ভোটের শরিয়তি আলোচনা

  মুফতি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ২১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভোটের শরিয়তি আলোচনা

ভোটদাতাকে পরকাল বিবেচনা করে ভোটদান বা সাক্ষ্য দিতে হবে। কেবল প্রথাগত সম্মান বা লাজ-লজ্জায় অথবা কোনো লোভ-লালসা ও ভয়-ভীতির কারণে ভোট দিতে যাওয়া ঠিক হবে না।

ভোটের ইসলামী ব্যাখ্যা হচ্ছে, ‘শাফায়াত’ বা সুপারিশ অর্থাৎ ভোটদাতা প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিচ্ছেন, তার মানে তিনি সুপারিশ করছেন। এ সুপারিশ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ভোটার বা ভোট প্রার্থী সামনে থাকা অত্যন্ত জরুরি। (সূরা নিসা : ৮৫)

অর্থ : ‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো ও সৎ কাজে সুপারিশ করবে সে ওই ভালো কাজের ও নেকির অংশ পাবে; আর যে কোনো মন্দ কাজে বা খারাপ বিষয়ে সুপারিশ করবে সেও সেই মন্দের অংশীদার হবে’।

উত্তম সুপারিশ হচ্ছে যথোপযুক্ত ও সৎ আমানতদার প্রার্থীর পক্ষে সুপারিশ করা যিনি আল্লাহর সৃষ্টির হক অধিকার সঠিকভাবে আদায় করবেন।

আর মন্দ সুপারিশ বা ভোট দেয়া হচ্ছে অযোগ্য, অপদার্থ-পাপী-অপরাধী বা কোনো সন্ত্রাসীর পক্ষে সুপারিশ করে তাকে গণমানুষের শাসক হওয়ার সুযোগ করে দেয়া।

এ থেকে বুঝা যাচ্ছে, আমাদের ভোটে পাস করে প্রার্থী তার তিন বছর বা পাঁচ বছর সময়ের মধ্যে যতরকম নেক বা বদ কাজ করবে তার সব কাজের সওয়াব বা আজাবে আমরাও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।

যদি কোনো অযোগ্যকে ভোট দিয়ে প্রতিনিধি করা হয় তাহলে পুরো জাতির সব হক-অধিকার বিনষ্টের সব গুনাহ ওই ভোটদাতার আমলনামায় যোগ হবে।

অর্থাৎ যার ভোটে পাস করে অযোগ্য, অপদার্থ, সন্ত্রাসী মেম্বার, চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য যত রকম পাপ-অপরাধ করবে, দেশ ও জাতির যত অধিকার নষ্ট করবে, তার ভোট দেয়ার কারণে পাস করা মেম্বার, চেয়ারম্যান, এমপি-মন্ত্রীরা যত পাপের ভাগী হবেন সমপরিমাণ পাপের ভাগী সংশ্লিষ্ট ভোটার বা ভোটদাতা হবেন।

কেননা ভোটদাতার ভোটে পাস করেই তো এতগুলো অন্যায়-অপকর্ম করার সুযোগ পেলেন জনপ্রতিনিধিরা।

অযোগ্য, অসৎ ব্যক্তিকে ভোট প্রদান মানে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, মন্দ সুপারিশ করা এবং অবৈধ ও না-জায়েজ অংশগ্রহণ করে তার ধ্বংসাত্মক ফলাফল ও তার সমপরিমাণ পাপরাশি ভোটদাতার আমলনামায় টেনে আনা।

তাই প্রত্যেক ব্যক্তি যিনি কোনো আইনসভা, রাজ্যসভা, স্থানীয় সরকার বা সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের ছোট-বড় কোনো সদস্যপদের প্রার্থী হলে তার পরকালীন জবাবদিহিতার ভয় থাকতে হবে।

তাকে নির্বাচনের ময়দানে আসার আগে তিনি নিজেই যেন নিজের পরীক্ষা নিয়ে নেন এবং এমনটি ভাবেন যে, এ দায়িত্ব নেয়ার আগে তার দায়-দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা কেবল নিজের ও নিজ পরিবার-পরিজন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল।

হাদিসের নির্দেশ অনুযায়ী ‘প্রত্যেক মানুষ নিজ পরিবার ও অধীনস্থদের ব্যাপারেও দায়িত্বশীল’।

আর এখন থেকে যখন কোনো আসনের সদস্যপদে নির্বাচিত হওয়ার পর এ আসনের সব জনগণ এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবরকম দায়-দায়িত্ব ভালো-মন্দ, সুবিধা-অসুবিধা, সুখ-দুঃখের সার্বিক জবাবদিহিতা তার নিজের ঘাড়ে চেপে বসল।

এ জন্য তাকে ইহকাল-পরকাল দুই জগতে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে।

কেউ কেউ বলেন, ‘অযোগ্যকে ভোট দিলে গুনাহ্’ বটে, তবে আমরা আর কতটুকু নেককার? আমরাও তো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অসংখ্য পাপে ডুবে থাকি! নিজের এসব পাপের তালিকায় যদি আরও একটি ভোট দেয়ার পাপ যুক্ত হয়, তাতে আর কী সমস্যা?

