সারা জাহানে খুশির ধুম

  গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সারা জাহানে খুশির ধুম

মাহে রবিউল আউয়াল মাস এলো। মুমিন হৃদয়ে এ মাসের তাৎপর্য ব্যাপক। রবিউল আউয়াল মাসব্যাপী তামাম মুসলিম জাহানে নবীর আদর্শ, চরিত্র নিয়ে চলে আলোচনা-পর্যালোচনা, মিলাদ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়াজ মাহফিল।

আলেম, পীর মাশায়েখ, জ্ঞানী-গুণীরা রাসূল (সা.)-এর গুণাবলী বা সিরাতের ওপর আলোকপাত করেন। মোহাম্মদ (সা.) আমাদের নবী (সা.)-এর নামের সংক্ষেপ। তাঁহার নামের পূর্ণ পরিচয় হল- আবু আল কাসেম মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদ আল মুত্তালিব ইবনে হাশিম।

মোহাম্মদ মোস্তফা বা আহমদ মোস্তফা নামে তিনি পরিচিত। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর আগমন বা জন্ম। জন্মের আগেই তিনি পিতৃহারা। ছয় বছর বয়সে মাতৃহারা এবং আট বছর বয়সে তাঁর দাদাও ইন্তেকাল করেন। উল্লেখ্য, তিনি পিতা বা দাদার কোনো সম্পত্তির উত্তরাধিকারী ছিলেন না। তখনকার সময়ে নাবালকরা সম্পত্তির উত্তরাধিকার পেত না। আর এ ভাবেই শুরু হয় দয়াল নবী (সা.)-এর পবিত্র জীবন।

রাসূল (সা.) দুনিয়ার জীবনে ৪০ বছর বয়সে নবুয়্যত লাভ করেন। রাব্বুল আলামিনের অপার রহমতে নবীর গুণাবলীর ভিত্তিতে তাঁর জীবন গড়ে ওঠে। মানব রূপে আসার কারণ, মানব জাতির আদর্শ রূপে মনুষ্যকুলের খেদমতে সমর্থ হওয়া।

যদিও অন্যদের মতো নানা মানবিক সীমাবদ্ধতায় তিনি জীবনযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। নির্যাতনের মুখেও তিনি সীমাহীন সবরের পরিচয় দিয়েছেন। মানব ইতিহাসে তাঁর অবদান ‘তাৎপর্য গগনচুম্বী’। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি বহুমুখী পরিচয়ে উদ্ভাসিত। ভ্রান্ত পথের পথিকদের তিনি সত্য পথে আহ্বান করার কারণে তিনি নির্যাতনের শিকার এমনকি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও উপহাস পেয়েছিলেন।

সে সময়ে এক বুড়ি প্রতিদিন তাঁর চলার পথে কাঁটা দিত। একদিন পথে কাঁটা ছিল না তখন রাসূল (সা.) চিন্তিত হলেন এবং বুড়ির খোঁজে গিয়ে দেখেন বুড়ি অসুস্থ। তিনি বুড়ির সেবা-যত্নে লেগে গেলেন। এমনই ছিল রাসূল (সা.)-এর চরিত্র মাধুর্য।

চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও নবীজি (সা.) অসাধারণ সবর, সাহস ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন। মানবীয় গুণরাজির উৎকৃষ্ট নিদর্শনের কারণেই মানুষ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, তাঁর ধর্ম গ্রহণ করেছে এবং ধর্মের জন্য শাহাদাৎবরণ করেছে। কোনো ধরনের ভোজবাজি দেখিয়ে নবী (সা.) মানুষকে দলে আনার চেষ্টা করেননি।

আল কোরআন ছাড়া আর কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা তাঁর জানা ছিল না। অবশ্য এ ক্ষেত্রে নবীজির মিরাজের ঘটনা এসে যায়। তবে মিরাজের ঘটনা যে রাব্বুল আলামিনের অশেষ মেহেরবাণী।

নবুয়্যত প্রাপ্তির আগেই সাধারণের কাছে আল আমিন বা সত্যবাদী বলে তাঁর পরিচয় ছিল। অমুসলিম পৌত্তলিকদেরও তাঁর ওপর আস্থা ছিল অগাধ। সবাই আমানত রাখত নবীজির কাছে। কেমন বিশ্বাস ছিল আমাদের রাসূল (সা.)-এর ওপর।

এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। রাসূল (সা.) একদিন একটি পাহাড়ের পাদদেশে সমবেত হওয়ার জন্য মক্কাবাসীদের আহ্বান জানান। অতঃপর আগত লোকজনকে বলেন- আমি যদি বলি পাহাড়ের অপর প্রান্তে দুশমনরা ওঁৎ পেতে আছে, তাহলে আপনারা কি বিশ্বাস করবেন?

