দেশের ভালো চাইলে সৎ মানুষকে ভোট দিন

  মুফতি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সৎ মানুষকে ভোট দিন

ভোট বিষয়ে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, অত্যাচারী, পাপাচারী, ও বেঠিক লোককে ভোট দিলে পাপের কারণ হয়ে থাকে; ঠিক তেমনি একজন সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেয়াতে সওয়াবও রয়েছে।

শুধু তাই নয় বরং তা একটি শরিয়ত নির্দেশিত যৌথ বা সামষ্টিক ফরজও বটে। (মুফতি মুহাম্ম্দ শফী (র.) : জাওয়াহিরুল ফিকহ : খ-২, পৃ-২৯৩, মাকতাবা দারুল উলূম, করাচি)

পবিত্র কোরআন যেভাবে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকে হারাম করেছে একইভাবে সত্য সাক্ষ্য দেয়াকে জরুরি ও আবশ্যকীয় বলে নির্ধারণ করে দিয়েছে। আল্লাহ ইরশাদ করেন।

তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য দান কর। (নিসা : ১৩৫) ‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায়-সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে।’ (মায়িদা : ৮)

আয়াতে মুসলমানদের প্রতি সত্য-সাক্ষ্য দানকে ফরজ করে দেয়া হয়েছে যেন কেউ তা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা না করে। আল্লহর সন্তুষ্টির জন্য, তাঁর নির্দেশ মনে করে সত্য সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে সবসময়।

সূরা তালাকে ইরশাদ হয়েছে- ‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে সাক্ষ্য দেবে।’ (তালাক : ০২)। এ আয়াতে সাক্ষ্য দান ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করতে বলা হয়েছে যা কিনা যৌথভাবে হয়ে থাকে। আরেকটি আয়াতে ইরশাদ হয়েছে।

‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন করবে না; আর যে তেমনটি করবে তার অন্তর পাপরাশিতে বিষাক্ত হয়ে পড়বে।’ (বাকারা : আয়াত নং-২৮৩)। অর্থাৎ, সত্য সাক্ষ্য না দিয়ে তা গোপন করা হারাম ও পাপ। সব আয়াতে সত্য সাক্ষ্য দেয়াকে মুসলমানের প্রতি ফরজ বলে দেয়া হয়েছে।

সুতরাং কোনোভাবেই মুসলমানরা সত্য সাক্ষ্য দিতে পিছপা হবেন না এবং কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না।

বর্তমানে যেসব অন্যায়-অপকর্ম-অপরাধ-সন্ত্রাস নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে তার অন্যতম একটি বড় কারণ হচ্ছে, নেককার ও সৎলোকদের বড় একটি সংখ্যা সাধারণত ভোট দেয়া-নেয়া এসব থেকে পালিয়ে থাকেন।

তার কারণ, তারা মনে করেন, নির্বাচন হারাম, গণতন্ত্র হারাম, ভোটাভুটি হারাম; এসব দুনিয়াদারি কর্মকাণ্ড বলে থাকেন। যার ফলাফল হচ্ছে- খারাপ লোকের শাসন, ভোট দিতে তারাই যায় বেশি যারা দু-চার টাকায় বিক্রি হয়ে যান।

আর বিক্রি হয়ে যাওয়া ভোটাররা কেমন প্রকৃতির প্রার্থীদের নির্বাচিত করবে বা করতে পারে তা তো সুস্পষ্ট। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যেনতেন ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে পুরো জাতির ঘাড়ে চেপে বসছে অযোগ্য, অপদার্থ, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজরা।

এ জন্য, প্রতিটি অঞ্চলে-কেন্দ্রে-আসনে যাকে অপরাপর প্রার্থীর তুলনায় নেককার বা সৎ মনে হয় তাকে ভোট দেয়া ছাড়া বিকল্প কোনো সুযোগ নেই এবং এ ক্ষেত্রে পালিয়ে থাকা বা অবহেলা করা শরিয়তের দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ এবং পুরো দেশ ও জাতির প্রতি জুলুম-অবিচারের নামান্তর হবে।

এমনকি কোনো আসনে যদি কোনো একজন প্রার্থীও সঠিক অর্থে পুরো সৎ ও আমানতদার না পাওয়া যায়; তবে যে কয়জন প্রার্থী রয়েছেন তাদের মধ্যে দ্বীন-ধর্ম, সততা, যোগ্যতায় এবং আল্লাহভীতিতে যিনি কিছুটা অগ্রগামী অর্থাৎ, যিনি অপকর্ম কম করবেন, তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা বৈধ এবং উত্তমও বটে।

