গল্প

পাকিস্তান ভাগ এবং ভুট্টোর গল্প

  মোস্তফা কামাল ২৬ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জুলফিকার আলী ভুট্টো সকালে পত্রিকা পড়ে উদ্বিগ্ন। তিনি পত্রিকা হাতে নিয়ে বাসার এ মাথা ও মাথা ছোটাছুটি করছেন। নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছেন। তিনি কিছুতেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে শেখ মুজিবের বৈঠক মানতে পারছেন না। তিনি মনে মনে বলেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব যদি শেখ মুজিবকে পশ্চিম পাকিস্তানে ডেকে পাঠাতেন তাহলে না হয় কথা ছিল! তিনি নিজে পূর্ব পাকিস্তানে গিয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে! মুজিব কি আমার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল! তিনি যে আমাকে কথা দিলেন, আমার হাতেই পাকিস্তানের ক্ষমতা ন্যস্ত করবেন! তাহলে মুজিবকে এত তোয়াজ করার কী আছে! না না! এটা হতে পারে না! কিছুতেই হতে পারে না!

ভুট্টো সাহেবের ছোটাছুটি দেখে তার স্ত্রী নুশরাত ভুট্টো অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এক পর্যায়ে তার কাছে এগিয়ে গিয়ে বলেন, কী হল ভুট্টো? ওমনভাবে ছোটাছুটি করছ কেন? কোনো সমস্যা?

ভুট্টো সাহেব হাতের পত্রিকাটি নুশরাত ভুট্টোর দিকে ছুড়ে দিয়ে বললেন, নিউজটি পড়ে দেখ।

নুশরাত ভুট্টো পত্রিকা হাতে নিয়ে নিউজটি খুঁজতে থাকেন। অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পরও তিনি পাচ্ছিলেন না। বিরক্ত হয়ে তিনি জানতে চাইলেন, কোন নিউজটা? দেখিয়ে দাও না!

ভালো করে দেখ না! প্রেসিডেন্ট সাহেবের সঙ্গে শেখ মুজিবের বৈঠক!

আচ্ছা আচ্ছা।

নুশরাত ভুট্টো খুব ভালো করে পত্রিকায় পাতায় চোখ রাখলেন। নিউজটি পেয়েই তিনি বললেন, ও আচ্ছা; পেয়েছি পেয়েছি!

নুশরাত ভুট্টো নিউজটি গড় গড় করে পড়লেন। তারপর বললেন, কী ঘটনা? হঠাৎ প্রেসিডেন্ট সাহেব ঢাকায় গিয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক করলেন!

ভুট্টো সাহেব হতাশার সঙ্গে বললেন, বুঝতে পারছি না। গোপনে কোনো আঁতাত হল কিনা কে জানে!

নিউজে তো বলেছে, প্রেসিডেন্ট সাহেব শেখ মুজিবের কিছু দাবি মেনে নিয়েছেন।

ওটা বড় কোনো ডিল না। আমি চিন্তিত, গোপনে কোনো ডিল হয়েছে কিনা তা নিয়ে।

অবশ্যই চিন্তার বিষয়। হঠাৎ মুজিব এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার কারণ কী?

বুঝতে পারছি না।

আসলে তুমি কোনো খোঁজই রাখছ না। প্রেসিডেন্ট সাহেবের এক আশ্বাসের ওপর ভরসা করে বসে আছ। উনি টিকে থাকার জন্য তো তোমাকে দেয়া প্রতিশ্র“তি নাও রাখতে পারেন!

আমি কী করব বলো! সারাক্ষণ তো আর এ কাজে লেগে থাকা যায় না। অন্য কাজও তো আছে!

তা আছে। তারপরও তোমাকে লেগে থাকতে হবে। ষড়যন্ত্রের রাজনীতির দেশ হচ্ছে পাকিস্তান। এটা তোমাকে বুঝতে হবে। তোমার আইয়ুব খানের কথা মনে নেই! তোমাকে এত ভালোবাসত! এক মুহূর্তের মধ্যে সেই ভালোবাসা কোথায় গেল!

সবই মনে আছে। ইয়াহিয়া খানও তার মতো আচরণ আমার সঙ্গে করবে বলে মনে হয় না।

তাহলে এত টেনশন কেন করছ? চুপচাপ বসে থাক।

সেটাও তো পারছি না। ভীষণ টেনশন লাগছে। কিছুতেই টেনশন দূর করতে পারছি না।

আমি একটা কথা বলি!

বল।

এই মুহূর্তে তোমার টেনশন কমাতে পারে জেনারেল হামিদ খান।

তাই?

হ্যাঁ।

তুমি জেনারেল হামিদ খানের কাছে যাও। উনি তোমাকে সঠিক তথ্য দিতে পারবেন।

ভালো বলেছ তো!