সবাই এক বাক্যে জবাব দিলেন, অবশ্যই বিশ্বাস করব। কারণ আপনি আল-আমিন, সত্যবাদী। দয়ার নবীর মক্কাজীবন ছিল নির্যাতনের কাল। আল্লাহর পথে ধর্মের জন্য, সত্যের পথে মানুষকে ডাকার কারণে তাঁর ওপর নেমে আসে নির্যাতন। তিনি সবর করেছেন সত্য, কিন্তু কখনও ভীত হননি।

খোদার মিশন প্রতিষ্ঠায় পিছপা হননি। অন্যায়ের প্রতিবাদে, সুবিচার কায়েমে তিনি ছিলেন অবিচল। একটি ঘটনা- এক ব্যক্তি আবু জেহেলের কাছে টাকা পেতেন। আবু জেহেল গড়িমসি করছেন। সেই ব্যক্তি রাসূল (সা.) কে ঘটনা বলেন। রাসূল (সা.) তাকে নিয়ে আবু জেহেলের বাড়ি গেলেন।

আবু জেহেল তার সামনে রাসূলকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল এবং টাকা পরিশোধ করে দিলেন। এভাবে নবীজির কাছে নতি স্বীকার করায় লোকজন আবু জেহেলকে বিদ্রূপ শুরু করে। তখন আবু জেহেল বলেন মোহাম্মদ (সা.)-এর সামনে আমি সম্মোহিত হয়ে যাই। তাই কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

উল্লেখ্য, তখনকার সময়ে আবু জেহেলই ছিল মক্কায় রাসূল (সা.)-এর অন্যতম প্রতিপক্ষ। মক্কি জীবনে এতিম, বিধবা, অভাবী, মুসাফির দাস ও দুঃখী মানুষের খেদমতে রাসূল (সা.) ছিলেন নিবেদিত। অন্যান্য ধর্মের বিজ্ঞ পণ্ডিতরাও রাসূল (সা.)-এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।

দি প্রফেট অব ইস্ট গ্রন্থের প্রণেতা দেওয়ান চাঁদ শর্মা বলেন, মোহাম্মদ ছিলেন পরোপকারের জীবন্ত প্রতিমূর্তি, তাঁর সান্নিধ্যে যারা এসেছেন তারা তাঁর প্রভাব এতটাই অনুভব করতেন যে, কোনোদিনই আর তাঁর কথা ভুলতে পারতেন না। হিস্টরি অব দি ইন্টালেকচুয়্যাল ডেভেলপমেন্ট অব ইউরোপ গ্রন্থে জন উইলিয়াম ড্রপার বলেন- ৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে আরবের মক্কা নগরীতে একজন বিশিষ্ট মানুষের জন্ম হয়।

সব মানুষের মধ্যে তিনি সেই মানুষ, যিনি মানব জাতির ওপরে সর্বাধিক প্রভাব বিস্তারকারী, তিনিই মোহাম্মদ (সা.)। মাইকেল হার্ট তার বইতে বিশ্বের ১০০ জন সেরা ব্যক্তির ভেতর হজরত মোহাম্মদ (সা.) কে প্রথম স্থান দিয়েছেন।

মদিনা জীবনে নবীজি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। মদিনার ঐতিহাসিক সনদে তিনি সবার অধিকার সুরক্ষা করেন। সব ধর্মমতের সহঅবস্থান নিশ্চিত করেন। যার যার ধর্ম তার তার এ নীতি বাস্তবায়িত করেন। সুবিচার কায়েম করেন। মক্কায় তিনি ছিলেন ধর্ম প্রচারক, মদিনায় তিনি রাষ্ট্রের জনক প্রশাসক ও বিচারক।

মদিনার জীবনে তিনি প্রশাসক ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বিভিন্ন গোত্র ও গোষ্ঠীর মধ্যে শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করেন। বরাবরই রাসূল (সা.) শান্তির পক্ষে ছিলেন কিন্তু দুশমনরা তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি কখনও। অস্ত্র হাতে নিতে তাঁকে বাধ্য করেছে। তিনি অস্ত্র হাতে নিয়েছেন মানুষের অধিকার রক্ষায়।

রাসূলে খোদা (সা.) যুদ্ধকে ঘৃণা করতেন। কিন্তু যুদ্ধ যখন তাঁর ওপর চাপিয়ে দেয়া হতো, তখন তিনি যথাসম্ভব রক্তপাত এড়ানোর চেষ্টা করতেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন কিন্তু নিজে রক্তপাত ঘটাননি। যুদ্ধে নবীজি (সা.)-এর দান্দান শরিফ ভেঙে যায় কিন্তু তিনি প্রত্যাঘাত করেননি। আট বছর তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নেন। এসব যুদ্ধে ৭৫৯ জন দুশমন খুন হয় এবং নিজের লোক শহীদ হয় ২৫৯ জন।

ইসলামে হানাহানি, সন্ত্রাস ও জোর-জবরদস্তির কোনো অবকাশ নেই। ইসলামের শ্রেষ্ঠ ফরিয়াদ ‘হে রব, তুমি আমাদের ইহ ও পরকালের কল্যাণ দাও। রক্ষা কর আজাব থেকে।’ মানব জাতিকে দুই জাহানের মঙ্গল ও মুক্তির জন্যই রাহমাতুল্লিল আলামিনের আবির্ভাব। তাই পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর খুশির পসরা সাজাতে মুমিন মুসলমান এ মাসে ব্যাপক কর্মসূচি পালন করে এবং ব্যাকুল হয়ে ওঠে।

লেখক : প্রাবন্ধিক

ই-মেইল : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×