তাবলিগের বিভক্তি প্রসঙ্গে

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাইফুল ইসলাম

ফাইল ফটো

না, আর চুপ থাকা গেল না। এ পাতার মাধ্যমে অনেক চেষ্টা করা হয়েছে তাবলিগের বিরোধ দূর করার জন্য। তারা যে আদাজল খেয়ে নেমেছেন একের ওপর অন্যের প্রভাব ও দখল পোক্ত করতে।

এতে করে শতবর্ষী এ আধ্যাত্মিক আন্দোলনের গায়ে রক্তাক্ত আক্রমণ, পাল্টা-আক্রমণের তকমা লেগে গেছে। হামলা, পাল্টা-হামলায় অন্তত একজনের প্রাণহানি ও দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।

যে আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকা নিয়ে ন্যক্কারজনক এ বিভক্তি, সে আল্লাহ বলছেন, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো মুসলমানকে হত্যা করে তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে।

আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন ও তার ওপর অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্য প্রস্তুত করেছেন ভীষণ শাস্তি। সূরা নিসা, আয়াত-৯৩।

অন্যত্র আল্লাহ বলেন, এ কারণেই আমি বনি ইসরাইলের প্রতি নির্ধারণ করে দিয়েছি যে হত্যার বদলায় হত্যা বা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কেউ যদি কাউকে হত্যা করল তবে সে যেন গোটা মানবজাতিকেই হত্যা করল, আর কেউ যদি কারও প্রাণ বাঁচাল তবে সে যেন গোটা মানবজাতির প্রাণ বাঁচিয়ে দিল। সূরা মায়িদা, আয়াত-৩২। আফসোস, তারা যদি বুঝত যে প্রতিহিংসা ও খুন ঝরিয়ে নয়, নিজেদের উত্তম আখলাক প্রদর্শন করে দ্বীনের দিকে আহ্বান করাই হচ্ছে ইসলামী দাওয়াহ ও এ তাবলিগেরই মূল উসুল!

মানুষ যখন নিজের ভুল অবস্থানে ও ব্যাখ্যায় সুদৃঢ় থাকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তখন আল্লাহ তাদের বোধশক্তি ও সঠিক বুঝের চিন্তা দূরে সরিয়ে নেন।

পরিস্থিতি মনে হচ্ছে, সরকার আলেমদের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় মাওলানা সাদের অনুসারীরা নির্বাচনকালীন সরকার ও সময়কে মোক্ষম মনে করে বিভিন্ন প্রোগ্রামের উদ্যোগ নিয়েছে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়ার জন্য। আর বিপরীত পক্ষ! তারাও ছেড়ে দেয়ার লোক নয়।

এ যে জেহাদ। না বন্ধু, কোনো কুফরি শক্তির বিরুদ্ধে নয়। খোদ একই তরিকায় দ্বীনের দায়ীর বিপক্ষে জয়ী হওয়ার জেহাদ! তা-ই যদি না হবে তবে কেন শতাধিক মানুষের রক্তে রঞ্জিত হল উত্তরা ও টঙ্গী? তবে কি দ্বীনের একনিষ্ঠ এ দাওয়াতের একনিষ্ঠতা তথা খুলুসিয়্যাত নষ্ট হয়ে গেছে?

কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর রাস্তায় মেহনতের এতদিনকার প্রচলন কি ভেস্তে গেছে? যদি তা-ই হয়ে থাকে তবে কেন?

এর পেছনের কারণ হতে পারে তাবলিগ জামাতের কাজ দ্বীন প্রচার তথা দ্বীনি দাওয়াতের একটি পন্থা হলেও বর্তমান পর্যায়ে এসে একেই আসল দ্বীন মনে করে নিচ্ছে কিছু মানুষ।

ধর্মের নিগূঢ় জ্ঞানের অভাব এবং গোঁড়ামি মানসিকতার কারণে ইসলামের পাঁচ খুঁটির চেয়ে তাদের কাছে তাবলিগের ছয় উসুল হয়ে গেছে মুখ্য।

অথচ হজরতজি ইলিয়াস (রহ.) এ ছয় উসুলকে বেছে নিয়েছিলেন আল্লাহর নির্দেশ : আপনার পালনকর্তার পথে আহ্বান করুন উত্তম উপদেশ ও হিকমাহ তথা প্রজ্ঞার মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন উত্তম পন্থায়... (সূরা আন-নাহল, আয়াত-১২৫)- মোতাবেক একটি উত্তম পন্থা হিসেবে।

ফলে যতদিন এটি একটি উত্তম পন্থা ছিল ততদিন এর প্রসারে বহু মানুষের বিরোধিতার পরও আল্লাহর রহমত ছিল। এতে কোনো ধরনের বিভক্তি ছিল না।

কিন্তু কালক্রমে কিছু মানুষ একেই প্রকৃত দ্বীন হিসেবে ভাবতে শুরু করায় দেখা দিয়েছে বিরোধ, বিভক্তি, এমনকি ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ। সামান্য মতবিরোধ রূপ নিয়েছে মুখোমুখি সংঘর্ষে। এমনকি কেউ কাউকে এক বিন্দু ছাড় দিতে রাজি হচ্ছে না, যদিও দু’পক্ষই মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করছেন।

আমাদের আশঙ্কা, দ্বীনের দাওয়াতের পদ্ধতি থেকে যখন এটিকে খোদ দ্বীনের আকৃতি বানিয়ে ফেলেছে কিছু মানুষ, তখন মুমিন মুসলমানের কোরআন তথা দ্বীনের হেফাজতের (সূরা আল-হিজর, আয়াত-৯) ওয়াদা মোতাবেক এ বিভক্তি চলে এসেছে আল্লাহর পক্ষ থেকেই।