আমি সবসময় ভালোই বলি। তুমি আমাকে গুরুত্ব দাও না।

কোথায় আমি তোমাকে গুরুত্ব দিই না? অবশ্যই তোমাকে গুরুত্ব দিই। তা না হলে কী তোমার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতাম!

আচ্ছা ঠিক আছে। শুনে খুশি হলাম। তুমি দেরি করো না। হামিদ খানের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করলেই বুঝতে পারবে বিষয়টি কী? তবে আমার ধারণা, প্রেসিডেন্ট সাহেবের এটা কোনো সূক্ষ্ম চাল।

তা হতে পারে।

হতে পারে না। এটাই হবে। তুমি দেখ।

আমার ভীষণ টেনশন হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট সাহেব যদি মুজিবের সঙ্গে হাত মেলায় তাহলে আমার কী হবে! আমি এত সহযোগিতা করলাম; তার প্রতিদান কী এই!

শোন, এখনই হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

যদি পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা মুজিবের হাতে ছেড়ে দেয়! এর আগে কয়েকবার পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট সাহেব শেখ মুজিবকে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসাতে চান। কিন্তু মুজিব নাকি তার প্রস্তাবে রাজি হয়নি।

এটা আমার বিশ্বাস হয় না। মুজিব প্রধানমন্ত্রীর অফার ফিরিয়ে দেবে! তাহলে সে চায় কী?

সে পাকিস্তানকে ভাগ করতে চায়।

তুমি কি শিওর?

আমার তাই মনে হচ্ছে। তা না হলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লোভ কেউ সংবরণ করে!

মুজিব হয়তো ভাবছে, সামরিক শাসক ইয়াহিয়ার অধীনে প্রধানমন্ত্রী হয়ে কী করবে! সব ক্ষমতা তো ইয়াহিয়ার হাতেই। ক্ষমতাবিহীন প্রধানমন্ত্রী হয়ে কী হবে!

প্রেসিডেন্ট সাহেব নিশ্চয়ই নিজের হাতে সব ক্ষমতা রাখবেন না!

আসলে আমরা শুধু শুধুই এসব আলোচনা করছি। আমরা সঠিক তথ্য তো জানি না! তুমি জেনারেল হামিদ খানের কাছে যাও। তার কাছে বিষয়টি জানতে চাও। উনি তোমাকে সঠিক তথ্য দিতে পারবেন।

ঠিক আছে। আমি আজই তাহলে যাচ্ছি।

ঠিক আছে। উনি নিশ্চয়ই তোমাকে কোনো কিছু গোপন করবে না!

করার কথা না।

তাহলে দেরি করো না।

জুলফিকার আলী ভুট্টো রাওয়ালপিন্ডিতে যাবেন বলে মনস্থির করলেন। টেলিফোনে রাওয়ালপিন্ডি যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট বুকিং দিলেন। বিকালেই তিনি করাচি থেকে রাওয়ালপিন্ডির উদ্দেশে যাত্রা করলেন। সন্ধ্যায় রাওয়ালপিন্ডি পৌঁছে তিনি হামিদ খানকে ফোন করলেন। তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চাইলেন। হামিদ খান সম্মতি দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি হামিদ খানের বাসায় পৌঁছে গেলেন। ভুট্টোকে তিনি স্বাদরে গ্রহণ করলেন। খুব ভালো করে আপ্যায়ন করালেন। তারপর তিনি ভুট্টোর সাক্ষাতের কারণ জানতে চাইলেন।

ভুট্টো সাহেব বললেন, হঠাৎ প্রেসিডেন্ট সাহেব ঢাকায় গিয়ে মুজিবের সঙ্গে বৈঠক করলেন! অবস্থাটা এমন যেন প্রেসিডেন্ট সাহেব জলে পড়েছেন। তাকে উদ্ধারের জন্য মুজিবের সাহায্য প্রয়োজন!

এ নিয়ে আপনার চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। এটি প্রেসিডেন্ট সাহেবের একটা কৌশল বলতে পারেন।

এটা কী ধরনের কৌশল? প্রেসিডেন্ট সাহেব দেশের অভিভাবক। তিনি ডাকলে কে আসবে না? যে কাউকে তিনি ডাকতে পারেন এবং তিনি প্রেসিডেন্টের আহ্বানে সাড়া দিতে বাধ্য।

আপনার সঙ্গে আমি একমত। তবে প্রেসিডেন্ট সাহেব ঢাকায় গিয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক করায় তিনি ছোট হয়ে গেছেন; এমনটি ভাবাও ঠিক নয়। তাছাড়া শেখ মুজিব একজন জননেতা। পূর্ব পাকিস্তানে তার মতো জনপ্রিয় নেতা এ মুহূর্তে আর কে আছেন?