যেমন কিনা মন্দ কমাতে সচেষ্ট হওয়া এবং জুলুম-নির্যাতন কমাতে চেষ্টা করা, শরিয়তেরই আরেকটি আইনি নীতিমালা হিসেবে প্রমাণিত, এমনটাই ফকিহ ইমাম ও ইসলামী আইন গবেষকদের ব্যাখ্যা।

এ আলোচনার সারসংক্ষেপ হচ্ছে, নির্বাচনগুলোয় ভোট প্রদান বিষয়টি শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যূনতম সাক্ষ্য প্রদান কর্মের অন্তর্ভুক্ত যা গোপন করাও হারাম এবং তাতে মিথ্যার আশ্রয় নেয়াও হারাম।

এটিকে শুধু একটি রাজনৈতিক হার-জিত এবং জাগতিক খেলা মনে করা মারাত্মক ভুল। আপনি যাকে ভোট দিচ্ছেন শরিয়তের মাপকাঠিতে তার অর্থ হচ্ছে আপনি এ মর্মে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন যে, এ ব্যক্তি নিজের বোধ-বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা জ্ঞান-অভিজ্ঞতা এবং সততা ও আমানতদারি প্রশ্নে এ দায়িত্ব পালনে উপযুক্ত এবং অন্যসব প্রার্থীদের চেয়ে উত্তম।

* আপনার ভোট ও সাক্ষ্যদানে যে জনপ্রতিনিধি সংসদ বা আইন সভায় পৌঁছবেন তিনি যতরকম ভালো-মন্দ পদক্ষেপ নেবেন তার দায়দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা আপনার-আমার ওপরও বর্তাবে। আমরাও তার সঙ্গে একই পাপ-পুণ্যের অংশীদার হব।

* মনে রাখতে হবে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে বা কারও একার কর্মকাণ্ডে কোনো ভুল হয়ে গেলে তার ভালো-মন্দ প্রভাব ব্যক্তি ও সীমিত পর্যায়ে পড়ে থাকে; পাপ-পুণ্যও সীমিত হয়ে থাকে। অন্যদিকে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে পুরো জাতি তাতে প্রভাবান্বিত হয়ে থাকে। তার সামান্যতম ক্ষতিও ক্ষেত্রবিশেষে কখনও কখনও পুরো জাতির ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। তাই তার সওয়াব বা শাস্তিও অনেক বেশি ও বড়।

* সত্য সাক্ষ্য গোপন করা পবিত্র কোরআনে হারাম বলা হয়েছে। তাই আপনার কেন্দ্রে বা আসনে নির্বাচনে যদি কোনো সঠিক বোধ-বিশ্বাস সম্পন্ন, ধর্মপরায়ণ প্রার্থী প্রস্তুত থাকেন তাহলে তাকেই ভোট দিতে হবে। এতে ত্রুটি বা ব্যতিক্রম করা কবিরা গুনাহ।

* যে প্রার্থী ইসলামী শাসনব্যবস্থাবিরোধী ধ্যান-ধারণা পোষণ করেন বা ইসলামবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন হন তেমন কাউকে ভোট দিলে একটি মিথ্যা সাক্ষ্যের অপর নাম যা ‘কবীরা গুনাহ’। (মিশকাত শরিফ : ব. হা. প্রাগুক্ত : পৃ-২৯২)

* টাকা-পয়সার বিনিময়ে ভোট প্রদান সর্ব নিকৃষ্ট পর্যায়ের ঘুষ গ্রহণ হিসেবে গণ্য এবং কয়েকটি টাকার খাতিরে ইসলাম ও রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল হবে।

অন্যদের জাগতিক জীবন জৌলুসপূর্ণ করতে গিয়ে নিজের দ্বীন-ধর্ম কোরবানি করা, চাই তা যত বেশি মাল-সম্পদের বিনিময়েই হোক না কেন; কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন : ‘ওই ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত যে অপরের দুনিয়া অর্জনের স্বার্থে নিজের ধর্ম বিকিয়ে দিল।’ (প্রাগুক্ত : পৃ-২৯৫)।

লেখক : মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

যোগাযোগ : ০১৬৪২১২৭০০৭

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×