মদিনার বুলবুলির কণ্ঠে সুরের গজল

  কাউসার মামুদ ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মদিনার বুলবুলির কণ্ঠে সুরের গজল

‘আসিছেন হাবিবে খোদা, আরশ পাকে তাই উঠেছে শোর, চাঁদ পিয়াসে ছুটে আসে আকাশ পানে যেমন চকোর, কোকিল যেমন গেয়ে ওঠে ফাগুন আসার আভাস পেয়ে, তেমনি করে হরষিত ফেরেশতা সব উঠল গেয়ে। হে মদিনার বুলবুলি গো গাইলে তুমি কোন গজল, মরুর বুকে উঠল ফুটে প্রেমের রঙিন গোলাপ-দল।’

রাসূলকে নিয়ে নজরুলের এই পঙ্ক্তি গেয়েই রচনা শুরু করতে চাই। পৃথিবীর সবচেয়ে পুণ্যবান মানুষটিই হলেন মুহাম্মাদ (সা.)। এক অপরূপ জীবনাচরণে তিনি আলোকোজ্জ্বল করেছিলেন গোটা বিশ্ব। তাবৎ দুনিয়াজুড়ে তাই তো এ মহামানবের জয়গান আর জয়ধ্বনি। আরবি এ মাসেই জন্মেছিলেন পেয়ারে হাবীব। রবিউল আউয়ালে।

সেদিন পাথুরে মরুতে ফুটেছিল এক জান্নাতি ফুল। খোদার বন্ধুতে মাত হয়ে গেল আরব-আজম। পৃথিবীজুড়ে নেমে এলো পরম শান্তির আবহ। পটপরিবর্তন ঘটল বহুকালের অন্ধ স্থিত বিশ্বাসের। মনুষ্যত্ব, সততা আর মানবতার ডাক নিয়ে এলেন মুহাম্মাদ।

শুধুই কি ডাক! তেষট্টি বছরের পূর্ণ জীবনে সত্য, কল্যাণ ও প্রভুর প্রত্যাদেশকে নিজের জীবনে প্রয়োগ করে মানবজাতিকে পথনির্দেশ করে গেছেন তিনি। বলে গেছেন, এটাই মহা সত্যের পথ। সফলতা ও কল্যাণের পথ। আমার জীবনচরিতই তোমাদের প্রতি পথনির্দেশ। তোমরা আমার অনুসারী হও।

আমাকে ধারণ কর তোমাদের সর্বত্রে এবং সফল হও। এই ছিল নবীজির আহ্বান। যার জীবনযাত্রা ছিল প্রভুর নাজিলকৃত কোরআনের আলোকেই। আল্লাহ তো তাই বলেন, ‘নিশ্চয় আমি আপনাকে উত্তম চরিত্র দান করে পাঠিয়েছি।’ মা আয়েশা তাই তো দরাজ কণ্ঠে আওড়ে গেলেন কানা খুলুকুহু আল-কোরআন অর্থাৎ; তার চরিত্র হচ্ছে কোরআন।

শান্তির দূত মুহাম্মাদ। উম্মতি উম্মতি করে কাটিয়ে দিয়েছেন পুরো জীবন। শান্তির ঘুম ঘুমাননি এক ফোঁটা। উপদ্রবহীন জীবনযাপন করেননি কোনো সময়। মানব সভ্যতাকে সত্য ও শুদ্ধির পথে আনতে কখনও গিয়েছেন ‘উকাজে’ কখনও হেঁটেছেন তায়েফে। সবখানেই অত্যাচারিত হয়েছেন পৃথিবীর এই শ্রেষ্ঠ মানব। তারপরও গিয়েছেন। বারবার বলেছেন, ‘এসো এক আল্লাহর পথে, এসো সত্য ধর্ম ইসলামের দিকে যা মানবতার শিক্ষা দেয়’।

অথচ তারা সেদিন এই ডাক শোনেনি। রাসূলকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল মুহূর্তে মুহূর্তে। আঘাতে আঘাতে মুমূর্ষু করেছিল দোজাহানের বাদশাহকে। তিনি চুপ করে গেলেন। ‘উহু’ শব্দটি করেননি। যদি আল্লাহর গজব নেমে আসে তায়েফে! আসমান-জমিন অপেক্ষা করছিল, তায়েফের দু’পাশের প্রস্তরে ঢাকা পাহাড় অপেক্ষা করছিল কখন আমাদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। আমরা ধ্বংস করে দেব এ অকৃতজ্ঞ জাতিকে।

কিন্তু নবী! তিনি যে দয়ার সাগর। উম্মতের জন্য সব উজাড় করা ভালোবাসা তার। তিনি জিবরাইলকে নিষেধ করলেন। বললেন, ‘থামো’! এরা আমার উম্মত। এরা অবুঝ। হয়তো এদের পরবর্তীরা আল্লাহকেই তাদের উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করবে। মুসলিম হয়ে জন্মাবে। আমি তো নবী। প্রভুর বার্তাবাহক। আমি তো ধ্বংসের জন্য প্রেরিত হইনি। আমি মানবতার মুক্তির জন্য প্রেরিত হয়েছি। মানব জাতীর মুক্তির জন্য পাঠানো হয়েছে আমাকে। আমি কি করে তাদের জন্য ধ্বংসের দোয়া করি!

