসে ঢুকেই পা বাড়াল ওয়াশরুমের দিকে। চোখে-মুখে পানি দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজের চেহারাটা দেখে কেন যেন লজ্জা পেল মাহতাব। দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল সে।