ভাসানী; ভাসানী সাহেবও নিশ্চয়ই জনপ্রিয়।

ভাসানী সাহেবের অবস্থা আর আগের মতো নেই। তাই তাকে নিয়ে আমাদের তেমন কোনো টেনশনও নেই। আমাদের টেনশন মুজিবকে নিয়ে। তাকে হাতে রাখতে পারলে আমাদের নব্বই শতাংশ টেনশন কমে যায়।

ও! সেজন্যই তাকে প্রধানমন্ত্রীর অফার দেয়া হয়েছে?

এটাও একটা রাজনৈতিক চাল। আপনি এত কিছু বোঝেন, এটা বোঝেন না!

সরি। আমার কেন জানি দুশ্চিন্তা হচ্ছে। বারবার শুধু মনে হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট সাহেব শেখ মুজিবের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।

এ ধরনের দুশ্চিন্তার কোনো মানে নেই। তাছাড়া আপনাকে তো প্রেসিডেন্ট সাহেব কথা দিয়েছেন!

প্রেসিডেন্ট সাহেব কি সেই কথা রাখবেন?

অবশ্যই রাখবেন। আচ্ছা, একটা কথা আমাকে বলেন তো! আমার ওপর আপনার আস্থা আছে?

অবশ্যই আছে।

তাহলে এত দুশ্চিন্তা না করে নিজের কাজ করেন।

ঠিক আছে। আমি তাহলে যাই। দয়া করে আমার দিকে খেয়াল রাখবেন।

জুলফিকার আলী ভুট্টো পরদিন বিমানে রাওয়ালপিন্ডির উদ্দেশে করাচি ত্যাগ করেন।

নুশরাত ভুট্টো ডাইনিং রুমে বসে কফি খাচ্ছেন আর গভীর মনোযোগে পত্রিকা পড়ছেন। পত্রিকার রাজনৈতিক খবরগুলোর ওপর তার মনোযোগ। পিপলস পার্টি ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলো কর্মকাণ্ডের কোনো খবর পত্রিকায় আসছে কিনা তা দেখেন। সরকারের কর্মকাণ্ডের খবরও পড়ার চেষ্টা করেন না। পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটছে, পশ্চিম পাকিস্তানে তার প্রতিক্রিয়া কী হচ্ছে তা-ও পত্রিকার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেন তিনি।

হঠাৎ নুশরাত ভুট্টোর সামনে এসে দাঁড়ালেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। তাকে দেখে বিস্ময়ের সঙ্গে নুশরাত ভুট্টো বললেন, আরে তুমি! সকালের ফ্লাইটেই চলে এসেছ নাকি?

হ্যাঁ। ভাবলাম, তুমি টেনশন করবে। তাই চলে এলাম।

বাহ! আমার জন্যও তাহলে তুমি ভাবো?

তোমার কী মনে হয়! তোমার জন্য আমি ভাবি না!

কী জানি! লোকমুখে শুনি, তোমার গার্লফ্রেন্ডের নাকি কোনো অভাব নেই!

এটা ঠিক না। যে-ই তোমাকে বলে থাকুক, ঠিক বলেনি।

তুমি তাহলে বলতে চাও, তোমার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই!

আচ্ছা, তুমি হঠাৎ এসব নিয়ে এত উদ্বিগ্ন হচ্ছ কেন? কোথায় তুমি আমার কাছে রাওয়ালপিন্ডির খবর জানতে চাইবে; তা না। তুমি নন-ইস্যু নিয়ে শুধু শুধু আমাকে বিরক্ত করতে চাচ্ছ।

কোনটাকে তুমি নন-ইস্যু বলছ?

থাক, এই বিষয় নিয়ে আমি আর তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই না।

কেন? আসল ইস্যুতে হাত দিয়েছি বলে?

জুলফিকার আলী ভুট্টো পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন, কোনটা আসল ইস্যু?

তোমার গার্লফ্রেন্ড।

ওটা কোনো ইস্যু না।

কেন? ওটা জীবনের অংশ না?

আমি সরি নুশরাত। এসব আলোচনা আমার ভালো লাগে না।

জুলফিকার আলী ভুট্টো আর দাঁড়ালেন না। তিনি হন হন করে অন্য রুমের দিকে এগিয়ে যান। নুশরাত ভুট্টো গলার স্বর উঁচু করে বলেন, রাওয়ালপিন্ডির খবর কী? কিছুই তো বললা না! রাওয়ালপিন্ডির খবরটা বলে যাও!

জুলফিকার আলী ভুট্টো থমথমে কণ্ঠে বললেন, তোমার ওসব জানার দরকার নেই।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.