আখেরি চাহার শোম্বা

ভালোবাসায় আলো আশায় রাসূল আমার

  মঈন চিশতী ০২ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মসজিদে নববী
মসজিদে নববী

‘রাসূল আমার ভালোবাসা/রাসূল আমার আলো আশা/রাসূল আমার প্রেম বিরহের মূল আলোচনা/রাসূল আমার কাজেকর্মে অনুপ্রেরণা’।

ওহুদ ময়দানে মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয়ের কথা শুনে এক আনসারি মহিলা দৌড়ে যাচ্ছেন। তাকে দেখে একজন বলল, ‘তুমি কি শুনেছ তোমার সন্তান তোমার ভাই এবং তোমার স্বামী তিনজনই যুদ্ধে নিহত হয়েছেন’?

ওই আনসারি মহিলা খুবই স্বাভাবিকভাবে ইন্নালিল্লাহ পড়ে জবাব দেন, আমি তাদের আগে শুনতে চাই আমার দয়াল নবী কেমন আছেন? এই ছিল নবী (সা.)-এর ব্যাপারে একজন সাধারণ অবলা নারীর হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা।

কিন্তু আমরা আজ ভালোবাসার দাবিদার হয়েও আমাদের অনেকের ভালোবাসা সেকি, নবীজির নাম শুনে কোনো আশেক যদি শ্রদ্ধাবনত হয়ে করজোড় হয়ে হাতে চুমু খায়, প্রেমের আতিশয্যে দরূদ পাঠ করে দাঁড়িয়ে কিংবা নবীজির বিচ্ছেদ যন্ত্রণায় গড়াগড়ি খায় তখন এর পেছনে দলিল খোঁজা শুরু করি, কোন হাদিসের ভিত্তিতে এমনটি করল। আমরা বুঝতে চাই না প্রেম দুঃখ যন্ত্রণা দলিল দিয়ে চলে না। তা মানুষের সাধ্যের বাইরে। ‘মাজহাবে ইশ্ক দিগারাস্ত প্রেমের ধর্মই ভিন্ন’। নবী জীবনের প্রতিটি কর্ম নবী প্রেমিকদের জন্য নতুন জীবনযাপনের প্রেরণা।

নবীজির প্রতিটি আমলের স্মরণও আল্লাহর ইশারা বা হুকুমেই হয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘ওয়ারাফা’না লাকা জিকরাকা। আমি আপনার স্মরণকে চিরন্তন উঁচু করে রাখব’। কারও স্মরণকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাখতে তার প্রতিটি আমল জীবনাচার পদ্ধতি বংশপরম্পরায় আলোচনা করতে হয়। এ আলোচনাগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করলে তা মানুষের স্মৃতিপটে জেগে থাকে।

এ কারণেই আমরা আমাদের প্রিয়জন বা জাতীয় বীর বা নেতাদের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে থাকি। বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত নবী মোহাম্মদ (সা.) যিনি বিশ্ব জগতের রহমত, তার জীবনচরিতের বিভিন্ন দিক নিয়ে ভক্তরা নানা অনুষ্ঠান পালন করবে এটাই স্বাভাবিক। আখেরি চাহার শোম্বা তেমনই একটি দিন। যেদিন নবীজির সুস্থতার খবর শুনে মদিনাবাসী আনন্দিত হয়ে দান সদকা শুকরানা নামাজ আদায় করেছিলেন। এটাই সুন্নতে সাহাবা হিসেবে আমাদের দেশে পালিত হয়ে আসছে।

আখেরি চাহার শোম্বা নবীজির আশেকদের জন্য শুকরিয়া দিবস। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশেই আরবি সফর মাসের শেষ বুধবারকে আখেরি চাহার শোম্বা হিসেবে স্মরণ করা হয়। বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) এ দিন রোগ থেকে মুক্তিলাভ করেন এবং গোসল করেন।

এ দিনের পর তিনি আর গোসল করেননি। এরপর তার রোগ বৃদ্ধি পায় অতঃপর ১২ রবিউল আউয়াল মাওলায়ে হাকীকির ডাকে সাড়া দেন। এ দিন মুসলমানরা গোসল করে, নতুন পোশাক পরে খুশবু লাগায়। তৎকালীন দিল্লির বাদশাহি কেল্লায় এ উৎসব উপলক্ষে বিশেষ দরবার বসত। এতে শাহজাদা ও আমির উমরারা শরিক হতেন (ফারহাঙ্গ-ই-আসফিয়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২৬)।