ভালো করে বোঝার চেষ্টা করুন! এটাই নফস ও শয়তানের সবচেয়ে বড় ধোঁকা। প্রথমত, কোনো মানুষ যদি প্রতিটি পাপের বেলায় এমনটি ভাবে, তা হলে সে কখনও কোনো পাপ থেকেই বাঁচতে পারবে না।

যদি কোনো ব্যক্তির দেহে অল্প পরিমাণে নাপাকি, মলমূত্র লেগে যায় তা হলে তার তা থেকে পবিত্র হওয়ার চিন্তা করা জরুরি।

দ্বিতীয় বিষয় হল, পাপে পাপেও বিরাট পার্থক্য থাকে। যেসব পাপের অনিষ্ট ও মন্দ ফলাফল পুরো জাতিকে ভোগ করতে হয়; সেসব পাপ ব্যক্তিগত পাপের তুলনায় অনেক মারাত্মক ও ভয়াবহ। ব্যক্তি পর্যায় বা প্রকৃতির পাপ-অপরাধ যত বেশিই হোক না কেন, যত মারাত্মকই হোক না কেন; তার প্রভাব ও ক্ষতি দু-চারজন অতিক্রম করে না।

যে কারণে তার ক্ষতিপূরণ বা দায় মুক্তি সাধ্য-সীমার ভেতরে থাকে; তা থেকে তাওবা ইস্তেগফার করে নেয়াও সহজ হয়ে থাকে এবং তার জন্য ক্ষমাপ্রাপ্তির প্রত্যাশাও করা যায়। যে পাপের মন্দ ফলাফল পুরো দেশ ও জাতির সবাইকে ভোগ করতে হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ, ভর্তুকি, সংশোধনের কোনো পথ থাকে না।

এটা এমন তীর বা গুলি যা একবার তীর বা বন্দুক থেকে বেরোলে ফিরিয়ে নেয়ার আর সুযোগ থাকে না। যে কারণে এ ক্ষেত্রে কোনো মানুষ যদি তার এমন বদ আমল থেকে ভবিষ্যতের জন্য তওবাও করে তবুও তার পুরনো অপরাধের দায়-দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া কঠিন এবং তার মুক্তির আশা অত্যন্ত ক্ষীণ।

তাই খারাপ ব্যক্তিকে ভোট দেয়া মানে- তার যত পাপ, চুরি, ডাকাতি, ব্যভিচার এর অংশি আপনি হলেন, এ পাপের তুলনা অন্যান্য পাপের সঙ্গে করা যায় না।

কেউ কেউ আবার এমনটিও ভাবে, লাখ লাখ ভোটের মধ্যে আমার একটা ভোটের মূল্যই বা আর কী? তা যদি অপাত্রে ব্যবহৃত হয়েও যায়, তাতে আর দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের ওপর কী বা তেমন প্রভাব ফেলবে?

ব্যাপারটি বুঝে রাখুন! যদি ভোট দিতে গিয়ে তেমনটি ভাবতে শুরু করেন, তা হলে এটা স্পষ্ট, পুরো একটা আসনে বা দেশে কোনো একটা ভোটও সঠিক ও যথাস্থানে পড়বে না।

আবার আমাদের এতদঞ্চলে ভোট গণনার যে প্রচলিত প্রথা বা নিয়ম, সে হিসেবে শুধু একজন অজ্ঞ-মূর্খের একটি ভোটই দেশ ও জাতির ভাগ্য নির্ধারণে সিদ্ধান্তকারী হয়ে যেতে পারে।

একজন ধর্মহীন বা ধর্মবিরোধী, বিকৃত বোধ-বিশ্বাসধারী অসৎ দুর্নীতিবাজ প্রার্থীর ব্যালটবাক্সে যদি শুধু একটি ভোট অন্যদের চেয়ে বেশি পড়ে, সে বিজয়ী হয়ে পুরো জাতির ওপর চেপে বসবে।

আর এভাবে কখনও কখনও কেবল একজন অজ্ঞ-মূর্খ মানুষের একটি ভোটের ব্যবধানে, সামান্য অবহেলা, অসচেতনতা, ভুল-ত্রুটি কিংবা অসততায় পুরো দেশ ও রাষ্ট্রের ধ্বংসের কারণ হতে পারে, রাষ্ট্রপরাধীন হয়ে যেতে পারে।

যে কারণে প্রচলিত ব্যবস্থাপনায় এক একটি ভোটও অনেক মূল্যবান। আর এ জন্যই প্রত্যেক ব্যক্তিরই শরিয়ত নির্ধারিত, নৈতিক, জাতীয়, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হল তিনি তার ভোটকে ঠিক মূল্যায়ন করে মনোযোগ দিয়ে নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে ব্যবহার করবেন।

লেখক : মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

যোগাযোগ : ০১৬৪২১২৭০০৭

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×