কারণ, আমরা দেখতে পাচ্ছি দুই দিকেই আলেম আছেন তারপরও কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছেন না। মাত্র কিছুদিন আগেও মাওলানা সাদের বয়ান শোনার জন্য মুখিয়ে থাকা আলেমরা ছোটখাটো কিছু বিরোধ নিয়ে তাকে আর সহ্য করতে পারছেন না। আবার একসময় নিজের চাদর বিছিয়ে দেয়া মুরব্বি আলেমদের বারবার দেয়া তাগাদাকে কোনো ধরনের পরোয়া না করে নিজের মতে অনড় মাওলানা সাদ।

কোনো ধরনের আর্থিক বা দুনিয়াবি সুযোগ-সুবিধা না থাকার পরও আমির পদ থেকে তাকে টলানো যাচ্ছে না। দু’পক্ষই মানুষকে খালেস দ্বীনের দিকে ডাকছে, অথচ একে-অপরকে, মাত্র কিছুদিন আগেও এক প্লেটে খাওয়া ভাইকে সহ্য করতে পারছে না, সমালোচনার সীমা ছাড়িয়ে ‘এতায়াতি’ ও ‘আমির অমান্যকারী’ মন্দ নামে একপক্ষ অন্যপক্ষকে উপহাস করছে। অথচ আল্লাহ বলেন : মুমিনরা! কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে... ও মন্দ নামে না ডাকে... (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত-১১)। শুধু কি তাই, আকস্মিক প্রতিপক্ষ হয়ে পড়া ভাইয়ের ওপর হাত তোলা ও হত্যাচেষ্টার সীমা ছাড়িয়ে গেছে তারা। এ অবস্থায় আল্লাহর বাণী নিশ্চয়ই আমার বান্দাদের মধ্যে আলেমরা আল্লাহকে ভয় করে (সূরা আল-ফাতির, আয়াত-২৮)- এর ওপর কারা আছে? আমরা মনে করি দু’পক্ষই আছে।

কিন্তু এ তাবলিগই দ্বীন বা দ্বীন প্রচারের একমাত্র পদ্ধতি নয়, তারপরও একেই একমাত্র দ্বীন মনে করার মানসিকতা যাদের পেয়ে বসেছে, তাদের মোহভঙ্গ করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকেই এমনটি হচ্ছে।

সকাল-বিকাল হায়াতুস সাহাবা পড়া মানুষ যখন বুঝতে পারেন না সাহাবিদের (রা.) পারস্পরিক আচরণ কেমন ছিল? তারা পড়ছেন আল্লাহর বাণী : মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল এবং তার সঙ্গীরা কাফেরদের বিরুদ্ধে কঠোর ও নিজেদের মাঝে পরস্পর সহানুভূতিশীল-নরমদিল-দয়ালু (সূরা আল-ফাতহ, আয়াত-২৯), অথচ মসজিদের বাইরে গেলে তারা নিজেদের স্বার্থে কঠোর হয়ে যাচ্ছেন। এমনকি তারা যে মন্দ কাজ করছেন তাও বুঝতে পারছেন না। এর ইঙ্গিত কী?

নিশ্চয় এর ইঙ্গিত আমরা যে পদ্ধতিতে কাজ করছি তা অপরিহার্য কিছু নয় আর এটাই আধুনিক সময়ে দ্বীন প্রচারের একমাত্র পদ্ধতিও নয়।

আল্লাহ বলেন : তিনি আল্লাহ, যিনি তার রাসূলকে (সা.) হেদায়েত ও সঠিক দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন যাতে তার দ্বীনকে অন্য সব ধর্মের ওপর জয়যুক্ত করেন এবং প্রতিষ্ঠাতারূপে আল্লাহই যথেষ্ট (সূরা আল-ফাতহ, আয়াত-২৮)। যুগে যুগে এ দ্বীনের দাওয়াতকে সামনে রেখে অনেক পদ্ধতি চালু হয়েছে আবার সময়ের ব্যবধানে তা হারিয়েও গেছে। খুব বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। সমসাময়িক ডা. জাকির নায়েকের প্রচার পদ্ধতিই ধরুন।

তিনি আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন উত্তমরূপে বিতর্ক করে দাওয়াত দেয়ার মাধ্যমে। আবার যে কোনো কারণে তার দাওয়াতি পদ্ধতি এখন বন্ধ। তাই বলে ইসলামের দাওয়াত তো থেমে থাকছে না।

সে হিসেবে এ তাবলিগ তো মাত্র এক শতাব্দীর কাছাকাছি সময় আগে এসেছে। এটিও হয়তো এক সময় হারিয়ে যাবে। হজরতজি ইলিয়াসকে (রহ.) যদি আমরা এক শতাব্দীর দ্বীনি দাওয়াতের মুজাদ্দিদও ধরি, তাহলেও বলা যায় এর চেয়ে ভালো কোনো পদ্ধতি নিয়ে হয়তো আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্য কেউ আসবেন দ্বীন প্রসারের জন্য। কারণ দ্বীন এক ও অদ্বিতীয়; কিন্তু এর প্রচারের মাধ্যম হবে অগণিত সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আল্লাহ সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন।

লেখক : সাংবাদিক; তাবলিগের পুরনো সাথী, মেখল-হাটহাজারী মাদ্রাসায় পড়ুয়া হাফেজ, মাওলানা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স

[email protected]