এই ছিল আমাদের নবী মুহাম্মাদের জীবনচরিত। আমাদেরকে ঐকবদ্ধ্য করার জন্য এই ছিল তার ত্যাগের খণ্ড চিত্র। এভাবেই পুরো জীবনকে তিনি আমাদের জন্য আদর্শ হিসেবে রেখে গেছেন। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে মুহাম্মাদকে ধারণ করেছি?

তার যে শাশ্বত সত্যের মূল সুর তা কি আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছি সর্বোতভাবে। নিজেকেই জিজ্ঞেস করে দেখুন! ভেতর থেকে দৈববাণীর মতো উত্তর আসবে, না! পারিনি। আসলে আমরা কি তারাই যারা মুহাম্মাদ (সা.) কে মুখের বুলিতেই রাখি। আমরা চরম প্রতিহিংসা পরায়ণ। আমরা পরস্পরকে হত্যা করতে উদ্ধত হই। আমাদের জীবন থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে মানবতা। একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল নই আমরা। পোশাক, মত, পথের দোহাই দিয়ে আমরা উম্মতে মুহাম্মদি আজ শতধায় বিভক্ত।

পরশ্রীকাতরতায় ভরে গেছে আমাদের হৃদয়। আমরা সহমর্মী নই, বিদ্বেষী। অথচ এ সব মুহাম্মাদ (সা.)-এর শিক্ষা ছিল না। তিনি শান্তি নিয়ে এসেছিলেন। ঐক্য ও পরম সত্যের আহ্বান নিয়ে এসেছিলেন। ফলে মাত্র দশ বছরের মাদানি জিন্দিগিতে আমূল পাল্টে গেল গোটা দুনিয়ার চিত্র। পৃথিবীতে বইতে লাগল শান্তির সুবাতাস।

তাই এখনও যদি আমরা রাসূলের জীবনকে আমাদের জীবনে ধারণ না করি, শুধু বিভেদেই ডুবে থাকি। একে অন্যের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন না হয়ে ওপরে শুধুই প্রসাধনীর মতো ইসলাম ও মুহাম্মাদ (সা.) কে প্রলেপ হিসেবে ব্যবহার করি।

তাহলে এর চেয়ে ধোঁকাবাজির আর কী হতে পারে। নবীজি তো কখনই নিজের জন্য কিছু জমিয়ে রাখেননি। অনাহারি, দরিদ্রের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন তার শেষ দিরহামটিও। ঘরে রাখা একটিমাত্র শুকনো খেজুর। তাই কেন ভিখারিকে দেয়া হল না তা নিয়ে মনক্ষুণ্ণ হয়ছিলেন তিনি।

তাহলে আমরা কারা! যারা তার আদর্শের কথা বলি মিম্বারে মিম্বারে। অথচ আমাদের জীবনে তার আদর্শের ছিটেফোঁটাও নেই। একরত্তি আদর্শও ধারণ করিনি আমরা। শুধু লম্বা বয়ান আর যুক্তিতর্কের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সত্যকে একটি প্রলেপে ঢেকে রেখেছি। তাহলে কোত্থেকে আসবে ইসলামের উচ্চকিত আহ্বান। কোথায় প্রতিষ্ঠিত হবে ইসলামের মহান ডাক।

নবী মুহাম্মাদ তো তলোয়ার দিয়ে ইসলাম কায়েম করেননি। শুধু ওয়াজ-নসিহতেই পাল্টে দেননি গোটা দুনিয়া। বরং তার চরিত্র মাধুর্য, মহানুভবতা আর কোরআনের আলোকে গঠিত জীবন চরিতই পাল্টে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। তাবৎ দুনিয়ার রাজা বাদশাহরা নত শিরে মেনে নিয়েছেন তার শ্রেষ্ঠত্ব।

শুধু তারাই কি! ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সব পণ্ডিত বিদ্বানরাও কি এক বাক্যে স্বীকার করেননি তার শ্রেষ্ঠতাকে! জর্জ বার্নার্ড শ, টমাস কার্লাইল, মহাত্মা গান্ধী, ডক্টর উইলিয়াম ড্রাপার, আলফোনস ডি লা-মার্টেইন, মাইকেল এইচ হার্ট, উইলিয়াম মন্টগোমেরি ওয়াট, ডিজি হগার্থ, এডওয়ার্ড গিবন, লেন পোলে, সাইমন ওকলি, ম্যাজারম্যান, অ্যানি বেসান্ত, ডব্লিউসি টেইলর, রেভারেন্ড বসওয়ার্থ স্মিথ, গুস্তাভ উইল, স্টাব, ওয়াশিংটন লারভিং, লিওনার্ড জন হেনরি আর্থার- এরা সবাই তো একই স্বরে বলেছেন মুহাম্মাদই সেরা। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব। তার জীবনব্যবস্থা সবার জন্যই অনুকরণীয়। তিনি সুপারম্যান।

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×