মুসলমানরা মূলত রাসূল (সা.) যে গোসল করে সুস্থতা বোধ করেছিলেন তা স্মরণ করে শোকরিয়ার নামাজ পড়া, দান-সদকা করে থাকে। সহিহ হাদিসে তার অসুস্থতা, অসুস্থকালীন অবস্থা, কর্মোপদেশ এবং তার ইন্তেকালের অবস্থা সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় হিজরি সনের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক বলেন, ‘রাসূল (সা.) যে অসুস্থতায় ইন্তেকাল করেন সে অসুস্থতা শুরু হয়েছিল সফর মাসের কয়েক রাত বাকি থাকতে। (সিরাতুন্নবী : ইবনে হিশাম)।

বোখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে রাসূল (সা.) ১১ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার ইন্তেকাল করেন। তার ইন্তেকালের তারিখ সম্পর্কে মতভেদ থাকলেও ১২ রবিউল আউয়াল মতটিই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য।

হজরত আলী (রা.) সূত্রে ইন্তেকালের এ তারিখটি বর্ণিত হয়েছে। আলা হজরত ইমাম আহমদ রেজা বেরলভী (রহ.) এটিকেই শুদ্ধতম রেওয়ায়েত বলে ফতোয়া দিয়েছেন। কারণ হজরত আলী (রা.) নবী পরিবারের এমন এক সদস্য যিনি অসুস্থতাকালীন, অবস্থায় মসজিদে যাতায়াত অবস্থায়, ইন্তেকাল পরবর্তী সময় গোসলকালীন কবরে শায়িত করার সময়ও রাসূল (সা.)-এর পাশে ছিলেন। কাজেই হজরত আলী (রা.)-এর কথাই অগ্রগণ্য।

সফর মাসের শেষ বুধবার। সকালবেলায় রাসূলে পাক (সা.) আয়েশা (রা.) কে ডেকে বললেন, ‘হুমায়রা! আমার জ্বর কমে গেছে, আমাকে গোসল করিয়ে দাও।

মদিনার প্রসিদ্ধ মিঠা পানির সাত কুয়া থেকে সাত মশক পানি সংগ্রহ করে ইষৎ উষ্ণ করে নবী (সা.) কে গোসল করানো হল। আসাহহূস সিয়ারে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) বলেছিলেন, ‘আমার ওপর সাত মশক পানি বইয়ে দাও, মশক যেন পূর্ণ হয়, এমন যেন না হয় তা থেকে কিছু পানি পড়ে গেছে। ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ গ্রন্থে আছে, রাসূল (সা.) পাথরের জলাধারে বসে সাতটি কুয়ার সাত মশক পানি নিজের মাথায় ঢালিয়ে নেন। এটিই ছিল হুজুরের দুনিয়ার শেষ গোসল। অতঃপর তিনি সুস্থতা ও আরাম বোধ করেন।

গোসল শেষে নবী (সা.) মা ফাতেমা ও নাতিদ্বয় ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইনকে ডেকে এনে সবাইকে নিয়ে সকালের নাশতা সারেন। এ খুশির খবর হজরত বেলাল (রা.) এবং সুফফাবাসী সাহাবিরা দ্রুত মদিনার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন। স্রোতের মতো নবীপ্রেমিকরা নবীজির দর্শনে ভিড় জমাতে লাগল। মদিনার অলিগলিতে আনন্দের ঢেউ লেগে গেল।

ঘরে ঘরে শুরু হল সদকা, খয়রাত, দান-খয়রাত ও শুকরিয়া জ্ঞাপন। হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) খুশিতে ৫,০০০ দিরহাম ফকির-মিসকিনদের জন্য বিলিয়ে দেন। হজরত ওমর ফারুক (রা.) দান করেন ৭,০০০ দিরহাম, হজরত উসমান (রা.) ১০,০০০ দিরহাম, হজরত আলী (রা.) দান করেন ৩,০০০ দিরহাম। মদিনার ধনাঢ্য মুহাজির সাহাবি হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) খুশিতে আল্লাহর রাস্তায় ১০০ উট দান করে দিলেন। কেউ কেউ খুশিতে ক্রীতদাস মুক্তি দিয়ে দেন, যাদের সম্পদ ছিল না তারা সালাতুস শুকুর আদায় করেন। নবীজির সুস্থতা ও আরামের খবরে সাহাবায়ে কেরামদের জানি আর মালি আমলের বিষয়টি আজ আমাদের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে আছে।

লেখক : email: [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter