প্রসঙ্গ খোদা হাফেজ এবং আল্লাহ হাফেজ

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সৈয়দ নজরুল ইসলাম

ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা জরুরি। বিবেকবান মানুষ তা জানে। একজন মানুষকে ডাকলে সে সাড়া দেবে। কিন্তু ভুল নামে বা তার অসম্পূর্ণ নামে ডাকলে সে অপমান বোধ করে।

কোনো সম্মানী ব্যক্তির পদবি বা তার নামের বানানের অন্য কোনো ক্রটি-বিচ্যুতি হলে তার জন্য তিরস্কৃত হতে হয়। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই যার যে নাম তাকে ঠিক সেই নামেই ডাকা উচিত।

আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা। সারা জাহানে তাঁর চেয়ে সম্মানী এবং ক্ষমতাবান আর কেউ নেই। তিনি দুই জাহানের শিরোমণি ও রহমত করে যাকে পাঠিয়েছেন তাঁকে কি আমরা কোরআন প্রদত্ত নামে ডেকে থাকি!

যারা আকিদা শিক্ষা দিয়ে থাকেন তারা সেই আকিদার ওপর আছেন কিনা ভেবে দেখা দরকার। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের আইন প্রণেতারা কোনো আইন বা বিধি-বিধান আইনে রূপ দেয়ার পরও আইনে ত্র“টি-বিচ্যুতি হয়ে থাকলে তা সংশোধন করে থাকেন।

একজন শিক্ষক তার লেকচারে ভুল তথ্য প্রদান করলে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে কিছু সংখ্যক ধর্মীয় গুরুজন আছেন তাদের আকিদায় বিচ্যুতি হলে তা স্বীকার করতে নারাজ থাকেন আর কেউ যদি তাদের ক্রটি ধরিয়ে দেন তাহলে ওই ব্যক্তিকে মুরতাদ বলতে দ্বিধা করেন না। কিন্তু তাদের বোঝা উচিত ভালোমন্দ বোঝার বুদ্ধি অনেকেরই থাকতে পারে।

রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটলে দুর্ঘটনা ঘটবে এটা স্বাভাবিক। সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে এবং পশ্চিম দিকে অস্ত যায় একজন বাচ্চা বুঝমান হওয়ার পরপরই বোঝে। কারণ এটা স্পষ্টই দৃশ্যমান এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই।

আল্লাহর বাণী যা শাশ্বত সত্য তা জেনেও কি আমরা তা মানছি? প্রশ্ন আসবে কেন মানছি না?

আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ। মুসলিম হিসেবে আমরা সবাই বিশ্বাস করি আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা কোরআনুল কারিমে তাঁর নাম ‘আল্লাহ’ বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, কুলহুওয়াল্লাহ, লা ইলাহা এভাবে অসংখ্য আয়াতে সৃষ্টিকর্তার নাম ‘আল্লাহ বলে’ (গুণবাচক ৯৯ নাম ছাড়া) উল্লেখ করা সত্ত্বেও আমাদের ইমান ও আকিদা শিক্ষাদাতাদের কেউ কেউ তাকে খোদা বলে ডাকেন কেন? শবেবরাত (ফারসি ভাষা) ও মিলাদ পালনকারী আকিদার লোক এখনও মোনাজাত বা দোয়া করার সময় হে খোদা বলে আরজি পেশ করে থাকেন, যার অনুসরণে সাধারণ মুসলমান কাউকে বিদায় জানানোর সময় খোদা হাফেজ বলে বিদায় জানাচ্ছেন।

এমনকি কোনো এলাকা থেকে অন্য কোনো এলাকায় প্রবেশের সময় রাস্তায় সাইনবোর্ডে লেখা থাকে খোদা হাফেজ। কোরআন পাকে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে আল্লাহ হাফেজ বললে ‘আল্লাহর’ রাখা নামেই তাঁকে স্মরণ করা হয় এবং কোরাআনুল কারিমকেই হুবহু অনুসরণ করা হয়। খোদা সম্বোধন করে মনের মধ্যে ওই আল্লাহকেই বলছি এই মর্মে ধারণা করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না কারণ আল্লাহই ‘আল্লাহ’। খোদা বলতে কোরআনে আল্লাহর কোনো নাম নেই।

সর্বশেষ আসমানি কিতাব হচ্ছে ‘কোরআন’। আল্লাহপাক তাঁর এই কিতাবের নাম দিয়েছেন কোরআনুল কারিম, কোরআনুল হাকিম, কোরাআনুল মাজিদ। অনেক আয়াতে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

এতদসত্ত্বেও আমরা আল্লাহ প্রদত্ত কিতাবের নাম পরিবর্তন করে রেখেছি কোরআন শরিফ। বাংলাদেশের বহু মসজিদের ভেতরের তাকে নজর দিলে এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। শব্দে ভাবার্থ যত সুন্দরই হোক না কেন আমাদের ভেবে দেখা দরকার আমরা কি পারি স্রষ্টার দেয়া নামের চেয়ে সুন্দর নাম রাখতে (নাউযুবিল্লাহ)। যারা এ কাজটি করেছেন তাদের উদ্দেশ্য কী?

‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ এ নাম কোরআনে পাকে আমাদের নবীর নাম এবং তাঁকে খাতামুন্নাবী, মানবজাতির রহমত করে মানবজাতিকে সত্যের পথ প্রদর্শনকারী হিসেবে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা সত্ত্বেও আমরা তাঁকে হুজুর পাক উল্লেখ করি কেন? এ দেশের অনেক ইমাম আছেন যারা প্রায়ই এ বাক্যটি তাদের বয়ানে কিংবা দোয়ার সময় উল্লেখ করে থাকেন।

কোরাআনুল কারিমে ‘আল্লাহ্পাক’ বিশ্বনবীকে যে নাম দিয়েছেন সেই নামে তাঁকে সম্বোধন করা যথার্থ নয় কি? কোরআনুল কারিমে তাঁর নাম কোথায় হুজুর পাক উল্লেখ আছে বলবেন কি? বলতে দ্বিধা নেই যে যারা এ নামে বিশ্বনবীকে সম্বোধন করেন তাদের কিছু ফায়দা আছে। কারণ আপনারা আপনাদের হুজুর বলে ডাকতে মুসলমানকে শিক্ষা দিয়েছেন। [চলবে]

লেখক : পরিচালক (অবসরপ্রাপ্ত), রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